somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোটগল্প "ওপারে আমার ঘর"

২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওপারে আমার ঘর
মঞ্জুর চৌধুরী
আমেরিকা থেকে কেউ দেশে যেতে চাইলে সেই খবর প্রকাশ করতে খানিকটা দ্বিধা বোধ করে। রাজ্যের আত্মীয় আর পরিচিতেরা নিজেদের আত্মীয় পরিজনদের জন্য উপহার সামগ্রী নিয়ে হাজির হন। সবই জরুরি। ওষুধের বোতল, বাচ্চাদের জামা, ডায়াবেটিস বা ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র, চকলেট, নতুন পুরোনো আইফোন, আর এমন কিছু রহস্যময় প্যাকেট যা হাতে দেওয়ার সময় সবাই নিচু গলায় ষড়যন্ত্র করছে, এমন স্বরে বলে "তেমন কিছু না। খুবই হালকা।"
এই "খুবই হালকা" জিনিসগুলোর ওজন সাধারণত সাত থেকে দশ পাউন্ড হয়ে থাকে।
প্লেন একেকজন সাধারণ যাত্রীকে পঞ্চাশ পঞ্চাশ মোট একশো পাউন্ড ওজনের মালামাল চেক ইন করার সুযোগ দেয়। যে দেশে যাচ্ছে সে নিজের জামা কাপড় ও আত্মীয়দের জন্য উপহার নিতে গিয়ে ওজন মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। এর উপর বাড়তি মাল ধরিয়ে দিলে যে ওকে এয়ারপোর্টে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, সেটা ইচ্ছা করেই কেউ বুঝতে চান না।
এদিকে আমাদের বাংলাদেশিদের স্বভাব হচ্ছে আমরা মুখের উপর না বলতে পারিনা। কাজেই, এই অহেতুক বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই দেশে যাওয়ার খবর একদম শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানাতে চান না।
সেবার স্বপরিবারে দেশে যাচ্ছিল নাবিলা। স্বামী স্ত্রী ও তিন সন্তানের জন্য মোট দশটা লাগেজ! পাঁচশো পাউন্ড ওজনের মাল নিতে পারবে। ডালাসের বাঙালি কমিউনিটিতে খবর ছড়িয়ে পড়তেই তার বাড়ি ছোটখাটো কুরিয়ার অফিস হয়ে গেল। সন্ধ্যায় ওর সাথে রাইসা দেখা করতে গেল। হাতে কিছু ছিল না। সে প্রায় আধঘণ্টা বসে রইল।
নাবিলা হাসতে হাসতে বলল, "তুমি কিছু পাঠাবে না?"
"না।"
"সত্যি? তোমার মা-বাবার জন্য কিছুই না?"
রাইসা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, "পাঠানোর জিনিস বাসায় অনেক আছে। আমি যখন যাব তখন নিয়ে যাব।"
তারপরে একটু থেমে হেসে বলেছিল, "তাছাড়া যদি তোমার স্যুটকেসে জায়গা না থাকে? দেখা যাবে তোমাকে লাগেজের ওজন কমাতে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে প্যান্ট টি শার্টের উপর শাড়ি পরে নিতে হবে।"
সবাই হেসে উঠল। এই অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। এয়ারপোর্টে গিয়ে দেখে লাগেজের ওজন বেশি। বাড়তি ওজনের জন্য একশো ডলার দিতে হবে। সামান্য কয়েক কেজির জন্য এত টাকা কে দেয়? হয় টাকা দিতে হবে, নাহলে জিনিস ফেলে দিতে হবে। যাত্রীরা তখন বুদ্ধি করে ব্যাগ থেকে সোয়েটার/জ্যাকেট জাতীয় ভারী পোশাক বের করে গায়ে চাপিয়ে প্লেনের দিকে হাঁটা দেয়।
নাবিলা বললো, "অসুবিধা নাই। জায়গা প্রচুর আছে। তুমি কিছু পাঠাতে চাইলে নিয়ে এসো।"
বাসায় ফিরে সে আলমারির ওপরের তাক থেকে একটি ব্যাগ নামাল। ব্যাগের মধ্যে বাবার জন্য কেনা ধূসর রঙের সোয়েটার। গত বছরের থ্যাংকসগিভিং ডিলে কিনেছিল। বাবা কোনো দিন আমেরিকায় আসেননি। বাংলাদেশের শীতেও এমন মোটা সোয়েটারের প্রয়োজন হবে না। তবু দোকানে এক বয়স্ক আমেরিকানকে সোয়েটারটি কিনতে দেখে তার বাবার কথা মনে হয়েছিল।
পাশে মায়ের জন্য একটি ছোট পারফিউম। মা মুখে না বললেও রাইসা জানে যে তিনি পারফিউম খুবই পছন্দ করেন। কেউ পারফিউম উপহার দিলে তিনি অতি যত্নে আলমারিতে তুলে রাখেন, ঈদে বা বিশেষ অনুষ্ঠানে একটু একটু করে শরীরে ছিটিয়ে দেন।
মায়ের জন্য এই পারফিউম কেনার মূল কারন ছিল পারফিউমের গায়ে লেখা "Homme" শব্দটি। শব্দটি পড়ে Home এর কথা মনে পড়ে। বাড়ি মানেইতো মা, মায়ের কোল, মায়ের হাতের স্পর্শ!
