আজকে প্রেস ক্লাব গিয়েছিলাম সকালে... ওখানে সিলভার ডোনার প্রোগ্রাম করা হয়েছিল, মানে যারা ১০ বার বা তার বেশি কোয়ান্টামে রক্ত দিয়েছে তাদের তারা সন্মমানিত করেছে। তাদের মধ্যে আমি একজন ভাগ্যবান, এই ভেবে না যে আমি একটা মেডেল পেয়েছি এই অর্থে না, ব্যপারটা হোল এই ৩০০ জনের মতো ভাই বোন ছিল যারা মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ তাদের সাথে একসাথে বসতে পারা, কথা বলার সুজগ পাওয়া, এই সুযোগটা পাবার জন্য।
রক্ত দিয়ে আমরা কতকিছুই না করি, আছে সাহিত্যে ব্যাবহার, সম্পর্কে ব্যাবহার করি (রক্তের সম্পর্ক), শুনেছি প্রেমিকাকে পত্র লেখে কেউ কেউ, বাংলা ছবির কত ডায়লগ হয়ে গেলো রক্ত নিয়ে...!!! বিজ্ঞানের ভাষায় রক্ত তরল যোজক কলা। এবং জীবনের জীবনের অবিছন্ন একটা অংশ। মাঝে মাঝেই দেখা দেয় আমাদের শরীরে রক্তের স্বল্পতা, তখন আমাদের শরীরে রক্তের জোগান দিতে হয়, আসুন জেনে নেই রক্ত সম্পর্কিত কিছু কথা...
রক্তের প্রয়োজন যাদের:
১. দূঘর্টনাজনিত রক্তক্ষরণঃ দূঘর্টনায় আহত রোগীর জন্য দূঘর্টনার ধরণ অনুযায়ী রক্তের প্রয়োজন হয়।
২. দগ্ধতাঃ আগুন পুড়া বা এসিডে ঝলসানো রোগীর জন্য পাজমা/রক্তরস প্রয়োজন। এজন্য ৩-৪ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
৩. অ্যানিমিয়াঃ রক্তে R.B.C. এর পরিমাণ কমে গেলে রক্তে পযার্প্ত পরিমাণ হিমোগোবিনের অভাবে অ্যানিমিয়া রোগ হয়।
হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়াতে R.B.C. এর ভাঙ্গন ঘটে
৪. থ্যালাসেমিয়াঃ এক ধরনের হিমোগোবিনের অভাবজনিত বংশগত রোগ। রোগীকে প্রতিমাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।
৫. হৃদরোগঃ ভয়াবহ Heart Surgery এবং Bypass Surgery এর জন্য ৬-১০ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
৬. হিমোফিলিয়াঃ এক ধরনের বংশগত রোগ। রক্তক্ষরণ হয় যা সহজে বন্ধ হয় না, তাই রোগীকে রক্ত জমাট বাধার উপাদান সমৃদ্ধ Platelete দেয়া হয়।
৭. প্রসবকালীন রক্তক্ষরণঃ সাধারণত প্রয়োজন হয় না তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে ১-২ বা ততোধিক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
৮. ব্লাড ক্যান্সারঃ রক্তের উপাদানসূমহের অভাবে ক্যান্সার হয়। প্রয়োজন অনুসারে রক্ত দেয়া হয়।
৯. কিডনী ডায়ালাইসিসঃ প্রতিবার ডায়ালাইসিস-এ ১ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
১০. রক্ত বমিঃ এ রোগে ১-২ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়।
১১. ডেঙ্গু জ্বরঃ এ রোগে ৪ ব্যাগ রক্ত হতে ১ ব্যাগ Platelete পৃথক করে রোগীর শরীরে দেয়া হয়।
১২. অস্ত্রপচারঃ অস্ত্রপচারের ধরণ বুঝে রক্তের চাহিদা বিভিন্ন।
রক্তদানের যোগ্যতা :
সাধারনত একজন সুস্থ ব্যাক্তি চার মাস অন্তর অন্তর রক্তদান করতে পারেন। এবার দেখে নেয়া যাক রক্তদানের যোগ্যতাসমূহ-
বয়স – ১৮-৫৭ বছর।
ওজন – ১০০ পাউন্ড বা ৪৭ কেজির উর্ধ্বে।
তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ( অনুচক্রিকা , রক্তরস ) ওজন ৫৫ কেজি বা তার উর্ধ্বে। রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে।
রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৭৫% বা তার উর্ধ্বে থাকলে। সম্প্রতি ( ৬-মাস ) কোন দূঘর্টনা বা বড় ধরনের অপারেশন না হলে।
রক্তবাহিত জটিল রোগ যেমন-ম্যালেরিয়া, সিফিলিস , গনোরিয়া, হেপাটাইটিস , এইডস, চর্মরোগ , হৃদরোগ , ডায়াবেটিস ,টাইফয়েড এবং বাতজ্বর না থাকলে।
কোন বিশেষ ধরনের ঔষধ ব্যবহার না করলে।
চার মাসের মধ্যে যিনি কোথাও রক্ত দেননি।
মহিলাদের মধ্যে যারা গর্ভবতী নন এবং যাদের মাসিক চলছে না।
রক্তদান ও রক্ত দানের পর
