somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সড়ক আইন, বাস্তবতা ও শুভকংরের ফাঁক

২০ শে নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সড়কে প্রায় প্রতিদিনই অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটছে। বুয়েটের এআরআই’র তথ্য অনুযায়ী গত বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ৭৬ জন। আহত হয়েছেন ৮ হাজার ৭১৫ জন। জানা গেছে, বুয়েট কেবল সংবাদপত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে দুর্ঘটনার এই তথ্য সংগ্রহ করেছে। বাস্তবে দুর্ঘটনার ঘটনা আরও বেশি। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে অসংখ্য দুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারানো ছাড়াও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিরা পঙ্গুত্ববরণ করছেন। হচ্ছেন বিকলাঙ্গ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন গড়ে ৫৫ ব্যক্তির প্রাণহানি হচ্ছে। আর বাংলাদেশ রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গবেষণা বলছে, দেশে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে ১২,০০০ মানুষ নিহত ও ৩৫,০০০ আহত হন। গত ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৬ আগস্ট থেকে ১৭ আগস্ট ১২ দিনে ঈদুল আজহা উপলক্ষে যাতায়াতকালে দেশে ২০৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২২৪ জন প্রাণ হারায়। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশের কারণ চালকের বেপরোয়া গাড়িচালনা। এর মধ্যে চালকদের বড় একটি অংশের বৈধ লাইসেন্স নেই।



গত বছরের ২৯ জুলাই দুই বাসের রেষারেষির বলি হয়েছিল ঢাকার শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মিম ও রাজু।
এ ঘটনার জন্মদাতা দুই বাসচালকেরও ভারি যান চালানোর লাইসেন্স ছিল না। বাসগুলোরও ছিল না ফিটনেস। তখন সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে প্রায় সারা দেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফুঁসে ওঠে। আন্দোলনের মুখে তাৎক্ষণিকভাবে সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, পুলিশ এবং পরিবহন মালিক-চালকদের টনক নড়ে। অনুসন্ধানে পরিবহন খাতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি, বেআইনি কর্মকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে আসে।

অবেশেষে বাংলাদেশে চালক ও পথচারী উভয়ের জন্য কঠোর বিধান যুক্ত করে শুক্রবার থেকে কার্যকর করা হয়েছে বহুল আলোচিত 'সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৯।' আন্দোলনের মুখে ১৯শে সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন আইন পাস করে সরকার। ১৪ মাস পর সেটা কার্যকর হল।

নতুন আইনের উল্লেখযোগ্য ১৪টি বিধান:
* সড়কে গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে হত্যা করলে ৩০২ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
* সড়কে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালালে বা প্রতিযোগিতা করার ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা তিন লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। আদালত অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ বা অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে দেয়ার নির্দেশ দিতে পারবে।
* মোটরযান দুর্ঘটনায় কোন ব্যক্তি গুরুতর আহত বা প্রাণহানি হলে চালকের শাস্তি দেয়া হয়েছে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল ও সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা।
* ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া মোটরযান বা গণপরিবহন চালানোর দায়ে ছয় মাসের জেল বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে।
* নিবন্ধন ছাড়া মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
* ভুয়া রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার এবং প্রদর্শন করলে ছয় মাস থেকে দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা এক লাখ থেকে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।
* ফিটনেসবিহীন ঝুঁকিপূর্ণ মোটরযান চালালে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হয়েছে।
* ট্রাফিক সংকেত মেনে না চললে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।
* সঠিক স্থানে মোটর যান পার্কিং না করলে বা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে।
* গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বললে এক মাসের কারাদণ্ড এবং ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
* একজন চালক প্রতিবার আইন অমান্য করলে তার পয়েন্ট বিয়োগ হবে এবং এক পর্যায়ে লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।
* গণ পরিবহনে নির্ধারিত ভাড়ার চাইতে অতিরিক্ত ভাড়া, দাবী বা আদায় করলে এক মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দণ্ডিত করা হবে।
* আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্সে পেতে হলে চালককে অষ্টম শ্রেনি পাস এবং চালকের সহকারীকে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে হবে। আগে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন প্রয়োজন ছিল না।
* গাড়ি চালানোর জন্য বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। এই বিধান আগেও ছিল।
* এছাড়া সংরক্ষিত আসনে অন্য কোনও যাত্রী বসলে এক মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।



আপাত দৃষ্টিতে ভাল এই আইনের বিরুদ্ধে কেন তবে পরিবহন মালিক শ্রমিক আন্দোলনে গেল? বিগত কয়েকদিনের আঞ্চলিক ধর্মঘটের পর নতুন সড়ক আইন কার্যকরের প্রতিবাদে আজ সারা দেশে যান চলাচল বন্ধ আছে।
রাজশাহী জেলার পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছেন, নতুন আইনটি সংস্কারের দাবিতে শ্রমিকেরা ধর্মঘট পালন করছে। তিনি বলেছেন, "নতুন আইনটা সংস্কার করা প্রয়োজন। এই আইনে ড্রাইভারের জন্য যে জরিমানা ধরা হইছে, সেইটা একজন ড্রাইভার কোথা থেকে দেবে? সে বেতন পায় কত টাকা?"

