ট্রলারটি যখন গন্তব্যে পেঁৗছেছে তখন বেলা গড়িয়ে এসেছে। নিয়াজ, জয়ন্ত আর শ্রাবণী বড়
একটি রিলিফ-কাজের ছোট একটা অংশ হিসেবে এসেছে - কাজেই তাদের কোনো গুরুত্ব দেবে
কি না সেটা নিয়ে খুব সন্দেহের মাঝে ছিল - কিন্তু দেখা গেল তাদের আশঙ্কা অমূলক। বিশাল
একটি বার্জ সমুদ্রের মাঝে নোঙর করে রাখা আছে। সেটি ঘিরে নানারকম কর্মব্যস্ততা। অসংখ্য
ট্রলার এবং নৌকা, কিছু ছোট লঞ্চ, বেশকিছু স্পিডবোট দাঁড়িয়ে আছে, তার মাঝে নানারকম
রিলিফ-সামগ্রী তোলা হচ্ছে - লোকজনের হৈচৈ চেঁচামেচিতে একটা কর্মমুখর পরিবেশ। কিন্তু
তার ভেতরেই তিনজন পেঁৗছানো মাত্রই তাদেরকে রিলিফ কাজের দায়িত্বে যে-মানুষটি তার
কাছে নিয়ে যাওয়া হল। ভদ্রলোক জাতীতে ব্রিটিশ, মধ্যবয়স্ক, চুলদাড়িতে পাক ধরেছে। রোদে
পোড়া চেহারা। তাদেরকে দেখে ভারি খুশি হলেন। জরুরিভাবে যোগাযোগ করে এই
জিনিসগুলো আনা হয়েছে - বোঝা গেল ওগুলো ছাড়া রিলিফ ওয়ার্কের ওষুধপত্রে একধরনের
অসংগতি থেকে যেত। ব্রিটিশ ভদ্রলোক ইংরেজিতে বললেন, "তোমরা অনেক কষ্ট করে এসেছ,
এখন বিশ্রাম নাও। বার্জের ওপরে তোমাদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।"
জয়ন্ত ইংরেজি মোটামুটি গুছিয়ে লিখতে পারে কিন্তু বলার সময় তার খানিকটা বাধো-বাধো
ঠেকে। তাই দিয়েই সে বলল যে তারা ট্রলারে শুয়ে-বসে এসেছে এবং মোটেও ক্লান্ত নয়। এই
কথা শুনে সাথে সাথে তাদের কাজে লাগিয়ে দেওয়া হল, শারিরীক পরিশ্রম করার মতো অনেক
মানুষ আছে, কিন্তু মোটামুটি লেখাপড়া জানে এখানে এরকম মানুষের খুব অভাব।
বার্জ থেকে নানা রিলিফ বের করে ট্রলার এবং নৌকায় তোলা হতে লাগল। ম্যাপে ছোট
ছোট দ্বীপগুলো চিহ্নিত আছে। কোথায়, কত মানুষ মারা গেছে, কতজন ঘরবাড়ি হারিয়েছে, কী
পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে লিখে রাখা আছে। ম্যাপ এবং লিস্ট দেখে জিনিসপত্রের পরিমাণ ঠিক
করে চিরকুটে সংখ্যাটি লিখে দেওয়া হতে লাগল। সেটি দেখে মালপত্র বোঝাই করে ট্রলার-
নৌকা-লঞ্চগুলো চলে যেতে শুরু করল। যেগুলো গিয়েছে সেগুলো ফিরে আসতে শুরু করেছে।
সেখানে মালপত্র বোঝাই করে আবার তাদের নতুন জায়গায় পাঠানো হতে লাগল।
রিলিফ ওয়ার্কে আরো অনেকে এসছে। একটা বড় অংশ এসেছে কিছু এনজিও থেকে।
বিশ্ববিদ্যালয় আর কলেজের আরো কিছু ছাত্র এসেছে। ছাত্রী হিসেবে শ্রাবণীই একজন তবে ব্রিটিশ রিলিফ টিমের সাথে কয়েকজন মহিলা এসেছে। জয়ন্ত যদিও মুখ টিপে হেসে বলল,
"তারা শুধু নামেই মহিলা, দেখতে শুনতে আকারে এবং আকৃতিতে সবাই এই দেশের বড়
সন্ত্রাসীর মতো !"
