*** জিঞ্জাসাবাদ ***
তাড়াতাড়ি করে এম.ডি. স্যারকে জানালাম। অন্য দুজন লোক তখনও আমার রুমেই। এম.ডি. স্যার দোতলা থেকে নেমে এলেন তাদের সাথে কথা বলার জন্য। অন্য সহকমর্ীরাও এলেন। জানাগেল এই দুজনের একজন একটি কোম্পানী এম.ডি. ও অন্যজন এসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। সেই লোকটি (যাকে এখন মোবাইল চোর বলা উচিৎ) আগেরদিন অনেকটা আমারসাথে করা কথপোকথনের অনুরুপেই তাদের সাথে মিটিং এর সময় ঠিক করে। পার্থক্য হলো এই দুজনকে জানানো হয় আমাদের কোম্পানীর এম.ডি. হচ্ছে তার বাপি এবং তার বাপি খুব দ্রুত একটা এগ্রিমেন্ট করতে চায়। এই কথার প্রেেিত সেই লোকদুটো প্রেজেনটেশন করার জন্য সাথে ল্যাপটপ ও প্রোজেকটরও নিয়ে আসে। লোকদুটোর সাথে থাকা দুটো বড় ব্যাগের ব্যাপারটা তখন আমি বুঝতে পারলাম। যাই হোক, লোক দুটো তাদের ভিজিটিং কার্ড দিয়ে চলে গেল।
আমরা অনুধাবন করার চেষ্টা করলাম নিশ্চই সেই চোরের অন্য পরিকল্পনা ছিল। হয়তো সেই সুযোগটা করে উঠতে পারছিলনা তাই যা পায় তাই লাভ সেই মনবৃত্তি থেকেই আমার মোবাইলটা খুব সুন্দরভাবে চুরি করে নিল।
*** থানা-পুলিশ ***
জীবনে কখনো থানায় পা দেইনি। আমার এক সহকমর্ী পুরো ঘটনাটা সংেেপ বর্ণনা করে সাধারন ডায়েরীর আবেদনপত্র লিখে দিলেন। উনাকে সাথে নিয়েই গেলাম গুলশান থানায়। জানলাম এই েেত্র সাধারন ডায়েরী প্রযোজ্য নয়, মামলা করতে হবে। আমরা সাধারন ডায়েরী করার অনুরোধ জানালে দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসার আবারো একটি আবেদনপত্র লিখতে বলেন। কি কারণে জানিনা উনি সেই দুজন লোককে পাশ কাটিয়ে আবেদনপত্রটি লেখার বর্ননা করে যাচ্ছিলেন। আমি বারবার উল্লেখ করাতে আবেদনপত্রে শেষের দিকে তাদের উপস্থিতির একটু বর্ণনা দেয়া হলো।
আবেদনপত্রের এক কপি আমার কাছে আছে। একবার ভেবেছি র্যাব -এর কাছে সেই কপি জমা দেব। পরোকখনে মনে হলো, রাঘব-বোয়াল ধরার ব্যসততায় এই চুনোপুটি মোবাইল চোর ধরার অভিযোগ হয়তো চাপাই পড়ে থাকবে!
*** নতুন মোবাইল ***
থানায় যাবার আগে গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারে গেলাম । একশত টাকা দিয়ে আগের নাম্বারের নতুন সিম কার্ড তুললাম।
বাসায় ঘটনাটা জানলে আব্বা-আম্মা আমার নিরাপত্তা নিয়েই চিনতিত হয়ে পড়বে। শুধু তাই না আমার অসচেতনতার জন্য এমনভাবে আমাকে দোষারোপ করবে যেন পৃথিবীতে বিশেষতঃ বাংলাদেশে এই প্রথম আমার মোবাইলটিই চুরি হলো। ঠিক করলাম, আমি সেই একই মডেল আবার কিনব। আমার খুব দামী মোবাইল সেট কেনার প্রতি কখনই তেমন আগ্রহ ছিল না। তাছাড়া এই সেটের সাথে আমার সখ্যতার কথাও ভুলিনি।
ক্রেডিট কার্ড ইসু্য হয়েই ছিল কিন্তু গড়িমসি করে তোলা হয়নি। মাসের শেষের দিক তাই অনেকটা হতদরিদ্র অবস্থা। ক্রেডিট কার্ডই এবার ভরসা। গ্রামীণফোন থেকে SCB গেলাম কিনতু বেলা তিনটার পর ব্যাংক বন্ধ। আর কোন উপায় নেই তাই 27শে মার্চ সকাল সকাল পৌছে গেলাম SCB । প্রায় মিনেট বিশেক দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে কার্ড হাতে পেলাম। যেহেতু প্রয়োজনটা একটু জরুরী তাই সাথে সাথে ব্যাংক থেকেই ফোন করে কার্ডটা আগে activate করলাম।
