তিনজনের ছোট দলটা বাসার সামনে এসে একধরনের মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে
রইল। জংলী গাছপালায় পুরোটা ঢেকে গিয়েছে কিন্তু তবু বোঝা যায় একসময় এটি নিশ্চয়ই
ছবির মতো একটা সুন্দর বাসা ছিল। দোতলা কাঠের বাসা। ওপরে একটি চমৎকার ডেক।
এখানে বসে নিশ্চয়ই সমুদ্র দেখতে পাওয়া যায়। বাসাটি ঘিরে যতড়ব করে গাছপালা লাগানো
হয়েছিল। সেগুলো পুরো এলাকাটিকে ছায়া দিয়ে ঢেকে রেখেছে। একসময়ে একটা গেট ছিল।
এখন সেখানে কিছু নেই। সুড়কি বিছানো ছোট একটা পথ।
তিনজন হেঁটে হেঁটে বাসাটির বারান্দায় এসে দাঁড়াল। জানালাগুলো খোলা। কাঁচ ভেঙে
গিয়ে কেমন যেন অসহায় মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। জয়ন্ত দরজাটি ধাক্কা দিতেই সেটি
ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করে খুলে গেল। কয়েক সেকেণ্ড অপেক্ষা করে জয়ন্ত ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে।
দীর্ঘদিন কেউ না-আসায় ঘরের ভেতরে একধরনের ভ্যাপসা গন্ধ। জয়ন্ত সাবধানে চারিদিকে
তাকিয়ে আরো কয়েক পা ভেতরে ঢুকে হাত দিয়ে অন্য দুজনকে ইঙ্গিত করতেই তারা ভেতরে
ঢুকল।
ঘরটি একসময় নিশ্চয়ই খুব সুন্দর করে সাজানো ছিল, এখনো তার কিছু চিহ্ন রয়ে গেছে।
তিনজন সাবধানে হেঁটে ঘরটিকে পরীক্ষা করে। একটি শেলফ কাত হয়ে পড়ে আছে। একটা
টেবিল-ল্যাম্প একপাশে ভাঙা। একটা সুদৃশ্য চেয়ার। ঘরের দেয়ালে ধূলি-ধূসরিত একটা ওয়েল
পেইন্টিং - শ্রাবণী কাছে গিয়ে ফুঁ দিতেই খানিকটা জায়গা পরিষ্কার হয়ে উজ্জ্বল রঙ বের হয়ে
এল। শ্রাবণী দেয়ালে টাঙানো অন্য ছবিগুলো পরীক্ষা করে দেখল, এলোমেলো চুলের হাসিখুশি
একজন মানুষ একটি বিদেশী মেয়ের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। শ্রাবণী বলল, "এটা নিশ্চয়ই পাগলা
ডাক্তার।"
জয়ন্ত এগিয়ে এসে বলল, "তুই কেমন করে বুঝতে পারলি ?"
"দেখছিস না পাশে ফরেনার মেয়ে ?"
"পাশে ফরেনার মেয়ের সাথে পাগলা ডাক্তারের কী সম্পর্ক ?"
"আমাদের দেশের যত সাকসেসফুল মানুষ তাদের সবার বিদেশী বউ।"
"তোকে বলেছে !"
"বিশ্বেস করলি না ?"
"আর এই পাগলা ডাক্তার সাকসেসফুল কে বলেছে ? সাকসেসফুল মানুষ এরকম জঙ্গলে
থাকে ? থেকে খুন হয়ে যায় ?"