"কিন্তু সব পরিবহন শ্রমিক ধর্মঘট করছে না। যার কাগজ ঠিক আছে সে চালাইতেছে। যার কাগজ ঠিকঠাক নাই, মানে মেয়াদ শেষ হইছে বা কাগজ হারিয়ে গেছে বা চুরি গেছে, তারা বইসা আছে। কারণ কাগজ হইতে তো সময় লাগে। একদিনে তো আর হয় না।"
নতুন আইনে দুর্ঘটনার জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও পাঁচ বছরের সাজার ব্যবস্থা রাখা রয়েছে।এই ধর্মঘট কতদিন চলবে, এমন এক প্রশ্নে মিঃ আলম বলেন, পরিবহন শ্রমিকের স্বার্থ নিশ্চিত হওয়ার পর তারা কর্মসূচি তুলে নেবেন।

সরকার কী বলছে?
সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সোমবার ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেছেন, কোন মহলের চাপের মুখে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন 'অকার্যকর' করা যাবে না। তিনি বলেন, "এই আইন যেন সহনীয় পর্যায়ে কার্যকর করা হয়, তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ আইন কাউকে শাস্তি দিতে নয়, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা কমাতে ব্যবহার করা হবে।"

বাস্তবতা কি?
তা বিচারের আগে চলুন সমস্যা গুলো চিহ্নিত করার চেষ্টা করি।
ক্যাটাগরি -১
* হেভি লাইসেন্স ছাড়াই হেভি গাড়ী চালানো
* সড়ক অপ্রতুলতা
* পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস না থাকা
* গাড়ীর ফিটনেস না থাকা
* পর্যাপ্ত বাস বে না থাকা
* আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকা
* যাত্রী পথচারিদের আইন অমান্য করার মানসিকতা
* মেইনস্ট্রীম মিডিয়া সহ সকল মাধ্যমে অপ্রতুল প্রচারণা

ক্যাটাগরি -২
* বেপরোয়া চালনা
* চালকের অধৈর্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও
* ক্লান্তি (একজন চালকের দিনে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর নিয়ম থাকলেও চালান ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত)
* গন্তব্যে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে বা বেশি যাত্রীর আশায় চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান ও রেষারেষিতে লিপ্ত হন।
* এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর শক্তি ধরে রাখতে অনেক চালক মাদক গ্রহণ
* দিনভিত্তিক গাড়ি ভাড়ায় চালান চালকরা।
* কম সময়ে বেশি যাত্রী পরিবহনে তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।


ক্যাটাগরি -১
* হেভি লাইসেন্স ছাড়াই হেভি গাড়ী চালানো

আমাদের গাড়ীর লাইসেন্স সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠান হলো বিআরটিএ। লাইসেন্স সমস্যার কার দায় কতটুকু একটু চোখ বুলিয়ে নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে, একটি গাড়ির বিপরীতে দেড়জন চালক থাকতে হয়। আমাদের দেশে গাড়ির সমসংখ্যক চালকই নেই। সড়কে দুর্ঘটনা রোধে গাড়ির অতিরিক্ত গতি নিয়ন্ত্রণে দরকার বৈধ চালক।’

নিবন্ধিত গাড়ি ও সরবরাহ করা লাইসেন্সের বিষয়ে বিআরটিএর পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, দেশে পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ১১৬টি গাড়ি বৈধ লাইসেন্স ছাড়া চালানো হচ্ছে। গত জুলাই পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত হয় ৪১ লাখ ছয় হাজার ৯৩৪টি গাড়ি। একই সময়ে লাইসেন্স দেওয়া হয় ৩৫ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৮টি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনসহ বিভিন্ন সংগঠনের কাছ থেকে জানা গেছে, ৩৯ শতাংশ ভারী গাড়ির চালকের বৈধ লাইসেন্স নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারী যানবাহনের ক্ষেত্রে গাড়ির তুলনায় আড়াই থেকে তিন গুণ বেশি চালক থাকা জরুরি। বিভিন্ন পরিবহন সমিতি ও ইউনিয়নের হিসাবে বাস, মিনিবাস, ট্রাক, পিকআপ, লরি, অটোরিকশার চালক থাকে একাধিক। বাস্তবে দেশে অবৈধ চালক আছে কমপক্ষে ১৬ লাখ।

