দেশজুড়ে কোকাকোলার বিরুদ্ধে বয়কটিং চলছে। কোকাকোলার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ওরা ইজরায়েলকে ফিলিস্তিনি মারতে টাকা দেয়। অথবা, ওদের মালিক ইহুদি।
বিশ্বজুড়েই এই বয়কট চলছে। কোকাকোলা, পেপসি, স্টারবাক্স, নেসলে ইত্যাদি সব কোম্পানির বিরুদ্ধেই একই অভিযোগ চলছে। বিজ্ঞাপন তৈরী হচ্ছে, আপনি এক কাপ কফি কিনছেন, আপনার টাকা বুলেট হয়ে আমাদের ভাইবোনদের হত্যা করছে। কারন সব কোম্পানিতে ইহুদি শেয়ার আছে।
এখানে ইহুদি মানেই কি সে "জায়নবাদী" (ইজরায়েল সমর্থক) - সেটা একটা প্রশ্ন উঠতে পারে। যেমন গোটা আমেরিকাতে এমনকি ইজরায়েলেও এমন বহু অর্থোডক্স ইহুদি পাওয়া যাবে যাদের ধর্মীয় আদর্শের সাথে ইজরায়েলের অস্তিত্ব সাংঘর্ষিক। আপনারা ফেসবুকের পন্ডিতরা অনেক শিক্ষিত, আপনাদের জ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করবো না - শুধু বলে দেই, এইটা ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট যে ইজরায়েল প্রতিষ্ঠার ধারণা সেকুলার ইহুদিদের মাথা থেকে বেরিয়েছিল। অর্থোডক্স, ধর্মপ্রাণ ইহুদিরা একে বোগাস, বাকওয়াস ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। ওদের ধর্মীয় বিশ্বাসে, মাসিয়াহ না আসা পর্যন্ত ওদের স্বাধীন নিজস্ব ভূমি থাকার অনুমতি নেই।
কালকে যদি কোন জঙ্গি দাবি করে বসে সেই ইমাম মাহ্দী, ওর উপর ঈমান আনতে হবে, নাহলে আপনি জাহান্নামী - কয়জন সাধারণ মুসলিম ওর উপর ঈমান আনবে?
ইজরায়েলের বা জায়নিস্টদের বিষয়টাও এমনই। অর্থোডক্স ইহুদিদের কাছে ওরা সন্ত্রাসী, কাফির। ওদেরই অনেক বড় বড় আলেম সহজ যুক্তি দেন, ইহুদি ধর্মীয় ভিত্তি যে দশটি কমান্ডমেন্টসের উপর প্রতিষ্ঠিত, জায়নিস্টরা একদম প্রকাশ্যে এর ৫টাই ভঙ্গ করে। ওরা খুন করে, ওরা জেনাহ করে, ওরা অন্যের সম্পদ চুরি করে (ভূমি দখল), ওরা প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করেনা, এবং ওরা লোভী। তাহলে ওরা ইহুদি হলো কিভাবে?
কঠিন যুক্তি! আসলেইতো, যে ঘুষ খায়, খুন ও জেনাহ করে, অন্যের সম্পদ লুট করে - সে কি নিজেকে সাচ্চা মুসলমান দাবি করতে পারে?
আরেকটা বিষয়ও আছে। যেমন মার্ক জাকারবার্গের মতন ইহুদি পরিবারে জন্মেও নাস্তিক ইহুদিও আছে প্রচুর। তাই "ফেসবুকও ইহুদি প্রতিষ্ঠান" তেমন একটা যৌক্তিক শোনায় না।
আর ডিটেইলে না যাই। শুধু এইটা বলি, ইজরায়েলের কারনে সমস্ত ইহুদি গোষ্ঠীকে জাত তুলে গালি দেয়া অনৈসলামিক। গালি দিতে হলে দিতে হবে "জায়নবাদী-ইহুদিদের।" যারা আসলেই নিরীহ মানুষ খুনের নেশায় মত্ত।
এখন শুধু কোকাকোলা না, দুনিয়ার বহু কোম্পানিই ইহুদিদের দ্বারা পরিচালিত হয়। তর্ক এড়াতে ধরে নিচ্ছি সবাই জায়নবাদী ইহুদি। কোক, পেপসি, গুগল, ফেসবুক, এমাজন, আমেরিকা, সৌদি সবাই ইহুদিদের অধীনে চলে। এদিকে ইহুদিরাই নির্বিচারে আমাদের ভাইবোনদের মারছে। অতি নৃশংসতার সাথে। আমরা কিছুই করতে পারছি না। আমাদের হাত বাঁধা।
এখন সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের করণীয় কি?
