somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আলেকজান্দ্রিয়া কড়চাঃ ক্লিউপেট্রা যেখানে হেঁটেছিল…!!!

২৭ শে অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৪:৫৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমিও সোল্লাসে চোখ-মুখ বাঁকায়ে, মাথা ঝাঁকায়ে চুইংগামের মতো টেনে লম্বা করে বললুম , ‘ইয়াহ, ইয়াহ, আলিইস্কান্দ্রিয়াআআআঅ্যাঅ্যা, আলিস্কান্দ্রিয়াআআআআআঅ্যা’। ক্যাপ্টেন মারভেল আমার দিকে অদ্ভুত ভঙ্গিতে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন।

************************************************************

সকাল আটটায় আলেকজান্দ্রিয়ার ট্রেন। হোটেল থেকে পাঁচ মিনিটের হাঁটা দূরত্বে আটাবা মেট্রো স্টেশন। ঘোড় পদক্ষেপে সেখানে গিয়ে তিন মিশরীয় পাউন্ডে পাশের এক স্টেশন পরেই আল সোহাদা স্টেশন। এখানেই কায়রোর প্রধান ফ্যারাও রামেসিস রেল জংশন । জংশনের ভিতরে চমৎকার কারুকাজ করা। মিশরের এই জিনিসটা বেশ। সবখানেই প্রাচীন প্রাচীন ভাব। মাঝে মাঝে মনে হবে পৃথিবী বুঝি থেমে আছে সেই তিন-চার হাজার বছর আগে। অসংখ্য বই পড়া ও সিনেমায় দেখা বিষয়গুলো চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিচ্ছে এ যে বিস্ময়রে পাগলু!

কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। ভিতরে ঢুকে মাথায় প্যাঁচ খাওয়া আফ্রিকিয় চুলের মোটাসোটা গোছের একজনকে জিজ্ঞেস করলুম, ‘ভাইজান গো, আলেকজান্দ্রিয়ার ট্রেনটা কোন প্লাটফর্মে খাড়ায় আছে। একটু কন দেহি চি’। লোকটি বোয়াল মাছের মতো বিরাট হাঁ করে চোখগুলোকে ৫০% ছোট করে কি সব বিড়বিড় করে চলে গেল। আরেকজনকে জিজ্ঞেস করলাম --এখানেও একই কান্ড। ঘটনা কী? মিলিটারি জান্তা সিসির মাইনকা চিপায় পড়ে সকলের জবান গলার চিপায় আটকে গেছে নাকি! ভীনদেশী ভাষা জানা-বুঝা লোকের সংখ্যা নিতান্তই কম হওয়ায় এটি একটি বিরাট বিড়ম্বনায় বটে।

ছবি-২: আলেকজান্দ্রিয়া শহরের ম্যাপ(আংশিক)। বামপাশের সমুদ্রের তীর ধরে চিন্হিত স্থান-কোইটবে সিটাডল, আল-আব্বাস আল-মুরসি মসজিদ, আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরী ও উপরে মাহাত্তারুন কাতারুন।

ছবি: রামেসিস ট্রেন স্টেশন(অন্তর্জাল)

যাহোক, এদিকে আমাদের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমার বন্ধুর উপর আবার এক্টুতেই টেনশন বাবা ভর করে। ট্রেন ছেড়ে গেলে বাবার কেরামতি শুরু হবে। বিপদ। এবার সামনে বিশালদেহী এক পুলিশ ভায়াকে দেখে উনাকে আমাদের ক্যাপ্টেন মারভেল বানালুম। প্রাচীন ক্লিউপেট্রার আলেকজান্দ্রিয়ার কথা পাড়তেই উনি টিকিট দেখতে চাইলেন। টিকিট দেখে মুচকি হাসি দিয়ে আরবীর লোকমাতে বিশাল টান দিয়ে, ‘আলিইস্কানদেরিয়েএএএ, আলিস্কানদেরিয়েএএএ’।

