খালেক ডাক্তার বসে বসে গনগনে আগুনে ইনজেকশনের সূই গরম করছেন। খেলার মাঠের পশ্চিম প্রান্তে পাকুড় গাছের নিচে বসেছেন তিনি। তার মুখের প্রতিটি পেশী শক্ত হয়ে আছে। তাকে দেখেই আমাদের রাত্মারাম খাঁচাছাড়া। স্কুলের চারদিকে থৈথৈ পানি। রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। পালানোর মতো কোন স্থলভাগ নেই। বাঁচার একমাত্র রাস্তাটা আগলে বসে আছেন খালেক ডাক্তার নিজে। উপায়ান্তর না দেখে স্কুল ঘরের উত্তরের বেড়ার ভাঙ্গা ফাঁক গলে পানির মধ্যে দিলাম ঝাঁপ । লক্ষ্য একদেড়শ গজ দূরে একটি কাঁটাবেতের ঝোপ। অনেক চেনা এই ঝোপে একবার পৌছতে পারলে আর কে পায়। কিন্তু পানি ভেঙ্গে যতই ঝোপের দিকে এগুচ্ছি ততই ডুবে যাচ্ছি।
এদিকে পালানোর খবর পেয়ে প্রধান শিক্ষক সিরাজ স্যার আমাকে ধরে আনার জন্য দুই ক্লাস সিনিয়র সফু ও হায়দার ভাইকে পাঠিয়েছেন । তারা হা-রে-রে করতে করতে তেড়ে আসছেন আমার দিকে। আর আমি যত এগুচ্ছি ততই ডুবে যাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত তাদের হাতে ধরা পড়ে গেলাম। তারা চ্যাংদোলা করে আমাকে ডাক্তারের সামনে নিয়ে এলেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনকে টিকা দেয়া হয়েছে। স্কুলের নানা প্রান্ত থেকে তাদের গোঙানির আওয়াজ আসছে। আমি ততক্ষণে আধমরা।
আমি ডাক্তারের মুখের দিকে তাকালাম। তার চোখ দুটি জ্বলজ্বল করছে। সারামুখে পোলাপানগুলোরে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচানোর কৃতিত্বের আভা। সেখানে খেলা করছে গৌরব। সেই গৌরবের কাছে আমি আত্মসমর্পন করলাম। ডাক্তার তপ্ত সূই দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে টিকা দেবার কাজ শেষ করলেন। এরপর টানা তিনদিন জ্বর। টিকার স্থানটি ফুলে ডোল। অতঃপর ঘা। খালেক ডাক্তার মারা গেছেন সেই কবে। আমার ডানহাতে এখনো রয়ে গেছে টিকার দাগ এবং ভয়ংকর স্মৃতি। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যারা এ পদ্ধতিতে পোলিও, যক্ষ্মাসহ মারাত্মক বেশ কয়েকটি রোগের টিকা নিয়েছেন তাদের হাতে এক বা একাধিক দাগ আছে। বিশ্বাস না হলে একবার পরখ করে দেখুন সত্যি কি-না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


