মঙ্গলবারের (২৫ ডিসেম্বর, ২০১২) প্রথম আলোর প্রথম পৃষ্ঠায় প্রকাশিত একটি খবর দেখে সত্যি মর্মাহত হলাম। কি ভয়ানক!!! বলে অনেকই হয়তো আতকে উঠেছেন, ভাবছেন যে ছেলে-মেয়েগুলো হাতে বিজয় চিহ্ন দেখিয়েছে, আনন্দে ভরিয়েছে এই দেশটাকে, তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একটি বড় অংশ উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নম্বর পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে বিষয়ভিত্তিক নম্বরের বেঁধে দেওয়া শর্ত পূরণ করতেও ব্যর্থ হচ্ছেন তাঁরা। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় পরীক্ষাতেই এঁরা জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন।
হাতির কথা আমারা সবাই জানি, শুরের দ্বারাই ১ টনের বেশি ওজন তুলতে পারে। কিন্তু সার্কাসের একটা হাতিকে দেখি একটা খুঁটির সাথে সামান্য দড়ি দিয়ে বেধে রাখে। বাচ্চা অবস্থায় শক্ত শিকল ও মোটা গাছের সাথে বেধে রাখা হয়, বাচ্চা তখন দুর্বল কিন্তু শিকল ও গাছ তখন খুব শক্ত। বাচ্চা তখন বাঁধা থাকতে অভ্যস্ত নয় সুতরাং তখন শিকল টানাটানি করে। কিন্তু সবসময় বিফল হয়, পরে একদিন বুঝতে পারে যে ঐ ভাবে টানাটানি করে কোন লাভ নাই... বাচ্চা হাতি যখন বড় হয় সে যখন অনেক শক্তিশালী তাকে একটা দুর্বল দড়ি দ্বারা ছোট খুঁটির দ্বারা বেধে রাখা যায়। কারন অবস্থা তাকে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলেছে।
শুধু কি তাই, সার্কাসের লোক হাতিটিকে যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করছে, দর্শক দেখছে তালি দিচ্ছে।
আমি বা আমরা এইরকম একটা অশুভ শক্তি, আমি বা আমরা গৃহশিক্ষক(ভাইয়া) বা কোচিং এর ভাইয়া, এই ছেলেমায়ে গুলোকে নিয়ে আজ সার্কাস খেলা দেখাছি আমরা, এই সার্কাস হোল A+ এর মোহে অন্ধ করে ব্যবসার খেলা, আর আপনারা তালি দিচ্ছেন... আনন্দে উতফুল্ল হয়ে নেচে উঠছেন... সত্যি অদ্ভুত!!!
আর ‘জাঙ্ক ফুড’ খাওয়াইয়ে তো সবার আলসার বানায়ে দেই। যাবে কই আমার কাসেই আসতে হবে... বুজলেন না তো এইটা হচ্ছে ‘জুঙ্ক ফুড’ ম্যাথড। সব টপিক গুলো নিয়া এমন এমন সব অদ্ভুত গল্প বানাব আর technically throwing করবো না খাইয়া যায় কই? খাবি আর পস্তাবি... হাহাহা... এখন সহজেই বিষয়টা মুখস্ত হবে, তোতা পাখি তৈরি হয়ে যাবে... exam এ A+ পাওয়া যাবে... ভাইয়া অস্থির...
আরে জানি তো আমি/আমরা অস্থির...
আমাদের মুল রসদ যোগায় স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা তারা ছাত্র ছাত্রীদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছে ক্লাসে ঠিকমত পরালেখা করা সম্ভব না, ভালো ফলাফল করার জন্য কোচিং করতে হবে... ওরাও বুঝে গেছে... অভিভাবকও বুঝে গেছে A+ লাগবে যেকোনো মুল্যে, আমরাও বুঝে গেছি কিভাবে হাতিয়ে নিতে হয়... তাইতো আমাদের রেট আকাশ ছোঁয়া।
আরেকটা পদ্ধতি আসে, এইটার নাম ‘Ping Pong’। যদি ‘X’কে বুঝাইতে পারি আমার কাসে পর তোমার রোল এখন তো ৫ তোমাকে ‘y’ এর আগে অর্থাৎ ২ বানায়ে দিবো... পাখি আর যায় কই... ওর রোল ২ হলেই হবে পড়ালেখা নিপাত যাক। অভিভাবক ও বেজায় খুশি... গর্ব করে বলবে, আমার সন্তান... আমিও খুশি আমার যে পকেট গরম হচ্ছে... m/
অনেক সময় অভিবাবক বলে শুধু A+ পাওয়ার জন্য যা করা লাগে তাই করতে। অর্থাৎ যা বোর্ডে এসেছে শুধু তাই পরাতে, কি ভয়ানক আত্মঘাতী সিধান্ত। ছাত্র ছাত্রিরা তো এইসব সিধান্ত আরও বেশি নেয়, সবার একটাই চিন্তা আমাকে যে করেই হোক A+ পেতে হবে। অনেক সময় অভিবাবক প্যাকেজ সিস্টেমে আসে, ৩ মাসে বই শেষ। একটা ছাত্র/ছাত্রীর জন্য ওই বইটা ১ বছরের জন্য ডিজাইন করা। কিন্তু আমরা তাদের বুঝাতে সক্ষম হয়েছি এটা ৩ মাসেই শেষ করা যায় ‘শর্টকাট’, এর সাথে এর যত রকম সুবিধা। সত্যি সুবিধা ৩ মাসেই টাকা কাছাইয়া লমু... হাহাহাহা... তারা দিতে প্রস্তুত আমাদের সমস্যা কি... A+ পাইলেই হোল!!!