আমরাও মনে মনে বুঝলুম সমস্যা তাহলে এই ‘আলিবাবার ইসকনদে’। আমিও সোল্লাসে চোখ-মুখ বেঁকিয়ে আরবীকে চুইংগামের মতো টেনে লম্বা করে, ‘ইয়াহ, ইয়াহ, আলিইস্কান্দ্রিয়াআআআ, আলিস্কান্দ্রিয়াআআআ’। ক্যাপ্টেন মারভেল আমার এই অদ্ভুত উল্লাসে এক সেকেন্ড থম মেরে থেকে বিকট হাসি দিয়ে আমাদেরকে মার্চ করে এগিয়ে চলল। বেচারা মনে হচ্ছে বিরাট মজা পেয়েছেন আমার আরবীর গ্রেটওয়ালীয় টান দেখে। দূর থেকে হাত দিয়ে ইশারা করে জানালেন প্লাটফর্মে দাঁড়ানো ট্রেনটাই, ‘আলিস্কান্দ্রিয়াআআআআআআআআআআআআ’।--বলে আবার বিকট হাসি দিয়ে প্রাপ্য ধন্যবাদ নিয়ে চলে গেলেন। ক্যাপ্টেন মারভেল আমাকে ভেংচি কেটে দিল মনে হচ্ছে।

আমাদের মতো আরো পশ্চিমা ও ফার ইস্টের পর্যটককেও দেখলাম হন্তদন্ত করে দুলকি চালে ‘আলিস্কানদেরিয়েএএ’ ট্রেন ধরতে আসছে।

লাফিয়ে উঠলুম ট্রেনে। এক বয়স্ক বাবাজি শেষ বারের মতো ট্রেনকে ঝাড় পোছ করছে। উনাকে মুচকি হাসি দিয়ে টিকিট ধরিয়ে দিলাম। উনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সহিত আমাদের সিটগুলো দেখিয়ে দিল। ট্রেনের সিটগুলো বেশ প্রশস্ত ও আরামদায়ক। একপাশে একটি সিট অন্যপাশে দুইটি, মাঝে আইল। পুরো ট্রেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এবং নির্দিষ্ট সময়েই চলাচল করে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার দিকেও বেশ সজাগ। তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে এতটা আশা করি নি, বিশেষ করে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে।

ছবি-৩: ক্লিউপেট্রার খুড়তুতো ভাইয়ের উবার গাড়ির খোঁজে মাহাত্তারুন কাতারুনের সামনে

ছবি-৪: প্রাচীন ইউরোপীয়ান স্টাইলের বাড়িঘর



কায়রো থেকে আলেকজান্দ্রিয়ার ট্রেন ভ্রমণটা বেশ এক্সসাইটিং ছিল। তবে একটি বিশেষ কারণে পুরো আনন্দটা জমে ক্ষীর আর হয় নি! আমি জানালার পাশের সিটে। হঠাৎ দেখি টপাক করে আমার পাশের খালি সিটে নেফারতিতির ছোটবোন ক্লিউপেট্রা এসে টুপ করে বসে পড়ল। আধুনিক ক্লিউপেট্রার পরনে জিন্স, জ্যাকেট ও মাথায় রাজকীয় মুকুটের বদলে স্কার্ফের মতো করে একটু মাফলার জাতীয় কাপড়। কানে হেডফোন লাগিয়ে মোবাইল টেপাটিপি করতে থাকল। আমি টেরা চোখে হিরু আলম স্টাইলে একবার দেখে নিলুম মিশরীয় সম্রাজ্ঞীকে। আমার ডানদিকে জানালার বাইরে নাইল ডেল্টার অপরূপ সৌন্দর্য। চিন্তা করছি, কোনটা বেশি অপরূপ ডানেরটা নাকি বামেরটা।