যদিও homme শব্দের মানে যে men, এটি পুরুষদের জন্য পারফিউম, রাইসা তখনও সেটি জানতো না। মাও জানেন না। তাঁর কাছে সুগন্ধি হচ্ছে সুগন্ধি, সেটার আবার নারী পুরুষ কি?
ভাই রায়হানের জন্য একটি ঘড়িও ছিল। দুবছর আগে কেনা। ভাইটার একটা ভাল ঘড়ির খুব শখ।
জিনিসগুলো রাইসা কাউকে দেয়নি। তার মনে হতো, নিজে সঙ্গে করে নিয়ে গেলে উপহারগুলোর মর্যাদা থাকবে। উপহার পাওয়ার সময়ে বাবা মা ভাইয়ের চোখ মুখের অভিব্যক্তি সে দেখতে চায়। অন্যের স্যুটকেসে গেলে সেগুলো কেবল মালপত্র হয়ে যাবে।
সে ব্যাগটি আবার তুলে রাখল।
তারপর রান্নাঘরের সিঙ্কে পড়ে থাকা প্লেট ধুতে গেল।
আমেরিকায় মন খারাপ করার অবসর নেই। থালা বাসন থেকে শুরু করে টয়লেট সিট পর্যন্ত সবকিছুই নিজেকে ধুতে হয়।
রাইসার দিন শুরু হতো ভোর ছয়টায়।
প্রথম অ্যালার্মে সে উঠত না। দ্বিতীয় অ্যালার্মে চোখ খুলে ফোনের দিকে তাকাত। তৃতীয় অ্যালার্মে তার স্বামী আদনান বিরক্ত হয়ে বলত,
"ঐ যদি আধঘন্টা পরেই উঠো, তাহলে আধ ঘন্টা পরে অ্যালার্ম দিলে সমস্যা কোথায়?"
রাইসা চোখ বন্ধ রেখেই বলত, "অ্যালার্মটা আমার মায়ের মতো। তিনবার না ডাকলে কাজ হয় না।"
তারপর শুরু হতো ছোটাছুটি। ছেলে আরিশের নাশতা, মেয়ের চুল বাঁধা, স্কুলের পানির বোতল, নিজের ল্যাপটপ, অফিসের মিটিং, ট্রাফিক, ইমেইল, গ্রোসারি, রান্না।
দেশে থাকতে মা সকালবেলা তার পেছনে পেছনে ঘুরতেন।
"রাইসা, ডিমটা খেয়ে যা।"
"চুলটা আঁচড়ে যা।"
"ওড়নাটা ঠিক করে পর।"
"বিকেলের আগে বাড়ি ফিরবি।"
সেই শাসনগুলো তখন তার কাছে লোহার শিকলের মতো লাগত। একদিন রেগে গিয়ে বলেছিল,
"মা, তুমি কি আমাকে কোনো দিন বড় হতে দিবে না?"
মা জবাব দিয়েছিলেন, "মায়ের কাছে বাচ্চারা কখনই বড় হয় না। ওদের শুধু বয়স বাড়ে।"
আমেরিকায় এসে রাইসা বড় হয়েছিল। এতটাই বড় যে অসুস্থ হলেও কাউকে বলতে পারত না। জ্বর নিয়ে রান্না করত, কোমরব্যথা নিয়ে বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিত। দেশের কথা মনে পড়লে যখন চোখ লাল হয়ে যেত, অফিস সহকর্মীদের বলত, "অ্যালার্জি।"
কিন্তু মাঝেমধ্যে খুব ইচ্ছা করত, কেউ কপালে হাত দিয়ে বলুক "তোর শরীর গরম কেন?"
মানুষের শরীরের বয়স বাড়ে। কিন্তু মন সবসময়েই শিশুর মত মায়ের কোলে ছুটে যেতে চায়।
প্রতি শনিবার সকালে মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হতো।
মা ফোনটি এমনভাবে ধরতেন যে স্ক্রিনে কেবল তাঁর কপাল দেখা যেত।
রাইসা বলত, "মা, ফোনটা নিচে নামাও।"
মা ফোন নিচে নামিয়ে থুতনি দেখাতেন।
"আরেকটু ওপরে।"
এবার সিলিং ফ্যান দেখা যেত।
পাশ থেকে বাবা বিরক্ত হয়ে বলতেন, "তুমি আমাকে দাও। সামান্য একটা ফোন চালানো এখনও শিখতে পারলে না!"
ফোন হাতে নিয়ে বাবা প্রথমে ক্যামেরা বন্ধ করে দিতেন। তারপর নিজের নাকের বিশাল একটি ছবি দেখিয়ে বলতেন, "এবার দেখা যাচ্ছে?"
