somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

জুল ভার্ন
এপিটাফ nnএক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস...খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে...কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়।আমার অদক্ষ কলমে...যদি পারো ভালোবেসো তাকে...ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে,যে অকারণে লিখেছিল মানবশ্রাবণের ধারা....অঝোর

এক ‘অশ্লীল’ সংস্কৃতিঃ ঘেঁটু বা ঘাঁটু গান.....

২৩ শে নভেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এক ‘অশ্লীল’ সংস্কৃতিঃ ঘেঁটু বা ঘাঁটু গান.....

"গাহিয়া ঘাটু গান নৌকা দৌড়াইতাম আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম" প্রখ্যাত বাউল শিল্পী সর্বজন শ্রদ্ধেয় শাহ আবদুল করিম এর এই বিখ্যাত গানে ঘাটু গানের কথা বলা হয়েছে সেই ঘাটু গানের এলাকা/অঞ্চল ভিত্তিক অনেক নাম আছে। অঞ্চলভেদে ‘ঘাটু’ শব্দটির উচ্চারণগত ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। এই শব্দটি "ঘাঁটু", "ঘেটু", "ঘেঁটু", "ঘাডু","গাড়ু", "গাঁটু", "গাডু" প্রভৃতি বলা হয়। নেত্রকোনা অঞ্চলে এটি ‘গাডু’ নামেই পরিচিত, তবে শিক্ষিতজনরা ‘ঘাটু’ বলেন; আবার, সুনামগঞ্জ অঞ্চলে একে ‘ঘাডু’ বলে।

বাঙালির সমকামিতা ও ঘেটুপুত্রের ইতিহাসঃ
অবিভক্ত বাংলার বৃহত্তর ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, সিলেট প্রভৃতি অঞ্চলে এক ধরনের লোকগানের প্রচলন হয়েছিল, তার নাম ঘেটুগান। এই গানের দলে নদীর বুকে নৌকো নিয়ে ভাসতে ভাসতে ঘাটে ঘাটে নেমে বায়না নিয়ে নাচ দেখাত ও গান শোনাত বলেই এর নাম ‘ঘেটুগান’। ‘ঘাট’ থেকে ‘ঘেটু’। ‘ঘেটুগান’ আসলে কৃষ্ণের বিরহে রাধার গান। এই গান নেচে নেচে রাধা সেজে পরিবেশন করত কিশোরেরা। তাদের পরনে থাকত রাধার পোশাক, অলঙ্কার, পায়ে আলতা, চোখে কাজল। অভাবী ঘরের দেখতে সুন্দর কিশোরদেরই এ-সব দলে নেওয়া হত, তালিম দেওয়া হত নাচগানের। সবসময় তাদের সাজিয়ে রাখা হত মেয়ের সাজে। লোকে এদের বলত ‘ঘেটুপুত্র’। সেকালের অভিজাতশ্রেণির মানুষেরা বাড়িতে ঘেটুগানের আসর বসাতেন। রাধারূপী ঘেটুপুত্রকে মনে ধরলে, তাকে কিছুদিনের জন্য বাড়িতে রেখে দিতেন; বিশেষত পুরো বর্ষার সময়টা। এই সময়টায় তাদের নিয়মিত শয্যাসঙ্গী হতে হতো সেই অভিজাত মানুষটির। এক সময় এটাই প্রথা হয়ে দাঁড়ায়। তখন এই প্রথার বিপক্ষে সমাজ কোন প্রশ্ন তোলেনি। তুলবার সাহস করেনি। বাড়ির স্ত্রীরাও এটা মেনে নেন বা মেনে নিত বাধ্য হন। ঘেটুপুত্রদের সতীনের চোখে দেখতে থাকেন এবং ‘সতীন’ বলে ডাকতো। ষাট-সত্তর বছর আগেও এই প্রথার বেশ চল ছিল। প্রথার সঙ্গে এখন অবশ্য লুপ্ত হয়েছে এ গানের ধারাও। বাংলাদেশের বিখ্যাত সাহিত্যিক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হুমায়ুন আহমেদের শেষ পরিচালিত ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। ছবিটিতে ঘেটুগানের সূত্র ধরে বাঙালির সমকামিতার ইতিহাসের এই অধ্যায়টি তিনি তুলে ধরেছেন। ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ চলচ্চিত্রতেও ফুটে উঠেছে কিশোরদের এই যন্ত্রণাকাতর জীবনের ছবি।


