আদি পুরান ঢাকার মানুষগুলোকে আমার সব সময়ই পছন্দ , সবসময়ই তাদের ভাল লাগে আমার । খুব আনন্দ ফুর্তিতে থাকে তারা , মানুষকে আপন করে নেয় । আবার যারা খারাপ,তারা খারাপ ই , ঢাকার বাইরের মানুষদের তারা দেখতে পারেনা , বাঙ্গাল বলে গাল দেয়
পুরান ঢাকা ছেড়েছি জীবনের তাগিদে , প্রয়োজনে । কিন্তু মন প্রাণ দিয়ে এখনও ভালবাসি পুরান ঢাকাকেই , পুরান ঢাকায় কেউ থাকে শুনলেই অন্যরকম ভাল লাগে , নিজের আপন মনে হয় । যতই মডার্ন আর ভাল ফেসিলেটিস ন্তুন ঢাকায় পাইনা কেন পুরান ঢাকার সেই মজা, শান্তি যেন কোথাও নেই ।
আজ প্রায় দেড় বছর পর গেলাম পুরান ঢাকায় ।
যেখানে আজীবন কাটালাম , বেড়ে উঠলাম সেখানে নয় , একদম আদি পুরান ঢাকায় , কলতাবাজার ,লক্ষ্মীবাজার এর দিকে , আমার জন্মস্থানে ।
মূলত গিয়েছিলাম একজন অসুস্থ রোগীকে দেখতে । যে বাসায় গিয়েছিলাম ঠিক তার আগের গলিতেই নাকি আম্মুরা ভাড়া থাকতো , আম্মুদের বিয়েরও আগে
তখন আপু(কাজিন) পিচ্ছি ছিল
তাই আম্মা (আন্টি) , আম্মু , আপু চাচ্ছিল অনেক বছর পর যখন আসা হল , নিজেদের চেনা সেই বাড়ি ঘর দেখে যাক , হয়তো পুরনো সেই বাড়ির মালিকরা নেই , চেনা মানুষরা নেই , তাও ঘুরে যাবে।
আমিও খুব আগ্রহ নিয়ে তাদের সাথে ঢুকচ্ছিলাম দেখার জন্যে , আগে আমরা কোথায় থাকতাম?
শুধু আম্মুদের মুখে গল্পই শুনি , সব কিছু , সবার। চিকন , অন্ধকার , শ্যাতশেতে গলি দিয়ে ঢুকতেই চেনা একজনের সাথে দেখা হল আপুর, সেখান থেকে সেই পুরনো বাড়ির মালিকদের সাথে। আম্মা,আম্মুকে জড়িয়ে ধরলেন সেই আন্টি , আপুকে , আমাকে কি আদর
মনেই হলনা যে এরা বাড়িয়াওলা ছিল আর আমরা ভাড়াটিয়া । বাড়িয়ালি আন্টি জোর করে নিয়ে গেলেন তাদের বাসায় , এখন আর সেই আগের ২তলা বাসা নেই,সেই জায়গায় এখন ৬তলা বিল্ডিং , উঠলাম ৬তলায় , সেই কি মায়া , কি গল্প , হাসি খুশি , এর কথা , ওর কথা জিজ্ঞেস করছে , খবর দিচ্ছে , নিচ্ছে , কে কোথায় আছে । কার কয়জন ছেলে মেয়ে । সেই বাসার বাড়িয়ালারা মানে আংকেলরা তো খুবই ভাল , তারাই আগলে নিল বেশি । তাদের মাঝে আমি যেন আমার পাপাকে(আংকেল) দেখতে পেলাম ।একদম কথা বার্তার ধরণ , মানসিকতা , চলা ফেরা,সব পাপার মতন।
পরে আম্মু আম্মা বলছিল , তোর পাপা এদের সাথে থেকে থেকেই এমন হয়েছিল,যা ইচ্ছে হত তা ই করতো ,বাজার সদাই বেশি বেশি করে করতো,আর সারাক্ষণ হইচই পছন্দ করত।
তাদের সাথে কিছুক্ষণ থেকে মনে হল , কোন কিছুরই কোন চিন্তা নেই যেন , তারাও বলে , কিসের চিন্তা , খাও দাও , মজা কর , চিন্তা করে কি হবে? বাঁচব কদিন ?
আরও বেশি ভাল লাগছিল অনেক বছর পর ঢাকাইয়া ভাষা শুনলাম
যে এলাকায় ছোট থেকে এত বছর কাটিয়ে এসেছি, সেটাও পুরান ঢাকাতেই কিন্তু তারাও এমন ভাষা বলতো না । এটা একেবারে আদি ঢাকাইয়া ভাষা
মজাই লাগছিল শুনতে ,কিছুক্ষণের জন্য আমিও কয়েকটা শব্দ শিখে গিয়েছিলাম
আমার মনে হচ্ছিল কোন রূপকথার দেশে চলে গিয়েছি আমি , যেখানে শুধু খাও দাও , আনন্দ কর , বিপদ আপদ যা ই আসুক একসাথে মোকাবেলা কর। কোন চিন্তা নেই , ধান্দা নেই ।
আম্মুও বারবার বলছিল,এসব মানুষের সাথে থাকলে মন এমনিই ভাল থাকে , হার্ট ভাল থাকে । এত হাশি খুশি । মানে সে এক অন্যরকম জগত মনে হল আমার , সবগুলা মানুষ এত ভাল।
তারা খুব শিক্ষিত নয় , হাই সোসাইটির নয় ,মডার্ন নয় কিন্তু তাদের মন টা খুব ভাল , খুব সরল সহজ , মিশুক , কিছুক্ষণের মধ্যেই কেমন আপন করে নিল আমাদের যারা প্রথম দেখেছে আমাদের কে , তাদের ছেলে মেয়েরা , তারাও যে কি ভাল ।
এত বছর পরেও সেই আগের মতই তুই তুকারি করে কথা বললেন তারা , বুকে জড়াল। যেন কয়েকদিন পর দেখা হল , অথচ মাঝে কেটে গেছে কয়েক বছর।
সেই সময়কার আদি ঢাকার মানুষ গুলোই ছিল অন্যরকম ।
খুব ভাল লাগলো , অনেক মন খারাপ ছিল সেই অসুস্থ রোগীর জন্য কিন্তু একটা গোলি পরেই যেন অন্য কোন জগত থেকে ঘুরে আসলাম
আশা রাখি তারা সবাই যেন খুব ভাল থাকেন , এমন ই থাকেন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