আমার সহকমর্ী বলেছিল বনানীতে মোটোরোলা সেলস্ এন্ড সার্ভিস সেন্টারে যেতে এবং গেলামও সেখানে। ওরা বলল সেলস্ আগামী মাস থেকে শুরু হবে হয়ত। কাছাকাছি আর কোথায় এই সেট পাওয়া যেতে পারে জিঞ্জেস করতেই জানলাম সেই গুলশান গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারের কথা । মনে পড়ল পত্রিকাতেও বিঞ্জাপন দেখেছিলাম। চলে গেলাম গুলশান গ্রামীণফোন সার্ভিস সেন্টারে। দামী-কম দামী অনেক সেট ছিল কিনতু যেটা খুঁজছি সেটা পাওয়া গেলনা। ভাবলাম কাছাকাছি শপার্স ওয়ার্ল্ড -এ যাই। কিনতু ওখানে শুধু নোকিয়ার একটা দোকান ছিল। এবার মনে হলো, সামনেই নাভনা টাওয়ারে একটু খুঁজে আসি; কিনতু পেলাম না । রোদে-গরমে বিরক্ত হয়ে, মুখ শুকনা করে অফিসে ফিরে আসলাম।
সহকমর্ীর হঠাৎ মনে পড়ে গেল আমার প্রিয় ল্যাভেন্ডার সুপার স্টোর এর পাশেই মোটোরোলার আরেকটা সেলস সেন্টার আছে। শুধু তাই না, মোবাইল জোন নামে আরেকটা সেন্টারের কথাও জানলাম। আমি মোবাইল জোন সেন্টারটা চিনিনা বলে সহকমর্ীকে নিয়ে বের হলাম; দেখা গেল ওটা এখনও চালু হয়নি। একসাথে দুজনই বাইরে থাকলে কাজের তি তাই সহকমর্ী চলে গেল। আমি চললাম মোটোরোলা সেলস সেন্টারের দিকে। নাহ্, অন্যান্য মডেল থাকলেও আমার কাংখিত মডেলটি নেই। অনেকটা হতাশ আমাকে বলা হলো সামনের ল্যান্ড ভিউ শপিং সেন্টারে খুঁজে দেখার জন্য; আমি কথামত গেলামও। দোতালায় একটেল অফিসের সামনেই দুটো দোকান দেখলাম। একটির কাছে গিয়ে ডিসপ্লেতে আমার কাংখিত সেটটি না দেখে ভেতরে গিয়ে জানতে চাইলাম আর কোন মডেল আছে কিনা। মডেল নাম্বার বলতেই দোকানী সম্মতি জানালো। আমার চোখ তখন চকচক করছে। জিঞ্জেস করলাম ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা যাবে কিনা; জানলাম তাও যাবে। ক'মাসেই এই মডেলটির দাম খানিকটা কমে এসেছে। দরদাম করলে আরেকটু কমানো যেতো কিনতু ইচ্ছে করলনা। সেটটা চালু করে, সিম কার্ড ভরে আনন্দিত আমি দোকান থেকে বের হয়ে আসার সময় খেয়াল করলাম ঠিক সামনের দোকানে ডিসপ্লে তে একই মডেল রাখা। আমি এবার মনে মনে একটু হেসে অফিসের দিকে পা বাড়ালাম।
*** মনের যত কথা ***
পঁচিশ তারিখে বাংলাদেশ-বারমুডার খেলা আর পরেরদিন স্বাধীনতা দিবস ; ইচ্ছে ছিল সবাইকে SMS করব শুভেচ্ছা জানিয়ে; সেটা আর হলোনা। স্বাধীনতা দিবসের ছুটির দিনে একটু ভয়েই ছিলাম তবে মাঝে মাঝে ফোন বন্ধ রাখার অভ্যাসের কারণে আব্বা-আম্মার প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়নি।
পরের দিন রোদে-গরমে ঘোরাঘুরির সময় মনে হচ্ছিল সেই চোর ব্যাটাকে পেলে প্রখর রোদের মাঝে ওকে বসিয়ে চারপাশে দামী-দামী সব মোবাইল সেট সাজিয়ে পাহারায় থাকতাম যেন শেষ পর্যনত্দ ওর মোাবাইল ফোবিয়া হয়!
নতুন সেট কিনে এখন আমি শানত্দ। সহকমর্ীদের সাথে আমিও পুরো ঘটনাটার নানা দিক নিয়ে মজা করি। আমরা ঠিক করেছি সেই চোর ব্যাটাকে খুঁজে বের করে বলব, "ভাই, আপনিতো মোবাইল চার্জার আর রেডিও শোনার Ear Piece ফেলে এসেছিলেন, ওটা দিতেই আপনাকে খুঁজছি..."
