ইংরেজিতে বলে ‘বায়ার্স রিমোর্স’। আপনি দোকান থেকে মাল কিনে ঘরে ফিরে দেখেন তাতে এখানে ফুটো, ওখানে কালো দাগ, ওজনে কম বা ভেজালে ঠাসা। তখন ইচ্ছা হয় গলা ছেড়ে কাঁদি। একেই বলে বায়ার্স রিমোর্স। বাংলাদেশের মানুষ মনে হয় এখন সে রকম বায়ার্স রিমোর্সে ভুগছে। সাড়ে চার বছর আগে আওয়ামী লীগকে বিপুল সংখ্যাধিক্যে তারা ক্ষমতায় বসিয়েছিল। সিটি করপোরেশনগুলোর সাম্প্রতিক নির্বাচনের ফল দেখে মনে এখন তারা অনুশোচনায় ভুগছে। প্রতিকার হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয়তাবাদী দলকে ভোট দিক আর না দিক, আওয়ামী লীগকে আর ভোট দেবে না, তা তারা ঠিক করে ফেলেছে।
বস্তুত ২০-২২ বছর ধরে একই কাণ্ড ঘটে চলেছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে বাংলাদেশের মানুষ দেশের দুই দলের একটিকে ক্ষমতায় বসায়। পাঁচ বছর যেতে না যেতেই সে দলের শাসনে তাদের নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় হয়। তখন তারা ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে দলকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর জন্য। কে জিতল সে কথা মুখ্য নয়। যারা ক্ষমতায় ছিল, তাদের নামানো গেল, এই ভেবেই আমরা খুশি। ফলে একবার নৌকা তো অন্যবার ধানের শীষ। এভাবে এক বিষচক্রে আমরা হাবুডুবু খাচ্ছি দুই দশকের বেশি সময় ধরে। বিকল্প আর কেউ নেই যে এই দুই দলের বাইরে কাউকে নির্বাচিত করব। ফলে, এক দল হারে, অন্য দল চেয়ার খালি দেখে তাতে বসে পড়ে। এটা ঠিক জেতা নয়, এ হলো ‘ভিক্টরি বাই ডিফলট’।
এ বছরের শেষ নাগাদ, অথবা আগামী বছরের গোড়ার দিকে বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়ার কথা। তাতেও সম্ভবত ভিন্ন কোনো ফল হবে না। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনের ফল দেখে মনে হয় চারদিকে ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে একটা ঢেউ এসেছে, সম্ভবত সে ঢেউয়ের প্রভাবেই যেখানে তাদের হারার কথা নয়, সেখানেও ক্ষমতাসীন দল গো-হারা হারছে। বিরোধী নেত্রীর কথা শুনে এমন বোধ হয়েছে, তিনি ধরেই নিয়েছেন সাধারণ নির্বাচন যদি হয় আর তাতে তিনি অংশগ্রহণ করেন, জিত তার হবেই। আরও বেশি গোলে জেতার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ব্যাপারটা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও নজর এড়ায়নি। পরাজয়ের আশঙ্কা মাথায় রেখে তিনি নির্বাচকদের সাবধান করে দিয়েছেন, বিরোধী দলকে ক্ষমতায় বসালে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ যে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তা বিপন্ন হবে।
খুব বেশি লোক তাঁর সে কথায় নড়েচড়ে বসেছে বলে মনে হয় না।
বস্তুত, গত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, অতি শত্রুও সে কথা মানবে। দেশের প্রবৃদ্ধি ঈর্ষাজনক, মোট জাতীয় উৎপাদন আগের সব সীমা অতিক্রম করে গেছে, বৈদেশিক বাণিজ্য খাতে ঘাটতি কাটিয়ে এখন আমরা বাণিজ্যিক উদ্বৃত্তের পথে। মোট বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয়ের পরিমাণও আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দেশের মানুষ ভোট দিতে যাওয়ার সময় এসব অর্জনের কথা মনে রাখবে, এমন আশা করা অন্যায় নয়। কিন্তু কই, ভোটের ফল দেখে তো মনে হয় না অধিকাংশ মানুষ সে কথা মনে রেখেছে।
কেউ কেউ যুক্তি দেখানো শুরু করেছেন, আওয়ামী সরকারকে ভিন্ন সম্ভবত উচ্চতর একটি মানদণ্ডে দেশের মানুষ বিচার করে। কিন্তু সে কেবল কথার কথা, তা প্রমাণের কোনো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি আমাদের জানা নেই। অবশ্য এই কথায় কোনো ভুল নেই, আওয়ামী সরকারের কাছ থেকে আমরা অনেক কিছুই আশা করি, যা আগের বিএনপি সরকারের কাছ থেকে আমরা কখনো আশা করিনি। যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংরক্ষণ ও একাত্তরের ঘাতক-দালালদের বিচার। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে, এ অভিযোগ যেমন করা যায়, তেমনি এ কথাও বলা যায়, ঘাতক-দালালদের বিচারের ব্যাপারে এই সরকারের মতো সংকল্প আগে অন্য কোনো সরকার দেখায়নি। অনুমান করি, দেশের এক উল্লেখযোগ্য অংশের মানুষের কাছে ঘাতক-দালালদের বিচারের ব্যাপারটি গুরুত্বপূর্ণ। চলতি সরকারের স্থানে প্রধান বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে সে বিচার থমকে পড়বে, অথবা ইতিমধ্যে ঘোষিত রায় কার্যকর স্থগিত হবে, এমন আশঙ্কা অমূলক নয়। কারণ, সে বিরোধী জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী, যার প্রথম সারির অধিকাংশ নেতা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ও কেউ কেউ দোষী হিসেবে প্রমাণিত। প্রমাণিত অভিযোগ সত্ত্বেও তারা যে নিজের বিরুদ্ধে নিজেরাই ব্যবস্থা নেবে, তেমন দিবাস্বপ্ন না দেখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