সমস্ত কাজ শেষ করে ঘুমুতে ঘুমুতে গভীর রাত হয়ে গেল। বার্জের ডেকে সবার শোওয়ার
ব্যবস্থা করা হয়েছে, শুধু মেয়েদের আলাদা কেবিন দেয়া হয়েছে। শ্রাবণীর কেবিনটি দেখে জয়ন্ত
এবং নিয়াজের চোখ হিংসায় ছোট ছোট হয়ে গেল। ছোট বাংক বেড, মাথার কাছে গোল
জানালা, ছোট খেলনার মতো একটা সিংক, লাগোয়া বাথরুম, সবকিছু ঝকঝক তকতক
করছে। জয়ন্ত দেখেশুনে মুখ ছুঁচালো করে বলল, "তোরা না নারীবাদী মহিলা - আমাদেরকে
শুকনো ডেকের মাঝে শুইয়ে রেখে নিজে এরকম কেবিন নিয়ে ঘুমুচ্ছিস যে ?"
"আমি নিইনি। আমাকে দেয়া হয়েছে।"
"ছুড়ে ফেলে দে। বলে দে থাকব না এখানে।"
শ্রাবণী বক্তৃতা দেয়ার ভঙ্গি করে বলল, "যে জাতি নারীদের সম্মান করে না সেই জাতির
উনড়বতি হয় না। তোরাও শেখ।"
পরের দিনটিও ব্যস্ততার মাঝে কাটল। বিকেলের দিকে তারা একটা দলের সাথে কাছাকাছি
ছোট একটা দ্বীপে রিলিফ নিয়ে গেল। তাদেরকে আসতে দেখে অনেক আগে থেকে মানুষজন
ভিড় করে দাঁড়িয়ে রয়েছে। শুকনো অভুক্ত মানুষ - ঘরবাড়ি ভয়ঙ্কর সাইক্লোন আর জলোচ্ছাসে
উড়ে গেছে। আগে থেকে খবর পেয়েছিল বলে নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে অবশ্য বেশির ভাগ মানুষ
প্রাণে বেঁচে গিয়েছে।
ফিরে আসার সময় আবার তারা হকুনদিয়া দ্বীপের অন্য পাশ দিয়ে ফিরে এল। গভীর
অরণ্যে ঢেকে থাকা দ্বীপটি দূর থেকে খুব রহস্যময় মনে হয়। এখানে কোনো মানুষ নেই। কেউ
গেলে সাথে সাথে মারা পড়ে চিন্তা করলেই কেমন জানি ভয় হয়।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠে জয়ন্ত আবিষ্কার করল, আজকের দিনটিতে তাদের ছুটি দেওয়া
হয়েছে। ঢাকা থেকে বেশকিছু ভলান্টিয়ার এসছে, তাদেরকে ব্যস্ত রাখার জন্যে সব কাজকর্মই
তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেখানে বার্জটি নোঙর করে রাখা হয়েছে সেই দ্বীপটি ঘুরে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এটি একেবারেই সাদামাটা একটা দ্বীপ। সাইক্লোনে ঘরবাড়ি ধুয়েমুছে
গিয়ে আরো সাদামাটা হয়ে গেছে। গ্রাম্য পথ ধরে হেঁটে আবিষ্কার করল সঙ্গে শ্রাবণী থাকার
কারণে পেছনে ছোট ছোট বাচ্চার একটি বড় মিছিল তৈরি হয়ে গেছে। বাচাগুলোর সাথে কথা
বলার চেষ্টা করে লাভ হল না। শহরের এই মানুষগুলোকে তারা বুঝতে পারে না। কথাবার্তা
বললে তারা দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে। এরকম সময়ে
জয়ন্ত বলল, "চল, হকুনদিয়া দ্বীপ থেকে ঘুরে আসি।"
নিয়াজ ভুরু কুচঁ কে বলল, "কী বললি ?"
"বলেছি হকুনদিয়া দ্বীপ থেকে ঘুরে আসি।"
"কীভাবে যাবি ?"
"খোঁজ করলেই একটা স্পিডবোট ট্রলার কিছু একটা পেয়ে যাব।"
শ্রাবণী বলল, "তারপর যখন খুন হয়ে যাবি তখন কী হবে ?"
জযন্ত বলল, "তুই সত্যিই বিশ্বাস করিস ওখানে গেলেই মানুষ খুন হয়ে যায় ?"
