somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক কি শত্র“তার?

২৭ শে মার্চ, ২০১৪ রাত ১২:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শিক্ষকগণ হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর। একটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির পেছনে শিক্ষকদের বিরাট অবদান। আর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সে ভিত্তিটা রচনা করে দেন। সুতরাং দুনিয়ার সকল বড় মানুষই তাদের প্রথম জীবনের শিক্ষকদের কাছে ঋণী থাকেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রদর্শন করেন। পরিণত বয়সে গিয়েও শিক্ষকের পায়ের ধুলো মাথায় নেন। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক পরিস্থিতি এমনটাই হয়েছে যে সে কৃতজ্ঞতাবোধ, শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন একেবারেই হারিয়ে যাচ্ছে। এখন প্রায়শঃই বড় বড় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন দাবি আদায়ের নামে শিক্ষকদেরকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করতেও দেখা যায়। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি, হুমকি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা কার্যালয়ে তালা লাগিয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা, ক্লাস বর্জন তো স্বাভাবিক ঘটনা। সমাজব্যবস্থার এমন অধঃপতন কেন হয়েছে এবং এর পেছনে ছাত্ররা দায়ী নাকি শিক্ষক দায়ী তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অথচ এক সময় সমাজে শিক্ষকের মর্যাদা ছিল সবার উপরে। ছাত্রদেরকে মানুষ করতে শিক্ষকগণ অনেক কঠোরতা করতেন কিন্তু অভিভাবগণ তাতে কোন ধরনের আপত্তি করেছেন বলে জানা যায় না। তারা বুঝতেন যে, তাদের সন্তানের মঙ্গলের জন্যই শিক্ষকদের এই আপাত কঠোরতা। আমরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজী কাদের নেওয়াজের শিক্ষকের মর্যাদা কবিতাটি পাঠ করেছি। মুঘল বাদশাহ আলমগীর তার পুত্রকে একজন শিক্ষকের কাছে পড়াতে দিয়েছিলেন। একদিন তিনি খোঁজ নিতে গিয়ে দেখেন শাহজাদা পাত্র থেকে পানি ঢালছেন আর শিক্ষক নিজ হাত দিয়ে পা ধুয়ে নিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে বাদশাহ ঐ শিক্ষককে ডেকে পাঠান। বাদশাহ’র আদেশ পেয়ে শিক্ষকতো ভয়ে মুষড়ে গেলেন। তিনি প্রথমে ভাবলেন বাদশাহ’র সন্তানকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালিয়ে না জানি তিনি কত বড় স্পর্ধার কাজ করে ফেলেছেন! কিন্তু পরক্ষণেই তার আত্মমর্যাদা বোধ জেগে উঠে। পরদিন তিনি মাথা উঁচু করেই বাদশাহ’র সামনে হাজির হন। কিন্তু তিনি যা ভেবে গিয়েছিলেন প্রকৃত ঘটনা তার বিপরীত। বাদশাহ শিক্ষককে তিরস্কার করে বললেন যে, আপনার কাছ থেকে আমার সন্তানতো কোন আদব-কায়দাই শিখলো না! এ কেমন শিক্ষা দিলেন যে আপনার ছাত্র আপনার পায়ে পানি ঢেলে দেবে আর আপনি আপনারই হাত দিয়ে পা পরিষ্কার করবেন? আপনি তাকে এমন শিক্ষা দিলেন না কেন যেন সে নিজেই নিজের হাত দিয়ে আপনার পা ধুয়ে দেয়? তখন শিক্ষক লজ্জিত বোধ করেন এবং শিক্ষকদের প্রতি বাদশাহ’র এত বড় সম্মান প্রদর্শনে অভিভূত হন। একারণে তিনি উচ্চকিত কণ্ঠে বাদশাহ’র প্রশংসা করেন।

কিন্তু আজ আমাদের অবস্থা কি হয়েছে? আইন করে আমরা শ্রেণিকক্ষে বেত নেওয়া বন্ধ করেছি। ছাত্ররা শিক্ষকদের সাথে বেয়াদবি করছে। নীতি-নৈতিকতা, সততা, ওয়াদা রক্ষা, মিথ্যা না বলার মত সদগুণগুলো শিখছে না। ফলে সমাজে অপরাধীর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। দেখা যাচ্ছে, যে যত বেশি শিক্ষিত সে তত অসৎ। রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড থেকে শুরু করে জাতীয় নেতৃত্বে পর্যন্ত যে যত উপরে উঠছে সে তত বেশি দুর্নীতিবাজ হচ্ছে, তত বেশি সে রাষ্ট্রের সম্পদ অবৈধভাবে ভোগ করছে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অন্যায়, অবিচার প্রবেশ করে মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়ে উঠেছে। প্রতিনিয়ত অসৎ মানুষগুলোর কাছে সৎ মানুষগুলো ঠকছে, অপমানিত হচ্ছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার এই ব্যর্থতার পেছনে এককভাবে ছাত্ররাই কি দায়ী? না, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের কারণে ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের স্বাভাবিক সম্পর্কটুকু হারিয়ে গেছে। আজকের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রচুর অর্থ খরচ করে ছাত্র-ছাত্রীরা পড়া-লেখা করে, শিক্ষকগণও শিক্ষা দেওয়াকে অন্যান্য আর আট-দশটা পেশার ন্যায় একটি পেশা মনে করে ছাত্রদের কাছ থেকে যথা সম্ভব নানা কায়দা-কানুন করে অর্থোপার্জন করেন। ফলে উভয়ের সম্পর্ক হয়ে গেছে ক্রেতা-বিক্রেতার মত। এর পেছনে শিক্ষকদের ব্যর্থতাও কম নয়।

