প্রথম পর্ব
দ্বিতীয় পর্ব
তৃতীয় পর্ব
-- আমাদের রাণী বিজ্ঞান খুব ভালবাসতো। একদিন তিনি আদেশ জারি করলেন, তাঁর দেশের সব নারীদের শিক্ষিত হতে হবে। সেজন্য সরকারীভাবে অনেকগুলো মেয়েদের স্কুল গড়ে তোলা হলো। সব নারীদের মাঝে শিক্ষা ছড়িয়ে যেতে থাকলো।বাল্যবিবাহও বন্ধ হয়ে গেল। একুশ বছরের কোন নারী বিয়ে করার অনুমতি পেত না। আমি অবশ্যই তোমাকে বলতে চাই, এর আগে আমরা কঠোর পর্দার ভিতরে আবদ্ধ ছিলাম।
আমি মাঝখানে জিজ্ঞ্যেস করে বসলাম, কিভাবে টেবিল ঘুরে গেল?
সে বললো, কিন্তু প্রাইভেসী রক্ষা করা হতো। কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো যেখানে কোন পুরুষ ভর্তি হতে পারতো না।
-- রাজধানীতে, যেখানে আমাদের রাণী থাকেন, সেখানে দুটো বিশ্ববিদ্যালয়।তার একটিতে একদিন একটি চমৎকার বেলুন তৈরী করা হলো, তারপর তার সাথে কতগুলো পাইপ জুড়িয়ে দেয়া হলো।এটাকে মেঘের উপরে এমনভাবে ভাসিয়ে রাখা হলো যাতে করে এটা দিয়ে বায়ুমন্ডল থেকে যত খুশী পানি টেনে নেয়া যায়। এর ফলে সেখানে কোন মেঘ জমতে আপ্রে না আর এর মাধ্যমে সেখানকার বুদ্ধিমতী প্রিন্সিপাল ম্যাডাম বৃষ্টি আর ঝড় বন্ধ করলেন।
-- সত্যি!! এখন বুঝতে পারছি কেন এখানে কোন কাদা দেখলাম না!! কিন্তু আমি বুঝলাম না কি করে পাইপের মাধ্যমে পানি সংগ্রহ করা সম্ভব? সে আমাকে সব বিস্তারিত বলল, কিন্তু আমার সীমিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান দিয়ে তেমন কিছুই বুঝতে পারলাম না।
-- যখন অন্য বিশ্ববিদ্যালয় এই ব্যাপারটা জানলো তারা ঈর্ষান্বিত হলো এবং আরো চমকপ্রদ কিছু করতে চাইলো।তারা আবিষ্কার করলো এমন এক যন্ত্র যা দিয়ে যত খুশী সূর্যের তাপ সংগ্রহ করা যাবে। সেই তাপ তারা সংরক্ষণ করে রাখলো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সবাইকে সরবরাহ করলো।
এদিকে যখন নারীরা নিত্যনতুন গবেষণায় রত, তখন এদেশের পুরুষরা মেতে ছিল কিভাবে তাদের মিলিটারী পাওয়ার আরো বাড়ানো যায় সেটা নিয়ে।
-- তোমাদের আবিষ্কারগুলো সত্যিই চমৎকার!! কিন্তু আমাকে বল, কিভাবে তোমরা তোমাদের পুরুষদের ঘরের ভেতর আটকালে? তোমরা কি প্রথমে তাদের ফাঁসিয়েছিলে?
-- না।
-- এটা এমন নয় যে, তারা নিজেরাই নিজেদের মুক্ত জীবন সমর্পণ করেছে আর চার দেয়ালের মাঝে বন্দী করে নিয়েছে। তবে তারা সেটা করতে বাধ্য হয়েছে।
-- হ্যাঁ, তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে।
-- কাদের দ্বারা? কিছু নারী সৈন্যদের দিয়ে? (অবাক হবার ইমো)
-- না না। কোন শক্তি দিয়ে নয়।
-- হ্যাঁ, আমিও তাই ভাবছি, এটা সম্ভব নয়। কারণ, পুরুষরা নারীদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী। তাহলে কিভাবে?
-- মেধা দিয়ে।
-- পুরুষের ব্রেন তো নারীদের ব্রেনের চেয়ে সাইজে বড় আর ওজনও বেশী, তাই না?