ভাবলাম জার্নিটা তাহলে দুর্দান্ত হবে। ডেল্টার সবুজের সমারোহ অবলোকন করতে করতে যাচ্ছি। কানে হেডফোনটা গুঁজে দিয়ে প্রিয় কিশোরদার গান ছেড়ে দিলাম ‘ এই পথ যদি না শেষ হয়/ তবে কেমন হতো তুমি বল তো’।

রাস্তার পাশে সারি সারি ফলের বাগান। বিশেষ করে সাইট্রাস জাতীয় ফলই বেশি, মানে কমলা আরকি! ২৪০ কিলোমিটারের মতো দূরত্ব। ট্রাভেল ডিউরেশন আড়াই ঘন্টার মতো।

কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর মনে হল পাশের সুন্দরী থেকে মিশর ও আলেকজান্দ্রিয়া সম্পর্কে জানি। এই ভেবে সম্রাজ্ঞীর দিকে ঘুরে তাকাতেই মিষ্টি স্বর ভেসে আসল,’ইন্ডিয়ান’। ‘নো, বাংলাদেশ’-- বাঙালী কৌতূহল নিয়ে আমিও মাগুর মাছের পিছলা হাসিতে ক্লিউপেট্রাকে জানালাম। খুশিতে উদ্ভাসিত হয়ে, ‘ব্যাঙলাডেছ, ব্যাঙলাডেছ’। আরো সব আরবিতে কি সব বলছিল এক বর্ণও বুঝলুম না। উচ্ছাসের কারণও বুঝলুম না।

নাম বললাম, ‘আ’ম আখে...’। খুবই সহজ ভঙ্গিতে হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে ছোট্ট করে আরবি একটি বাক্য বলল যার শেষের শব্দটি শুধু বুঝলুম মহারাণীর নাম। ইলিনা। মুখে পাকা পেয়ারার মতো হাসি ঝুলিয়ে ধরে আরবিতে আমাকে আরও কিছু বলল। আর আমি সেটা না বুঝতে পেরে কদবেলের মত শক্ত হাসিতে বুঝালাম, ‘আরবী, নাহি আতা, নাহি আতা’। সাহেবী ইংলিশটা যদি...। তীব্র মাথা ঝাঁকালো ডানে-বামে। হতাশ। আধুনিক ক্লিউপেট্রা ঘাগু ব্রিটিশদের উপহার গ্রহন করে নি।

মনে করলুম মিশরীয়রা যেহেতু শাহরুখ আর অমিতাভের ভীষণ ভক্ত সেহেতু...। আমাকে তব্দা করে দিয়ে ইশারায় জানালো সেটাও এক বিন্দু নয়। মনে মনে হতাশায় বললাম কোনটা তুমি জানো সুন্দরী-- বার্মিজ, চাইনিজ, আমহারি, জুলু, ভুলু; খালি বলো আরবী বাদে কোনটা জানো?

এরপর ইশারা ইঙ্গিতে, গুগল টান্সলেট করে দুজনেই কিছু ভাব-বিনিময় হল। কিন্তু জীবনে এই প্রথম ভাষা জ্ঞানের অভাবে নিজের চুল টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে করল। আহ, কী সময়টাই না কাটত! ক্লিউপেট্রার পক্ষ থেকেও বেশ আগ্রহ ছিল। কিন্তু সেই ভাষা…! যা বুঝলাম মিস ক্লিউপেট্রার মাদারটাঙ্গ আরবী এবং ফ্রেঞ্চটা কাজ চালানোর মতো পারলেও ইংরেজিতে একেবারেই...। ব্রিটিশদের উপর মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল। হালার পো’রা ইজিপ্ট শাসন করেছিস অথচ ভড়ং করা ভাষাটা আমাদের মতো ঢুকাতে পারিস নি মস্তিস্কে দু-চার লাইন। নাইল ডেল্টার সবুজকে এখন নীল মনে হচ্ছে।