রাইসার এতই হাসি পেত যে কথাই বলতে পারতো না।
মেয়ের হাসি দেখে বাবাও হেসে উঠতেন। মা রাগের ভান করতেন।
কল শেষ হলে রাইসার ঘরটা হঠাৎ খুব চুপ হয়ে যেত।
ফোনের পর্দায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে তার মনে হতো, মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সে কয়েক মিনিটের জন্য আগের রাইসা হয়ে যায়। যে মেয়ে দুপুরে ঘুমিয়ে উঠলে টেবিলে ভাত ঢাকা পেত, বাড়িতে ফিরতে দেরি করলে বাবা গলির মুখে দাঁড়িয়ে থাকতেন।
কল কেটে গেলে সে আবার দুই সন্তানের মা, একজন স্ত্রী, একটি কোম্পানির দায়িত্বশীল এম্প্লয়ী।
পৃথিবীর এপাশে তাকে কেউ আর মেয়ে বলে চিনত না।
বাবা তাকে কোনো দিন "মা" ছাড়া অন্য কিছু বলে ডাকেননি।
রাইসা কলেজে পড়ার সময় একবার রাত করে বাসায় ফিরেছিল। ফোনের চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল। বাবা গলির মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মুখ কঠিন। চোখের নিচে অন্ধকার।
রাইসা ভেবেছিল খুব বকবেন।
কিন্তু তাকে দেখে বাবা শুধু বলেছিলেন, "ক্ষুধা লাগছে, মা? কিছু খেয়েছো?"
সেদিন বাবার সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে রাইসার মনে হয়েছিল, বাবার ভালোবাসা বুঝি সন্তানের উপর রাগ করতেও ভয় পায়, পাছে সন্তানটি আরও দূরে সরে যায়।
আমেরিকায় আসার দিন এয়ারপোর্টে বাবা সেই একই প্রশ্ন করেছিলেন।
"প্লেনে ক্ষুধা লাগবে না তো?"
মা তখন কাঁদতে কাঁদতে বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, "প্লেনে খাবার দেয়। তোমার মেয়ে জঙ্গলে যাচ্ছে না।"
বাবা গোপনে রাইসার হাতে পাঁচশ টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়েছিলেন।
রাইসা হেসে বলেছিল, "এটা দিয়ে আমেরিকায় কী করব?"
বাবা বলেছিলেন, "কিছু করতে হবে না। কাছে রাখিস। দেশের টাকা।"
বাবার স্পর্শ লেগে থাকা নোটটি এখনো তার ওয়ালেটে আছে। ডলার, ক্রেডিট কার্ড আর ড্রাইভিং লাইসেন্সের পেছনে। দেশের স্মৃতি। বাবার স্মৃতি। পৃথিবীর সবচেয়ে দামি নোট।
রাইসা শেষবার দেশে গিয়েছিল চার বছর আগে।
তারপর থেকে ঝামেলা লেগেই থাকে। এক বছর গেল করোনার ভয়। পরের বছর চাকরি বদল। তারপরেরটা আরিশের স্কুল। তার পরের বছর টিকিটের উচ্চমূল্য। প্রতিবছরই কারণগুলো যুক্তিসংগত ছিল। জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগুলো প্রায়ই অসংখ্য যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত জমতে জমতে ঘটে।
মা কখনো সরাসরি বলতেন না, "দেশে আয়।"
বলতেন, "এ বছর আসার কোনো সম্ভাবনা আছে?"
রাইসা ক্যালেন্ডার খুলে বলতো, "বাচ্চাদের সামার ব্রেকে দেখি।"
সামার এলে বলতো, "অফিসে বড় প্রজেক্ট চলছে।"
প্রজেক্ট শেষ হলে বলতো, "ডিসেম্বরে টিকিটের দাম খুব বেশি।"
মা প্রতিবারই বলতেন, "ঠিক আছে। কাজকর্ম নষ্ট করে আসতে হবে না। আমরা তো আছিই।"
"আমরা তো আছিই" এই কথাটার ওপর মানুষ বড় নিশ্চিন্তে ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। কেউ মনে রাখে না, "আছি" একটি অতি সাময়িক ব্যাপার। "নেই" এ পাল্টে যেতে সময় নেয়না।
সময় তার কাজ চালিয়ে যায়।
বাবার হাঁটার গতি কমে গিয়েছিল। ভিডিও কলে সোফা থেকে উঠতে গেলে হাত দিয়ে টেবিলের কোণ ধরতেন। আগে মাথাভর্তি কালো চুল ছিল। এখন চুলের চেয়ে মাথার ত্বক বেশি দেখা যায়।
মায়ের চুল প্রথমে কানের পাশে পেকেছিল। পরে কপালের কাছে। এখন পুরো মাথায় সাদা-কালো এমনভাবে মিশে গেছে, যেন রাত শেষ হওয়ার আগেই ভোর ঢুকে পড়েছে।
একদিন ভিডিও কলে রাইসা বলল, "মা, চুলে রং করো না কেন?"
মা হেসে বললেন, "কার জন্য করব?"
