মন ভালো নেই
বিষাদ ছুঁয়েছে আজ, মন ভালো নেই,
মন ভালো নেই;
ফাঁকা রাস্তা, শূন্য বারান্দা
সারাদিন ডাকি সাড়া নেই,
একবার ফিরেও চায় না কেউ
পথ ভুলকরে চলে যায়, এদিকে আসে না
আমি কি সহস্র সহস্র বর্ষ এভাবে
তাকিয়ে থাকবো শূন্যতার দিকে?
এই শূন্য ঘরে, এই নির্বসনে
কতোকাল, আর কতোকাল!
আজ দুঃখ ছুঁয়েছে ঘরবাড়ি,
উদ্যানে উঠেচে ক্যাকটাস্ত
কেউ নেই, কড়া নাড়ার মতো কেউ নেই,
শুধু শূন্যতার এই দীর্ঘশ্বাস, এই দীর্ঘ পদধ্বনি।
টেলিফোন ঘোরাতে ঘোরাতে আমি ক্লান্ত
ডাকতে ডাকতে একশেষ;
কেউ ডাক শোনে না, কেউ ফিরে তাকায় না
এই হিমঘরে ভাঙা চেয়ারে একা বসে আছি।
এ কী শান্তি তুমি আমাকে দিচ্ছো ঈশ্বর,
এভাবে দগ্ধ হওয়ার নাম কি বেঁচে থাকা!
তবু মানুষ বেঁচে থাকতে চায়, আমি বেঁচে থাকতে চাই
আমি ভালোবাসতে চাই, পাগলের মতো
ভালোবাসতে চাই-
এই কি আমার অপরাধ!
আজ বিষাদ ছুঁয়েছে বুক, বিষাদ ছুঁয়েছে বুক
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই;
তোমার আসার কথা ছিলো, তোমার যাওয়ার
কথা ছিল-
আসা-যাওয়ার পথের ধারে
ফুল ফোটানো কথা ছিলো
সেসব কিছুই হলো না, কিছুই হলো না;
আমার ভেতরে শুধু এক কোটি বছর ধরে অশ্রুপাত
শুধু হাহাকার
শুধু শূন্যতা, শূন্যতা।
তোমার শূন্য পথের দিকে তাকাতে তাকাতে
দুই চোখ অন্ধ হয়ে গেলো,
সব নদীপথ বন্ধ হলো, তোমার সময় হলো না-
আজ সারাদিন বিষাদপর্ব, সারাদিন তুষারপাত-
মন ভালো নেই, মন ভালো নেই।
মুখের বদলে কোনো মুখোশ রাখবো না
সব ছিন্ন হয়ে যাক, এই মিথ্যা মুখ,
এই মুখের মুখোশ
সম্পূর্ণ পড়ুক খুলে;
এই মিথ্যা মানুষের নকল সম্পর্ক, এই
ভোজভাজি
যা যাওয়ার তার সবই খসে যাক,
ঝরে পড়ে যাক,
ছিন্ন হয়ে যাক এই কৃত্রিম ভূগোল,
এই মিথ্যা জলবায়ু;
স্পষ্ট হোক, প্রকাশিত হোক তার নিজস্ব প্রকৃতি
ছিন্ন হোক এই কৃত্রিম বন্ধন,
অদৃশ্য অলীক রজ্জু
থাক শুধু যা কিছু মৌলিক
পদার্থের যা কিছু প্রধন সত্তা;
সব ছিন্ন হয়ে যাক, খসে যাক,
ঝরে পড়ে যাক
থাক শুধু মৌলিক সত্তা, যা কিছু মৌলিক
আমি আর কোথাও কোনো মুখোশ
রাখবো না,
মুখোশ রাখবো না,
মুখোশের সাথে মিথ্যা সম্পর্কের
এই কঠিন কপট রজ্জু
আজ খুলে ফেলে ছিন্ন করে দেবো;
আমি কোনো মুখোশ রাখবো না,
মুখের বদলে কোনো মুখাকৃতি
মোটেও রাখবো না,
সব ছিন্ন হয়ে যাক, চুকে বুকে যাক
শেষ হয়ে যাক
এই মিথ্যা মুখোশ আমি
মোটেও রাখবো না।
মগ্নজীবন
এই এটুকু জীবন আমি দিওয়ানার মতো
ঘুরেই কাটিয়ে দিতে পারি
দিগ্ভ্রান্ত নাবিকের মতো অকূল সমুদ্রে পারি
ভাসাতে জাহাজ;
আমার সমগ্র সত্তা পারি আমি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে দিতে
কোনো সুফী আউলিয়ার মতো
ধ্যানের আলোয়,
ঝরা বকুলের মতো পথে পথে নিজেকে ছড়াতে পারি আমি
ছেঁড়া কাগজের মতো এমনকি যত্রতত্র ফেলে দিতে পারি,
এইভাবে ফেলতে ফেলতে ছড়াতে ছড়াতে এই এটুকু জীবন
আমি পাড়ি দিতে চাই-
এই এটুকু জীবন আমি হেসে খেলে দুচোখের জলে
ভালোবেসে, ভালোবাসা পেয়ে
কিংবা না পেয়ে
এভাবে কাটিয়ে দিতে চাই;
এই ছোটো এটুকু জীবন আমি বংশীবাদকের মতো
এভাবে কাটাতে পারি পথে পথে ঘুরে
উদাস পাখির মতো ভেসে যেতে পারি দূর নীলিমায়
সুদূরের স্বপ্ন চোখে নিয়ে,
পারি আমি এটুকু জীবন নিশ্চিত ডুবিয়ে দিতে গানের নদীতে
আনন্দধারায়,
