স্যার,
আসসালামু-আলাইকুম।
রমজানের রোযাগু্লো না থাকলে কি নিয়ে যে দিন কাটাতাম আল্লাহই ভালো জানেন। ভীষন হতাশ আর অসহায় লাগছে স্যার; ঠিক সেই দিনগুলোর মত যখন বুয়েটে ক্লাস শুরু হতে দেরী হচ্ছিল। আমি ০৯ ব্যচের। আপনি তো জানেনই স্যার আমরা প্রায় ৮ মাস পরে ক্লাস শুরু করি।
ভীষন মুষড়ে পড়েছি স্যার। বুয়েটে পড়ার জন্য সচরাচর যতটা মেধার প্রয়োজন বলে শোনা যায় ততটা আমার কখনই ছিল না। চান্স পাওয়ার পর আমার খুশিটাও ছিল তাই অপার্থিব,অসাধারন রকমের। ঠিক যেমন ধরুন কদিন আগে নাসার বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে রোবট নামিয়ে যতটা খুশি হয়েছিলেন অনেকটা সেরকম। অচেনা বুয়েট নিয়ে ভয় ছিল, অসম্ভব মেধাবী সহপাঠীদের নিয়ে জড়তা ছিল; এসব কাটিয়ে একটা সময় আবিষ্কার করলাম আমি বুয়েটকে ভীষন ভালোবাসি। আমার ভালোবাসার এই জায়গাটাতে যখন আঘাত লাগলো তখন কি আর ভালো থাকা যায় স্যার? খুব কষ্ট হচ্ছে,খুব।
সময় যত গড়াচ্ছে অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে ততই ডুবে যাচ্ছি। হয়ত আমার এই আশংকা অহেতুক, হয়ত খুব দ্রুতই সব ঠিক হয়ে যাবে, আমরা আবার ক্লাসে ফিরব আর ক্লাস টেস্ট, ল্যাব রিপোর্ট, কুইজ এসবে যখন ব্যস্ততার চুড়ান্ত হবে তখন বলব, “উফফ! এভাবে মানুষ বাঁচে!” কিন্তু কোথায় যেন হিসেবটা ঠিক মিলতে চায় না; এমন অনির্ধারিত ছুটি তো এই ছোট্ট বুয়েট জীবনে নতুন নয়। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় কখনোবা আপনাদের কাছে আবদার করে আরো কতবার ছুটি নেয়া হয়েছে। কই তখন তো এত গুমোট লাগেনি দিনগুলো!
গণিতে আমি বিশেষ ভালো নই। জুলাইয়ের ১১ তারিখে ক্লাসটেস্ট ছিল। ১০ তারিখ রাতে অংক করতে বসেছি; ক্ষণে এক বন্ধু জানালো বুয়েট ৪৪ দিনের জন্য বন্ধ। বিশ্বাস করুন স্যার এতটা হতাশাজনক আর অনাহুত আর কোন বন্ধের ঘোষণা হতে পারত না। জুলাইয়ের ১১ তে যেদিন আমরা সবাই রেজিষ্ট্রার ভবনের সামনে একত্রিত হলাম সেদিন বারবার মনে হচ্ছিল খুব সহজেই হয়ত আমরা লক্ষ্য অর্জন করতে পারব,অবাঞ্ছিত বন্ধ তুলে নেয়া হবে, অযাচিত আর অনিয়মকারী ব্যক্তিরা আমাদের বিরক্ত করা বাদ দিয়ে বুয়েট ছেড়ে চলে যাবেন! তারপর বহু দিন পেরিয়ে গেল, বুয়েট তার ৬০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্দোলনের সাক্ষী হল, আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে গেলাম, আমরা মান্যবর শিক্ষামণত্রীর দ্বারস্থ হলাম;আমাদের আশ্বাস দেয়া হল, “ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।”; আমরা সবাই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলাম তাঁদের উদ্যোগের উপর। কোথায় কি ! হঠাৎ শুনি মহোদয় বিব্রত বোধ করছেন। আমরা বুঝে নিলাম পাশার দান উল্টাচ্ছে, মন্ত্রী মহোদয় সুর পাল্টেছেন। এরমধ্যে আমাদেরকে, আমাদের শিক্ষকদেরকে বহু ধরনের অপবাদ শুনতে হয়েছে, হুমকিও শুনতে হয়েছে। অবাক হয়ে নিজেকে আবিষ্কার করলাম আমি মৌন মিছিলে আমার সেই শিক্ষকের পাশে হাঁটছি ১১ জুলাই যাঁর কাছে আমাদের অংক পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল। ভাবছিলাম কত দ্রুত সবকিছু বদলাতে পারে! কোথায় ইএমই ভবনের ক্লাসরুম আর কোথায় বুয়েট টু বঙ্গভবন পদযাত্রা!
এতকিছুর পরও আজ অবধি কিছুই হল না স্যার। আমরা যে আঁধারে ছিলাম সে তিমিরেই রয়ে গেলাম...না না, একথাটা মনে হয় ঠিক বলা হল না। এই অন্ধকারেও আমরা অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি; ক্লাসের চার দেয়ালের মধ্যে কঠিন মানুষের আড়ালে আপনাদের ভেতরের যে স্নেহার্দ্র মানুষগুলো ঢাকা পড়ে যায় আমরা তাঁদেরকে খুঁজে পেয়েছি, বুয়েট যে আসলেই স্পেশাল তা আবারো বুঝতে শিখেছি, বুয়েটের প্রতি, দেশের প্রতি আপনাদের যে ভালোবাসা, যে দায়বদ্ধতা তা লক্ষ করেছি; এই বোধগুলো সামনের দিনগুলোতে আমাদের ভীষন প্রয়োজন হবে।
উপর মহল আমাদেরকে বড্ড অবহেলা করছে স্যার, আপনাদেরকেও। আমরা তো কোন অন্যায্য দাবী করিনি, আমরা তো খুব স্বল্প সংখ্যক বিভ্রান্ত মানুষ নই, আমরা আমাদের দাবীতে সৎ, সচেতন এবং ঐক্যবদ্ধ; তারপরও আমাদের দাবী আদায় হচ্ছে না। এসব কিছু নির্দেশ করে ক্ষমতার কেন্দ্র আমাদের থেকে বিমুখ কিংবা আমাদের ক্ষীণ কণ্ঠস্বর অত বড় কান অবধি পৌছায়নি। যতযাই হোক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ভিন্ন আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই, অন্য কোন উপায়ও নেই; এতে সময় লাগে লাগুক, হতাশা আর বিতৃষ্ণার আগুনে আরো কিছুটা দগ্ধ হই তবু পিছু হটার কোন সুযোগ নেই। আমরা আমাদের ঠকাতে পারি না, আপনাদের শিক্ষা আর সন্মানকে ভুলুণ্ঠিত হতে দিতে পারিনা।
সত্য সবসময় জয়ী হয় তাইনা স্যার? আমরা তো আপনাদের কাছে এমনটাই শিখেছি।
ইতি
আপনার স্নেহের একজন ছাত্র।।
সংগৃহিত : Snigdha Afsana ম্যাডাম
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে আগস্ট, ২০১২ বিকাল ৩:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



