somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সফট পাওয়ারের খেলঃ দিরিলিস এর্তুগ্রুল থেকে পদুমাবৎ-তানহাজি!!!

২৪ শে মে, ২০২০ রাত ১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



নজীরবিহীন এই সময়ে টিভি সিরিজ ও মুভি দেখার ধুম পড়েছে। গত দুইমাসে আমিও রানীক্ষেতে আক্রান্ত মুরগীর মতো নতুন অনেক কিছু শেখার ফাঁকে ফাঁকে ঝিঁমাতে ঝিঁমাতে নেটফ্লিক্সে চারটি টিভি সিরিজ দেখেছি। চারটি সিরিজই কাছের কিছু মানুষ দেখতে উৎসাহ যুগিয়েছিল। এরপর রিভিউ পড়ে মনে হয়েছে দেখি দেকি! একটি স্প্যানিশ থ্রিলার ‘Money Heist’, একটি আমেরিকান ক্রাইম-ড্রামা, ‘Ozark’, একটি টার্কিশ হিস্ট্রিক্যাল ফিকশন, ‘The Protector’, আর শেষেরটি ভারতের কন্সপিরেসি থ্রিলার, ‘Sacred Games’। আরও দু একটা দেখার চেষ্টা করেছি কিন্তু...!

ঘরে বসেই ‘বোকাবক্স’-এ তাবৎ দুনিয়ার বৈচিত্র উপভোগ করা একটি চমৎকার অভিজ্ঞতায় বটে! বিভিন্ন সংস্কৃতি, সভ্যতা, কৃষ্টি, জীবনাচারণ সম্পর্কে জানার জন্য এই টিভি সিরিজগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। তাই জানা ও নিছক আনন্দ-বিনোদনের মাধ্যমে সময় কাটানোর জন্য এগুলো দেখা যেতেই পারে। কিন্তু কেউ যদি নানামুখি সেই বৈচিত্রতাকে ভিন্ন-আঙ্গিকে উপস্থাপণ করে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে গোটা মানব সমাজের জন্য একটু হুমকীর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে সেটা কোনোভাবেই একজন মানবিক মানুষের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভবপর নয়।

নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেন তাঁর ‘আইডেন্টিটি অ্যান্ড ভায়োলেন্সঃ দ্যা ইলুশন অব ডেস্টিনি’ বইয়ে লিখেছেন, ‘একই ব্যক্তি, কোনও দ্বন্দ্ব ছাড়াই, ইউএস-আমেরিকান নাগরিক, ক্যারিবিয়ান বংশোদ্ভূত, আফ্রিকান বংশধর, খ্রিস্টান, উদারবাদী, একজন মহিলা, নিরামিষাশী, একটি দূরপাল্লার দৌড়বিদ, ইতিহাসবিদ, একজন স্কুলশিক্ষক, উপন্যাসিক , একজন নারীবাদী, হেটেরোসেক্সুয়াল, সমকামী অধিকারে বিশ্বাসী, একজন থিয়েটার প্রেমী, পরিবেশবাদী কর্মী, টেনিস ফ্যান, একজন জাজ সংগীতজ্ঞ এবং বাইরের মহাকাশের জীবনের বুদ্ধিমান জীবে বিশ্বাসী ইত্যাদি’।

তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? একজন একটি সভ্যতা বা সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হলেই সেখানেই তার ডেস্টিনি বা নিয়তি বা পরিচয় সীমাবদ্ধ নাও হতে পারে। অর্থাৎ একজন মানুষ একই সঙ্গে অনেক পরিচয়ে পরিচিত হতে পারেন। সময়ে সময়ে এর রূপভেদ হতে পারে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিকতায়, ভালো-মন্দ মিশিয়ে। আর এই বৈচিত্রময় পরিচয়কে সমাজের সবাই মেনে নেওয়ায় সৌন্দর্য। কিন্তু…?

