somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মধুর ক্যান্টিনের অরুনদা একজন রাজনৈতিক কালের সাক্ষী

২৬ শে মার্চ, ২০১৪ রাত ৮:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অরুনদা – ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের পরিচালক বা মালিক । উনার বাবা প্রয়াত মধুদা ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ পাক বাহিনীর হাতে নিহত হন । ১৯৭১ পূর্ববর্তি স্বাধীনতার সংগ্রামে এই দেশের ছাত্র সমাজ যখন দুর্বার আন্দোলনে নিমজ্জিত । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীনতা পূর্ব বাংলাদেশের একমাত্র রাজধানী মনে করা হত সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি পরিচালিত হতো তখন ৪ খলীফা খ্যাত ৪জন ছাত্রনেতার নেতৃত্বে । সেই ছাত্র নেতাগণ হলেন তৎকালীন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি শাহজাহান সিরাজ ও সাধারন সম্পাদক নুরে আলম সিদ্দিকি এবং ডাকসু ভিপি আসম আব্দুর রব ও ডাকসু জিএস আব্দুল কুদ্দুস মাখন । এই ৪ জন কখনই একা চলতে পারতেন না । যখনই হাঁটতেন বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য় ক্যাম্পাসে চলাফেরা করতেন সাথে ৫০-১০০ জন কর্মী সমর্থক পরিবেষ্টিত থাকতেন । আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং সেই সাথে ১৯৯০ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে একটি ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির প্রথমে আহবায়ক ও পরে সাধারন সম্পাদক থাকার কারনে অনেক লম্বা সময় মধুর ক্যান্টিনে পার করতে হয়েছে । কখনও সেই সকাল ১০/১১ টা থেকে টানা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাটিয়ে দিতে হয়েছে । সংগত কারনেই অরুনদা ছিল একজন কাছের মানুষ । এমনও সময় ছিল যে অনেকেরই বাড়ি থেকে চিঠিপত্র C/O অরুনদা , মধুর ক্যান্টিন এই ঠিকানায় আসতো । তখন তো আর মোবাইলের যুগ ছিল না , চিঠিপত্রই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল । কিংবা সকল ছাত্র সংগঠনেরই তিনি ছিলেন রিলে সেন্টার । সকল খবরাখর উনার মাধ্যমেই আদান প্রদান করা হতো । কাজটি করতেনও তিনি অত্যন্ত আনন্দ ও নিষ্ঠার সাথে । সকাল ১০ টা থেকে বেলা ১ টা পর্যন্ত অরুনদা ব্যাস্ততার জন্য দম ফালানোর সময় পেত না । একদিকে উনি চিৎকার করে বলছেন এই এখানে কত বিল আর একদিকে চিৎকার করে বলছেন শাহীন ভাই অমুখ আপনাকে এই বলেছে । আমাদের সময় আমরা চাঁদা তুলে ব্যানার ফেস্টুন তৈরি করতাম । বিশেষ করে মিছিলের অগ্রভাগে একটি ব্যানার থাকতো । রুটিন মিছিল ছাড়া সপ্তাহে প্রায় দুই তিন দিনই ইস্যু ভিত্তিক মিছিল থাকতো । সেই মিছিলের জন্য ব্যনার তৈরি হতো নিলখেতে । কাপরের উপর কালি দিয়ে একজন আর্টিস্ট তা লিখে দিত । এই কাজের জন্য কাপর কেনা ও লেখার খরচ বাবদ কিছু টাকা নিয়মিত প্রয়োজন পড়তো । কতদিন টাকা টাকা জোগাড় করতে না পেরে অরুনদার কাছ থেকে ধার