বর্তমানে শুধু মুদ্রণের জন্যই কেন্দ্রীয়ভাবে এক লাখ ৭৯ হাজার ৩৯৪টি লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আর ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, বগুড়াসহ বিভিন্ন জেলার আরো অন্তত ছয় লাখ আবেদনকারী লাইসেন্স পেতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আটকে আছে।

২০১১ সালের নভেম্বর থেকে বিআরটিএ স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স দিচ্ছে গ্রাহকদের। এর জন্য চুক্তি হয় টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে। প্রথম দফা চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির পাঁচ বছরে ১১ লাখ ৫০ হাজার ড্রাইভিং লাইসেন্স সরবরাহের কথা ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে ওই সংখ্যক লাইসেন্স ছাড়াও অতিরিক্ত এক লাখ ৭২ হাজার লাইসেন্স সরবরাহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এরপর দ্বিতীয় দফা চুক্তিতে ১৫ লাখ লাইসেন্স সরবরাহের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় প্রতিষ্ঠানটি। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ১৩ লাখ ৮০ হাজার লাইসেন্স সরবরাহ করেছে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান ড্রাইভিং লাইসেন্স সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের পাঁচ বছরের মধ্যে যে কার্ড দেওয়ার কথা ছিল তা দেওয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৪০ হাজার কার্ড এসেছে, আরো ৪০ হাজার কার্ড আসবে। এ ছাড়া বর্তমান সরবরাহকারীকে ৩০ শতাংশ লাইসেন্স কার্ড সরবরাহের প্রক্রিয়া দ্রুত চূড়ান্ত হবে বলে আশা করছি। সংকটের কারণে অনেক স্থানে লাইসেন্স বিতরণ করতে হচ্ছে ধীরে। আমরা নতুন লাইসেন্স সংগ্রহের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছি। প্রক্রিয়া শেষ হতে ছয় মাস লাগবে। এই সময়ের মধ্যে সংকট মোকাবেলায় সাড়ে চার লাখ লাইসেন্স দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব বলে আশা করছি।’



সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সংকট উত্তরণের জন্য চুক্তির অতিরিক্ত ৩০ শতাংশ লাইসেন্স সরবরাহের জন্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান টাইগার আইটিকে চাপ দিলেও প্রস্তাবটি গতকাল পর্যন্ত সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির কাছে পাঠানো হয়নি। প্রস্তাবটি এক মাসের মধ্যে অনুমোদন হলেও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত লাইসেন্স ছয় মাসের আগে সরবরাহ করতে পারবে না বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এ ছাড়া প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ বছরের জন্য নতুন ৩৫ লাখ লাইসেন্স সংগ্রহের জন্য বিআরটিএ গত ২১ জুলাই দরপত্র আহ্বান করেছে। এরই মধ্যে দুইবার দরপত্রের সময় বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সময় বাড়িয়ে করা হয়েছে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর। এই দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হতে সময় লাগবে অন্তত আট মাস। আট মাসে দরপত্র চূড়ান্ত হওয়ার পর চুক্তি হবে বিআরটিএর সঙ্গে। তারপর লাইসেন্স সরবরাহ করতে লাগবে কমপক্ষে ছয় মাস। অর্থাৎ নতুন করে লাইসেন্স পেতে অপেক্ষা করতে হবে অন্তত ১৪ মাস। লাইসেন্স সরবরাহের হার কমে যাওয়ায় সংকট আরো প্রকট হবে বলে মনে করছেন বিআরটিএর কর্মকর্তারা।

এই বাস্তবতায় আইনের প্রয়োগ করতে গিয়ে চালকদের উচ্চমাত্রার জরিমানা কি যথাযথ হবে? লাইট থেকে হেভি লাইসেন্স গ্রহনের জন্য পরীক্ষা গ্রহণ এবং তার ব্যবস্থা না রেখে এবং তার জন্য বিআরিটএর যে টাইম জট তা সমাধানের ব্যবস্থা না করে শাস্তির বিধান কি সছিক হলো? এমনি লাইসেন্স প্রদানের যে ধীর গতি এবং সময় জট তা নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং আবেদনকারীদের প্রাপ্ত অস্থায়ী রশিদের ভিত্তিতে জরিমানার আওতার বাইরে রাখলে আশা করি তাদের পেরেশানি দূর হবে। আবার যথাযথ লাইসেন্স গ্রহনের বাধ্যবাধকতাও অটুট রবে।

