
নিউ মার্কেট থেকে টিউশন শেষ করে এক নাম্বার বাসে করে বাসায় ফিরছিলাম।
বাস আন্দরকিল্লা পার হচ্ছিলো। এই সময় পিছন থেকে একজন হঠাৎ তার ছোট ভাইকে ফোন দিয়া বলে উঠলো, "রবিউল, তর ভাবিরে ফোন গরি ফোনন্য রিসিভ গইরতো হ। হ দে রিসিভ ন গইরলে আঁই বিষ হাইউম।"
যুবকের কথা শুনে আশেপাশে সবাই মুচকি মুচকি হাসা শুরু করলো। আমি পিছন ফিরে তাকায়া যুবকটার মুখ দেখে আর হাসতে পারলাম না। তার চেহারা পড়ে মনে হলো, এই লোক আত্মহত্যা করলেও করতে পারে। কি গভীর বেদনা চোখে-মুখে! কি ক্লান্তি!
একটু পরে বেচারা ছোটভাইকে আবার ফোন দিলো। "এহনো রিসিভ ন গরে? তুই ফোন দিয়াত থাক। আঁই কিন্তু বিষ হাই ফেলাইউম।" আবার সবাই মুচকি মুচকি হাসি।
আমার খুব খারাপ লাগতে লাগলো যুবকের জন্য। এই বেদনার খবর আমি জানি। ভালোবাসার মানুষের অবহেলা কি যে কঠিন সেটা আমি অনুভব করছি গত কয়দিনে। আমার খুব কাছের একজন মানুষকে দেখে। এই মানুষটা ভালোবেসে কেমন যেন হইয়া গেলো!
কি সব পাগলামী! যেটা হবার নয় সেটা নিয়েই মাতলামি। কিছু বুঝালে সেটা মাথার উপর দিয়া যায়। এই আপাত নিরীহ মানুষটাকে যদি বলা হয়- ভালোবাসার জন্য তোমাকে ঘর ছাড়তে হবে আমি নিশ্চিত তিনি ঘর ছাড়বেন। যদি বলা হয়- খুন করো। আমার মনে হয় তিনি একবারও না ভেবে খুন করবেন।
তাকে কত বুঝালাম, এই পাগলামির ফল, শূন্য। উনি বলেন, "আমি শূন্যই চাই। শূন্য নিয়াই আমি থাকতে পারবো।" কি বাচ্চামী! অথচ আমার দেখা খুব ঠান্ডা এবং যুক্তিবাদী একজন মানুষ।
আসল কথা হলো, যত ঠান্ডা আর যুক্তিবাদীই হোক না কেন, মানুষ পারে না। প্রকৃতি যত ধৈর্যই মানুষকে দিক না কেন, প্রিয়জনের অবহেলা সহ্য করবার ক্ষমতা মানুষকে দেওয়া হয়নি। মানুষ সব সহ্য করতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার মানুষের অবহেলা-অপমান মানুষ সহ্য করতে পারে না।
আমার পরিচিত মানুষটাও পারছে না। আমার পেছনের সিটে বসা যুবকটাও হয়তো পারছিলো না। ছোটভাইয়ের কাছে ফোন করে কি বারবার কী আকুতি!
"যে হন প্রকারে তর ভাবিল্লাই যোগাযোগ গর। নইলে আঁই রাতিয়াই বিষ হাইউম।"
আমি যখন বাস থেকে চকবাজার নামছিলাম তখনো ছেলেটা ছোটভাইকে ফোন দিচ্ছিলো। আহারে বেচারা! বউটা কি ফোন করবে? আমি জানি না। হয়তো সেও আর থাকতে পারবে না। ফোনটা রিসিভ করে ফাজিল ফাজিল গলায় বলবে, "কেমন দেখালাম, হুম! আমার সাথে আর বাড়াবাড়ি করবা?" কিংবা হয়তো রিসিভ করবেই না।
হয়তো ছেলেটা অতি তুচ্ছ কারণে ইঁদুর মারার বিষ খাইয়া মরে যাবে কিংবা পুরোটাই বউকে পটানোর জন্য। বউ ঠিক হয়ে গেলে সিগারেটে কষে টান দিতে দিতে হা হা হা হা করে হাসবে নিজের মনে। আমরা জানি না। কোনটাই জানি না।
তবে একটা ব্যাপার পরিষ্কার। পৃথিবীতে একজন থাকে, যে চায়, সমস্ত চারপাশ কাঁপায়া সঙ্গী কিংবা সঙ্গীনীকে ভালোবাসে। আরেকজন থাকে যার এইসব গায়েই লাগে না। পৃথিবীর সমস্ত অবহেলা-অপমান নিয়া সে ভালোবাসাময় মানুষটার পৃথিবী ভাঙ্গচোর করে।
ভালোবাসার বিপরীতে ভালোবাসা খুব কম মানুষই দেখায় পৃথিবীতে। ভালোবাসার বিপরীতে ভালোবাসা পায়ও অল্প কয়জন মানুষ।
ভাগ্যবান মানুষ এই পৃথিবীতে কম। খুবই কম...
১৯ নভেম্বর, '১৬। অগ্রানের রাত।
চট্টগ্রাম।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৯ দুপুর ১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