-- হ্যাঁ, কিন্তু তাতে কি? হাতীর ব্রেনও পুরুষমানুষদের ব্রেনের চেয়ে অনেক বেশী বড় আর ভারী।কিন্তু পুরুষরা তাদেরকে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ী হাতিকে শৃংখলে আবদ্ধ করেছে এবং পরিচালনা করেছে।
-- ভাল বলেছ তো। কিন্তু ঠিক কি ঘটেছে বল দেখি। আমি তো আর ধৈর্য রাখতে পারছি না।
-- নারীদের ব্রেন পুরুষদের ব্রেনের চেয়ে দ্রুত কাজ করে।দশ বছর আগে যখন মিলিটারী অফিসাররা নারী বিজ্ঞানীদের ‘সেল্টিমেন্টাল নাইটম্যায়ার’ বলেছিল, তখন কিছু যুবতী নারী তাদের এই কটু মন্তব্যের জবাব দিতে চেয়েছিল। তখন উভয় প্রিন্সিপাল ম্যাডাম তাদের এই বলে বাধা দিল যে, যখন সুযোগ আসবে তখন কথা নয়, কাজ দিয়ে তারা এর উপযুক্ত জবাব দিবে। আর সুযোগ আসবার জন্য তাদেরকে খুব বেশী দিন অপেক্ষা করতে হয়নি।
আমি হাততালি দিয়ে উঠলাম, কি চমৎকার!! এখন এই গর্বিত পুরুষরা তাদের আবেগতাড়িত স্বপ্নগুলো দেখতে থাকুক।
-- কিছুদিন পরেই পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে কিছু লোক হঠাৎ আমাদের দেশে এসে আশ্রয় চাইলো। তারা রাজনৈতিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছিল।
-- সে দেশের রাজা যিনি কিনা ভাল সরকার গঠনের চেয়ে ক্ষমতায় বেশী বিশ্বাসী ছিলেন, আমাদের দয়ালু রাণীর কাছে তার অফিসারদের ফেরত চাইলেন। কিন্তু রাণী তাদেরকে ফেরত পাঠাতে অস্বীকৃতি জানায়।এতে করে সে রাজা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
-- আমাদের মিলিটারী অফিসাররাও মুহূর্তে প্রস্তুত হয়ে যায় শত্রুপক্ষকে মোকাবিলা করতে।
-- কিন্তু শত্রুপক্ষ আমাদের চেয়ে বেশী শক্তিশালী ছিল। নিঃসন্দেহে আমাদের সৈন্যরা সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছে, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে বিদেশী সৈন্যরা আমাদের সৈন্যদেরকে পরাজিত করতে থাকে আর সামনে এগোতে থাকে।
-- প্রায় সব পুরুষেরা যুদ্ধে গিয়েছিল, এমনকি ১৬ বছরের বালক পর্যন্ত। আমাদের বেশীর ভাগ সৈন্য মারা পড়লো, কেউ কেউ ফিরে চলে আসলো। শত্রুরা রাজধানীর ২৫ মাইলের ভিতরে চলে আসলো। (উদ্বিগ্ন হবার ইমো)
-- এক জরুরী মিটিং বসলো রাণীর প্রাসাদে জ্ঞানী-গুণী নারীদের নিয়ে, কিভাবে আমাদের দেশকে রক্ষা করা যায়?