"বাবার জন্য।"
পাশ থেকে বাবা বললেন, "আমার চোখে তো তোমার মা চিরকালই সুন্দর। সুচিত্রা সেন! আমারই আফসোস! আমি কখনও ওর চোখে উত্তম হতে পারলাম না।"
মা ধমক দিলেন, "বুড়ো বয়সে ন্যাকামি করো না।"
বাবা বললেন, "বুড়ো বয়সেই তো ন্যাকামি করা যায়। যৌবনে করলে মানুষ সন্দেহ করে।"
তিনজনই হেসে উঠল।
তারপর বাবা চা খেতে গিয়ে কাশলেন। সামান্য কাশি। কিন্তু রাইসার হাসি থেমে গেল।
দেশ থেকে দূরে থাকা মানুষের কাছে প্রতিটি কাশি সম্ভাব্য বিপর্যয়, প্রতিটি গভীর রাতের ফোন মৃত্যুসংবাদ, প্রতিটি "কিছু হয়নি" কথার ভেতর লুকিয়ে থাকে ভয়ংকর কিছু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা।
রাইসা জিজ্ঞেস করল, "বাবার কাশি কত দিন ধরে?"
মা স্বাভাবিক গলায় বললেন, "দু-এক দিন।"
বাবা বললেন, "তোমার মা বাড়িয়ে বলে। কিছু না।"
পরে রায়হানকে ফোন করলে সে বলল, "আরে না, আপু। শীতের কাশি।"
"ডাক্তার দেখিয়েছিস?"
"দেখাব।"
"কবে?"
"এই সপ্তাহে।"
"কোন দিন?"
রায়হান বিরক্ত হয়ে বলল, "তুমি আমেরিকায় বসে এত টেনশন করো কেন? আমি তো আছি।"
এই "আমি তো আছি" কথাটা শুনলেই রাইসার নিজেকে অপ্রয়োজনীয় মনে হতো। আবার একই সঙ্গে স্বস্তিও হতো।
প্রবাসীরা অনেক সময় দায়িত্ব ও অপরাধবোধের মাঝখানে একটি সুবিধাজনক সেতু বানায়। সেই সেতুর ভিত্তি দেশে তো কেউ একজন আছে।
নাবিলার ফ্লাইটের আগের দিন রাইসা তাকে একটি ছোট প্যাকেট দিয়ে এল।
মায়ের পারফিউমটি।
"এত হালকা?" নাবিলা অবাক হয়ে বলল।
"হ্যাঁ।"
"আর কিছু দিবে? আমার এখনও পাঁচ পাউন্ড ওজন বাকি আছে।"
"না।"
তারপরেও একদম শেষ মুহূর্তে রাইসা ব্যাগ থেকে ধূসর সোয়েটারটিও বের করল।
"এটা বাবার জন্য।"
নাবিলা সোয়েটার হাতে নিয়ে বলল, "এইটা বাংলাদেশের শীতে পরলে আংকেল একদম সিদ্ধ হয়ে যাবেন।"
তারা দুজনেই হাসল।
নাবিলার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গ্রোসারি শপের পার্কিং লটে গাড়ির ভেতর বসে রাইসা কাঁদল। খুব নিঃশব্দে। পাশের গাড়িতে বসা এক বৃদ্ধ আমেরিকান ভদ্রলোক তার দিকে তাকিয়ে ভদ্রতা করে চোখ ফিরিয়ে নিলেন।
রাইসা ভাবল, লোকটি হয়তো মনে করছে তার জীবনে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে। অথচ কিছুই ঘটেনি। মা বেঁচে আছেন। বাবা বেঁচে আছেন। ভাই আছে। পুরোনো বাড়িটাও আছে।
কিছুই হারায়নি। শুধু সে সেখানে নেই। কখনো কখনো অনুপস্থিতিও শোকের মতো ভারী হয়।
তিন দিন পর মা ভিডিও কলে পারফিউমটি দেখালেন।
"নামটা অদ্ভুত। গুয়ের লাইন! "
রাইসা হেসে বলল "ওটা গেরলেইন হবে।"
"এমন কঠিন উচ্চারণ! অনেক দামি নাকি?"
"না, মা।"
"সত্যি বল।"
"তোমাকে দাম বললে তুমি ব্যবহার করবে না।"
"এমনিতেও ব্যবহার করব না। রেখে দেব।"
রাইসা জানত মা এটাই করবেন। খুব দামি জিনিস মা জমিয়ে রাখেন।
বাবা সোয়েটার পরে ক্যামেরার সামনে এলেন। ঢাকার তাপমাত্রা তখন সাতাশ ডিগ্রি। কপালে ঘাম জমেছে।
রাইসা হেসে বলল, "বাবা, খুলে ফেলো!"
বাবা বললেন, "না, খুব আরাম।"
মা পেছন থেকে বললেন, "মিথ্যা কথা! পাঁচ মিনিট ধরে ফ্যানের নিচে দাঁড়িয়ে আছে।"
"তুমি চুপ করো তো।"
"বুড়ো মানুষ গরমে অজ্ঞান হলে তোমার মেয়ে আমেরিকা থেকে পানি ঢালতে আসবে?"
বাবা ক্যামেরার দিকে একটু এগিয়ে এসে বললেন, "কেমন লাগছে, মা?"