শ্রাবণী দার্শনিকের মতো মুখভঙ্গি করে বলল, "বেঁচে থাকাটাই যদি জীবনের অর্থ হয়ে থাকে
তাহলে কচ্ছপ হচ্ছে সবচে সবকসেসফুল। কয়েকশ বছর বেঁচে থাকে।"
নিয়াজ একটু অধৈর্য হয়ে বলল, "অনেক ফিলসফি হয়েছে। এখন চল যাই।"
জয়ন্ত বলল, "একটু অন্য ঘরগুলো দেখ যাই।"
"কথা ছিল ঢুকব এবং বের হব।"
"এই তো ঢুকেছি। এখন অন্যঘরগুলোতে ঢুকে বের হয়ে যাব।"
নিয়াজ হতাশ হওয়ার ভঙ্গিতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
নিচের সবগুলো ঘরই ধূলায় ধূসর। মাকড়শার জাল এবং পোকামাকড়ে ঢেকে আছে। কিছু
ব্যবহারী জিনিস, দেয়ালে আরো কিছু ছবি, কয়েকটা আসবাবপত্র পাওয়া গেল। দেতলায় ওঠার
সিঁড়িটা একটু নড়বড়ে মনে হল। জায়গাটা দিনের বেলাতেই অন্ধকার, তাই মোমবাতি দুটো
জ্বালিয়ে নেয়া হল। তিনজন সাবধানে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। জয়ন্ত কয়েক পা উঠে বলল,
"সিঁড়ি মনে হয় ঘুণ ধরে ক্ষয়ে গেছে। সাবধান।"
শ্রাবণী জিজ্ঞেস করল, "সাবধানটা কীভাবে হব ? ওজন কম করে দেব ?"
"তা বলছি না। নিচে দেখে পা ফেলিস। রেলিংটা শক্ত করে ধরে রাখিস। হঠাৎ করে ভেঙ্গে
গেলে যেন আছাড় খেয়ে পড়ে না যাস।"
"নিয়াজের মতো !"
"হঁ্যা, নিয়াজের মতো।"
নিয়াজ বিরক্ত কয়ে বলল, "ব্যাপারটা ফানি ছিল না। যদি পড়ে যেতাম তাহলে মরে
যেতাম।"
শ্রারণী বলল, "এবং হকুনদিয়ার নামটি সার্থক হতো।"
উপরে উঠে একটা দরজা পাওয়া গেল। দরজাটি বন্ধ। জয়ন্ত কয়েকবার ধাক্কা দিয়ে বলল,
তালা মারা রয়েছে।"
"আমাদের কাছে চাবি নেই - কাজেই এখন এটি মিশন ইমপসিবল।"
"জোরে একটা লাথি দিয়ে দেখি, তালা ভাঙতে পারি কি না।"
"একজনের বাসায় তালা ভেঙে ঢোকা আইনত দণ্ডনীয়।"
জয়ন্ত দাঁত বের করে হেসে বলল, "কিন্তু যদি সেই বাসাটা হয় হকুনদিয়ার পাগলা
ডাক্তারের বাসা এবং সেই বাসায় গত পাঁচবছর কেউ ঢুকে না থাকে তাহলে সেটা আইনত
দণ্ডনীয় নয়। সেটা ভদ্রতা -"
বলে জয়ন্ত একটু পিছিয়ে এসে প্রচণ্ড জোরে লাথি দিল। দীর্ঘদিনের অব্যবহারে মরচে পড়ে
তালা নিশ্চয়ই নড়বড়ে হয়েছিল, জয়ন্তের লাথিতে তালা ভেঙে দরজা শব্দ করে ভেতরের দিকে
খুলে যায়। শ্রাবণী চোখ বড় বড় করে বলল, "তোর পায়ে জোর তো ভালোই আছে। রাত্রিবেলা
মানুষের ঘরের দরজা ভেঙে বেড়াস নাকি ?"
জয়ন্ত বুকে থাবা দিয়ে বলল, "হাফ ব্যাক, নাজিরপুর উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ফুটবল
টিমের ক্যাপ্টেন।"
নিয়াজ জয়ন্তকে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে বিস্ময়সূচক শব্দ করল, বলল, "কী আশ্চর্য !"