* গাড়ীর ফিটনেস না থাকা
এটা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের যে দফতর গুলো আছে তার ভূত আগে তাড়াতে হবে। এক গাড়ী মালিককে দেখেছি ফটো শপে গড়াীর রংচটা বডি কালার ঠিক করে সেই ছবি দিয়েই ফিটনেস লাইসেন্স নিয়েছে? কিভাবে সম্ভব? এই শুভংকরের ফাঁকি অবশ্যই দূর করতে হবে। আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে সেই ভূতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে জেলে দিতে হবে। গাড়ীর কালো ধোঁয়া নিয়ন্ত্রনেও তথৈবচ দশা।

* সড়ক অপ্রতুলতা * পর্যাপ্ত পার্কিং স্পেস না থাকা * পর্যাপ্ত বাস বে না থাকা * আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থা না থাকা
এ সমুদয় সমস্যা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই সমাধান করতে হবে। শুধু চালক যা পথচারী বা যাত্রীদের দোষারুপ না করে আমাদের পর্যাপ্ত নূন্যতম
সুষ্ঠু সড়ক ব্যবস্থাপনা আগে নিশ্চিত করতে হবে। আর সীমাবদ্ধতার কথা গোপন না করে বরং পজিটিভলি সম্প্রচারে আনলে মানুষও সহনশীলতার সাথেই সহযোগী মনোভাবে নিজেদের বদলাতে মানসিক প্রস্তুতি নেবে।
* মেইনস্ট্রীম মিডিয়া সহ সকল মাধ্যমে অপ্রতুল প্রচারণা
মিডিয়ার শক্তিশারী ভূমিকা পুরোই অনুপস্থিত। সড়ক ও দূর্ঘটনা, সকল গ্রুপের সচেতনতা নিয়ে প্রচুর ফিলার, নাটিকা, নাটক, সিনেমা সকল ক্ষেত্রই বিনিয়োগ করতে হবে দেশপ্রেমের দায় থেকেই। সেই চার্লি চ্যাপলিন আমলেই দেখেছি তাদের ফানের মাঝেও আইন মানার, আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার শিক্ষা হাস্যরসের মাধ্যমেই দেয়া হতো।


ক্যাটাগরি -২
* বেপরোয়া চালনা
* চালকের অধৈর্য, অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও
* ক্লান্তি (একজন চালকের দিনে ৮ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর নিয়ম থাকলেও চালান ১২-১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত)
* গন্তব্যে তাড়াতাড়ি পৌঁছাতে বা বেশি যাত্রীর আশায় চালক বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালান ও রেষারেষিতে লিপ্ত হন।
* এছাড়া দীর্ঘ সময় ধরে গাড়ি চালানোর শক্তি ধরে রাখতে অনেক চালক মাদক গ্রহণ
* দিনভিত্তিক গাড়ি ভাড়ায় চালান চালকরা।
* কম সময়ে বেশি যাত্রী পরিবহনে তারা অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন।

সকল কিছুর মূলে চালকদের প্রতি মালিকদের অসুস্থ শর্তই দায়ী। চুক্তি ভিত্তিক গাড়ী নিয়ে যখন একজন চালক পথে বের হয় তখন মাথায় একটাই চিন্তা থাকে চুক্তির টাকা উঠানোর পরই তার নিজের আয়, হেল্পারের আয়। তাই তাদের প্রতি সম্পূর্ণ দোষের আঙুল তোলার আগে এসবের সমাধানে মালিক পক্ষের সাথে বসতে হবে। তাদের রুট পারমিটের সময় শর্ত যুক্ত করে দিতে হবে। দেশের অন্যন্য সকল শিল্প প্রতিষ্ঠান, ব্যবাসয়ী প্রতিষ্ঠান যদি নিজেদের কাঁধে ঝুকির দায় নিয়েই কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে কোম্পানী পরিচালনা করতে পারে, ট্রান্সপোর্ট কোম্পানী নয় কেন?
চালকদের চাকুরির নিশ্চয়তা এবং বেতন ভিত্তিক নিয়োগপত্র প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই তাদের মধ্যে যে আগ্রাসী যাত্রী ধরার প্রবণতা কমে আসবে। দিনে নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্রিপ দিয়ে নিশ্চিন্তে বাড়ী চলে যাবে। আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের অধিকারের দাবী মানতে হবে। কারণ চালকেরাও মানুষ।
উল্টো তাদের হাতে আরো অসংখ্য মানুষের জীবন মরণ নির্ভর করে। তাই তাদের প্রতি নূন্যতম মৌলিক মানবাধিকারের নিশ্চয়তার বিধান করতে হবে। অবৈধ চাঁদা বা জরিমানা দিয়ে তাদের মনে তা উসুল করার যে প্রচন্ড চাপ থাকে অবৈধ চাঁদা বন্ধের মাধ্যমে তা প্রতিহত করতে হবে। শুধু এটুকু নিশ্চিত করতে পারলে বাকীগুলো আপনাতেই কমে আসবে । কারণ সেগুলো এই একটা অনিশ্চয়তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবেই উদ্ভুত।