বর্তমান আওয়ামী সরকারের সঙ্গে বিগত সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফারাক রয়েছে। পাঁচ-সাত বছর আগে বাংলাদেশকে ‘আরেক আফগানিস্তান’ ভাবা হচ্ছিল। বিগত সরকারের সমর্থনে সন্ত্রাসবাদ বাংলাদেশে আসন গেড়ে বসেছে, সে অভিযোগ আন্তর্জাতিক তথ্যমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়েছিল। গত সাড়ে চার বছরে সে অভিযোগ অপসৃত হয়েছে, বিশ্বের কোথাও কেউ আর এখন বাংলাদেশকে ‘কুকুন অব টেররিজম’ বলে তকমা আঁটে না। এর কৃতিত্ব বর্তমান সরকারের, সে কথা না মেনে উপায় নেই। কই, ভোটের সময় সে কথাও তো কেউ মনে রাখছে বলে মনে হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের যে লম্বা লাইন দেখেছি, তাতে মেয়েদের সংখ্যাই বেশি নজরে এসেছে। চলতি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারী অধিকারের ক্ষেত্রে বিশেষ অগ্রগতি হয়েছে। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের বাস্তবায়নেও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য এসেছে। দারিদ্র্য কমার সঙ্গে সঙ্গে শিশুমৃত্যু কমেছে, প্রসূতিমৃত্যু কমেছে, নারীশিক্ষা বেড়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো। নীতি-নির্ধারকদের আসনে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে মেয়েদের সংখ্যা বেশি। আগামী নির্বাচনে যদি বিরোধী জোট ক্ষমতায় আসীন হয়, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন খাতে বইতে পারে। এই জোটের অলিখিত অন্যতম শরিক হেফাজতে ইসলামের নেতারা নারী অধিকারের বিরুদ্ধে রীতিমতো প্রকাশ্যে যুদ্ধে নেমেছেন। তাঁদের খুশি করতে জোট সরকার কর্মক্ষেত্রে নারীর অবস্থান সংকুচিত করতে পারে, নারীর শিক্ষা অধিকার ব্যাহত করতে পারে, নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে যে আইনি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে, তার রদ করতে পারে।
কই, দল বেঁধে যেসব মেয়ে ভোট দিতে লাইন দিচ্ছেন, তাঁরা কি এসব কথা বিবেচনায় এনেছেন? আমার তো মনে হয় না।
আগামী নির্বাচনে বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে আরও একটি বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। তারেক রহমান দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন, এমন আশাবাদ এ জোটের কেউ কেউ করছেন। এ কথা শুনে কেউ হয়তো আহ্লাদে আটখানা হবেন, কিন্তু অনুমান করি দেশের অধিকাংশ মানুষ আকাশে মেঘের আশঙ্কা দেখবে। সে সম্ভাবনা অথবা আশঙ্কা মাথায় রেখে ভোটের সিদ্ধান্ত নিলে আমরা পস্তাব কম।
যাঁরা আগামীবার নতুন সরকার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন, তাঁদের আগেভাগে এই বিষয়গুলো বিবেচনা করার অনুরোধ করি। নির্বাচন দিল্লি কা লাড্ডু নয়, যাকেই ভোট দিই না কেন, তাতেই আমাদের পস্তাতে হবে, এ কোনো পূর্বনির্ধারিত নিয়তি নয়। পরপর চারটি নির্বাচন করে আমরা দেখিয়েছি, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ভোট-ব্যবস্থা মোটের ওপর আমরা নির্মাণ করতে পেরেছি। তৃতীয় বিশ্বে খুব কম দেশই আছে, যেখানে একটানা দুই দশক শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। এটি আমাদের বিশাল অর্জন। কিন্তু শুধু নির্বাচনই তো গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্রের আসল লক্ষ্য সুশাসন। যে দল বা জোটকেই আমরা ভোট দিই না কেন, তাদের কাছ থেকে সুশাসনের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দাবির অধিকার আমাদের আছে।
ঘাতক-দালালের বিচার, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান ও নারীর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও তাদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আমাদের চাওয়া উচিত।
বাংলাদেশের নির্বাচকদের ‘এক দিনের বাদশা’ বলা হয়েছে। আসল বাদশা-শাহজাদাদের ক্ষমতায় বসানো বা ক্ষমতা থেকে কান ধরে নামানোর যোগ্যতা তাদের আছে, সে কথার প্রমাণ তারা রেখেছে। কিন্তু এ কেমন বাদশাহি যে ভোট ফুরাতে না-ফুরাতেই কৃতকর্মের জন্য পস্তাতে হয়?
অতএব, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।
নিউইয়র্ক
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