অনেকে আবার আমাদের কর্মচারীর মতো দেখে, ভাইভা নেয়। অদ্ভুত সব প্রশ্ন করে, আমি বা আমরা বেশি মন খারাপ করি না... আমাদের টাকা পাইলেই হোল... সন্মান থন্মান ব্যাপার না... অইগুলা এখন এম্নিতেই জাধুঘরের জিনিস... হাতাহতি না করাই ভালো...
আরেকটা মোক্ষম আস্র হোল ‘ওস্তাদের মাইর শেষ রাইত’ পদ্ধতি। পরীক্ষার আগে দাগাইয়া দেই, পারলে প্রশ্ন দিয়া দেই (অনেক স্কুল কলেজ এর স্যার আছেন উত্তেজনা ধরে রাখতে পারেন না প্রশ্ন দিয়া দেন... ধরাও খান... লুল)। ইন্টেন্সিব কেয়ার ইউনিট খুলি... ১০ দিনে A+ পওয়ার গ্যারান্টি দেই। শেষ রাতে আসার জন্য আমন্ত্রন জানাই... এতো বড় লোভ অনেকের কাছেই ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হয় না... ওর যে A+ লাগবে তা যে করেই হোক... অভিভাবকই নিয়ে আসে... আমিও খুশি হতে থাকি... অট্টহাসি দেই...
এরপর ফলাফল প্রকাশ হয়... শিক্ষার্থী ভুল-শুদ্ধ যা-ই লিখুক না কেন, তাকে নম্বর দিতেই হবে। আর নম্বর দিতে হবে বাড়িয়ে বাড়িয়ে। যে শিক্ষার্থী পাস নম্বর পাওয়ার যোগ্য নন, তাঁকে পাস নম্বর বা তার অধিক নম্বর দিতে হবে। আর বাড়িয়ে বাড়িয়ে নম্বর দেওয়ার ফলে যে শিক্ষার্থী ৫০ নম্বর পাওয়ার যোগ্য, তিনি পেয়ে যান ৬০, ৬৫, ৭০ বা তার অধিক। নম্বর দেওয়ার বেলায় উদার নীতিমালা অনুসরণ করার ফলে কৃত্রিমভাবে মেধার বিস্ফোরণ ঘটে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়, আমি চূড়ান্ত ভাবে সফল হই।
...
...
...
আজ অনেকদিন ধরেই আমি পড়াই, গরিব মানুষ... তাই হয়তো, আর এটাই সহজ উপায় ভেবে।
সবসময় বিষয়ভিত্তিক গভীর পাঠাভ্যাসের কথা বলে এসেছি, বলেছি A+ কিছু না ভার্সিটি ভরতি পরিক্ষায় বুঝা যাবে তোমার অবস্থান... আমি গানিতিক সমস্যা নিজের হাতে করে দেই নাই। এই কথাগুলো অনেকেই ভালো ভাবে নেয় নাই... পরীক্ষার আগে কাউকে কনদিন ফোন দেই নাই, জানতে চাইনাই... কি করছে পরিক্ষায়...
এই ব্যাপার গুলোর জন্য এখনো আমি ভালো ভাইয়া হয়ে উঠতে পারি নাই... অনেকেই আমাকে ভুল বুঝেছে... আমাদের আসলে স্বনির্ভর হতে শিখতে হবে... বইটা নিজেকেই পড়তে হবে... সমস্যা গুলো নিজেই সমাধান করতে হবে... একদম না পারলে গৃহশিক্ষকের সাহায্য নেয়া যায়।
অভিবাবকেও বুজতে হবে জিপিএ ৫ ই সব কিছু না...
তবু এই দায় আমি এড়াতে পারি না, আমিও দায়ি..
মুল লেখা

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