এই তপ্ত এটুকু জীবন আমি স্বচ্ছেন্দে ভিজিয়ে নিতে পারি
পানপাত্রে-
ধুয়ে নিতে পারি এই জীবনের সব দুঃখ, অপমান, গ্লানি,
এই পরাজয়, এই অপর ব্যর্থতা, এই অখণ্ড বিরহ,
এই উপেক্সার অনন্ত দিবসরাত্রি, এই একা একা
নিভৃত জীবন;
এই এটুকু জীবন আমি নির্ঘাত কাটিয়ে দিতে পারি
এভাবে ট্রেনের হুইসিল শুনে
উদাসীন পথিকের মতো পথে, পর্বতারোহীর অদম্য নেশায়
আকাশে ঘুড়ির পানে চেয়ে;
এই মগ্ন জীবন আমি নাহয় নিঃসঙ্গ কয়েদীর মতো
এভাবে কাটিয়ে দিয়ে যাই
অন্ধকারে, অন্ধকারে।
বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ
আমি হয়তো কোনোদিন কারো বুকে
জাগাতে পারিনি ভালোবাসা,
ঢালতে পারিনি কোনো বন্ধুত্বের
শিকড়ের একটু জল-
ফোটাতে পারিনি কারো একটিও আবেগের ফুল
আমি তাই অন্যের বন্ধু বলেছি;
আমার হয়তো কোনো প্রেমিকা ছিলো না,
বন্ধু ছিলো না,
ঘরবাড়ি, বংশপরিচয় কিচ্ছু ছিলো না,
আমি ভাসমান শ্যাওলা ছিলাম,
শুধু স্বপ্ন ছিলাম;
কারো প্রেমিকাকে গোপনে বুকের মধ্যে
এভাবে প্রেমিকা ভেবে,
কারো সুখকে এভাবে বুকের মধ্যে
নিজের অনন্ত সুখ ভেবে,
আমি আজো বেঁচে আছি স্বপ্নমানুষ।
তোমাদের সকলের উষ্ণ ভালোবাসা, তোমাদের
সকল প্রেম
আমি সারি সারি চারাগাছের মতন আমার বুকে
রোপণ করেছি,
একাকী সেই প্রেমের শিকড়ে আমি
ঢেলেছি অজস্র জলধারা।
সকলের বুকের মধ্যেই একেকজন নারী আছে,
প্রেম আছে,
নিসর্গ-সৌন্দর্য আছে,
অশ্রুবিন্দু আছে
আমি সেই অশ্রু, প্রেম, নারী ও স্বপ্নের জন্যে
দীর্ঘ রাত্রি একা জেগে আছি;
সকলের বুকের মধ্যে যেসব শহরতলী আছে,
সমুদ্রবন্দর আছে
সাঁকো ও সুড়ঙ্গ আছে, ঘরবাড়ি
আছে
একেকটি প্রেমিকা আছে, প্রিয় বন্ধু আছে,
ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে
ভালোবাসার প্রিয় মুখ আছে
সকলের বুকের মধ্যে স্বপ্নের সমুদ্রপোত আছে,
অপার্থিব ডালপালা আছে
আমি সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা, সেই স্বপ্ন
সেই রূপকথার
জীবন্তমানুষ হয়ে আছি;
আমি সেই স্বপ্নকথা হয়ে আছি, তোমাদের
প্রেম হয়ে আছি,
তোমাদের স্বপ্নের মধ্যে ভালোবাসা হয়ে আছি
আমি হয়ে আছি সেই রূপকথার স্বপ্নমানুষ।
কোথায় যাই, কার কাছে যাই
আজ বন্ধের দিন; কোথাও কিছু খোলা নেই
সবখানে শুধু বন্ধ, শুধু বন্ধ;
একেকটি দরোজার সামনে বড়ো বড়ো শাটার নামানো
যেন বন্ধ-করা একটি কাঠের বাক্সের মতো সমস্ত শহর,
তালাবন্ধ যেন এই সুনীল আকাশ; আজ
বন্ধের দিন, নিউ মার্কেটের সবগুলো গেটে তালা
সাকুরায় যেন বহুদিনের কারফিউ;
পোষ্টাপিসের হলূদ বারান্দা জনশূন্য,
কাঠের সিঁড়ি শব্দহীন
ব্যাঙ্ক, বীমা, নীলক্ষেত টেলিফোন অফিস
কোথাও কোনো স্বাভাবিক কাজকর্ম নেই,
এই বন্ধের দিনে বেইলী রোডের দোকানগুলোতে
কিছুই পাওয়া যাবে না-
সারা এলিফ্যান্ট রোড যেন কোন এক অচিন ঘুমের দেশ।
আজ বন্ধের দিন, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই,
নিউ মার্কেটের বইয়ের দোকান বন্ধু,
সাকুরা আজ খুলবে না
স্টেডিয়ামের সবগুলো দোকানে ঝাঁপফেলা,
খবরের কাগরের অফিসে কেউ নেই, টেলিফোন বন্ধ
আমি আজ কোথায় যাই; শহরের একটি রোস্তরাঁ কিংবা
পানশারঅও খোলা নেই,
শিশুপার্ক, কার্জন হল, কলা ভবন
বন্ধ, বন্ধ, সব বন্ধ,
এই বন্ধের দেনে এই জনশূন্য গোধূলিতে
তাহলে আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই!