জয়ন্ত এবং শ্রাবণী ভেতরে ঢুকে নিয়াজের মতোই চমৎকৃত হয়ে যায়। ভেতরে অত্যন্ত
চমৎকার আধুনিক একটি ল্যাবরেটরি। চমৎকার শ্বেতপাথরের টেবিল। দামি মাই্ে#956;াস্কোপ।
উপরে তাকে কাচের শেলফ। টেবিলের পাশে ছোট ফ্রিজ, হিটার সেন্ট্রিফিউজ। পাশে শেলফে
সারি সারি বই খাতা, নোট বই।
শ্রাবণী অবাক হয়ে বলল, "এই ল্যাবরেটরিটা দেখি একেবারে চকচক করছে।"
"দরজা জানালা সব বন্ধ ছিল বলে নষ্ট হয়নি।"
"কী সুন্দর ল্যাবরেটরি দেখেছিস ?" নিয়াজ মুগ্ধ হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে বলল, "এরকম
একটা জঙ্গুলে জায়গায় কেউ এরকম ল্যাবরেটরি তৈরি করতে পারে ?"
নিয়াজ হাতের মোমবাতিটা নিয়ে শেলফের দিকে এগিয়ে গিয়ে একটা বই টেনে নেয়। ধূলা
ঝেড়ে বইটা দেখে বলল, "জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিঙের বই।"
"তার মানে পাগলা ডাক্তার একজন জিনেটিক ইঞ্জিনিয়ার ছিল ?"
নিয়াজ বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠায় হাতে-লেখা নামটি পড়ে বলল, "পাগলা ডাক্তারের ভালো নাম
মাজেদ খান। ড. মাজেদ খান।"
"এরকম সুন্দর একটা নাম থাকার পরও তাকে সবাই পাগলা ডাক্তার ডাকে কেন ?"
"আমাকে জিজ্ঞেস করিস না। আমি এই নাম দিইনি।" নিয়াজ শেলফ থেকে আরো
কয়েকটা বই নামিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। নিয়াজ পড়াশোনা সং্#956;ান্ত ব্যাপারে খুব উৎসাহী।
কোনো বই পেলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে না-দেখে নামিয়ে রাখে না। যদিও একটু আগে সে চলে যাবার
জন্যে অধৈর্য হয়ে উঠেছিল কিন্তু হঠাৎ করে বই এবং কাগজপত্র দেখে সে খুব উৎসাহী হয়ে
উঠে। মোমবাতিটা টেবিলে বসিয়ে সে কাগজপত্র বের করে দেখতে থাকে। জয়ন্ত একটা
মাই্ে#956;াস্কোপের ধূলা ঝেড়ে চোখ লাগিয়ে দেখার চেষ্টা করে। শ্রাবণী একধরনের বিস্ময় নিয়ে
ঘরের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে থাকে। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না যে এরকম একটি নির্জন দ্বীপে
একজন মানুষ এরকম চমৎকার একটি ল্যাবরেটরি দাঁড় করিয়ে ফেলতে পারে।
নিয়াজ বই এবং কাগজপত্র ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ করে বলল, "এই দ্যাখ ! কী পেয়েছি।"
"কী ?" জয়ন্ত মাই্ে#956;াস্কোপ থেকে চোখ তুলে নিয়াজের দিকে তাকাল।
"ডায়েরি।"
"ডায়েরি ? শ্রাবণী নিয়াজের দিকে এগিয়ে এল।
"হঁ্যা। পার্সোনাল ডায়েরি।" নিয়াজ পৃষ্ঠাগুলো ওল্টাতে থাকে এবং হঠাৎ করে সেখান
থেকে ভাঁজ-করা একটা কাগজ নিচে পড়ল। শ্রাবণী কাগজটা তুলে নিয়ে ভাঁজ খুলে তাকায়,
ভেতরে টানা হাতে কিছু একটা লেখা। শ্রবণী কৌতুহলী হয়ে মোমবাতির আলোতে পড়ার চেষ্টা
করে। মানুষটির হাতের লেখা সুন্দর হলেও পড়তে কষ্ট হয়।
সম্ভবত লিখেছে খুব তাড়াহুড়ো করে। সেজন্যে পড়তে শ্রাবণীর সময় লাগল। পড়ে হঠাৎ
করে শ্রাবণীর ভুরু কুঞ্চিত হয়ে উঠে। সে কাঁপা গলায় বলল, "কী লেখা এখানে ?"
নিয়াজ মুখ তুলে তাকাল, বলল, "কী লেখা ?"
শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, "পড়ে-দ্যাখ।"
নিয়াজ কাগজটি হাতে নিয়ে মোমবাতির আলোতে পড়ার চেষ্টা করে। সেখানে লেখা, "এ
আমি কী করেছি ! একজন একজন করে সবাইকে খুন করেছে - এখন কি আমার পালা ? কেউ
যদি ভুল করে এই দ্বীপে চলে আসে তার কী হবে ?"
ওরা একজন আরেকজনের দিকে তাকাল। জয়ন্ত ফিসফিস করে বলল, "কী লিখেছে
এখানে ? কে খুন করেছে ? কাকে খুন করেছে ?"
নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকে। পেছন থেকে কয়েক পৃষ্ঠা পড়ে। তারপর কিছু পৃষ্ঠা
আগে চলে আসে। হঠাৎ করে সে মুখ তুলে তাকায়। মোমবাতির আলোতে দেখায় তার মুখ
ভয়ে রক্তশূন্য হয়ে আছে। শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, "কী লেখা আছে ডায়েরিতে ?"
"বেজি !"
"বেজি ? কী হয়েছে বেজির ?"
"এই বেজিগুলো সাধারণ বেজি নয়। মাজেদ খান ইঞ্জিনিয়ারিং করে ওদের মাঝে বুদ্ধিমত্তার
একটা জিন ঢুকিয়ে দিয়েছে।"
"কী বলছিস তুই !"
"হঁ্যা। এই দ্যাখ।" নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা খুলে পড়ে শোনাল, "সুইডেনের ্#956;ান্স
লেবরেটরিতে প্রফেসর সোয়ান্সন যে এক্সপেরিমেন্টটি করেছেন আমি আজকে সেটি করেছি।
বেজির যে-ক্লোনটি তৈরি করেছি তার তিন নম্বর ্#956;মোজমে বুদ্ধিমত্তার জিনটিতে মানুষের
বুদ্ধিমত্তার জিনটি বসিয়ে দিয়েছি। জানিনা এই ভ্রূনটা ঠিকভাবে বড় হবে কি না - যদি বড় হয়
তাহলে প্রথম একটা স্তন্যপায়ী প্রাণীর মাঝে মানুষের এরকম একটা জিন ঢুকিয়ে দেয়া হল।"
নিয়াজ মুখ তুলে তাকাল। কাঁপা গলায় বলল, "তার মানে বুঝতে পারছিস ? মাজেদ খান
এখানে কিছু বেজি তৈরি করেছে যেগুলোর বুদ্ধিমত্তা মানুষের মতো -"
জয়ন্ত মাথা নেড়ে বলল, "কী বলছিস পাগলের মতো ?"
"আমি পাগলের মতো বলছি না, এই দ্যাখ মাজেদ খান কি লিখেছে।" নিয়াজ ডায়েরির
আরো কিছু পৃষ্ঠা উল্টিয়ে পড়তে থাকে। "বেজিটির বুদ্ধিমত্তা অন্য বেজি থেকে বেশি কি না
সেটা আজকে প্রমাণিত হয়ে গেল। বেজিটি খাঁচা থেকে পালিয়ে গেছে। এই খাঁচা থেকে
কোনোভাবে বেজিটির পালিয়ে যাবার কথা নয়। কারণ বুদ্ধিমত্তাহীন কোনো প্রাণী এই খাঁচার
ছিটকিনি খুলতে পারবে না। শুধুমাত্র অত্যন্ত উনড়বত শ্রেনীর বুদ্ধিমত্তা আছে এরকম একটা প্রাণীই
ছিটকিনি খুলে বের হয়ে যেতে পারে। কাজটি খুব ভুল হয়ে গেল। সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রাণী
ছাড়া পেয়ে গেল। এখন এটি যদি তার বাচ্চাদের মাঝে এই বুদ্ধিমত্তার জিন ছড়িয়ে দেয় ?
তারা যদি নতুন বাচ্চার জন্ম দেয় ? এই পুরো দ্বীপটি বুদ্ধিমান বেজি দিয়ে ভরে উঠে ?"