আমি একসময় ঢাকার অলিঁয়াস ফ্রঁসেসে ঢুঁ দিতাম। ইস, সে সময় যদি কন্টিনিউ করতাম সেই যাতায়াতটা। কিংবা ‘কাইফা হালুকা, ইয়া হাবীবী’ ভাষাটাও যদি রপ্ত করতে পারতাম। আপসোস। মারডালা।

কষ্টে কিশোর দা’র গান পালটে সতীনাথ ভাদুড়ীর গান লাগালাম, ‘মরমীয়া তুমি চলে গেলে/ দরদীয়া আমার কোথা পাব/কারে আমি এ ব্যথা জানাবো...বল না গো বিদায়ের বারতা/ মনে আমার সইবে না যে সে ব্যথা।

যথারীতি সাড়ে দশটায় আলেকজান্দ্রিয়া পৌঁছে একটা পাকা পেয়ারা হাসি ও টা টা পেলুম। কি আর করা! আগে বাড়ো। হতাশায় তো ভ্রমণ বাতিল করতে পারি না। মারডালা।



ছবি-৫-৬: স্টেশন থেকে ভূমধ্যসাগরমুখী



আলেকজান্দ্রিয়া ট্রেন স্টেশনের সংস্কার কাজ চলছে। স্টেশনের সামনেটা খোলামেলা ও চমৎকার। সকাল সাড়ে দশটা। ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়ার সৌন্দর্য্য টের পেলুম।

স্টেশন থেকে ডানদিকে শ’দুয়েক মিটার দূরেই বিখ্যাত রোমান থিয়েটারের ভগ্নাবশেষ কয়েক একর জায়গা জুড়ে। আমাদের লিস্টে এটি ছিল। কাছে গিয়ে দেখি লোহার রেলিং দিয়ে সুন্দর করে ঘেরা থাকলেও বাইরে থেকেই সবটা দেখা যাচ্ছে। হুদাই ভিতরে ঢুকে জনপ্রতি ৮০ পাউন্ড খরচ মিসকিনদের জন্য একটু কষ্টকরই। আমাদের হাতে সময়ও কম। বাইরে থেকেই টপাটপ কয়খান ছবি তুলে রওয়ানা হলুম পরবর্তী গন্তব্যস্থলে। পাশের পাহারারত এক পুলিশ জোরে সোরে বলে উঠল, ‘আল হিন্দি, আল হিন্দি’। আরব দেশগুলোর মানুষেরা অনেকেই ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয়দের ‘হিন্দি বা আল হিন্দি’ নামে ডাকে পরে জেনেছিলুম।

ছবি-৭: ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে এগিয়ে চলছে পঙ্খিরাজ


ছবি-৮: বাঁয়ে ফেনিল সমুদ্র রেখে সিটাডলের প্রবেশমুখে

ইতোমধ্যে উবার, আলেকজান্দ্রিয়া সেট করে নিয়েছি। দিলাম উবার ডাক। এবার যাব সমুদ্র পাড়ের ঐতিহাসিক কোইটবে সিটাডলে। ভাড়া ১৭ মিশরীয় পাউন্ড। উবারের ড্রাইভার ফোন দিয়ে আরবীতে জানতে চায় ‘কিরে, তোরা কই আছস’ এই জাতীয় কিছু হবে। আমি ওকে ইংরেজীতে বলি আলেকজান্দ্রিয়া ট্রেন স্টেশনের (এখানেও আমি ভুল করেছি, বলতে হত ‘আলিস্কান্দ্রিয়েএ মাহাত্তারুন কাতারুন’) সামনে চলে আসুন, জনাবে আলা। বেচারা ইংরেজির মাথামুন্ডু কি বুঝেছে কে জানে? খালি আরবিতে বিড়বিড় করেই যাচ্ছে।