লোকে "বয়কট ইজরায়েল", "বয়কট ইজরায়েলি পণ্য", "বয়কট ইজরায়েলি সাপোর্টার" পথ বেছে নিয়েছে।
এতে দোষের কিছু নেই। উল্টো বলা চলে, এটি একটি মাধ্যম যা আসলেই কাজ করে। কোকাকোলার ডেসপারেট এডভার্টাইজিং সেটারই প্রমান।
যুক্তি পরিষ্কার, আমার বাবাকে যে হত্যা করেছে, আমি ওর দোকানে গিয়ে শপিং করছি, বিষয়টা আমার বিবেকের সাথে যায় না। আমি অন্য কারোর দোকানে যাব। আরও সহজ উদাহরণ দেই, আমরা অনেকেই পাকিস্তানী পণ্য এড়িয়ে চলি। ৭১ এ আমরা আমাদের অনেক স্বজনকে হারিয়েছি, এজন্য সরাসরি পাকিস্তানী সরকার ও সেনাবাহিনী দায়ী ছিল। পাকিস্তান আজও ক্ষমা চায়নি। এখন স্বাভাবিকভাবেই ওদের পণ্য কিনতে অনেকেরই বিবেকে বাঁধে।
একই যুক্তিতে মুসলিমরা এসব পণ্য বয়কট করছে।
সবচেয়ে অবাক হচ্ছি যারা পাকিস্তানী পণ্য বয়কটকে স্বাগত জানায়, ওরাই আবার ইজরায়েলি পণ্য বয়কট নিয়ে মানুষকে হাসি তামাশা করছে। এ কেমন হিপোক্রেসি?
এখন আসি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। ইসলামিক আকিদার সাথে এটি কতটা জড়িত? এটি কি হালাল নাকি হারাম? বয়কট না করলে কি ঈমান চলে যাবে?
ফেসবুকে দেখছি এক হুজুর দোকানে দোকানে গিয়ে কোক পেপসি যারা বিক্রি করছেন উনাদের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। উনার দাবি "মোজো" বিক্রি করতে হবে। মোজো বা আফগানী পণ্য বিক্রি করলে তবেই ঈমান ফেরত আসবে। ন্যূনতম, কোক পেপসি বয়কট করতে হবে।
প্রশ্নটা এখানেই, আসলেই কি কোক খেলে বা বিক্রি করলে ঈমান চলে যাবে? কোকাকোলা বা কাফের নাসারার কোন প্রতিষ্ঠানে (ফেসবুক, গুগল, এমাজনসহ দুনিয়ার বড় বড় প্রতিষ্ঠান) চাকরি করলেও ঈমানহারা হবো?
ইসলামের নিয়মানুযায়ী, আপনি যদি কোন কিছুকে "হারাম" ঘোষণা করতে চান, তাহলে অবশ্যই "আপনাকে" প্রমান দিতে হবে কেন সেটি হালাল নয়। নাহলে, বাই ডিফল্ট সবই হালাল।
কোক-পেপসি পান করলে ঈমান কেন যাবে? এগুলি যদি এলকোহলিক বেভারেজ হতো, তাহলে অবশ্যই হারাম হতো। ইজরায়েলের সাথে সম্পৃক্ততা থাকুক বা না থাকুক। সৌদি আরবও যদি এমন কোন পণ্য বানায় (যেমন মদ/মাদক, সৌদি শূকর ইত্যাদি), যা ইসলামিক মতে হারাম, তাহলে সেটা হারাম হবে, আর ইজরায়েল যদি এমন কোন পণ্য বানায়, যা ইসলামিক মতে হালাল (যেমন কোশার প্রাণীর মাংস থেকে শুরু করে যেকোন হালাল পণ্য), তাহলেও সেটি হালাল। আপনার মন সায় দিক অথবা না দিক, এইটা নিয়ম।
তাহলে হালাল হারাম নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠবে না আশা করি।
এখন আসি ঈমানের বিষয়ে।
শুধু কোক-পেপসি না, যেকোন ইজরায়েলি পণ্য ব্যবহার করলেই কি ঈমান চলে যাবে? যেহেতু ওরা মুসলিমদের মারছে?
