"আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, দেশে ফিরে যাব। আর বেশিদিন এইদেশে থাকলে দোযখে যেতে হবে। 'দুনিয়া দুনিয়া' অনেক হয়েছে, এখন আখিরাত নিয়েও কিছু ভাবতে হবে।"
"কেন? আবার কী হলো?"
"আজকে কত তারিখ বল দেখি?"
"ছয়ই জানুয়ারী!"
"এইটাই প্রবলেম। এইকারণেই দেশে ফিরে যেতে চাইছি। এইদেশে থাকলে কেউ তারিখ জিজ্ঞেস করলে ‘ছয়ই জানুয়ারী’ জবাব দিতে হয়।"
আমি অবাক হয়ে গেলাম। ছয়ই জানুয়ারীর সাথে ইসলামের শত্রুতার কোন সূত্র খুঁজে পেলাম না।
"আরে ব্যাটা, হিজরী তারিখ কত সেটা জানিস?"
"নাহ। আরবি ক্যালেন্ডার শুধু রমযান মাস ছাড়া ফলো করা হয়না।"
অকপটে সত্য স্বীকার করে নিলাম।
"পনেরই রবিউল আউয়াল।"
"ও আচ্ছা।"
"ও আচ্ছা মানে? এখনও বুঝতে পারছিস না?"
"না।"
"বারই রবিউল আউয়াল যে ঈদে মিলাদুন্নবী গেল, সেটাও যদি তোকে ধরিয়ে দিতে হয়, তাহলে এইসব সত্যান্বেষী-ফত্যান্বেশীতে লিখালিখি বন্ধ করে দে, বুঝলি?"
কথাটিতে বিরাট একটা খোঁচা বিদ্যমান, বুকে এসে বিঁধে।
নড়েচড়ে বললাম, "বারই রবিউল আউয়াল গেছেতো এত উতলা হচ্ছিস কেন?"
বন্ধু তাজ্জব হয়ে চোয়াল ঝুলিয়ে বলল, "এত বরকতময় একটা দিন চলে গেল, কোন ইবাদত বন্দেগী করতে পারলাম না, আর তোর মনে কোন আফসোস হচ্ছে না?"
হেসে বললাম, "তুই যদি বুঝতে পারতি ঐ দিনে 'ইবাদত' না করায় তুই যে পরিমাণ সোয়াব কামিয়েছিস, তাহলে তুই আফসোস করতি কেন আরও আগে অ্যামেরিকায় এলি না!"
বন্ধু জানে ফালতু কথা বলার অভ্যাস আমার নেই। সে ভুরু কুঁচকে বলল, "মানে?"
হেসে বললাম, "আমাকে আগে তুই বল, বারই রবিউল আউয়াল তোরা কী সেলিব্রেট করিস?"
"নবীজির(সঃ) জন্মদিন অফকোর্স!"
"নবীজির (সঃ) জন্মদিন যে বারই রবিউল আউয়াল, এই কথা তোকে কে বলেছে?"
"পুরা দুনিয়া জানে। তারা সবাই কী ভুল?"
"আমাদের দেশে ক্ষমতায় যখন যে আসে, তার দলের স্বার্থের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচিত হয়, দেশের কোটি কোটি অন্ধ সমর্থক চুপচাপ তা মেনে নেয়, তার মানে কী সেসব এডিটেড ইতিহাস ১০০% সঠিক? নবীজির(সঃ) জন্মদিন নিয়ে যত ইসলামিক এবং হিস্টোরিকাল রেফারেন্স আছে, সবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দূর্বলতম রেফারেন্স হচ্ছে এই 'বারই রবিউল আউয়াল' তারিখ, এইটা জানিস?"
"পন্ডিতি ফলাতে আসিস না।"
যদিও বন্ধুর গলায় একদমই জোর নেই। ও জানে আমার কাছে তথ্য আছে, প্রমাণও আছে।
গলা পরিষ্কার করে বলতে শুরু করলাম, "ইসলামে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় দুইটি রেফারেন্সকে, এক আল্লাহর বাণী কুরআন। আল্লাহ যা বলেন তাই মেনে নিতে হবে। এবং দুই, নবীজির(সঃ) মুখের বাণী বা সহীহ হাদিস। কথা হচ্ছে, আল্লাহ বা নবীজি(সঃ) কখনও কোথাও কী বলেছেন যে তাঁর জন্মদিন বারই রবিউল আউয়াল?"
"লক্ষ লক্ষ হাদিস আছে, আমার কী সব জানা আছে নাকি? নিশ্চই কোথাও বলেছেন, নাহলে এত এত স্কলাররা এই তারিখকে কেন ফলো করবে?"