রাইসা দেখল, সোয়েটারটি বাবার গায়ে ঢিলেঢালা। বাবা অনেক শুকিয়ে গেছেন। চার বছর আগে যে মাপটি তার মনে ছিল, সেই শরীর এখন আর নেই।
তবু সে বলল, "খুব সুন্দর।"
বাবা শিশুর মতো খুশি হলেন।
রাতে রাইসা ক্যালেন্ডার নিয়ে বসল। পরের বছরের জুন মাসে তিন সপ্তাহ ছুটি নেবে। অফিসে আগেভাগে জানাবে। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ থাকবে। টিকিট এখনই কিনলে কম পড়বে।
সে হিসাব করল, চারটি টিকিট, ঢাকায় খরচ, উপহার, আদনানের ছুটি।
অঙ্কটা বড়।
কিন্তু বাবা-মায়ের বয়সের পাশে কোনো অঙ্ক বসানো যায় না।
সে টিকিটের ওয়েবসাইট খুলল। অনেকগুলো তারিখ দেখে শেষ পর্যন্ত ব্রাউজার বন্ধ করে দিল।
আগামীকাল আদনানের সঙ্গে কথা বলবে।
রাত তিনটা সতেরো মিনিটে ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে রায়হানের নাম।
রাইসার বুকের ভেতর কে যেন একমুঠো বরফ ঢেলে দিল। দেশে তখন দুপুর। তবু অসময়ের ফোন মানেই তার কাছে মৃত্যুসংবাদ।
ফোন ধরেই সে বলল, "কী হয়েছে?"
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড কোনো শব্দ নেই।
"রায়হান, কথা বল!"
"আপু, ভয় পাস না।"
এই বাক্যটি শোনার পর পৃথিবীর কোন মানুষ ভয় না পেয়ে থাকতে পারে?
"বাবা?"
"গতরাতে বাবা বাথরুমে পড়ে গিয়েছিল।"
রাইসার গলা শুকিয়ে গেল।
"এখন কোথায়?"
"হসপিটালে। কথা বলছে। ডাক্তার বলছে মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছে।"
রাইসা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। কোথায় যাবে জানত না। তবু দাঁড়াল। যেন দাঁড়ালে দূরত্ব কিছুটা কমবে।
"আমাকে আগে জানাসনি কেন?"
"তুই চিন্তা করবি।"
একটা কড়া ধমক দিতে গিয়েও সে দিতে পারলো না। নিজেকে সামলালো। ওপাশে রায়হান চুপ।
আদনান উঠে বাতি জ্বালাল। রাইসার মুখ দেখে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। শুধু ল্যাপটপ খুলে ফ্লাইট খুঁজতে শুরু করল।
পরদিন অফিসে ফোন, বাচ্চাদের স্কুল, কাপড়, পাসপোর্ট...সবকিছু এলোমেলো গতিতে ঘটতে লাগল।
যে যাত্রার পরিকল্পনা সে চার বছর ধরে করতে পারেনি, ভয় সেই যাত্রার ব্যবস্থা চার ঘণ্টায় করে দিল।
ঢাকার ফ্লাইটে উঠে রাইসা ঘুমাতে পারল না।
তার মনে হচ্ছিল, যদিও বিমানটি সামনে এগুচ্ছিল, সে যেন সময়ের হাত ধরে কেবল পেছনেই যাচ্ছিল।
সে দেখল ছোটবেলার উঠান। বাবা সাইকেলের পেছনে বসিয়ে তাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন। মা টিফিন বক্সের ঢাকনা বন্ধ করতে করতে বলছেন, "সবটুকু খেয়ে আসবি। খবরদার! খাবার যেন নষ্ট না হয়।"
দেখল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন বাবা রিকশায় চেপে মেয়েকে ক্লাসরুমে নামিয়ে দিতে আসছেন।
দেখল আমেরিকা যাওয়ার রাতে মা তার স্যুটকেসের ফাঁকে মরিচের আচার, গুঁড়া মশলা আর একটি ছোট জায়নামাজ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন।
রাইসা বিরক্ত হয়ে বলেছিল "মা, আমেরিকায় কি মরিচের আচার পাওয়া যায় না?"
মা বলেছিলেন, "পাওয়া যায়। কিন্তু আমার হাতের আচার তুই কোথায় পাবি?"
এত বছর পর প্লেনের অন্ধকারে বসে রাইসা বুঝল, মা আসলে আচার দেননি। তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যে সামান্য উপস্থিতি গুঁজে দিয়েছিলেন।
বিমান চলছিল ঘণ্টায় নয়শ কিলোমিটার বেগে। কিন্তু রাইসার মনে হচ্ছিল যেন খুব ধীরে চলছে। সময়ও কি এমন? চলে গেলে দ্রুত মনে হয়, ফিরে আসতে গেলে অসহ্য ধীর?