আমি ইংরেজিতে বোঝায় আলেকজান্দ্রিয়া, ও আমাকে আরবিতে বোঝায় আলিস্কান্দ্রিয়েএ। ও মাহাত্তারুন কাতারুন, আমি ট্রেন স্টেশন। আমি ট্রেন ও কাতারুন। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ধরে বুঝাবুঝির পালা শেষ হলে সিদ্ধান্ত নিলাম গাড়ির নাম্বার চেক করতে হবে। কারণ সে আমাদের কাছেই চক্কর খাচ্ছে। সেখানেও গণ্ডগোল। কারণ সব গাড়ির নাম্বারই আরবীতে লেখা। সাথে সাথে গুগল থেকে আরবী নিউমেরিকগুলো জেনে গাড়ির নাম্বার প্লেট চেক করতে থাকি।

আবার ফোন দিয়েই আমাকে আরবীতে এইস্যা ঝাড়ি। মনে মনে ভাবলুম গালিটা এরকম হতে পারে, ‘হালার পো, তোরে উবারে কে গাড়ি ডাকতে কইছিল, খবিস কোথাকার’। গালি-টালি হজম করে আমি আমার বন্ধুকে বলি তাড়াতাড়ি গাড়ির নাম্বার খোঁজ কর এ ব্যাটা আমাদের পিটাবে যে গরম মনে হচ্ছে ফোনে। সামান্য ভাড়ার জন্য ওর মনে হয় বিশ মিনিট ইতোমধ্যে চলে গেছে। এবং আমিও ম্যাপে দেখছি আমাদের আশেপাশেই সে ঘুরঘুর করছে, মাগার চিনবার পারছি না। একটু পরেই দেখি কল কেটে দিয়েছে ক্লিউপ্রেট্রার খুড়তুতো ভাই। আমরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম।
পরে অবশ্য উবারেই গিয়েছি তবে সেটা কায়রো থেকে আমাদের পরিচিত একজন তার ফোন থেকে ডেকে দিয়েছিল।

রোমান থিয়েটার পার হয়ে মূল শহর ধরে এগিয়ে চলছে গাড়ি। আর কিছুদূর গেলেই ভূমধ্যসাগর। সারি সারি ইউরোপীয়ান গোথিক স্টাইলের বাড়ি রাস্তার দুইপাশে। বেশির ভাগ বাড়িঘরই শতবর্ষী মনে হচ্ছে। চমৎকার বাড়িগুলোর মধ্যে অনেকগুলো পরিত্যক্ত মনে হল। এগুলো মিশরের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার চালচিত্র প্রকাশ করছে। মিলিটারি শাসন একটি অসম্ভব সম্ভাবনাময় দেশকে কীভাবে জাহান্নামের পথে টেনে নিতে পারে তা মিশর ও পাকিস্তানকে না দেখলে বোঝা মুশকিল। অথচ উর্দিপরা জেনারেলদের কুৎসিত চাকচিক্যময় জৌলুস দেখে বিবমিষা না এসে পারবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে অভিজাত সবকিছু তাদের দখলে। অথচ জীর্ণকায় গাধার পিঠে চড়ে হাটে যাওয়া শীর্ণকায় মানুষের সংখ্যাও নিতান্তই কম নয় প্রাচীন সভ্যতার আঁতুড়ঘর এই দেশটিতে।

ছবি-১০: ফোর্টের ভিতরে মূল প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে।


ছবি-৯: প্রাসাদের ভেতরের হাওয়াঘরের জানালা দিয়ে আলেক্সান্দ্রিয়া শহর।



যাহোক, ড্রাইভার ‘ইয়া হাবীবী’ গাড়ীতে আরবী ভাষার চমৎকার একটি গান ছেড়েছে। এক্টু পরেই ভূমধ্যসাগরের শীতল ও গীতল হাওয়ার পরিবেশ টের পেলুম সামনে তাকিয়ে। ভূমধ্যসাগরের এই রূপ দেখে মনে হল কেন বিশ্বের অধিকাংশ পর্যটক ভূমধ্যসাগরের দেশগুলোতে অবকাশ যাপন করতে আসে? তাপমাত্রা তখন ২৩-২৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। সাথে মিষ্টি মেডিটেরিয়ান হাওয়া। ভ্রমণের জন্য আদর্শ ।