নিয়েছি । প্রতিদিনের চা-নাস্তার খাবার তো বাকি থাকতোই । কোন ধার অরুনদাঁকে ফেরত দেয়া হয়েছে এমন রেকর্ড অন্ততঃ আমার জানা নেই । আবার ধার ফেরত দেয়া হয় নাই বলে পুনারায় ধার পাওয়া যায় নাই বা চা-নাস্তার বাকি বন্ধ হয়েছে এমন রেকর্ডও নাই । সেইটা যে শুধু আমরা করেছি তাই নয় , তৎকালীন সকল ছাত্র সংগঠনেরই একই অবস্থা এবং ত্রাতা হচ্ছে অরুনদা । এই খবর অবশ্য নেতৃবৃন্দ ছাড়া সাধারন কর্মীরাও জানে না । সাধারন মানুষতো দূরের কথা । অরুন্দা কিন্তু সেই সমস্ত বাকির খাতা ইতিহাস হিসেবে রেখে দিয়েছে । শুনেছি উনার বাবার আমল থেকে যে সমস্ত বাকি আছে সবই সেই খাতায় লিপিবদ্ধ । মাঝে মাঝে ক্যান্টিনের একদম খাস কামড়ায় অরুনদার পাশে গিয়ে বসতাম । সেটা সম্ভব হতো দুপুর আড়াইটা তিনটার দিকে । তখন হয়তো কারও জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু মধুর ক্যান্টিনে পরিচিত কেউ নেই কিংবা ক্ষিধা লেগেছে , পকেটে টাকা নেই , এখন বাকিতে খেতে হবে । সেই সময় টুকি টাকি নানান কথা হতো । উনার ছেলেবেলার কথাও উনি বলতেন । ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী ছাত্র আন্দোলনের সময় উনার বয়স মাত্র ১০/১১ বা তার চেয়ে কিছু কম বেশি হবে । মধুদা সকালে বাজারে যেতেন । সেই সময়টায় অরুনদার উপর ক্যান্টিনের দায়িত্ব থাকতো । বয়সে ছোট থাকার কারনে উনি সব কিছু সামাল দিতে পারতেন না । সেই সাথে ৪ খলিফার আনাগোনা সার্বক্ষণিক ভাবে ছিল । একজন ঢুকলে কমপক্ষে ৫০-১০০ কাপ চা দিতে হতো । চা খেয়েই নেতারা চলে যেতেন । বিল লিখতে অনেক সময় অরুনদার সমস্যা হতো । মধুদা বাজার থেকে এসে জিজ্ঞাসা করতেন বাকীর খাতা ঠিকমত লেখা হয়েছে কিনা । অরুনদা তা কোনদিনই ঠিকভাবে লিখতে পারতেন না । তখন মধুদা জিজ্ঞেস করতেন রব (আসম আব্দুর রব ) কয়বার এসেছিল , যদি দুইবার আসতো তবে উনার নামে ১৫০ কাপ চা লেখা হতো, আবার জিজ্ঞেস করতেন সিরাজ (শাহজাহান সিরাজ) কয়বার এসেছিল । যদি একবার আসতেন তবে উনার নামে ৬০ কাপ চা এর দাম বাকীর খাতায় লেখা হতো । এইভাবে কোন নেতা কয়বার আসতেন তার উপর বিল লেখা হতো এবং কার সাথে আনুমানিক কতজন থাকতে পারেন তা মধুদার জানা ছিল । বাংলাদেশের বর্তমান বড় বড় রাজনীতিবিদরা প্রায় সকলেই মধুর ক্যান্টিন এর রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাথে জড়িত । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হউক বা না হউক মধুর ক্যান্টিনে যেতেই হতো । মধুর ক্যান্টিনই ছিল মুলত রাজনীতির অফিস । অন্তত ৯০’র আন্দোলন পর্যন্ত আমরা তাই দেখে এসেছি । মধুদা থেকে শুরু করে বর্তমান অরুনদা পর্যন্ত সেই বাকীর খাতায় যাদের নাম আছে তারা আজ সকলেই রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভাবে প্রতিষ্ঠিত । কিন্তু অরুনদা এখনও ক্যান্টিন চালায় । বাকীর খাতা হয়তো শুধু ইতিহাস হয়েই থেকে যাবে ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×