শ্রাবণী ভয়-পাওয়া গলায় বলল, "তার মানে আমাদের পিছু-পিছু যে বেজিটা আসছিল
সেটা মানুষের মতো বুদ্ধিমান ?"
কেউ শ্রাবণীর কথার উত্তর দিল না। নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ থেমে
গিয়ে বলল, "এই দ্যাখ কী লেখা - আমি এই দ্বীপের সব বেজিগুলো মারার চেষ্টা করেছি। গুলি
করে মারার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সেই বুদ্ধিমান বেজিকে মনে হয় মারতে পারিনি। আজকে প্রথম
কিছু বেজির বাচ্চাকে পিছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে ছুটে যেতে দেখলাম। তাহলে কি বুদ্ধিমান
নতুন বেজির বাচ্চার জন্ম হয়েছে ? সর্বনাশ ! এখন কী হবে ? আমি বেজিগুলোকে মারার চেষ্টা
করেছি বলে আমাকে শত্রু হিসেবে ধরে নিয়েছে। এই বেজিগুলো কি এখন থেকে আমাকে
কিংবা সব মানুষকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করবে ?"
মোমবাতির আলোতে সবাই চুপ করে বসে থাকে। কেউ কোনো কথা বলতে পারে না।
নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আবার পড়তে শুরু করল,
"বেজিদের একটি বুদ্ধিমান প্রজন্মের জন্ম হলে তারা কী করবে ? সবার আগে নিজেদের খাবার
সংগ্রহের ব্যাপারটি নিশ্চিত করবে। আজকে আমি তাই আবিষ্কার করেছি। তারা একটি বড় গর্ত
করে সেখানে সাপদের এনে জড়ো করেছে। আমি জানতাম না সাপ তাদের এত প্রিয় খাবার।
সাপগুলো বাঁচিয়ে রাখার জন্যে ইঁদুর ধরে এনে গর্তের মাঝে ছেড়ে দিচ্ছে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার।"
নিয়াজ মুখ তুলে তাকিয়ে বলল, "এখন বুঝতে পারছিস আমি যেই গর্তটাতে পড়তে
যাচ্ছিলাম সেটা কোথা থেকে এসেছে ?
"হঁ্যা। বুঝতে পেরেছি।"
শ্রাবণী ভয় পাওয়া গলায় বলল, "এখন কী হবে ?"
জয়ন্ত অনিশ্চিতের মতো মাথা নাড়ল, বলল, "আমি জানি না।" সে ধীরে ধীরে দরজার
কাছে হেঁটে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে ভেতর থেকে ছিটকিনি আটকে দিল। অন্য দুজন এক
ধরনের আতঙ্ক নিয়ে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ করে ছিটকিনি আটকে দিয়ে তারা
প্রথমবার স্বীকার করে নিল এখানে তারা একটা ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি এসে পড়েছে।
নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে গিয়ে আবার পড়তে শুরু করল,
"বুদ্ধিহীর প্রাণী চলে সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে কিন্তু বুদ্ধিমান প্রাণী নতুন জিনিস শিখতে পারে। এই
বেজিগুলো বুদ্ধিমান। তারা প্রতিদিন নতুন জিনিস শিখছে। আজকে আবিষ্কার করলাম,
বেজিগুলো আমার পোষা কুকুরটিকে মেরে ফেলেছে। রাত্রিবেলা কুকুরটার চিৎকার শুনে আমি
বন্দুক নিয়ে ছুটে বের হয়ে গেছি। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বেজিগুলো জানে - একটা প্রাণীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে তার দৃষ্টি। কাজেই সবার আগে সেগুলো কুকুরটার
উপর ঝাপিয়ে পড়ে তার চোখদুটো খুবলে তুলে নিয়েছে। তার পরের অংশটি সহজ। বেজিগুলো
ধারালো দাঁত দিয়ে কুকুরের ঘাড়ের বড় আর্টারিটা ছিনড়ব করে দিয়েছে। কী নৃশংস ! বেজিগুলো
তাদের থেকে অনেক বড় প্রানীকে হত্যা করতে শিখে গেছে - এখন কি আমাদের হত্যা করবে ?