নদনদীর দেশ বাংলা। নদীকে ঘিরেই এখানে গড়ে উঠেছে মানুষের আলো-আঁধারি জীবন। তখনও মানুষ নিজেদের ঘরের মধ্যে বিনোদনের হাজার উপকরণ নিয়ে হাজির হয়নি। তাই সবটাই ছিল সামাজিক। তাতে সম্প্রীতির আহ্বান যেমন ছিল, তেমনি ছিল নানান সামাজিক ব্যাধি। এদেশে তখন সদ্য ফিরিঙ্গি জাহাজ এসে ভিড়তে শুরু করেছে। তখনও বর্ষায় কূল ছাপিয়ে যখন নদীর জল হাওরে জমা হত, তখন সেই এলাকার মানুষের কাজ বলতে কিছুই থাকত না। দিন কাটত আমোদে-আনন্দে। আর সেই আনন্দকে উস্কে দিতে ঘাটে ঘাটে নৌকো ঘুরে বেড়াত। নৌকোয় থাকত একদল নারীবেশী সদ্য-কিশোর। ঘাটে ঘাটে ঘুরে বেড়াত বলে তাদের নাম হয়েছিল ঘাঁটু ছোকরা। আর এই ঘাঁটু ছোকরাদের নাচই ছিল ঘাঁটু নাচ।

বাংলা সংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া অনেক উপকরণের কথা বলতে গেলে ঘাঁটু গানের কথা এসেই পড়ে। কিন্তু তার ইতিহাসে ঐতিহ্যের উজ্জ্বল দিকটার তুলনায় যেন অন্ধকার দিকটাই বেশি। এই ইতিহাস মনে পড়িয়ে দেয় অসংখ্য কিশোরের উপর যৌন নির্যাতনের ছবি। তখনও চাইল্ড অ্যাবিউজ নিয়ে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি পৃথিবীর কোথাও। তাই সেই ছেলেদের কান্নার খবর যে কেউ রাখেনি, সেকথা বলাই বাহুল্য। ঘাঁটু গানের উৎপত্তি সম্পর্কে বিতর্ক আছে। তবে মোটামুটি মনে করা হয় ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে শ্রীহট্টের কাছে আজমিরিগঞ্জ এলাকার এক বৈষ্ণব আচার্য ও তাঁর কম বয়সী শিষ্যদের রাধাভাবকে আশ্রয় করে ঘাঁটু গানের সূত্রপাত। আর তাই শেষ সময় পর্যন্ত ঘাঁটু ছোকরাদের নাচের সঙ্গে যে চটুল গান ব্যবহৃত হত, তার বিষয়বস্তুও হতো রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিশেষ করে রাধাবিরহ।

তবে ক্রমশ এই ধর্মীয়-দার্শনিক সীমারেখা অতিক্রম করে ঘাঁটু গান হয়ে ওঠে এক ধরনের যৌনলিপ্সার প্রতীক। আর সেই লিপ্সার শিকার ঘাঁটু-ছোকরারাই। তাদের লম্বা চুল রাখা এবং মহিলাদের মতো সাজপোশাক করা বাধ্যতামূলক ছিল। এমনকি মহিলাদের মতো চালচলনও অভ্যেস করতে হত তাদের। আর এই নারীবেশী কিশোরদের মাঝখানে রেখে চটুল গানের তালে তালে রীতিমতো বাইজির মতো নাচতে হত। এতেই তৃপ্ত হত মানুষের আকাক্ষা।


একটি ঘাঁটু দলে একজন মূল ঘাঁটু ছোকরা ছাড়াও বেশ কয়েকজন সদস্য থাকত। তারা প্রত্যেকেই ছিল ঘাঁটু, অর্থাৎ তাদেরও মেয়ে সেজে থাকতে হত। আর থাকতেন একজন ‘সরকার’ বা ‘মরাদার’ (মহড়াদার>মরাদার)। এই সরকাররাই ঘাঁটুকে নাচে-গানে এবং তত্ত্বকথায় পারদর্শী করে তুলতেন। এছাড়া আরও যাঁরা থাকতেন তাঁরা হলেন দোহার বা পাইলদার। এঁরা ছিলেন বাদ্যযন্ত্রশিল্পী, সময় সময় গানের দোহার ধরতেন। ঘাঁটুর সঙ্গে সমস্বরে উচ্চগ্রামে সুর তুলে তাঁরা দর্শকের মন মাতিয়ে তুলতেন। তখন ঢোল, খোল, করতাল বাঁশির পাশাপাশি হারমোনিয়াম এবং দোতারাও ব্যবহার করা হত।