"সবাই যখন বলছে তখন নিশ্চয়ই একটা কারণ আছে।"
জয়ন্ত একটু রেগে বলল, "এখানকার মানুষেরা আরো কী বলছে শুনিস নি ?"
"কী বলছে ?"
"বলেছে সাইক্লোনটা সোজা এদিকে আসছিল, এখানকার এক পীর সাহেব ধমক দিয়ে
পুবদিকে সরিয়ে নিয়েছেন। বলছে গভীর রাতে গ্রামের রাস্তায় বাস্তায় ওলাবিলা ইনিয়ে বিনিয়ে
কাঁদছে - যার অর্থ গ্রামের সব মানুষ কলেরায় মরে যাবে। বলছে চাঁদনী রাতে সুপারি গাছে বসে
বসে পরীরা আকাশে উড়ছে। আরও শুনবি ?"
"থাক, অনেক বক্তৃতা হয়েছে।"
জয়ন্ত গলা উচিয়ে বলল, "তোরা যেতে না চাইলে নাই। দরকার হলে আমি একা যাব।"
"কেন ?"
"প্রমাণ করতে চাই পুরোটা কুসংস্কার। আর কিছু না হোক তখন মানুষ আবার এই সুন্দর
দ্বীপটায় থাকতে পারবে।"
শ্রাবণী কিছু না বলে জয়ন্তর চোখে তাকিয়ে রইল। জয়ন্ত বলল, "মনে করিস না আমি
পাগলামো করছি। এরকম একটা ব্যাপার জেনেশুনেও যদি দ্বীপটাতে অন্তত পা না ফেলে আসি
তাহলে নিজের কাছে নিজের খারাপ লাগবে, মনে হবে কুসংস্কারকে প্রশ্রয় দিয়ে ফেললাম।"
"ঠিক আছে।" শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, "আমি যাব।"
নিয়াজ বলল, "তাহলে আমি একা আর বসে থেকে কী করব ? আমিও যাব।"
জয়ন্ত হাতে কিল দিয়ে বলল, "চমৎকার ! আমি গিয়ে দেখি একটা স্পিডবোট ট্রলার
নৌকা কিছু-একটা পাই কি না।"
শ্রাবণী মনে মনে আশা করছিল রিলিফ-কাজে সবাই ব্যস্ত থাকবে, জয়ন্তের এরকম
পাগলামোর জন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দেখা গেল কিছুক্ষণের মাঝেই জয়ন্ত
একগাল হাসি নিয়ে ফিরে এল, সে জব্বার মিয়াকেই পেয়ে গেছে। জব্বার মিয়া চাইছে না
তারা সেখানে যাক, কিন্তু যখন জোরাজুরি করেছে তখন শেষপর্যন্ত পেঁৗছে দিতে রাজি হয়েছে।
কিছুক্ষণের মঝেই দেখা গেল, সমুদ্রের নীলপানি কেটে জব্বার মিয়ার ট্রলারটা ছুটে যাচ্ছে।
ট্রলারের ছাদের ওপর তিনজন চুপচাপ বসে আছে।
হকুনদিয়া দ্বীপে পেঁৗছে ট্রলারটাকে টেনে খানিকটা বালুর ওপর তুলে জব্বার মিয়া নেমে
এল, সে এমনিতেই কথা বেশি বলে না। এখন আরও কম কথা বলছে। জয়ন্ত বলল, "থ্যাংক
ইউ ভেরি মাচ জব্বার মিয়া। আপনি নামিয়ে না দিলে আমাদের এখানে আসা হত না।"
"কাজটা ভালো হল না।" জব্বার মিয়া নিচু গলায় বলল, "এর আগেরবার যে খুন হয়েছে,
আপনাদের মতোই একজন ছিল। কিছু-একটা সাহস দেখানোর জন্যে এসেছিল, এসে খুন
হল।"
জয়ন্ত একটু ফ্যাকাশে মুখে বলল, "আমরা খুন হব না। আপনি কোনো চিন্তা করবেন
না।"
"এখানে আসতে চেয়েছিলেন, এসেছেন।" জব্বার মিয়া শক্তমুখে বলল, "আমি এখানে
অপেক্ষা করি, আপনারা একটু ঘুরাঘুরি করে আসেন, ফেরত নিয়ে যাই।"
নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, "হঁ্যা, জব্বার ভাই ঠিকই বলেছে। তুই আসতে চেয়েছিলি,
এসেছিস। এখন চল যাই।"
জয়ন্ত বলল, "তোরা যেতে চাইলে যা। আমি না-দেখে যাব না।"
"এখানে দেখার কি আছে ? জঙ্গল গাছপালা দেখিসনি কখনো ?"