তো এখানেই নবীজির (সঃ) জীবনী থেকে উদাহরণ দেই। বাকিটা নিজেদের বুদ্ধি খাটিয়ে বের করুন।
নবীজির (সঃ) জীবন কেটেছে মক্কায়। ৪০ বছর বয়সে ওহী নাজেল হয়, এবং যেদিন প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার শুরু করেন, সেদিন থেকেই উনার আপন আত্মীয়রাই প্রাণের শত্রু হয়ে যায়। দীর্ঘ ১৩ বছর অকল্পনীয় অত্যাচার সহ্য করার পর তিনি মদিনায় হিজরতে বাধ্য হন। এই দীর্ঘ ১৩ বছরের অত্যাচারের একটি phase ছিল তিন বছরের সামাজিক বয়কট। কুরাইশরা সব মুসলিম এবং বনু হাশেমী গোত্রকে ৩ বছরের জন্য সব ধরনের সামাজিকতা, অর্থনৈতিক লেনদেন ইত্যাদি থেকে বয়কট করেছিল। সমাজচ্যূতি যাকে বলে। মরুভূমির পরিত্যক্ত উপত্যকায় মুসলিমরা তখন বিনা খাবার ও পানি নিয়ে আশ্রয় নেন। বাজার থেকে খাবার কিনতে পারতেন না, সঙ্গে আনা পশুর মাংসতো বটেই, সাথে চামড়া সিদ্ধ করে খেয়ে, মরুভূমির আগাছা পাতা চিবিয়ে কোনরকমে বেঁচে ছিলেন। শিশুরা মায়ের দুধ না পেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রনায় চিৎকার করে কাঁদতো। মা দুধ দিবেন কিভাবে? নিজেইতো অভুক্ত। ক্ষুধার যন্ত্রনায় কতজন যে ঐ ৩ বছরে মারা গেছেন তার কোনই হিসাব নেই।
মুসলিমরা সেই বয়কট করেনি। কুরাইশরা করেছিল।
তবে মুসলিমরা যখন ক্ষমতা পায়, তখন কুরাইশ ক্যারাভানে হামলা চালিয়ে ওদেরকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করে দিত। এটাকেও "বয়কটের" সাথে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে মিলাতে পারেন। কারন যারা ইজরায়েলি/ওদের বন্ধুদের পণ্য বর্জন করছেন, ওদেরও লক্ষ্য ইজরায়েলকে অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল করা।
মদিনায় হিজরতের পরে ইহুদিদের সাথে মুসলিমদের শীতল যুদ্ধ শুরু হয়। এদিকে মদিনার বাজার পুরোটাই ছিল ইহুদিদের দখলে। মুসলিমরা নিজেরাই একটি বাজার তৈরী করে (সুদমুক্ত হওয়ার জন্য, এবং পণ্যের গুনগত মান, মাপ ইত্যাদিতে সততা নিশ্চয়তার জন্য) - কিন্তু মুসলিমদের জন্য ইহুদি বাজারে কেনা বেচা হারাম করা হয়নি। আমরা সবাই জানি যে বনু কাইনুকার বাজারে এক মুসলিম নারী পণ্য কিনতে গেলে তাঁর শ্লীলতাহানি ঘটে, এবং এর ফলেই ওদের গোত্রকে বহিষ্কার করা হয়। যদি "বয়কট" থাকতো, তাহলে সেই সাহাবী ঐ মার্কেটে যেতেন না।
নবীজি (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদেরও ইহুদিদের সাথে, বাইজেন্টাইনদের (সিরিয়া, দামেস্ক, শাম অঞ্চলে), বা মুশরিকদের সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন চলমান ছিল। সুমামা ইব্ন উসাল (রাঃ) নামের বনু হানিফার এক নেতা মুসলিম হওয়ার পরে কুরাইশদের বয়কট করেন, এতটাই এর প্রভাব ছিল যে আবু সুফিয়ান পারলে নবীজির (সঃ) পায়ে ধরে মাফ চান, এবং নবীজি (সঃ) সুমামাকে নির্দেশ দেন বয়কট তুলে নিতে। কুরাইশরা তখনও মুসলিমদের প্রাণের শত্রু, সুযোগ পেলেই সমানে মুসলিম মারতো।