আমার ল্যাবরেটরি এসিসটেন্ট খুব ভয় পেয়েছে। ভয় পাওয়ারই কথা।"
নিয়াজ ডায়েরি থেকে মুখ তুলে বলল, "মনে আছে জব্বার মিয়া কী বলেছিল ?"
"কী বলেছিল ?"
"চোখদুটো সাবধান।"
"হঁ্যা। মনে আছে -"
"এখন বুঝেছিস তো কেন ?"
কেউ কোন কথা না বলে নিয়াজের দিকে তাকিয়ে রইল। নিয়াজ ডায়েরির পৃষ্ঠা ওল্টাতে
ওল্টাতে হঠাৎ করে থেমে যায়। একটা বড় নিশ্বাস নিয়ে আবার পড়তে শুরু করল, "আজকে
আমার ল্যাবরেটরি এসিস্টেন্ট খুন হয়ে গেল। মৃতদেহটি বাসার সামনে পড়েছিল। চোখদুটো
খুবলে নিয়ে ঘাড়ের বড় আর্টারিগুলো ধারালো দাঁত দিয়ে কেটে নিয়েছে। কাজটি করেছে প্রায়
নিঃশব্দে। আমি রাতে কোন শব্দও শুনতে পারিনি। তাকে আমি ঘর থেকে বের হতে নিষেধ
করেছিলাম। কিন্তু সে আমার কথা না-শুনে ঘর থেকে বের হয়েছিল। কেন বের হল ? আমার
ধারণা বেজিগুলো কোনো একটা বুদ্ধি বের করে তাকে বের করে নিয়েছে। এখন এই দ্বীপে আমি
একা। আমার ধারণা বাইরে থেকে কোনো সাহায্য না পেলে আমার অবস্থাও আমার ল্যাবরেটরি
এসিস্টেন্টের মতো হবে।"
নিয়াজ আবার মুখ তুলে তাকাল। জয়ন্ত জিজ্ঞেস করল, "ডায়েরি কি এখানেই শেষ ?"
"না। আরো কয়েক পৃষ্ঠা আছে।"
"কী লেখা আছে এখানে ?"
নিয়াজ পড়তে শুরু করে, "বুদ্ধিমান প্রাণীর প্রথম চেষ্টাটাই হল তার বুদ্ধিমত্তাকে ছড়িয়ে
দেওয়া। কাজেই এই-বেজিগুলো যে সেরকম চেষ্টা করবে সে-ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ
নেই। এই দ্বীপের যেদিকেই তাকাই সেদিকেই আমি বেজিগুলোকে দেখতে পাই। নিষ্পলক
দৃষ্টিতে দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করে। দৃষ্টিগুলো দেখে আমার বুক কেঁপে ওঠে। আমি আজকাল ঘর থেকে বের হই না। মাথার কাছে লোডেড বন্দুক রাখি। কিন্তু কেন জানি মনে
হয়, এই বন্দুক আমাকে রক্ষা করতে পারবে না। আমার মনে হয়, এটি খুব বড় সৌভাগ্য যে
বেজিগুলো এই দ্বীপের মাঝে আটকা পড়ে আছে। এখান থেকে অন্য দ্বীপে কিংবা দেশের মূল
ভূখণ্ডে যেতে পারছে না। যদি একবার চলে যায় তখন কী হবে ! পৃথিবীর মানুষ আমাকে যেন
ক্ষমা করে।"
"আমার মনে হয় প্রাণীটা বুদ্ধিমান হবার পর নিশ্চয়ই তারা ভাব বিনিময় করার জন্যে
নিজেদের একটা ভাষা আবিষ্কার করেছে। ডেকের ওপর বসে আমি বাইনোকুলার দিয়ে
চারপাশের বেজিগুলোকে দেখি। মনে হয় এগুলো এখন নিজেদের মাঝে কথা বলছে। মনে হচ্ছে
বেজিগুলোর নিজস্ব কোনো ভাষা আছে। শুধু-যে ভাষা আঝে তা নয় - মনে হয় সামনের পা
দুটোকে হাত হিসেবে ব্যাবহার করার চেষ্টা করে। আজকাল আমাকে খুব সাবধান থাকতে হয় -
মনে হয় বেজিগুলো ঘরের ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকে যেতে পারে।"
"যে-জিনিসটি এখনো বেজিগুলো শিখেনি সেটা হচ্ছে আগুনের ব্যবহার। তাহলে কি এই
আগুন দিয়েই কোনোভাবে এদের ধ্বংস করতে হবে ? আমি জানি না।"
"আমার কী হবে আমি জানি না। আমি যে ভুল করেছি সেজন্যে ঈশ্বর আমাকে ক্ষমা
করুন।"
নিয়াজ ডায়েরিটা বন্ধ করে ওদের দিকে তাকিয়ে বলল, "ডায়েরিটা এখানেই শেষ।"
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। মোমবাতির আলোটি স্থির হয়ে ছিল, মাঝে মাঝে
কেঁপে উঠছে, দেয়ালে তাদের বড় ছায়া পড়েছে। শ্রাবণী কাঁপা গলায় বলল, "এখন কী হবে ?"