বন্ধুরা ছুটিতে কেউ গেছে দেশের বাড়িতে, কেউ দেশের বাইরে
যারা ঢাকায় তারাও যে যার গর্তে ঢুকে আছে,
সবখানে এই দরোজা-লাগানো শহরে, এই গেটবন্ধ
নগরীতে আমি কোথায় যাই।
ব্যাঙ্ক, বীমা, পত্রিকার অফিস আজ
সব বন্ধু, কোথাও কেউ নেই,
তাহলে এই একলা রিকশায়, উদাসীন সাইকেলে চেপে
আমি কোথায় যাবো, কার কাছে যাবো!
এই বিষণ্ন সন্দ্যায় একাকী ঘুরতে ঘুরতে
যদি তোমাদের বাড়ির কাছে চলে যাই-
তোমাদের সেই বন্ধু গেটটিও কি কিছুতেই খুলবে না,
সারারাত ডাকাডাকিতেও কি গুম ভাঙবে না তোমাদের কারো,
এই শহরে একটিবারের জন্যেও কি কেউ এই বন্ধ দরোজা
আর খুলবে না, আর খুলবে না?
তাহলে এই বন্ধের দিনে, এই সর্বত্র তালা-লাগানো শহরে
এই নিঃসঙ্গ সাইকেলে চেপে অবিরাম বেল বাজাতে বাজাতে
বলো আমি কোথায় যাই, কার কাছে যাই,
কোন নরকে যাই!
প্রেমের কবিতা
আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি
টেপ করে রাখলে
পৃথিবীর যে-কোনো গীতি কবিতার
শ্রেষ্ঠ সঙ্কলন হতে পারতো;
হয়তো আজ তার কিছুই মনে নেই
আমার মনে সেই বাক্যালাপগুলি নিরন্তর
শিশির হয়ে ঝরে পড়ে,
মৌমাছি হয়ে গুনগুন করে
স্বর্ণচাঁপা আর গোলাপ হয়ে ঝরতে থাকে;
সেই ফুলের গন্ধে, সেই মৌমাছির গুঞ্জনে
আর কোকিলের গানে
আমি সারারাত ঘুমাতে পারি না, নিঃশ্বাস ফেলতে
পারি না,
আমাদের সেই কথোপকথন, সেই বাক্যালাপগুলি
আমার বুকের মধ্যে
দক্ষিণ আমেরিকার সমস্ত সোনার খনির চেয়েও
বড়ো স্বর্ণখনি হয়ে আছে-
আমি জানি এই বাক্যালাপগুলি গ্রথিত করলে
পৃথিবীর একটি শ্রেষ্ঠ প্রেমের
কবিতা হতে পারতো;
সেইসব বাক্যালাপ একেকটি
হীরকখণ্ড হয়ে আছে,
জলপ্রপাতের সঙ্গীত মূর্ছনা হয়ে আছে,
আকাশে বুকে অনন্ত জ্যোৎ্লারাত্রির
স্নিগ্ধতা হয়ে আছে;
এই বাক্যালাপের কোনো কোনো অংশ
কোকিল হয়ে গেয়ে ওঠে,
কেনো কোনো অংশ ঝর্না হয়ে নেচে বেড়ায়
আমি ঘুমাতে পারি না, জেগে থাকতেও পারি না,
সেই একেকটি তুচ্ছ শব্দ আমাকে কেন যে
এমন ব্যাকুল করে তোলে,
আপাদমস্তক আমকে বিহ্বল, উদাসীন,
আলুথালু করে
তোলে;
এই কথোপকথন, এই বাক্যালাপগুলি
হয়তো পাখির বুকের মধ্যে পেট করা আছে,
নদীর কলধ্বনির মধ্যে ধরে রাখা আছে
এর চেয়ে ভালো প্রেমের কবিতা আর কী
লেখা হবে!
২য় পর্ব

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