রক্তদানের আগে প্রতিটি রক্তদাতাকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জিজ্ঞাসা করা হয়। সেগুলোর সঠিক উত্তর দিতে হবে। রক্তদাতার শারীরিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, নাড়ীর গতি পরীক্ষা করা হয় এবং রক্তদাতার রক্ত জীবানুমুক্ত কি না তা জানার জন্য সামান্য রক্ত নেয়া হয়। এছাড়া এই রক্তের মাধ্যমে রোগী রক্তদাতার রক্তের মধ্যে কোন জমাটবদ্ধতা সুষ্টি হয় কি না তাও পরীক্ষা করা হয় (ক্রসম্যাচিং)। রক্ত পরীক্ষার পর কারও রক্তে এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস -সি, সিফিলিস বা অন্য কোন জীবানুর উপস্থিতি ধরা পরলে তাকে (রক্তদাতা) প্রয়োজেনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পরামর্শ দেয়া হয়।সূঁচের অনুভূতি পাওয়ার মাধ্যমে রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে সময় লাগে সবোর্চ্চ ১০ মিনিট। রক্তদানের পূর্বে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে- যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা।রক্তদাতা প্রয়োজন মনে করলে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে।রক্তদানের সময় মাথা- শরীর সমান্তরাল থাকতে হবে। দূর হতে রক্ত দিতে এলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। রক্ত দান করার পরে অবশ্যই নুন্যতম ৫ মিনিট শুয়ে থাকতে হবে। [রক্তের প্রবাহ সমগ্র শরীরে স্বাভাবিক হবার জন্য এটা অতীব জরুরী]। সাধারণত রক্তদান করার পর অতিরিক্ত দামী খাবার গ্রহনের প্রয়োজন নেই। তবে রক্তদানের পর সপ্তাহ খানেক স্বাভাবিক খাবারের পাশাপাশি অন্যান্য সময়ের দ্বি-গুণ পানি পান করতে হবে। কেননা একজন রক্তদাতা যেটুকু রক্ত দান করেন [সাধারণত ১ পাউন্ড] তার প্রায় ৬০ ভাগ ঐ সময়ের মধ্যে পূরণ হয়। শুধু লোহিত রক্ত কণিকা পূরণ হতে ১২০ দিন বা ৪ মাস সময় নেয়। রক্তদানের পর অবশ্যই তারিখ মনে রাখতে হবে। [প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেই কার্ড সরবরাহ করে]।
বেশিরভাগ রক্ত দাতাই রক্তদানের পর কোন সমস্যা অনুভব করেন না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা তলপেটে ব্যাথা, দূবর্লতা, মাথা ঘোরা, সূঁচ প্রবেশের স্থানে ক্ষত লালচে দাগ এবং ব্যাথা অনুভব করতে পারেন। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা জ্ঞান হারাতে পারে বা মাংসপেশীতে খিচুনি ধরতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঠিক হয়ে যায়, কোন ঔষধের প্রয়োজন হয়না।
রক্তদানের সুবিধা:
প্রতি ৪ মাস অন্তর রক্ত দিলে দেহে নতুন BLOOD CELL সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।
দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকগুন বেড়ে যায়।
নিয়মিত রক্তদানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে বলে হৃদপিন্ড বিশেজ্ঞরা মনে করেন।
স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে আপনি জানতে পারেন আপনার শরীর রক্তবাহিত মারাত্মক রোগ যেমন-হেপাটাইটিস-বি,এইডস, সিফিলিস ইত্যাদির জীবাণু বহন করছে কিনা।
স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানসিক প্রশান্তি আসে।
রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো পৃথিবীর সবোর্চ্চ সেবার অর্ন্তভুক্ত।
আরও জানতেঃ Click This Link
এবার আমার কথা বলিঃ
আজকের অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারলাম যে বাংলাদেশে প্রতি বছরে মাত্র ৬ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন, শুনে কম মনে হলেও এর মাত্র ২৭% আসে সেচ্ছায় রক্তদাতার কাছ থেকে আর বাকিটার কিছু অংশ তাদের আত্মীয় আর বেশি ভাগই আসে ঝুঁকিপূর্ণ পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে। যা কিনা খুবই ঝুকি পূর্ণ। আর রক্ত নিয়ে তো হরহামেশাই ব্যাবশা হচ্ছে, এমনকি রক্তে সেলাইন পর্যন্ত মিশানো হচ্ছে!!! এবার একটু হিসাবে আসি, একজন লোক ৪ মাস অন্তর অন্তর রক্ত দিতে পারে, তাহলে বছরে হয় ৩ ব্যাগ। যদি দুই লাখ লোক নিয়মিত রক্ত দেয় তাহলে বছরে ৬ লাখ ব্যাগ হয়ে যায়। মানে রক্তের চাহিদা পূর্ণ হয়ে যায়। ১৬ কোটির এই দেশে কি দুই লক্ষ মানুষ নেই যারা এই কাজটা করতে পারে??? আজকের প্রধান অতিথি সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কয়দিন আগে বলেছিলেন, মানুষ যখন তার পরিপার্শ্বকে অনুভব করতে ভুলে যায় বা ব্যর্থ হয়, তখনই কিন্তু সে মৃত, তার হাত-পা চলমান; কিন্তু সে মৃত। আমরা কি সবাই মৃত???