ঢাকায় নামার পর আর্দ্র বাতাস তার মুখে এসে লাগল। বহু বছর পর মায়ের স্পর্শের মতো পরিচিত অনুভূতি।
ইমিগ্রেশনের লাইন, লাগেজ, কাস্টমস সবকিছু তার কাছে নিষ্ঠুর বিলম্ব মনে হলো। বাইরে বেরিয়ে সে রায়হানকে দেখল।
চার বছরে ভাইয়ের পেট একটু বেড়েছে, মাথার সামনে চুল কমেছে। তবু হাসিটা আগের মতো।
রাইসা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল।
রায়হান বলল, "আরে আপু, এইভাবে কাঁদছো কেন? মানুষ দেখছে।"
"দেখুক।"
"তুই আমেরিকা থেকে কান্না ইমপোর্ট করে আনছিস নাকি? হাহাহা!"
রাইসা কাঁদতে কাঁদতেই ওর পিঠে ঘুষি দিল।
"বাবা কেমন আছে?"
"আগের চেয়ে ভালো। কথাও বলছে।"
"মা?"
রায়হান জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, "মা হস্পিটালেই আছে।"
"ভিডিও কলে দেখাসনি কেন?"
"তোর ফ্লাইটের সময় তোকে অস্থির করতে চাইনি।"
রাইসার হঠাৎ রাগ হলো।
"তোরা সবসময় আমাকে বাঁচিয়ে রাখিস কেন? কষ্ট থেকে, খবর থেকে, দায়িত্ব থেকে? আমি কি এই পরিবারের কেউ না?"
রায়হান শান্ত গলায় বলল, "তুই দূরে থাকিস বলেই দুশ্চিন্তা বেশি করিস। দড়িকে সাপ ভেবে ভয় পাস!"
ঢাকার রাস্তায় তখন সন্ধ্যা নামছিল। বাসের হর্ন, ধুলো, দোকানের আলো, রাস্তার পাশে চায়ের ধোঁয়া সবই একই রকম আছে, তবু কিছুই যেন আগের মত নেই। হয়তো শহর বদলায়নি। ফিরে আসা মানুষটাই বদলে গেছে।
হসপিটালের করিডরে মাকে প্রথমে চিনতে পারেনি রাইসা।
একটি বেঞ্চে কুঁজো হয়ে বসে ছিলেন। ধূসর চুল খোঁপা থেকে বেরিয়ে এসেছে। হাতে বাবার রিপোর্টের ফাইল। চোখের নিচে ক্লান্তির গভীর ছায়া।
রাইসা সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই মা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন।
তারপর বললেন, "এত রোগা হয়েছিস কেন?"
রাইসা কাঁদতে কাঁদতে মাকে জড়িয়ে ধরল।
"তুমি এখনো এই কথা বলছ?"
মা মেয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। মায়ের শাড়িতে হসপিটালের গন্ধ। ঘাম, ওষুধ আর দুশ্চিন্তার মিশে আছে। তবু সেই বুকের ভেতর মুখ রাখতেই রাইসার মনে হলো, পৃথিবীতে এত বছর তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা ছিল না। আজ সে ঠিকানায় ফিরেছে।
মা তাকে সরিয়ে মুখ দেখলেন।
"এত শুকিয়ে গেছিস কেন? চোখের নিচে কালি পড়েছে।"
"মা!"
"চুলও পাতলা হয়েছে।"
"তুমি আমাকে আদর করবে, নাকি খুঁত ধরে বেড়াবে?"
মা প্রথমবার হাসলেন।
"দুটো আলাদা নাকি?"
হাসির পরপরই মায়ের মুখ কেঁপে উঠল।
"তোর বাবা তোকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে আছে।"
বাবাকে দেখে রাইসার মনে হলো, হাসপাতালের বিছানাটি কোনো জাদুতে তাঁকে ছোট করে দিয়েছে।
বাবার বাঁ হাত নিস্তেজ। মুখের একপাশ সামান্য বেঁকে আছে। কিন্তু রাইসাকে দেখেই চোখ দুটি জ্বলে উঠল।
অস্পষ্ট গলায় বললেন, "মা… এসেছিস?"
রাইসা তাঁর হাত ধরে বসে পড়ল।
কত কথা সে ভেবে রেখেছিল!
"কেন নিজের যত্ন নাওনি?"
"কেন অসুখ লুকিয়েছ?"
"কেন আমাকে আগে জানাওনি?"
কিছুই বলতে পারল না।
বাবা অনেক কষ্টে বললেন, "ক্ষুধা লাগছে? কিছু খেয়েছিস?"
রাইসা মাথা নিচু করল। তার মনে হলো, মানুষ মৃত্যুর দরজার কাছাকাছি পৌঁছেও নিজের স্বভাব বদলায় না। বাবা এখনো নিজের শরীরের আগে মেয়ের ক্ষুধার কথা ভাবছেন।
সে বাবার হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল, "খুব ক্ষুধা লাগছে, বাবা।"
বাবা তৃপ্তির মতো চোখ বন্ধ করলেন।
"তোর মা… ভাত দেবে।"
মা কিছু বললেন না। শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন।
বাবা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন।
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার দিন তিনি হুইলচেয়ারে বসে বাড়িতে ঢুকলেন। রাইসা দেখল, ড্রয়িংরুমের দেয়ালে এখনো তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের ছবি। তার ঘরটাও প্রায় আগের মতো রাখা হয়েছে। আলমারিতে পুরোনো বই, আয়নার কোণে শুকনো হয়ে যাওয়া স্টিকার, টেবিলের ড্রয়ারে ভাঙা কলম।
বিছানার চাদর নতুন।
মা বললেন, "তোর ঘর ঠিক সেভাবেই রাখি যেভাবে তুই রেখে গিয়েছিলি।"
"আমি তো আসি না।"
"ঘর কি জানে তুই আসবি না?"