-- কেউ কেউ সৈন্যদের মতো করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবার পরামর্শ দিলো, কিন্তু অন্যরা তাতে আপত্তি করলো। কারণ, নারীদের তলোয়ার আর বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ করার কোন প্রশিক্ষণ নেই, তারা জানেও না কিভাবে মারণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়। তৃতীয়পক্ষ আক্ষেপ করতে থাকলো নিজেদের দুর্বল দেহ নিয়ে।
রাণী বললেন, যদি শারীরিক শক্তি দিয়ে না পারো, তবে বুদ্ধি দিয়ে দেশ বাঁচাতে চেষ্টা করো।
কিছুক্ষণ নীরবতা বয়ে গেল। মাননীয় রাণীমাতা আবারো বললেন, আমি যদি আমার দেশ আর সম্মান হারাই, তাহলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমার আর কোন রাস্তা থাকবে না।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (যারা সূর্যের তাপ সংগ্রহ করেছে) প্রিন্সিপাল ম্যাডাম (যিনি কিনা পুরো আলোচনাতে চুপচাপ ভাবছিলেন)বললেন, আমাদের বেশীর ভাগই শেষ হয়ে গেছে, খুব অল্প আশাই বাকী আছে। তারপরও একটা চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে, এটাই প্রথম, আর এটাই শেষ।এই প্রচেষ্টা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আত্মহত্যা ছাড়া আর কোন উপায় থাকবে না।উপস্থিত সবাই উচ্চকন্ঠে বলে উঠল, কিছুতেই আমরা তাদের অধীনস্ত হবো না, যা-ই ঘটুক না কেন।
রাণী সবাইকে ধন্যবাদ জানালেন এবং প্রিন্সিপাল ম্যাডামকে তার চেষ্টা চালাতে বললেন।
প্রিন্সিপাল ম্যাডাম পুনরায় দাঁড়িয়ে বললেন, কিন্তু আমরা বাইরে যাবার আগে অবশ্যই পুরুষদের অন্তঃপুরে প্রবেশ করতে হবে। এটা আমাদের পর্দা রক্ষার্থেই জরুরী।
হ্যাঁ, অবশ্যই, রাণীজী বললেন।
পরেরদিন রাণী সকল পুরুষদের ঘরে ফিরে বিশ্রাম নিতে বললেন, নারীদের সম্মান আর চলার স্বাধীনতা রক্ষার্থে।
পুরুষরা এতোই ক্লান্ত ছিল যে তারা আর অগ্রসর না হয়ে বিশ্রামে যাওয়ার আদেশ মেনে নিলেন।তারা নত হয়ে গেল আর কোন রকমের উচ্চবাচ্চ্য ছাড়াই অন্তঃপুরে প্রবেশ করলো।তারা নিশ্চিত ছিল যে দেশের জন্য আর কোন আশাই বাকী নেই।
এরপর প্রিন্সিপাল ম্যাডাম তার দুই হাজার ছাত্রী নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে এলেন, সূর্যের আলো এবং তাপ ঘনীভূত করে নিক্ষেপ করলেন শত্রুর উপর।
তাপ আর আলো এতো বেশী ছিল যে সৈন্যরা সেটা সহ্য করতে পারলো না। তারা দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে পালাতে লাগলো। তাদের জানা ছিল না কি করে এই জ্বলে-পুড়ে গলে যাবার মতো প্রচন্ড তাপের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হয়। যখন তারা তাদের অস্ত্র-শস্ত্র, গোলা-বারুদ সব ফেলে পালালো, সবাই ভীষণরকমভাবে পুড়ে গেল।
-- তারপর থেকে আর কেউ কখনো আমাদের আক্রমণ করার চেষ্টা করেনি।
-- এরপরে তোমাদের পুরুষরা আর ঘর থেকে বেরোতে চায়নি?
-- হ্যাঁ, তারা মুক্ত হতে চেয়েছিল। কিছু পুলিশ কমিশনার আর জেলা ম্যাজিস্ট্র্যাট রাণীর কাছে দাবী জানিয়েছিল যে আর্মি অফিসাররা তাদের ব্যর্থতার জন্য শাস্তি পেতে পারে, কিন্তু তারা তো তাদের দায়িত্বে কোন অবহেলা করেনি, তারা কেন শাস্তি পাবে? তারা তাদেরকে পূর্ব দায়িত্বে বহাল করবার জন্য রাণীর কাছে আবেদন করেছিল।
রাণী তাদের সবাইকে জানালেন যে, যখনই প্রয়োজন হবে তাদেরকে তাদের পূর্ববর্তী দায়িত্বে অবশ্যই ফিরিয়ে নেয়া হবে।
-- এটা খুব ভালো হয়েছে। যদি কোন অসৎ নারী থেকে থাকে, তোমরা খুব সহজেই তাকে শাস্তি দিতে পারবে।যেহেতু তোমরা কোন রকমের রক্তপাত ছাড়াই এতো বড় বিজয় লাভ করলে, সুতরাং কোন ধরণের অন্যায় বা অন্যায়কারীকে নিয়ন্ত্রণ করাও তোমাদের জন্য খুব কঠিন হবে না।
-- এখন, সুলতানা তুমি কি এখানেই বসবে নাকি আমার রুমে এসে বসবে?
-- তোমার রান্নাঘর রাণীর শোবার ঘরের চেয়ে কম নয়!! হাসিমুখে উত্তর দিলাম।
ক্রমশ......
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই অক্টোবর, ২০১০ রাত ১০:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