...এই সৌন্দর্যকে পদদলিত করে, ...এই আইডেন্টিটিগুলোকে ঝুঁকিতে রেখে, ...এই অধিকারকে অবদমিত করে, ...এই বৈচিত্রতাকে জাতির উন্নতির অন্তরায় বিবেচনা করে-- যখন একক ও অদ্বিতীয় বা ব্যষ্টিক চিন্তার উদ্ভব ঘটে তখনই তা সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ভয়ঙ্কর অভিশাপে রূপ নিতে পারে।

এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। ধরুন, পাকিস্তানীরা যদি বাংলা ভাষাকে, বাঙালীসত্বাকে, বাঙালী মুসলিম বা হিন্দু বা আদিবাসী বৈচিত্রতাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারত, তাহলে কি আমাদের ঐ রক্তস্নাত কালোরাত দেখতে হত? কিংবা ইতিহাসের চাকাটাকে আরেকটু পেছনে টেনে নিলে--কী দেখতে পাই? বৈচিত্রতাকে পায়ে দলার ফলে লক্ষ লক্ষ প্রাণের সংহার ও ঘৃণার বিষবাষ্প যা এখনও উদগীরণ করে চলেছে বেশির ভাগ হৃদয়ে--সেটি কি কোনো জাতি বা সম্প্রদায়ের জন্য শুভ?

অতীতকে চেষ্টা করলেও আমরা সহজে ভুলতে পারি না। তবে অতীতের ভালোটা রেখে মন্দটাকে ভুলে যাওয়ায় উচিত। তা না হলে ঐ হন্টিং মেমোরি দোদল্যমান আত্নাকে ধাওয়া করে স্বর্গ নাকি নরক পর্যন্ত টেনে নিবে তা তো সহজেই অনুমেয়!

আর ঠিক এই সমস্যায় পতিত হয়েছে গোটা বিশ্ব, বিশেষ করে বড় বড় শক্তিগুলোর ক্ষেত্রে। আমেরিকায় ট্রাম্প চায় হোয়াইট সুপ্রামেসিস্ট ও আমেরিকার পুরনো গৌরব ফিরে আনতে অভিবাসী বিতাড়নের মাধ্যমে। বৃটেনে বরিস জনসনও ব্রেক্সিটের মাধ্যমে তাই। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য দেশেও বাড়ছে রক্ষণশীলদের দাপট। শুদ্ধ ইউরোপ। অভিবাসীহীন ইউরোপ। চীন চায় তার প্রাচীন ও মধ্যযুগের ঝেং হি’র সেই নৌ আধিপত্য ও সিল্করুটের পাওয়ার সাথে হানদের বিস্তার। তুরস্ক চায় মধ্যযুগের সেই গৌরবময় আফ্রিকা থেকে অস্ট্রিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত অটোমান সুলতানের যুগ। ভারত চায় চন্দ্রগুপ্ত যুগের সেই বাংলা-আফগানিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত তথাকথিত সোনালী যুগের অধ্যায়।



এরই ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি, নব্য অটোমান সুলতান সোলাইমান হওয়ার স্বপ্নে বিভোর সুলতান এরদোগান কিংবা নব্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত হওয়ার ঘোরলাগা স্বপ্নে বিভোর সম্রাট মোদি। এখন তো আর টেরিটরি দখলের মাধ্যেম সেটা অনেকাংশেই সম্ভব নয় কিন্তু অন্য উপায় তো রয়েছে। হ্যাঁ, মোক্ষম অস্ত্র ‘সফট পাওয়ার’। হারানো গৌরব ফিরে পাওয়ার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর অব্যর্থ কৌশল। আর এতে দুই দেশই সফল।

সফট পাওয়ারের সাংস্কৃতিক টুলটিকে চাবুক হিসেবে নিয়ে এরদোগান ইতোমধ্যে রীতিমত অবিশ্বাস্য বাজিমাত করেছেন। এরদোগানের স্বপ্নটা অবশ্য আরও বৃহৎ ফ্রেমে বাঁধা। একাধারে বলকান অঞ্চলে আগের সেই অটোমান গৌরবের কিছুটা ফিরে আনা এবং গড়ানো তেলে পিছলে পড়া ক্ষীয়মান মোল্লাতন্ত্রের সৌদীদের মুসলিম বিশ্বে আধিপত্যের ফাঁক গলে ঢুকে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমরা পাচ্ছি সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অংশ হিসেবে ‘ম্যাগনিফিসেন্ট সেঞ্চুরী’ কিংবা ‘দিরিলিস এর্তুগ্রুল’, যেখানে ইতিহাসকে ম্যানুপুলেইট করে দেখানো হচ্ছে কীভাবে এক সাধারণ মুসলিম উপজাতি যোদ্ধা একে একে ক্রিশ্চিয়ান ক্রসেডার, বাইজেন্টাইন যোদ্ধা কিংবা দুর্ধর্ষ মোঙ্গলদের পরাজিত করে বীর বিক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে মুসলিম সালতানাত গঠনে।