রাইসা জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল।
দুপুরে মা টেবিলভর্তি খাবার সাজালেন। ইলিশ ভাজা, ডাল, আলুভর্তা, বেগুনভাজি, গরুর মাংস। সবই রাইসার প্রিয় খাবার।
রাইসা বলল, "এত রান্না কেন?"
মা বললেন, "পেট ভরে খা। ওখানে কি দেশি গরুর মাংস, পদ্মার ইলিশ, গাছের বেগুনের ভাজি পাস?"
বাবা পাশে বসে অল্প অল্প খাচ্ছিলেন। রাইসা তাঁর প্লেটে মাছের কাঁটা বেছে দিল।
বাবা বললেন, "ছোটবেলায় আমি তোর কাঁটা বেছে দিতাম।"
"এখন আমি দেব।"
"সবকিছুর পালা আসে, তাই না?"
তিন সপ্তাহ দ্রুত চলে গেল।
বাবা ওয়াকার নিয়ে হাঁটতে শিখলেন। মা প্রতিদিন তাঁর ওষুধ গুনে রাখতেন। রাইসা বাজার করত, রান্নাঘরে মায়ের পাশে দাঁড়াত, বিকেলে ছাদে যেত।
একদিন মা কাপড় মেলতে মেলতে বললেন, "তুই চলে গেলে বাড়িটা আবার খালি হয়ে যাবে।"
রাইসা বলল, "রায়হান তো আছে।"
"এক সন্তানের জায়গা আরেকজন পূরণ করতে পারে না।"
বলতে বলতে মায়ের গলা ধরে এলো। সাথে সাথে তিনি অন্যদিকে ফিরে তাকালেন। নিজের চোখের পানি তিনি সন্তানদের দেখাতে রাজি নন। রাইসা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। এত দিন তার ধারণা ছিল তার মা বেশ শক্ত মনের মানুষ। আজ বুঝল, পৃথিবীর কোন মা শক্ত মানুষ হতে পারেন না। তাঁরা কেবল নিজের ভাঙার শব্দ বুকের ভিতর চেপে রাখেন।
সে বলল, "আমার ভয় হয়, মা।"
"কীসের ভয়?"
"পরেরবার এসে যদি তোমাদের দুজনকে একসঙ্গে না পাই?"
মায়ের হাত থেমে গেল। ছাদের ওপর বিকেলের রোদ। পাড়ার মসজিদে আজান শুরু হয়েছে। বাতাসে ভেজা কাপড় দুলছে।
মা ধীরে ধীরে বললেন, "একসঙ্গে না পেলেও এক জায়গায় ঠিকই পাবি।"
"কোথায়?"
মা রাইসার বুকের ওপর আঙুল রাখলেন। "এখানে। বাবা থাকবে তোর আদরে। আমি থাকব তোর শাসনে। দেখিস, তুই যখন তোর মেয়েকে বকবি, আমার গলা শুনতে পাবি।"
রাইসা হাসার চেষ্টা করল।
"তোমার মতো এত বকতে পারব না।"
মা বললেন, "তুই আমার চেয়েও বেশি বকিস। ভিডিও কলে তোকে দেখেছি।"
মা-মেয়ে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই রাইসা মাকে জড়িয়ে ধরল। কাপড়ের দড়িতে ঝুলতে থাকা একটি সাদা ওড়না বাতাসে উড়ে এসে দুজনকে ঢেকে দিল। কয়েক মুহূর্তের জন্য পৃথিবীটা সাদা হয়ে গেল।
ফেরার দিন বাবা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত যেতে চাইলেন।
সবাই নিষেধ করল। তিনি শুনতে রাজি না। অবশেষে ঠিক হলো বাড়ির গেট পর্যন্ত আসবেন। ওয়াকার নিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়ালেন।
মা রাইসার ব্যাগে চানাচুর, আচার, দেশি মশলা আর মিষ্টি ঢোকাচ্ছিলেন।
রাইসা বলল, "মা, আমেরিকায় সব পাওয়া যায়।"
মা তার দিকে তাকালেন।
দুজনেই একই সঙ্গে বহু বছর আগের কথাটি মনে করল।
মা বললেন, "পাওয়া যায়। কিন্তু...."