ভূমধ্যসাগরের পাশে মাথা তুলে আছে এই অসাধারণ স্থাপত্যের সিটাডল। পরিষ্কার নীল দিগন্ত আকাশ। বিশাল বিশাল ঢেউগুলো এসে আছড়ে পড়ছে প্রাসাদের বাঁধানো দেয়ালে। প্রাসাদের দেয়ালে বসে অনেক ক্লিউপেট্রা-এন্টনিকে ভূমধ্যসাগরের নিটোল হাওয়া পান করতে দেখলাম। কী স্নিগ্ধ পরিবেশ!
ছবি-১১: ঐতিহাসিক আবু আল-আব্বাস আল-মুরসি মসজিদ


ছবি-১২: এক ভারতীয় ভদ্রলোক-বিশ্ববিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীর সামনে লাগেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে।

প্রাসাদের ভেতরে অনেক হাওয়াঘর। ভিতর থেকে বাইরের ভূমধ্যসাগরের দৃশ্য সত্যিই অপরূপ! আমরা সেখানে ঘন্টা দুয়েক থেকে ভূমধ্যসাগরের তীর ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। পথেই ঐতিহাসিক আবু আল-আব্বাস আল-মুরসি মসজিদ। স্থাপত্যশৈলীর প্রশংসা না করলেই নয়।

সেখান থেকে মিশরের অর্থনৈতিক অবস্থার মতোই ভাঙাচুরা ট্যাক্সিতে ২০ পাউন্ডে উঠে পড়লাম। খ্যাঁক খ্যাঁক করে কাশতে কাশতে ট্যাক্সি বাবা চলে আসল ৩ কিলোমিটার দূরত্বের বিশ্ববিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরীতে (বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়া)। রাস্তাতে তেমন ট্রাফিক ছিল না।

ভূমধ্যসাগরের কোল ঘেঁষে লাইব্রেরী চত্তর। নতুন করে নির্মিত এই লাইব্রেরীর বিশালত্ব দেখে চমৎকৃত হলাম। স্থাপত্যশৈলী মনে রাখার মতো। ৭০ পাউন্ড প্রবেশ ফি বিদেশীদের জন্য। অনেকটা সময় লাইব্রেরীতে ব্যয় করলাম। রাস্তার ওপাশেই আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। আলেকজান্দ্রিয়ার মানুষদের চেহারা মিশরের অন্য অংশের মানুষদের থেকে অনেকটাই আলাদা মনে হয়েছে আমার। অনেককেই ইউরোপীয় ভেবে ভুল হতে পারে। কিংবা আরব ও ইউরোপীয়ানের মিশেল।

এরপর আসলাম ১২ কিমি দূরের ঐতিহাসিক মন্তাজা গার্ডেনে। প্রায় সন্ধ্যা। ইতোমধ্যে ঠান্ডা হিমেল হাওয়া গায়ে আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। আলো আধাঁরির মাঝে গার্ডেনের মধ্যে সমুদ্রের শনশত শব্দের মাঝে ঘোরাঘুরি অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার ছিল। লোকজন নেই বললেই চলে। কারণ একটু পরেই বন্ধ হবে। শুধু স্থানীয় কিছু গ্রুপকে দেখলাম সমুদ্রের তীরের এই বাগানে বার-বি-কিউ পার্টির আয়োজন করেছে। ফিরতি পথে দেখি এমনই একটি গ্রুপ আস্ত একটি খাসি/ভেড়াকে পুড়িয়ে রুটিসহ হাবিজাবি দিয়ে গপাগপ গিলছে। সাথে অনেকগুলো বিড়াল। আমাদেরকে দেখেই বুঝেছে ‘আল হিন্দি’ পর্যটক। আগ বাড়িয়ে ভীষণভাবে ধরেছে তাদের ‘আল অ্যারাবিয়া’ পার্টিতে যেন আমরাও ‘আল হিন্দি’রাও যোগ দেই। নিছক আতিথিয়তাই মনে হল। কিন্তু আমরা সময়ের সংক্ষিপ্ততার কথা তুলে ধরে ‘আল বিদা’ বলে সেখান থেকে চলে আসি।