আর মোদি ঠিক একই কাজ করতে গিয়ে একধাপ এগিয়ে টার্গেট করেছে তারই স্বদেশী ২০ কোটি মুসলিমকে। মোদির পলিসিকে সাধুবাদ জানিয়ে একের পর এক তৈরি হচ্ছে ইতিহাস বিকৃতির যজ্ঞ। পদুমাবত থেকে তানহাজি; কেজারি থেকে পানিপথ। অনেক মুসলিমই যাদের বীর হিসেবে গন্য করে সেই আলাউদ্দিন খলজি, আওরঙ্গজেব, আহমেদ শাহ আবদালীদের কুখ্যাত বানিয়ে হিন্দু জাগরণের এই কৌশল নতুন না হলেও এর স্বরূপ এখন ব্যাপকতা পেয়েছে। ফলে একই দেশে মুসলিমদের কাছে আওরঙ্গজেব বীর হলেও শিবাজী মারাঠা বর্গী দস্যু বা ভিলেন। অপরদিকে, হিন্দুদের কাছে শিবাজী বীর পূজিত হলেও খলজিরা ভীনদেশী লুটেরা কিংবা ধর্ম-বিনাশকারী।

অতীতে রবীন্দ্রনাথ কিংবা বঙ্কিমের শিবাজী’র প্রশংসা অনেক মুসলিমই শ্লেষ মিশ্রিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলেও সেটার আপিল ততটা ব্যাপকতা পায় নি। আধুনিক যুগের কালচারাল ডাইমেনশন সেই ন্যারেটিভকে এখন নতুন মাত্রা দিয়েছে। একই অডিয়েন্সকে বারবার একই দৃশ্য গেলানো গেলে এক সময় ঠিকই তাদের অন্তরীন ধারনাকে মডিফাই করা সম্ভব হবে যা আমরা নাৎসি মন্ত্রী গোয়েবলস থেকে জানি। এই ন্যারেটিভগুলোই পশ্চিমারা নানা জাতি-গোষ্ঠীর বিপক্ষে অতি উত্তমভাবে ব্যবহার করে আসলেও তাদের রেশ অরিয়েন্টাল রিজিয়নে এতটা তীব্রতা পেয়েছিল না। এখন এরদোগান কিংবা মোদি সেই ন্যারেটিভ জাদুকাঠি বিবেচনায় নিয়ে দোর্দন্ড প্রতাপে নিজ নিজ দেশে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলাফল। শতভাগ সাফল্য।

এখানে মোদি ও এরদোগানের মধ্যে মিল থাকলেও অমিলটুকুও প্রণিধানযোগ্য। মোদি যেখানে নিজ দেশেরই একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে প্রতিপক্ষ বানিয়ে তার পলিটিক্যাল অভিলাষ কায়েম করছে এবং চন্দ্রগুপ্তের আসনে আসীন হতে চাচ্ছে, সেখানে এরদোগান তার হারানো অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তি ফিরে পেতে তাঁর চিন্তাভাবনা পশ্চিম থেকে পুবের দিকে সরে এনেছে অর্থাৎ তার প্রতিপক্ষও বলতে গেলে অদৃশ্য মুসলিমই। অর্থাৎ মুসলিম বিশ্বের একাধিপতি হতে হলে একজন হিরো বানাও। সেই হিরো এখন এর্তুগ্রুল, হয়ত পরে অন্য কেউ। মোদি যদি নিজের মধ্যে চন্দ্রগুপ্ত কিংবা শিবাজীর ছায়া দেখে এরদোগানও নিজের মধ্যে এরটুগ্রুল কিংবা সোলাইমানের ছায়া দেখছেন। আর সেই ছায়ারা প্রাচ্যের দিকে হেলে সৌদীদের মুসলিম বিশ্বে ডমিনেশনকে খর্ব করার এক অনন্য উপায় হিসেবে ইতোমধ্যে ভূমিধ্বস বিজয় ত্বরান্বিত করেছে। সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সকল দিক দিয়ে এরদোগানের বাজীর ঘোড়া এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বলকান; মধ্যপ্রাচ্য থেকে আফ্রিকা; সেন্ট্রাল এশিয়া থেকে সাউথ এশিয়া।