"না, তিনি এমন কোথাও বলেননি যে তাঁর জন্ম বারই রবিউল আউয়াল তারিখে হয়েছে। তবে তিনি এইটা স্পষ্ট বলেছেন যে তাঁর জন্ম সোমবারে হয়েছে। কারণ সোমবারে তাঁর জন্মদিন বলেই তিনি প্রতি সপ্তাহে এই দিনে রোযা রাখতেন।"
"আর বলতে চাইছিস ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দের সালটাও ভুল?"
"হিজরী ক্যালেন্ডারের আগে আরবে কোন ক্যালেন্ডার চালু ছিল না। তাঁরা মহা গুরুত্বপূর্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তারিখ নির্ধারণ করতো। যেমন ধর, তিন বছর আগে ক্ষরা হয়েছিল, তাহলে আজকের দিন রেফার করতে গেলে তারা বলতো 'ক্ষরার তিনবছর পরের পনেরই রবিউল আউয়াল।' এর দুই তিন বছর পর আরেকটা কোন বড় ঘটনা ঘটলে সেটাকে ঘিরে আবার নতুন ক্যালেন্ডার চালু হতো। সেই হিসেবে নবীজির (সঃ) জন্ম year of the elephant এ, মানে যে বছর আবরাহা হাতি নিয়ে কাবা ঘর আক্রমণ করেছিল, তাঁর জন্ম সেই একই বছর। তাঁর সমসাময়িক লোকজনের দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করেই এই জন্মসনটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। হিস্টোরিক্যালি যা ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। তবে এই সনটাও একদম ১০০% নিশ্চিত না। আল্লাহ ভাল জানেন।"
"তাহলে বারই রবিউল আউয়ালটা এলো কী করে?"
"ইবন ইসহাকের নাম শুনেছিস? তিনিই প্রথম নবীজির(সঃ) জীবনী সবচেয়ে সাকসেসফুলি রচনা করেন। তাও নবীজির(সঃ) জন্মের প্রায় দুইশো বছর পরে লেখা। তিনিই প্রথম লিখেছিলেন, নবীজির (সঃ) জন্ম বারই রবিউল আউয়াল, সোমবার। মজার কথা হচ্ছে, তিনি কোথাও উল্লেখ করেননি এই তথ্য তিনি কোথায় পেলেন। এখন যদি সমসাময়িক কালে রচিত আরেকটি জীবনী গ্রন্থ আমরা ঘাটাঘাটি করি, যা লিখেছিলেন তাবাকাত ইবন সা'আদ, তিনি বলেছেন, 'নবীজির(সঃ) জন্ম সোমবারে হয়েছে, কেউ বলেন তারিখটি ছিল ১০ম রবিউল আউয়াল, আবার কেউ বলেন ২রা রবিউল আউয়াল।' ১০ম রবিউল আউয়ালের পক্ষে ইবনে আব্বাসও সাক্ষ্য দেন। কেউ সাক্ষী দেন ৮ম রবিউল আউয়ালে জন্মেছেন। কেউ ২০শে রবিউল আউয়ালেরও কথা বলেছেন। কিন্তু এতো সূত্রের একটাও কিন্তু ১২ই রবিউল আউয়ালের কথা বলেনা। ১২ই রবিউল আউয়াল জনপ্রিয় হয়েছে মিডিয়েভাল পিরিয়ডে এবং এর কারণ একমাত্র ইবন ইসহাক। নব্বই ভাগেরও বেশি সিরাত (নবীজির(সঃ) জীবনী) লেখক ইবন ইসহাকের লেখাকেই কপি পেস্ট করে থাকেন। তিনি যা বলেছেন, তাই সবাই চোখ বন্ধ করে মেনে নেন। কোন খোঁজ নেয়ারও প্রয়োজন মনে করেননা। সেখান থেকেই আমরা এখন এই দিনটা পালন করি। হয়তোবা তারিখটা সঠিক, হয়তোবা ভুল, আল্লাহ ভাল জানেন। তবে এই দিনটির আলাদা কোনই গুরুত্ব নেই, এইটা নিশ্চিত। কারণ গুরুত্ব থাকলে নবীজি (সঃ) নিজেই নিশ্চিত করতেন আমরা যেন তা পালন করি। যেমনটা তিনি দুই ঈদের তারিখ নিশ্চিত করে গেছেন।"
দীর্ঘ বক্তৃতা অত্যন্ত ধৈর্য্যের সাথে শোনার পর বন্ধু বলল, "আচ্ছা, নাহয় মেনে নিলাম তারিখটা সঠিক না, কিন্তু এই দিনটিতে নবীজিকে (সঃ) স্মরণ করে দোয়া দুরুদ পড়লে অথবা এক্সট্রা নফল ইবাদত করলেতো দোষের কিছু নেই।"
"ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাবার অভ্যাসটা মানুষের কখনই গেল না। ভাইরে, তুই কী নবীজির(সঃ) থেকে, খলিফাদের চেয়ে, তাঁর সাহাবীদের চেয়ে বেশি ধর্ম বুঝিস? যদি তাঁরা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন না করে থাকেন, তবে তোর এত কিসের ঠ্যাকা পড়েছে আগ বাড়িয়ে মাতবরি দেখাবার?"