ট্যাক্সিতে করে সোজা মাহাত্তারুন কাতারুন। রাত দশটায় আমাদের কাতারুন। পাশের একটি রেস্তরাঁতে বসে রাতের খাবার খেলাম।

হাতে কিছু সময় থাকায় পাশের বাজারের দিকে হেঁটে যেতেই দেখি এক দোকানী বড় বড় কমলা বিক্রি করছে। আরবীতে লেখা ১০ পাউন্ড। প্রথমে আমরা বুঝতে না পেরে উনাকে এক আঙুল উঁচিয়ে এক কেজি দিতে বললাম। দোকানী আমাদের ১ কেজি কিনতে চাওয়ায় হাসতে শুরু করেছে। পাশের এক ভদ্রলোক এসে জানালেন দশ পাউন্ডে তিন কেজি হিসেবে এখানে বিক্রি হয়। এক কেজি কমলা এখানে কেউ কেনে না। দামের এই অবস্থা দেখে আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি। ১০ মিশরীর পাউন্ড মানে ৪৭ টাকাতে তিন কেজি এই বিশাল সাইজের সদ্য গাছ পাড়া কমলা। ব্যাগ ভর্তি করে নিয়ে সামনে এগিয়ে দেখি স্ট্রবেরী বিক্রি হচ্ছে ১২ পাউন্ডে ( ৫৫ টাকা), কিং সাইজ আপেল ১৪ মিশরীয় পাউন্ড। ডালিম ১৬ মিশরীয় পাউন্ড। নাশপাতি ৮ পাউন্ড। সব তরতাজা ফলমূলের দাম অসম্ভব কম মনে হল। আমরা কমলা তিন কেজি, স্ট্রবেরি এক কেজি, কিং আপেল তিন কেজি কিনে কাতারুনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম।


ছবি-১৩: ৪৭ টাকায় তিন কেজির কমলা বিক্রেতা মোহাম্মদ

ট্রেন যখন রামেসিস ট্রেন স্টেশন, কায়রোতে পৌঁছালো তখন রাত্রি প্রায় একটা। ট্যাক্সি চালককে আমাদের গন্তব্য বোঝাতে না পেরে হেঁটেই রওয়ানা হলাম গুগল ম্যাপ ধরে। দোকান পাট বন্ধ। কিছু খাবার দোকানের সামনে অনেকে জোছনার আলোয় হুকার(শিশা) পাইপ নিয়ে ঘরর ঘরর করে টানছে।

হঠাৎ মনে হল ওদের সাথে মিলে জোছনা ও হুঁকা একসাথে মেখে-খেয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে কিছুক্ষণ এখানে গড়াগড়ি করে যেতে পারলে মন্দ হত না। আমার ভাব বুঝতে পেরে বন্ধুরা কড়া চোখে তাকাল। এই হুঁকাখোর আরবদের দেখলে মনে হবে এদের চেয়ে সুখী জাতি মনে হয় পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। বাড়ির উঠোনে, দোকানের সামনে, মাঠে-ঘাটে হুঁকোর বিশাল পাইপ নিয়ে ছেলে-মেয়ে, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতারা সুখটানে ব্যস্ত।

রাস্তায় আমাদের মতো অনেকেই হেঁটেই চলাফেরা করছে। প্রায় ১৮ মিনিট পরে আমাদের হোটেলে ফিরে আসলাম।

আগামীকাল ফ্যারাও আখেনাটেনের দাদা-পরদাদা কিংবা নাতিপুতিদের মমি দেখতে যেতে হবে বিশ্ববিখ্যাত কায়রো মিউজিয়ামে…!!!