এখন প্রশ্ন হলো আমাদের মতো গরীবদের কী হবে তাহলে? আমরা কী সারাজীবন বৃহৎ এই শক্তিবর্গের বগলের নিচে বসে মিউঁ মিউঁ করেই যাব। নাকি নিজেদের কোনো বীরকে সামনে এনে সেয়ানে সেয়ানে টক্করে যাব। আমরা এ নিয়ে চিন্তা না করলেও পাকিস্তানের সাবেক প্লেবয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিন্তু বসে থাকেন নি। তিনি জানেন তার দেশ পদুমাতের রতন সিংহের মতো ইতিহাসের রুগ্ন মহারাজাকে থান্ডারাস বীরবিক্রম রতনসিংহ মহারাজায় রূপালী পর্দায় তুলে ধরার মতো সামাজিক কিংবা আর্থিক অবস্থায় নেই। তো খলজির কিংবা আওরঙ্গজেবের বলিউডের পর্দায় ভিলেইনাস উপস্থিতির কাউন্টার হিসেবে একজন সুপ্রিম হিরো দরকার; যা একই দর্শকের মনের গহীনে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত ইচ্ছেটার বিস্ফোরণ ঘটাবে। সেই চিন্তা থেকেই তুর্কি খলজি’র বর্তমান রূপালী পর্দার তুর্কি সাগরেদ এর্তুগ্রুলকে হিরোর আসনে বসিয়ে দিয়েছেন টুইট করে। আর যায় কোথায়? ঝাঁকে ঝাঁকে পাকিস্তানি-ভারতীয় (বাংলাদেশও মনে হয় বাদ নেই) জনতা এখন অজু করে এর্তুগ্রুল দেখতে বসে গেছেন টিভি সেটের সামনে কিংবা ইউটিউবসহ অন্য স্যোসাল মিডিয়াতে। এই ঝাঁকের কইয়ের লম্ফঝম্ফ আবার পরাক্রমশালী ভারতীয় মিডিয়া বেশ রাখ ঢাক গুড়গুড় করে চেপে রেখেছে। কেউ এই নিয়ে টুঁ শব্দ করছে না। পাছে নব্য চন্দ্রগুপ্ত যদি রাগ করে।

ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া যে এভাবে আসতে পারে তা মনে হয় চন্দ্রগুপ্তের শিষ্যরাও ভাবতে পারে নি। চিন্তা করুন ভারতের একটি জনগোষ্ঠী যখন ‘রামায়ণ’র জনপ্রিয়তা ‘গেম অব থ্রোনস’কেও ছাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঐ একই চেতনায়। তার পাশের লাগোয়া বাড়ির হয়ত আরেক জনতা তানহাজি-পদুমাবত, ‘রামায়ণ’কে ছেঃ বলে সুদূরের ‘এর্তুগ্রুল’ দেখছে আরেক চেতনায়। একই পরিবেশে, একই সমাজে বাস করে এই বৈপিরত্য নিজেদের অস্তিত্বের জন্য শুভ নাকি অশুভ তা কি নব্য চন্দ্রগুপ্তেরা টের পাচ্ছেন?