রক্ত দানের শুরুটা বেশ মজার এবং হঠাত করে, ২০০৬ সালে একুশে বই মেলায়। তখন কলেজে পরতাম ১ম বর্ষে। আমার বন্ধু তোফায়েল [Tofial Azam] আর মনিকে [Mofazzal Karim Moni] নিয়ে গিয়েছিলাম বইমেলায়। সারাদিন খাওয়া দাওয়া নাই সন্ধ্যার সময় হঠাত করেই মাথায় ঢুকল রক্ত দিতে হবে, আমি আর তোফায়েল দিলাম আর মনি দিলো না, এভাবেই শুরু।
একটু খোলামেলা করেই বলি, আমি মোট ১৪ বার রক্ত দিয়েছি যার ১২ ব্যাগ কোয়ান্টামে আর ২ ব্যাগ আমার দুই আত্মীয়কে... কোয়ান্টাম বলে ১ ব্যাগ রক্ত দিয়ে, ৪ জন মানুষের জীবন বাঁচানো যায়। সেই হিসাবে ১২*৪+২=৫০ জন লোকের উপকারে আসতে পেরেছি, আমার অস্তিত্ব দিয়ে, শরীরের অংশ দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে... ২ আত্মীয়ের মধ্যে একজন আমার সম্পর্কে দাদা লাগে, এই কয়দিন আগে কোরবানির ঈদে যখন বাড়ি গিয়েছিলাম, তখন তার সাথে দেখা, সে বলল দাদা ভাই তোমার রক্ত পাইয়া এতো ভালো লাগছে যে আমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে গেছি, আর মনে হয় তোমার একটা অংশ আমার মধ্যে আছে। কি অদ্ভুত আমারও তো তাই মনে হয়। আর বাকি ঐ ৪৮ জঙ্কে তো আর আমি চিনি না, তবে যখনি দেখি একটা রোগীকে রক্ত দেয়া হচ্ছে, তখন মনে হয় এইতো আমার রক্ত... মনটা অদ্ভুত রকম এক আনন্দে ভরে ওঠে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।
অনেকেই নিয়মিত রক্ত দেয় না, আবার অজুহাত দেখায় যে সে তার আত্মীয়দের দিবে। কিন্তু খেয়াল করুন আমার এতোদিনে মাত্র ২ জন আত্মীয়কে রক্ত দিতে হয়েছে... হোলে আর হয়তো দু একবার দেয়া হোতো, কিন্তু এতো বার কি দেয়া হোতো??? বসে থাকবেন না। বুজলেনই তো, ‘নিরাপদ রক্ত সরবরাহের’ মূল ভিত্তি হলো স্বেচ্ছায় ও বিনামূল্যে দান করা রক্ত। একটু কি sacrifice করা যায় না... পাশে কি দারানো যায় না, এই অসহায় মানুষ গুলোর... নাকি আমরা মরেই বেঁচে থাকতে চাই... আমরা তো এমন না, আমরা তো রক্ত দিতে প্রস্তুত এমন জাতি, ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, দেশের জন্য দিয়েছি। এবার এই সুন্দর দেশে প্রতিটি মানুষের শুসাস্থের নিশ্চয়তা করতে রক্ত দেবার পালা...
জীবনে যত পুরুস্কার পেয়েছি তারমধ্যে এটা একটু অন্যরকম, এবং এটা আমি তাদের উৎসর্গ করতে চাই তাদের যাদের আমি মাঝে মধ্যেই বিরক্ত করি। বলি, “দোস্ত এক ব্যাগ রক্ত দিতে পারবি?” এবং যারা বলে, “হ্যা”।
পুনশ্চঃ যদি কেউ এই লেখা পরে অন্তত এক ব্যাগ রক্ত দান করেন তবে লেখা সার্থক, অন্তত এটা একটা জীবন রক্ষার কাজে লাগবে এই ভেবে। চাইলে shear করতে পারেন...
মূল লেখা
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই জানুয়ারি, ২০১৩ রাত ২:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