তাহলে বুঝা যাচ্ছে নবীজির (সঃ) জীবনীতে "বয়কট" ছিল একটি কৌশল, যা শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে ঠিকই - কিন্তু মুসলিমদের উপর "ফরজ" করা হয়নি। যাদের ইচ্ছা হয়েছে তাঁরা সেই কৌশল অবলম্বন করেছেন, অনেকেই করেননি।
আজকের যুগেই আমরা দেখতে পারি চাইনিজরা উইঘুর মুসলিমদের মেরে সাফ করে দিচ্ছে, বার্মিজরা রোহিঙ্গাদের - কিন্তু আমাদের বাড়ির কোন পণ্যটা মেড ইন চায়না না? বার্মিজ আচার/লুঙ্গিতো গোটা দেশেই জনপ্রিয়। এই যে কথাগুলি বলছি, ফেসবুকে, সেটাও আমেরিকান কোম্পানি, যে আমেরিকা ইজরায়েলের নির্লজ্জ সমর্থক, এবং আমাদেরই ট্যাক্সের টাকায় সেই ইজরায়েলকে সাহায্য করে আমাদেরই নীতিনির্ধারকরা। আমরা কি আমেরিকায় বাস করা বন্ধ করে দিব? নাকি আমরা আন্দোলন করবো যে আমাদের ট্যাক্সের টাকায় নিরীহ শিশু হত্যা চলবে না? আইভীলীগ কলেজগুলোতে সেটাই হয়েছে, যে দাবানল গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। নেতৃত্ব দিয়েছে এদেশেরই তরুণ ছাত্র সমাজ যারা বেশিরভাগই খ্রিষ্টান ও ইহুদি। কিভাবে ওরা জানলো? আমাদের সাথে মিশেইতো? এদেশে যদি আমরা না থাকতাম, আফগানিস্তানের কোন পাহাড়ের চিপায় আন্দোলন করতাম, তাহলে এই ছাত্ররা কি আমাদের খোঁজ নিত? না।
বটম লাইন হচ্ছে, যারা বয়কট করছেন, ভ্যারি গুড। হাত পা গুটিয়ে নির্বিকার থাকার বদলে কিছু একটাতো করছেন।
যারা এই বয়কটের সুযোগে মোজো বা পামির কোলার ব্যবসা করে টাকা কামাচ্ছেন, ভ্যারি ব্যাড। আপনারা মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির নাজায়েজ ফায়দা তুলে ধান্দাবাজি করছেন।
বয়কট যারা করছে না, করতে পারছে না - ওদেরকে ঈমানহারা/কাফের/মুরতাদ ইত্যাদি ট্যাগ দিচ্ছেন, এখনই তওবা করে নিজেদের শুধরান।
যারা বয়কটকারীদের নিয়ে হাসিতামাশা করছেন, একটুতো লজ্জা পান। ওরা কিছু একটাতো করছে। নিরীহ অসহায় মানুষের উপর জুলুমের প্রতিবাদে যেখানে খোদ আমেরিকাতেই হাজার হাজার অমুসলিম ছাত্র নিজেদের ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারকে বাজি ধরে প্রতিবাদ করছে সেখানে আপনি হাসিতামাশা করা ছাড়া আর কি করছেন? কিছুটা মনুষত্ববোধতো জাগানরে ভাই!
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জুলাই, ২০২৪ রাত ১২:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