আরেকটা কথা না বললেই নয়। আগের সেটটির ডিসপ্লেতে যে ওয়ালপেপারটি সেট করেছিলাম, তার গ্রাফিঙ্ -এ একটু হাইটেক ভাব ছিল। একটা অস্পস্ট অবয়ব ছিল যাকে আমি অদৃশ্য মানব মানে আমার কল্পনায় কাংখিত মানব নাম দিয়ে দিয়েছিলাম। নতুন সেটটিতে সেই ওয়ালপেপারটি নেই। আমি খুব মিস্ করছি সেই অদৃশ্য মানব কে...!
তবে যাই হোক আমি আবারো আমার যাত্রাপথে আগের মত রেডিও টিউনিং করি আর মগ্ন থাকি সামিনা-কুমার বিশ্বজিতের গানে, "...তুমি আমার নতুন সর্বনাশ, তবু কল্পনাতে তোমার সাথে আমার বসবাস..." ।
*** উপসংহারে উপদেশ ***
শুরুতে ভাবিনি একটা মোবাইল চুরির ঘটনার কথা লিখতে গিয়ে এত গল্পের অবতারণা করব। আগে জানতাম আমি বেশী কথা বলি, এখন দেখছি বেশী লিখিও! এই দীর্ঘ সাহিত্য রচনার পেছনে আমার লেখকসত্তাকে পরখ করে দেখার অপরিকল্পিত প্রয়াস থাকলেও মূল উদ্দেশ্য ছিল সবাই যাতে আরো একধাপ সকর্ত হয়ে ওঠে এইসব অনভিপ্রেত প্রতারণা থেকে।
আমি দৃষ্টিভঙ্গিকে আরো একটু গভীর করতে চাই। যে লোকটি চুরি করলো সে একজন তরতাজা যুবক ছিল। কি করতে পারে সে ওই মোবাইলটি দিয়ে ? ওটা বিক্রি করলে এখন আর খুব বেশী টাকা পাবেনা। আমি খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিচ্ছি যে কয় টাকাই সে পাক না কেন পুরোটাই ব্যয় হবে নেশা জাতীয় দ্রব্য- হেরোইন কিনবা গাঁজা - কেনায়।
আজকের তরুন-তরুণী ও যুবক-যুবতীদের উপদেশ দিতে চাইনা তবে একটু ভাবতে অনুরোধ করছি। যে যেই অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যেই থাকিনা কেন নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা বোধ তৈরী করতে হবে। এই প্রজন্ম একটু আড্ডাবাজ হতে পারে, একটু-আধটু বাবা-মার কথার অবাধ্যও হতে পারে ; সময়ের স্রোতে এই ছোট-খাট দস্যিপনাগুলো একসময় মিষ্টি-মধুর স্মৃতিই তৈরী করে । সব প্রজন্মেই এমন হয়েছে। সব পরিক্খায় প্রথম হতেই হবে এমন কথা নেই। জীবনের রুঢ় বাসত্দবতায় কখনো কখনো নিজের কোমল স্বপ্নগুলো হোঁচট খেতেই পারে। যদি মনে হয় সব কিছু শেষ, তাতেও অবাক হবনা। শুধু একটাই কাম্য, নিজেকে যাতে নিজের কাছে ছোট হতে না দেই, মানবীয় সত্তার অবলুপ্তি না হয় যেন। নিভৃত কোণে হলেও এই বিশ্বাস থাকতে হবে, আমিই পারব।
একদিনে আদর্শ মানব হওয়া যায়না। কিনতু ছোট-খাট মূল্যবোধের অবয় খুব দ্রুতই নিজেকে নিঃশেষ করতে পারে। আমাদের এই প্রজন্ম কি এতটাই হতাশ যে নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতে হবে! আমরা কি এতটাই সামর্থ্যহীন যে চুরি-ছিনতাই করতে হবে ! আমরা কি এতটাই বিবেক বিবর্জিত যে সামান্য কারণে রক্তপাতেও দ্বিধা করিনা ! এতটাই কাপুরুষ কি যে তরুণী, যুবতী কিনবা নিশ্পাপ শিশুর উপর পাশবিক নিযর্াতনেও পিছপা হইনা !
অর ঞ্জানের শিাই প্রথম ও শেষ নয়। নিজের বুদ্ধি-বৃত্তিকে সুস্থ স্রোতে ধাবিত করতে হবে। বন্ধু হতে জানতে হবে। জীবনে একজন বন্ধু খুব বেশীই প্রয়োজন। আমরা যদি সবাই বন্ধু হয়ে পাশে এসে বিশ্বাস ও ভালবাসায় একজন আরেকজন এর হাতটা ধরি তাহলেই তো একসময় আমরা একত্রিত ও সুসংগঠিত জাতি হয়ে উঠব। আমার বিশ্বাস এই প্রজন্ম তা পারবে ... ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