গত মঙ্গলবার দৈনিক সমকাল প্রকাশিত একটি খবর থেকে জানা যায়, ‘বগুড়ার সোনাতলা উপজেলার সুখানপুকুর এলাকার হুয়াকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অর্ধশতাধিক ছাত্র-ছাত্রীকে পিটিয়ে আহত করেছেন ওই স্কুলের শিক্ষক দম্পতি।’ প্রকাশিত খবর থেকে আরো জানা যায়, ‘এই বিদ্যালয়ের পার্শ্বস্থ আদর্শ কোচিং সেন্টারে এই বিদ্যালয়েরই ১০০ ছাত্র/ছাত্রী কোচিং নেয়। কোচিং কর্তৃপক্ষ ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে বিনোদনের জন্য শিক্ষা সফরের আয়োজন করে। ২৩ মার্চ দিনাজপুর জেলার স্বপ্নপুরীতে যাওয়ার জন্য তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা আগের দিন ২২ মার্চ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার কাছে ছুটির আবেদন করে। কিন্তু ছুটির আবেদন গ্রহণ করেননি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা উম্মে কুলসুম। তা সত্ত্বেও ২৩ মার্চ শিক্ষা সফরে যায় তারা। পরদিন সোমবার শিক্ষা সফরে যাওয়ার অপরাধে বিদ্যালয়ের একটি রুমে আটকে প্রধান শিক্ষিকা ও তার স্বামী একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক আসাদুল বারী ছাত্র-ছাত্রীদের বেধড়ক পেটান। এতে প্রায় অর্ধশত ছাত্র-ছাত্রী আহত হয়। বিষয়টি জানতে পেরে বিক্ষুব্ধ অভিভাবকরা বিদ্যালয়ে গেলে কৌশলে প্রধান শিক্ষিকা উম্মে কুলসুম ও তার স্বামী সহকারী শিক্ষক আসাদুল বারী বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে যান।’

যেখানে কোমলমতি ছাত্র/ছাত্রীদের জন্য শিক্ষকদের চোখ রাঙানিই যথেষ্ট ছিল সেখানে শিক্ষকগণ হাতে বেত নেন, বেধড়ক পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠান। শিক্ষকদের এসব কর্মকাণ্ডে আমি শিক্ষকসুলভ সততা এবং ধৈর্যের কোন পরিচয় পাইনা। নিজেরাই যেখানে নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করতে পারেন না, নিজেদের মেজাজ ধরে রাখতে পারেন না, সেখানে তারা ছাত্র/ছাত্রীদেরকে কি শিক্ষা দেবেন? সম্মানের পাত্র হতে গেলে নিজেদেরকে সে যোগ্যতাও প্রদর্শন করতে হয়। শুধু শিক্ষক হলেই মানুষ সম্মান করবে না, তাদের আচরণে শিক্ষণীয় কিছু থাকতেও হবে। ছাত্র শিক্ষকের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় আবার শিক্ষকও ছাত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী নন। সুতরাং ছাত্রদের সাথে শত্র“তার সম্পর্ক না রেখে শিক্ষার জন্য প্রাঞ্জল পরিবেশ বজায় রাখা উচিৎ। প্রয়োজনে তাদের গায়ে হাত তোলাকেও আমি ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করি যদি সেটা সীমা না ছাড়ায় কিংবা সেটা ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত না করে। এ ব্যাপারে অভিভাবকদের আপত্তি তোলার মানসিকতা দূর করার দায়িত্বটুকুও শিক্ষকদেরই।

বাদশাহ আলমগীরের মত মানসিকতা অতীতে যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে ছিল। কিন্তু সেটা পরিবর্তীত হয়ে ‘বেত নিষিদ্ধ’ হওয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি হওয়াটা তাদেরই ব্যর্থতা। সুতরাং সকল বাঁধা বিপত্তি এড়িয়ে এই পঁচে যাওয়া সমাজ পুনর্গঠনে শিক্ষকদের এখন ভূমিকা রাখতে হবে।
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×