একটি দলের একক অনুষ্ঠানের প্রচলন যেমন ছিল, তেমনই ছিল দুটি ঘাঁটু দলের প্রতিযোগিতার প্রচলনও। তখন একটি দল গানের কথায় অপর দলকে একটি প্রশ্ন করত, আর সেই দলকে উত্তর দিতে হত গানের মাধ্যমেই। খানিকটা কবিয়ালের মতো। তবে কবিয়ালের ক্ষেত্রে দার্শনিক উপসঙ্গ প্রধান হয়ে উঠলেও এখানে সেই অবকাশ ছিল না। এখানে চটুলতাই ছিল প্রধান। স্থানে স্থানে বিপক্ষ দলকে পরাজিত করতে অশ্লীল রসিকতার আশ্রয় নিত ঘাঁটুরাও। তবে তার থেকেও অন্ধকার ভবিষ্যত অপেক্ষা করে ছিল এই গানের ধারাটির জন্য। আর সেটা এলো সতেরো-আঠেরো শতক নাগাদ। সতেরো-আঠেরো শতক নাগাদ ঘাঁটু ছোকরাদের কিনে নেওয়ার প্রচলন শুরু হয়। যাঁরা ছেলেদের কিনে নিতেন তাঁদের বলা হতো ‘সৌখিনদার’ বা ‘খলিফা’। এঁরা কিন্তু শিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না। ঘাঁটু ছোকরাদের তাঁরা ব্যবহার করতেন উপপত্নীর মতো।

ক্রমশ বিশ শতকে এসে যখন নাচগানের থেকে এই অশ্লীল যৌনাচারের দিকটাই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন আর এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার কোনো জায়গা ছিল না। ‘ঘাঁটু’ শব্দটি ক্রমশ অপভাষায় পরিণত হয়। আর সেইসঙ্গে ছোটদের নিরাপত্তার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়গুলির রাধাভাবের মধ্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মুক্তির কথা লুকিয়ে ছিল বলে মনে করেন অনেকেই। অথচ সেই একই মূল থেকে জন্ম নিয়েছিল এমন একটি ঘৃণ্য প্রভাব। আমাদের সংস্কৃতিতে যেমন গর্ব করার মতো উপাদানেরও অভাব নেই, তেমনই ‘ঘাঁটু’ গান এক অব্ধকার ইতিহাসের কথাই মনে পড়ায়। যে ইতিহাসকে ফেলে আসতে পারা সত্যিই এক সামাজিক সাফল্য।৷

তথ্যসূত্রঃ
(১) Ghetu Gaan- Wakil Ahmed
(২) ঘেটু গানঃ উইকিপিডিয়া।
(৩) ছবিঃ হুমায়ূন আহমেদের নির্মিত ঘেটুপুত্র কমলার ছবির দৃশ্য।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৫০
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি বদলে যাচ্ছি......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ সকাল ৯:৪৬

আমি বদলে যাচ্ছি.....

আমার বন্ধু দেবনাথ সেদিন ৬৫ বছর বয়সে পা দিল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, 'নিজের মধ্যে- এই বয়েসে পৌঁছে, কিছু পরিবর্তন অনুভব করছ কি?'

বন্ধু উত্তর দিল.....

এতবছর নিজের পিতামাতা, ভাইবোন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মদ, নারী ও লেখক

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ দুপুর ১:২৫



একজন লেখক বললেন, আমি কেন মদ খাই, তা আমি জানি। তুমি খেতে চাও না, খেয়ো না।
প্রতিভাবান পুরুষরা যদি ঠিক আশ মিটিয়ে মদ আর নারী সঙ্গ না ভোগ করে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিস্ময়বোধক চিহ্নের অসুস্থ সমাচার!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ বিকাল ৩:১২



গত সপ্তাহ সোমবার সকাল সাড়ে আটটার সময় ক্রিসের একটা ফোন পেলাম। ক্রিস চি চি করে মোটামুটি করুণ সুরে বললো,
মফিজ, আমি আজকে অফিসে যাইতে পারবো না। তুমি দয়া কইরা বসরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=কার্তিকের জলে পা ডুবিয়ে বসতে চাই=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ বিকাল ৪:০৮



©কাজী ফাতেমা ছবি

হিম জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকতে চাই নিরিবিলি,
জলের সাথে কিছু গোপন গল্প হবে আমার,
আর সময়কে দেখাবো বুড়ো আঙ্গুল,
সময় ভেবেছে সে আমার উচ্ছলতাগুলো কেড়ে নিয়ে
ঠেলে দিয়েছে বিষাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। কবির আর্তনাদ

লিখেছেন শাহ আজিজ, ০৫ ই ডিসেম্বর, ২০২২ বিকাল ৫:০৫



তিনটি ঘটনা আমাকে চিরস্থায়ীভাবে সংসারবিমুখ করেছিল |
৭২ বছরের জীবন পেলাম। সময়টা নেহাত কম নয়। দীর্ঘই বলা যায়। এই দীর্ঘ জীবনের পেছনে ফিরে তাকালে তিনটি ঘটনার কথা মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×