জয়ন্ত বলল, "আমি ভেতরে ঢুকে দেখতে চাই।"
জব্বার মিয়া একটা নিশ্বাস ফেলে ট্রলারের পাটাতন থেকে একটা কাঠ সরাল। দেখা গেল
সেখানে হাতে-তৈরি একটা বন্দুক। বন্দুকটা হাতে নিয়ে বলল, "তাহলে এইটা সাথে রাখেন।"
জয়ন্ত ভুরু কুচঁ কে বলল, "বেআইনি অস্ত্র ? লাইসেন্স আছে ?"
"লাইসেন্স কোথায় থাকবে ! হাতে-তৈরি বন্দুক ট্রলারে রাখি। চোর-ডাকাতের উৎপাতের
জন্য রাখতে হয়।"
"না।" জয়ন্ত মাথা নাড়ল, "বেআইনি অস্ত্র রাখব না।"
জব্বার মিয়া খানিকক্ষণ জয়ন্তর চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে একটা নিশ্বাস ফেলে
বন্দুকটা আবার পাটাতনের ভেতরে রেখে কাঠ দিয়ে ঢেকে দিল। জয়ন্ত বলল, "আপনি কোনো
চিন্তা করবেন না জব্বার মিয়া। আমাদের কিছু হবে না। আমরা বেশি ভিতরে যাব না - একটু
ঘুরোঘুরি করে চলে আসব।"
"আমায় গিয়ে রিলিফ নিয়ে যেতে হবে। রিলিফ পেঁৗছে দিয়েই আমি চলে আসব। আপনার
ঠিক এইখানে থাকবেন।"
"ঠিক আছে।"
জব্বার মিয়া এবার ট্রলারের ছাদের সাথে লাগানো একটা লম্বা কিরিচ টেনে বের করে
ওদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, "এইটা সাথে রাখেন। এইটা রাখার জন্যে লাইসেন্স লাগে
না।"
জয়ন্ত ইতস্তত করে কিরিচটা হাতে নিল, সাবধানে ধার পরীক্ষা করে বলল, "এইটা রাখব?"
নিয়াজ বলল, "রেখে দে। কখন কী কাজে লাগে।"
"যদি কোন বিপদ দেখেন আগুন জ্বালাবেন।"
"আগুন ?"
"হঁ্যা। ম্যাচ আছে সাথে ?"
"আছে।"
"দুইটা মোমবাতি নিয়ে যান -"
"দিনের বেলা মোমবাতি দিয়ে কী করব ?"
"সাথে রাখেন।" বলে জব্বার মিয়া দুইটা বড় বড় মোমবাতি বের করে দিল।
নিয়াজ মোমবাতিগুলো হাতে নেয়, হঠাৎ করে সে কেমন যেন আতঙ্ক অনুভব করতে
থাকে। শুকনো গলায় বলল, "আর কিছু লাগবে জব্বার ভাই ?"
"দড়ি। আর লাঠি।"
"কেন ? দড়ি আর লাঠি কেন ?"
জব্বার মিয়া বলল, "জানি না। তবে মানুষ বিপদে পড়লে লাগে। আগে যে লোকটা খুন
হল -"
জব্বার মিয়া হঠাৎ করে থেমে গেল। নিয়াজ ভয়ে ভয়ে বলল, "যে খুন হল ?"
"না, কিছু না।" জব্বার মিয়া মাথা নেড়ে বলল, "আপনারা যখন যাবেনই তখন ভয়
দেখিয়ে লাভ কী ?"
"তবু শুনি।"
"শোনার কিছু নাই। একটা গর্তের মাঝে পড়ে ছিল - সাথে দড়ি আর অন্য মানুষ থাকলে
বের হতে পারত।"
"ও।"
"হঁ্যা। সবসময় তিনজন একসাথে থাকবেন।"
"ঠিক আছে।"
"আমি অন্ধকার হবার আগেই আসব।"
"ঠিক আছে।"
জব্বার ট্রলার থেকে একটা লম্বা বাঁশ এবং নাইলনের কিছু দড়ি বের করে দিল। বাঁশটা
কেটে তিন টুকরা করে তিনজনের হাতে দিয়ে বলল, "আল
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