আর এখানেই নব্য সুলতান এরদোগানের কিস্তিমাত। নিজ দেশে সেকুলার জনগণের বাটে পড়ে কিছুটা কোনঠাসা হয়ে থাকলেও তাঁর বাজির ঘোড়া যেভাবে এক দেশ থেকে আরেক দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন---কে মনে করবে এই ঘোড়ার সওয়ারী একজন অভিজ্ঞ চালক হলেও অতিরিক্ত দাপাদাপিতে ঘোড়া নিজেই কাহিল? নানামুখী টানাপোড়েনে নাভিশ্বাস অবস্থা।

আবার প্রশ্ন আসতে পারে সুদূর তুরস্কের এর্তুগ্রুল টিভি সিরিজ উপমহাদেশে এত জনপ্রিয় হওয়ার কারন কী হতে পারে? এখানেও সেই সুবিখ্যাত নিউটনের থার্ড ল কাজ করেছে চরমভাবে। এতদিন ভারতে ঐতিহাসিক কাহিনি নিয়ে সিনেমা হলেও এতটা কদর্যভাবে মুসলিম শাসকদের তুলে ধরা হয় নি। ফলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মাঝে অতীতের সে সব সিনেমার একটি সর্বজনীন আপিল ছিল। যদিও ইতিহাস সাক্ষী দেয় মুসলিম-হিন্দু কোনো শাসকই ধোয়া তুলসীপাতা ছিল না। কিন্তু বর্তমান আরএসএস নিয়ন্ত্রিত মোদি জমানায় সেই কালচারাল ডাইভারসিটির সর্বজনিন আপিলকে ইচ্ছে করেই ভেঙে ঘৃন্য বিকৃতির মাধ্যমে একমুখি করে পরিচালিত করায় এর প্রতিক্রিয়া যে অচিরেই প্রকাশ পাবে তা সহজেই অনুমেয় ছিল। ২০ কোটির পক্ষে তো ১০০ কোটির চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আবার পার্শ্ববর্তী দেশের নড়বড়ে হাভাতে অর্থনীতির পাকিস্তান কিংবা অনেকাংশে উদারপন্থী বাঙ্গালী মুসলিমেরা দিবে সেটাও সম্ভব নয় নানা কারনে, বিশেষ করে অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতিটাই এখানে মুখ্য। আর এ জায়গাতেই এরদোগানের বাজিমাত। এরদোগান ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে পাকিস্তানের হালহকিকত। পাকিস্তানও জানে তার দুর্বলতা। যার ফলশ্রুতিতে দেখতে পাই, উপমহাদেশীয় রতনসিংহ-সদাশিব ভাউ বা তানাজিদের বিপক্ষে সুদূর এশিয়া মাইনরের এর্তুগ্রুল কিংবা সুলতান সুলেমান। যদি এ ট্রেন্ড চলতেই থাকে, তাহলে এরকম তানাজি কিংবা এর্তুগ্রুলদের আমরা দেখতে পাব রূপালীর পর্দায় নিয়মিতই। সবই নব্য রাজা-মহারাজার মহড়া তাদের ভুখা-নাঙ্গা প্রজাদের অতীতের মতো প্রটেকশনের ভয় দেখিয়ে, ক্ষমতার অভিলাষে।

আর এভাবে সত্যিই চলতে থাকলে-- এই টিভিসেটের সামনে বসে থাকা বর্তমানের মগজহীন তানাজি কিংবা রতনসিংহ কিংবা এর্তুগ্রুলেরা শুধু ঘরে বসেই ভার্চুয়াল তলোয়ার দেখে আস্ফলন করবে না, এরা সময়ে সময়ে রাস্তায় তাদের জং ধরা হাসুয়া-খুন্তি-বটি নিয়ে মহড়াও দিবে এবং বাস্তবে জোসে হুঁশ হারিয়ে ক্ষণে ক্ষণে দিল্লি-কলকাতা-করাচি-ঢাকার পাড়া-মহল্লা লাল ছোপ ছোপ রক্তে রঞ্জিত করলেও অবাক হব না? যার মহড়া ইতোমধ্যে দিল্লি থেকে শুরু হয়েছে।



এবার সেই অমর্ত্য সেনের কথায় ফিরে যাই। আমরা যখন সামষ্টিক পরিচয়কে লাথি মেরে নিজেদের শুধুমাত্র হিন্দু বা শুধুমাত্র মুসলিম পরিচয় তুলে ধরতে যাব বিকৃত হিরোইজমের মাধ্যমে কিংবা বৈচিত্রতাকে দুমড়ে-মুচড়ে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় রত হব অসুস্থ নেশায়--তখনই সমাজে বিশৃঙ্খলাগুলো গুবরে পোকার মতো কিলবিল করতে শুরু করবে আমাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দৈনতার জন্য; যা আমরা এখন নব্য চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যে হরহামেশায় দেখছি। যার প্রতিক্রিয়া অপরাপর প্রতিবেশিদের মাঝেও যে অচিরেই ছড়িয়ে পড়বে না কিংবা ইতোমধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে কিনা তা নিশ্চয় নব্য রাজা-রানীরা হিসেব রাখছেন ভালোভাবেই!