"অসুবিধার কী আছে?"
"অবশ্যই অসুবিধার আছে। নবীজিকে(সঃ) পৃথিবীতে পাঠানোই হয়েছিল যাতে তিনি যেন ইবাদতের সব মাধ্যম এবং তরিকা সম্পর্কে আমাদের সবাইকে অবহিত করেন। তিনি সেটা করেওছেন। তিনি জীবিত থাকাবস্থাতেই আল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন ইসলাম ধর্মকে পূর্ণতা দেয়া হয়ে গেছে, এরমধ্যে নতুন কিছু সংযোজন অথবা বিয়োজন করা যাবেনা। করলে আল্লাহকে অপমান করা হবে, তাঁর নবীকে(সঃ) অপমান করা হবে। এই অপরাধের শাস্তি জাহান্নাম!"
"বলিস কী! সারা বিশ্বে যেভাবে বিপুল সমারোহে কোটি কোটি মানুষ ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন, সবাই তাহলে জাহান্নামে যাবে?"
"সবাই জানেনা বলেই করে। সবাইকে জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব। কিন্তু কেউ যদি জানার পরেও ফাজলামি করে, তবে সেটার জন্য সে নিজে আল্লাহর কাছে দায়ী থাকবে। নবীজির (সঃ) জন্মদিন পালন করা ইসলামে ফরয না, তবে কেউ যদি তাঁর জন্মদিন 'উদযাপন' করতেই চায়, তবে তাঁকে নবীজির (সঃ) দেখানো রাস্তাতেই পালন করা উচিৎ - প্রতি সোমবার রোযা রাখা। আর তারচেয়েও বড় কথা হচ্ছে, নবীজিকে (সঃ) সম্মান দেয়ার বেস্ট উপায় হচ্ছে, তাঁর শেখানো আদর্শ মেনে চলা। বছরের একটা দিন আমরা তাঁর কথা স্মরণ করে নামাজ পড়ে কান্নাকাটি করে গোস্ত পরোটা খাবো, আর বছরের বাকি তিনশো চৌষট্টিদিন ত্যাদড়ামি করে বেড়াবো, এইটাতো কোন কাজের কথা না। তাই না?"
বন্ধু চুপচাপ হয়ে আছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, "কী হলো? বুঝতে পারিস নাই, নাকি আরও বুঝাতে হবে?"
সে বিরবির করে বলল, "তাহলে আমার বাপদাদারা এতদিন যা পালন করে এসেছে, সব ভুল ছিল?"
গলার স্বর শান্ত করে বললাম, "তাঁরা মানুষ, ভুল করার জন্যই তাঁদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহও সেটা জানেন। তিনি পরম করুণাময়। আমাদের এখন এইটা make sure করতে হবে যাতে আমাদের পরবর্তী জেনারেশন কখনও আমাদের ভুল নিয়ে চিন্তায় না পড়ে। বাকি আল্লাহ ভরসা।"
বন্ধু স্মিত হাসি হাসলো।
তাঁর মন হালকা করতেই বললাম, "এখনও কী ইচ্ছা করছে নাকি কাফের নাসারার দেশ ছেড়ে স্বদেশ পাড়ি দেবার?"
রসিকতায় সে হেসে দিল।
তার কাঁধে হাত রেখে বললাম, "একদিন দেশে ফেরার ইচ্ছাতো আমাদের সবারই আছে। বিদেশে থেকে দেশে চলমান অসঙ্গতিগুলো আইডেন্টিফাই করে নেই, সেসব সমাধানের পথ শিখে ফেলি - তারপর আর তোকে বলতে হবেনা, আমিই তোকে এসে বলবো, 'অনেক হলো বন্ধু, এবার বাড়ি চলো!' আমরা না ফিরলে দেশকে বদলাবেটা কে?"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