"মাজেদ খানের একটা বন্দুক ছিল, সে পুরো ব্যাপারটা জানত তারপরও নিজেকে বাঁচাতে
পারে নাই। আমরা কেমন করে বাঁচব ?" নিয়াজ সবার দিকে তাকিয়ে বলল, "আমাদের কোনো
আশা নেই।"
"সব আমার দোষ।" জয়ন্ত মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, "আমি যদি তোদের জোর করে নিয়ে না
আসতাম -"
"ওসব বলে লাভ নেই।" শ্রাবণী মাথা নেড়ে বলল, "এখন কী করা যায় সেটা বল।"
"এমন কী হতে পারে যে আমরা শুধু শুধু ভয় পাচ্ছি ?"
"মানে ?"
"এই-যে বুদ্ধিমান বেজির ব্যাপারটা - আসলে এটা খানিকটা বাড়বাড়ি। আসলে সেরকম
কিছু নেই। একটা বেজি আর কত বিপজ্জনক হবে ? এইটুকু একটা জন্তু -"
নিয়াজ এবং শ্রাবণী নিশব্দে জয়ন্তের দিকে তাকিয়ে রইল। জয়ন্ত বলল, "আগেই কেন
ভয়ে কাবু হয়ে থাকব ? ব্যাপারটা দেখা যাক। এই ডায়েরিটা পাঁচ বছর আগের লেখা, পাঁচবছরে
কত কী হতে পারে।"
"উল্টোটাও হতে পারে।" নিয়াজ বলল, "পাঁচবছর আগে এটা যত ভয়ঙ্কর ছিল এখন
হয়তো আরো অনেক বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে গেছে।"
"হঁ্যা। উল্টোটাও হতে পারে - কিন্তু আগেই সেটা ধরে নেব কেন ? এই-যে আমরা
তিনজন হেঁটে হেঁটে এসেছি, আমাদের কিছু হয়েছে ? সত্যিই যদি ভয়ঙ্কর বেজি আ্#956;মণ করে
মানুষকে মেরে ফেলতে পারত - তাহলে আমাদের মারল না কেন ?"
"তা ঠিক।" নিয়াজ মাথা নেড়ে বলল, "তাহলে তুই কী করতে চাস ?"
"প্রথমে এখান থেকে বের হয়ে বাসাটা দেখি। কী হচ্ছে না হচ্ছে বোঝার চেষ্টা করি।
এখন মনে হচ্ছে জব্বার মিয়ার বন্দুকটা নিয়ে এলে খারাপ হত না।"
"মাজেদ খানের একটা বন্দুক ছিল, সেটা খুঁজে দেখলে হয়।"
শ্রাবণী ভুরু কুঁচকে বলল, "তুই কখনো বন্দুক দিয়ে গুলি করেছিস ?"
"না। কিন্তু সেটা আর কত কঠিন হবে ?"
"একটা নাকি ধাক্কা লাগে - বেকায়দা ধাক্কা লেগে নাকি মানুষ উল্টে পড়ে।"
"ধুর। বাজে কথা। পুঁচকে পুঁচকে সন্ত্রাসীরা বন্দুক দিয়ে কাটা রাইফেল দিয়ে গুলি করছে
না ?"