ছবি-সিরিজ দেখুন-- তবে হরে রাম বুলিতে বা অজু করে নয়; নিছক মনের আনন্দে দেখুন; সময় কাটানোর হাতিয়ার হিসেবে দেখুন; জানার জন্য দেখুন; তা নাহলে সেই ভার্চুয়াল তলোয়ার কার যে কখন গর্দান নেওয়ার জন্য রূপালী পর্দা ফেঁড়ে ধরাধমে আবির্ভুত হবে তা বলা মুশকিল হলেও সত্যাসত্য নিরুপণে বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই, শুধু অতীতের লাল ছোপ ছোপ দাগগুলোর দিকে দৃষ্টিপাত করলেই হবে। যারা ভুক্তভোগী তারাই শুধু জানে এর ভয়ঙ্কর বাস্তবতা। ফিরে না আসুক সেই কালোরাতগুলো জিঘাংসার বলি হয়ে...রুপালী পর্দার আড়াল থেকে...!!!

*******************************************************************************
@আখেনাটেন/মে-২০২০

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০২০ রাত ১:২৯
২৪টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চট্রগ্রাম যে ভাবে বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

লিখেছেন দেশ প্রেমিক বাঙালী, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সকাল ৯:১২


আরাকান আমলে চট্টগ্রাম বন্দরের সমৃদ্ধি ঘটলেও সে সময় দৌরাত্ম বেড়ে যায় পর্তুগীজ এবং মগ জলদস্যুদের। এরা চট্টগ্রামের আশেপাশে সন্দ্বীপের মত দ্বীপে ঘাঁটি গেড়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে লুটপাট করত এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রতিভা

লিখেছেন রাজীব নুর, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৩



এক শকুনের বাচ্চা তার বাপের কাছে আবদার ধরলো-
বাবা, আমি মানুষের মাংস খেতে চাই, এনে দাও না প্লিজ!
শকুন বলল, ঠিক আছে ব্যাটা সন্ধ্যার সময় এনে দেব।

শকুন উড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরুর নাড়ি ভুরি খাওয়া নিয়ে দ্বিধা জায়েজ /না জায়েজ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৩৭


কোরবানী বা ঈদ-উদ-আযহা এলে সারা পৃথিবীতে মুসলমানরা বিভিন্ন পশু কোরবানী করে থাকে। মাংস ও ভুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে। অনেকে আবার ভুড়ি খাননা বা খেতে চাননা কারণ খাওয়া ঠিক না বেঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আলোচিত খুন , আলোচিত গুম, আলোচিত ধর্ষণ ও আলোচিত খলনায়ক।

লিখেছেন নেওয়াজ আলি, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৩:৪০

মেজর সিনহাকে চারটা নাকি ছয়টা গুলি করেছে তা নিয়ে বিতর্ক করে কি লাভ এখন। তাকে নির্মম নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে এটাই সত্য। আর এই হত্যা করেছে দেশের আইন শৃঙ্খলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

৮ টি প্রয়োজনীয় ও বিনোদনমূলক ওয়েবসাইটের লিংক নিয়ে সামুপাগলা হাজির! (এক্কেরে ফ্রি, ট্রাই না করলে মিস! ;) )

লিখেছেন সামু পাগলা০০৭, ১২ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৪৬



করোনার সময়ে অনেকেই ঘরবন্দি অবস্থায় আছেন। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। বড়দের অফিস চললেও অপ্রয়োজনীয় কাজে সচেতন মানুষেরা বাইরে যাচ্ছেন না। ইচ্ছেমতো বাইরে গিয়ে শপিং, ইটিং, ট্র্যাভেলিং করে ছুটির দিনটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×