বাকিটা বললেন না। বলতে হলো না।
এয়ারপোর্টে যাওয়ার আগে রাইসা বাবাকে জড়িয়ে ধরল। বাবার শরীর এখন হালকা, কাঁধ সরু। তাঁর বুকের সঙ্গে মুখ লাগিয়ে রাইসা ক্ষীণ হৃৎস্পন্দন শুনতে পেল।
তার মনে হলো, সে কোনো মানুষকে নয়, একটি ঘড়িকে জড়িয়ে ধরে আছে। ঘড়িটি টিকটিক করে চলছে। আর সে জানে না, আবার ফিরে আসার আগ পর্যন্ত ঘড়িটি চলবে কি না।
বাবা কানের কাছে বললেন, "যাও, মা। বাচ্চারা কষ্টে আছে।"
মা বললেন, "দুবাই পৌঁছে একবার ফোন দিবি। তারপরে আমেরিকা পৌঁছে আরেকবার।"
রায়হান বলল, "কাঁদিস না। এয়ারপোর্টে দেরিতে গেলে ফ্লাইট মিস হতে পারে।"
রাইসা গাড়িতে উঠে জানালা নামাল। মা হাত নেড়ে যাচ্ছেন। বাবা ওয়াকার ধরে দাঁড়িয়ে। তাঁর গায়ে সেই ধূসর সোয়েটার। ঢাকার গরমে কপালে ঘাম।
রাইসা চিৎকার করে বলল, "বাবা, সোয়েটার খুলে ফেলো! গরম লাগছে!"
বাবা শিশুর মতো হেসে বললেন, "এইটা আমার মায়ের দেয়া সোয়েটার! এসির মত আরাম লাগছে।"
সবাই হেসে উঠল। গাড়ি চলতে শুরু করল।
হাসির মধ্যেই মুখগুলো ছোট হয়ে গেল। গলি শেষ হলো। বাড়ি আড়াল হয়ে গেল।
রাইসা জানালা দিয়ে হাত বের করে রেখেছিল আরও কিছুক্ষণ, যদিও হাত নেড়ে বিদায় জানানোর মতো কেউ তখন দেখা যাচ্ছিল না।
আমেরিকায় ফিরে জীবন আবার আগের গতিতে চলতে শুরু করল।
অফিস, স্কুল, বাজার, রান্না, মিটিং, রাশ আওয়ার ট্রাফিক, দাওয়াত।
তবে রাইসা এবার পরের বছরের জন্য অপেক্ষা করল না। ছয় মাস পরের টিকিট কিনে ফেলল। টিকিটের দাম বেশি ছিল। অফিসে ছুটি পাওয়া কঠিন ছিল। বাচ্চাদের কয়েক দিন স্কুল মিস হবে। সে মনকে কোনো যুক্তি শুনতে দিল না। প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ফোনের ক্যালেন্ডার খুলে একটি করে দিন কেটে দিত।
একশো বিরাশি দিন। একশো একাশি। একশো আশি।
সময় এগিয়ে চলল। বাবার হাঁটা একটু ভালো হলো। মায়ের চুল আরও একটু সাদা হলো। শীত গেল, বসন্ত এল।
এক রাতে ভিডিও কলে বাবা বললেন, "আর কত দিন?"
"সাঁইত্রিশ দিন।"
মা পেছন থেকে বললেন, "দিন গোনার কিছু নেই। দেখতে দেখতে চলে আসবে।"
অপেক্ষারত মানুষের কাছে দিন "দেখতে দেখতে" আসে না। প্রতিটি দিন, প্রতিটা ঘন্টা অনেক দীর্ঘ মনে হয়।
ঘুমানোর আগে সে ক্যালেন্ডারে দাগ দিল। ছত্রিশ দিন।
ভোরে তার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে রায়হানের নাম।
রাইসা ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইল। হাত বাড়াতে পারল না।
পাশে আদনান ঘুমিয়ে। জানালার বাইরে আমেরিকার আকাশে ধীরে ধীরে আলো ফুটছে। পৃথিবীর অন্য পাশে তখন সন্ধ্যা নেমে গেছে।
ফোন বেজেই চলেছে।
রাইসার মনে হলো, মাঝখানে শুধু একটি ফোন নয়, একটি সমুদ্র বাজছে। হাজার হাজার মাইল দূরত্ব বাজছে। ফেলে আসা সব বছর একসঙ্গে বাজছে।
শেষ পর্যন্ত সে ফোনটি হাতে নিল।
কিন্তু ধরার আগে চোখ বন্ধ করে খুব নিচু গলায় বলল, "আল্লাহ, এবার গেলে যেন দুজনকেই পাই।"
তারপর কলটি ধরল।
ওপাশ থেকে কী বলা হলো, তা ঘরের আর কেউ শুনতে পেল না।
শুধু দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারের পাতাটি এসির বাতাসে কাঁপতে থাকল।
সেখানে লাল কালিতে লেখা, "দেশে যেতে আর ছত্রিশ দিন।"
#ছোটগল্প
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৫৭
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা এবং "দি ম্যাট্রিক্স" এর নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যানে এদের ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রাইভেট টেলিফোন কম্পানি হলে কেমন হতো?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



গত ব্লগে টেলিফোন নিয়ে বলেছিলাম। মোবাইল থেকে টেলিফোনে কল দেওয়া বা রিসিভ করা যেতো না। শুধু টিএনটি একটিভ করা সিমে টেলিফোনে কল করা যেতো। বা টেলিফোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×