"তুই তো আর সন্ত্রাসী না। সন্ত্রাসী হলে তো আর চিন্তা ছিল না।"
"যাই হোক -" নিয়াজ বলল, "এখন আর সেটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই। আমাদের
কাছে বন্দুক নাই, আছে বাঁশের লাঠি, সেটা হাতে নিয়ে বের হতে হবে।"
"হঁ্যা।" জয়ন্ত লাঠিটা হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
সাবধানে দরজা খুলে তারা ল্যাবরেটরি-ঘর থেকে বের হয়। একটা ছোট করিডোর ধরে
হাঁটতে থাকে। পাশাপাশি কয়েকটা ঘর, একটা সম্ভবত স্টোর রুম, একটা লাইব্রেরি, আরেকটা
ছোট বিশ্রাম করার ঘর। করিডোরের একপাশে দরজা, দরজা খুলে সম্ভবত বারান্দায় যাওয়া যায়। দরজাটার সামনে দাঁড়িয়ে একটু ইতস্তত করে জয়ন্ত দরজা খুলে বের হয়ে এল। ভেতরে
অন্ধকার থেকে হঠাৎ প্রখর আলোতে এসে তাদের সবার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। মোমবাতিগুলো ফুঁ
দিয়ে নিভিয়ে তারা বারান্দার রেলিঙের কাছে এগিয়ে যায় - ভালো করে দেখার জন্যে তাদের
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হল। উজ্জ্বল আলোতে চোখ সয়ে যাবার পর তারা আবিষ্কার করল এই
বারান্দাটি থেকে একপাশে সমুদ্রের চমৎকার একটি দৃশ্য দেখা যায়, অন্যপাশে দ্বীপের
গাছগাছালি। তাদের মনের ভেতরে বেজি নিয়ে ভয়ঙ্কর দুর্ভাবনাটি না থাকলে নিঃসন্দেহে এখানে
দাঁড়িয়ে তারা দৃশ্যটি উপভোগ করত। তারপরও তারা সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। শ্রাবণী
হেঁটে বারান্দার অন্যপাশে এসে বনের দিকে তাকিয়ে থাকে। বড় বড় গাছ, গাছের নিচে
ঝোপঝাড়। গাছপালা ঝোপঝাড়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শ্রাবণী একধরনের অস্বস্তি
বোধ করে, অস্বস্তিটি ঠিক কেন বোধ করছে সে ধরতে পারে না - তার শুধু মনে হয় ওখানে
কিছু-একটা জিনিস ঠিক নেই। শ্রাবণী রেলিঙে ঝুকে পড়ে আরো তীক্ষ্নচোখে তাকাল, হঠাৎ
করে মনে হল গাছের নিচে ঝোপের আড়ালে কিছু একটা যেন নড়ে উঠেছে। শ্রাবণী তীক্ষ্ন
চোখে তাকিয়ে হঠাৎ ভয়ানকভাবে চমকে উঠে। বাসাটি ঘিরে গাছপালাগুলোর নিচে যতদূর চোখ
যায় অসংখ্য বেজি নিশ্চল হয়ে বসে আছে। এতদূর থেকে বোঝা যায় না কিন্তু তাদের ছোট
ছোট কুতকুতে চোখ তাদের দিকে স্থির দৃষ্টিতে নিবদ্ধ হয়ে আছে। শ্রাবণী আতঙ্কে একটা আর্ত
চিৎকার করে উঠল এবং সেই চিৎকার শুনে নিশ্চল বেজিগুলো একসাথে পেছনের দুই পায়ের
ওপর ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
জয়ন্ত কাঁপা গলায় বলল, "কী হয়েছে ?"
শ্রবণী হাত তুলে দেখাল, "ঐ দেখ।"
জয়ন্ত এবং নিয়াজ তাকিয়ে দেখে বাসাটি ঘিরে কয়েক হাজার বেজি পেছনের পায়ের ওপর
ভর দিয়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে স্থিরচোখে তাদের তিনজনের দিকে তাকিয়ে আছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