মালিক পক্ষকে এই মানবিক বিষয়ে সরকার বাধ্য করতে পারলে সমস্যার আশি ভাগই সমাধান হয়ে যায়। আর যে টুকু বাকী থাকে তা আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা যাবে বলেই আশাবাদী। তখন তারা আর আন্দোলনের কোন যৌক্তিক ইস্যু খুঁজে পাবে না।

একজন অন্যজনকে প্রতিপক্ষ না ভেবে সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হলেই- কোন সমস্যাই সমস্যা থাকে না।
আশা করছি মালিক, শ্রমিক, সরকার সকলেই যার যার অবস্থান থেকে সমস্যা গভীরে গিয়ে তার সমাধানে আন্তরিক হবে।
সীমাবদ্ধাতার মাঝেও আন্তরিকতায় প্রচেষ্টা চালাবে সুস্থ সুন্দর ও সুষ্ঠু সমাধানের।
মানুষ মুক্তি পাক ভোগান্তি থেকে।


তথ্যসূত্র:
কালের কন্ঠ
যুগান্তর
বিবিসি
অন্তর্জাল




সর্বশেষ এডিট : ২০ শে নভেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৪৮
২৮টি মন্তব্য ২৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাড়ী ভাড়া বিষয়ক সাহায্য পোস্ট - সাময়িক, হেল্প/অ্যাডভাইজ নিয়েই ফুটে যাবো মতান্তরে ডিলিটাবো

লিখেছেন বিষন্ন পথিক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ৯:১৭

ফেসবুক নাই, তাই এখানে পোস্টাইতে হৈল, দয়া করে দাত শক্ত করে 'এটা ফেসবুক না' বৈলেন্না, খুব জরুরী সহায়তা প্রয়োজন।

মোদ্দা কথা...
আমার মায়ের নামে ঢাকায় একটা ফ্লাট আছে (রিং রোডের দিকে), ১৬০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সকাল ১০:৪৫


জীবনানন্দ দাস লিখেছেন- সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে...। বনলতা সেন কবিতার অসাধারণ এই লাইনসহ শেষ প্যারাটা খুবই রোমান্টিক। বাংলা শিল্প-সাহিত্যের রোমান্টিসিজমে সন্ধ্যার আলাদা একটা যায়গাই রয়ে গেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বৃত্তে বৃত্তান্ত (কবিতার বই)

লিখেছেন মোহাম্মাদ আব্দুলহাক, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ দুপুর ১২:৫৯



দ্বিপদী
মিত্রাক্ষর

রসে রসে সরস কথা বলে রসের কারবারি,
তারতম্য না বুঝে তরতর করে সদা বাড়াবাড়ি।
————
রূপসি রূপাজীবা হলে বহুরূপী রূপোন্মত্ত হয়,
রূপকল্পের রূপ রূপায়ণে রূপিণী রূপান্তর হয়।
---------
পিপাসায় বুক ফাটলে পানির মূল্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ৮:৪৪



"বাবার ঘরেও খেতে পাইনি, স্বামীর ঘরেও কিছু নেই!", এই কথাটি আমাকে বলেছিলেন আমাদের গ্রামের একজন নতুন বধু; ইহা আমার মনে অনেক কষ্ট দিয়েছিলো।

আমি তখন অষ্টম শ্রেণীত, গ্রাম্য এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নতুন জীবন- সাত

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ রাত ১০:৫৭



আগের পর্ব: নতুন জীবন- ছয়

ইন্সপেক্টরের কপালে ভাঁজ পড়ল,
- না জানিয়ে খুব খারাপ করেছ। একে বলে বিকৃতি- গোপনে সহায়তা করা। এটা একটা অপরাধ; তুমি জানো না?
আমি মাথা নিচু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×