কীভাবে যাবেনঃ আগের পোস্টে বিস্তারিত রয়েছে। তবুও বলি, আমাদের মতো মিসকিন গোত্রের পর্যটক হলে কায়রো গিয়ে রামেসিস স্টেশন থেকে কোনো মিশরীয় ধরে ৯০ পাউন্ডের বিনিময়ে টিকিট আগেই সংগ্রহ করতে হবে। আমার পরামর্শ একদিনে আলেকজান্দ্রিয়া ভ্রমণ না করে এট লিস্ট এক রাত থাকতে পারলে বেটার। পারলে বেশি দিন থাকেন। কবরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত গল্প করার অনেক রসদ পাবেন, এটা নির্দিধায় বলতে পারি। আমরা ঘেউ-ঘেউ দৌড়ের উপর থাকায় অনেক কিছু মিস করেছি। সে জন্য আপসোস রয়ে গেছে।

**ভয়ে আছি শিরোনাম নিয়ে। চোখের সমস্যায় ব্লগার চাঁদ্গাজী আবার ‘ক্লিউপেট্রা যেখানে হেঁটেছিল’র জায়গায় ‘ক্লিউপেট্রা যেখানে হেগেছিল’ পড়ে ফেলে। লেখার ইজ্জত পাঞ্চার তাইলে…?


ছবি-১৪: বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়ার ভেতরের চিত্র

আগের পর্ব: নেফারতিতির দেশেঃ মিশরের পিরামিডের বালুভূমিতে !!!

************************************************************
আখেনাটেন/অক্টো-২০১৯
ছবি: লেখক।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১৯ বিকাল ৫:০৭
৪২টি মন্তব্য ৪২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্রগ্রাম যে ভাবে বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ৯:১২


আরাকান আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি ঘটলেও সে সময় দৌরাত্ম বেড়ে যায় পর্তুগীজ এবং মগ জলদস্যুদের। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশে সন্দ্বীপের মত দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট করত এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিভা

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৩



এক শকুনের বাচ্চা তার বাপের কাছে আবদার ধরলো-
বাবা, আমি মানুষের মাংস খেতে চাই, এনে দাও না প্লিজ!
শকুন বলল, ঠিক আছে ব্যাটা সন্ধ্যার সময় এনে দেব।

শকুন উড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরুর নাড়ি ভুরি খাওয়া নিয়ে দ্বিধা জায়েজ /না জায়েজ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৩৭


কোরবানী বা ঈদ-উদ-আযহা এলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা বিভিন্ন পশু কোরবানী করে থাকে। মাংস ও ভুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেকে আবার ভুড়ি খাননা বা খেতে চাননা কারণ খাওয়া ঠিক না বেঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আলোচিত খুন , আলোচিত গুম, আলোচিত ধর্ষণ ও আলোচিত খলনায়ক।

লিখেছেন নেওয়াজ আলি, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৪০

মেজর সিনহাকে চারটা নাকি ছয়টা গুলি করেছে তা নিয়ে বিতর্ক করে কি লাভ এখন। তাকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এটাই সত্য। আর এই হত্যা করেছে দেশের আইন শৃঙ্খলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ টি প্রয়োজনীয় ও বিনোদনমূলক ওয়েবসাইটের লিংক নিয়ে সামুপাগলা হাজির! (এক্কেরে ফ্রি, ট্রাই না করলে মিস! ;) )

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৪৬



করোনার সময়ে অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। বড়দের অফিস চললেও অপ্রয়োজনীয় কাজে সচেতন মানুষেরা বাইরে যাচ্ছেন না। ইচ্ছেমতো বাইরে গিয়ে শপিং, ইটিং, ট্র্যাভেলিং করে ছুটির দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×