somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শহীদ ডা. মিলন : তুমি আমাদের ক্ষমা করে দিও ।

২৭ শে নভেম্বর, ২০১২ রাত ১:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



তুমি ছিলে তখন তরুণ চিকিৎসক । তুমি গণতন্ত্রের পুঁজারী । জীবন দিয়ে সেটি তুমি প্রমাণ করেছো । তোমার স্মরণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির উল্টো দিকে নির্মিত হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। নির্মাণশৈলী আর ভাবগাম্ভীর্য দুটোই এর আছে। পথের ধারে অল্প জায়গা নিয়ে করা স্মৃতিস্তম্ভটি শুধু তোমার স্মৃতি নয়, বরং বর্তমান প্রজন্মের প্রেরণার অনন্ত উৎস। আপোসের বিরুদ্ধে অনন্য সাধারণ প্রতিবাদ।
আজ তোমার মৃত্যূ দিবসে এখানেই অনেকেই ছুটে যাবেন কিন্ত আমি যাবো না,ডা:মিলন । আমার সে সাহস নেই । বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা ফুলে ফুলে বেদি ভরিয়ে দেবেন।
আজ তোমার স্মুতিস্তম্ভটির ধোয়ামোছার কাজ চলছে। প্রতিবছর তাই হয়। কিন্তু বছরের বাকি দিনগুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠের ক্যাম্পাসে নির্মিত স্মৃতিস্তাম্ভটি পড়ে থাকে অযত্ন-অবহেলায়। স্মৃতিস্তম্ভটিকে ঘিরে থাকা লোহার শেকলটি নেই। এর ভেতরে অবাধে প্রবেশ করছে পথশিশুরা। নিজের মতো করে খেলাধুলা করছে। তারা ইতিহাস জানে না। জানারও সুযোগ নেই। একইভাবে না জানার সুযোগ নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। কিন্তু এর পরও তাঁদের একটি বড় অংশ উদাসীন। স্মৃতিস্তম্ভটিকে পার্কের বেঞ্চের মতো ব্যবহার করে তারা। দল বেঁধ আড্ডা দেয়। সর্বশেষ ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় এমন দৃশ্য দেখেছি ।

আজ তোমার স্মৃতিস্তম্ভটিকে চারপাশ থেকে ঘিরে থাকে আবর্জনার স্তুপ। দুই পাশের গাছ থেকে হেলে পড়া ডালে এর শরীর ঢাকা থাকে। সামনের জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে অলস সময় পার করে প্রাইভেট কার, রিকশা, সিএনজি চালিত অটোরিকশা। ফলে তোমার স্মৃতিসত্মম্ভটি চোখের সীমানায় আসে না বললেই চলে। স্থাপত্যটির কাছে গিয়ে একবার তাকালে পরিষ্কার হয়, এর "রক্ষনাবেক্ষন" বলতে কিছু নেই। শ্বেতপাথরের সিঁড়িগুলোতে কয়েকস্তর ধুলো জমে আছে। একই রকম ধুলোয় ঢাকা একটি পাথরের গায়ে খোদাই করা আছে আবেগঘন শব্দগুচ্ছের ওপর হাতে লেখা " নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী মুখ"। আর পাশের স্মৃতিফলকটি এখন বলা চলে পরিত্যক্ত। ভঙ্গুর অবস্থায় এটি কোন রকমে দাঁড়িয়ে আছে। খুব কাছে চোখ নিতে পারলে দৃশ্যমান হয়। ফুঁ দিয়ে ধুলো সরাতে পারলে পাঠোদ্ধার করা যায়। এতে লেখা আছে "এই রাজপথ সিক্ত হয়েছে "শহীদ ডাক্তার শামসুল আলম মিলনের রক্তে"। বেদনার বোধ জাগা স্মৃতিফলকটি উন্মোচন করেছিলো তোমারই কন্যা "শ্যামা "। অনেক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা নিয়ে এক সময় কাজগুলো করা হয়েছিল। কিন্তু এখন বদলে গেছে সব। ইতিহাস যেন উল্টো পথে পা বাড়িয়েছে।

অথচ খুব আগের কথা নয়। ১৯৮২ সালে ক্ষমতার দখল নেন জেনারেল এরশাদ। এ স্বৈরশাসকের পায়ে পিষ্ট হতে থাকে গণতন্ত্র। এর প্রতিবাদও ছিল তীব্র। গণতন্ত্রের দাবিতে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দেন জাফর,দীপালী সাহা, জেহাদ, তাজুল, জয়নাল, নূর হোসেনসহ আরও অনেকে। এর ধারাবাহিকতায় আসে নব্বই। দীর্ঘ নয় বছরের ক্ষোভ বঞ্চনা রূপ নেয় গণআন্দোলনে।
তুমি তখন বাংলাদেশ মেডিক্যাল এ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক। এরশাদ সরকারের স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন করেছো । বিএমএ'র আন্দোলনের নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলে তুমি । তাই সরকারের রোষানলে পড়তে হয় তোমাকে। তোমাকে চাকরির্চ্যূৎ করা হয়। চিকিৎসকসমাজের আন্দোলনের মুখে সরকার সে আদেশ বাতিল করে। তবে হয়রানি চলছিল। এরই একপর্যায়ে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর এরশাদের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা তোমাকে পিছন থেকে গুলি ছোড়ে।
মনে পড়ে আমি তখন কয়েকজন ছাত্র নেতা সহ মধুর ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে টি.এস.সির দিকে আসছিলাম । হটাৎ গুলির শব্দ পাই । গুলি তো অনেক সময় ধরে চলছিলো তাই চমকাই নাই । এরাশাদ সরকারের লেলিয়ে দেয়া সন্ত্রাসীরা তখন কার্জন হল ও শহীদুল্লা হলে অবস্থান নিয়ে দোয়েল চত্বর এলাকা থেকে গুলি করছিলো । আমাদের সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের নেতা কর্মীরা টি.এস.সি এলাকায় অবস্থান নিয়েছিলো । সামনে এগিয়ে দেখি তুমি গুলিবিদ্ধ ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রতিবাদের রক্তে ভেসে যায়। আর সে রক্ত আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। গণআন্দোলন রূপ নেয় গণঅভু্যত্থানে। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তোমার মুত্যূর পরই সরকার কারফিউ জারি করে । আমি শাহবাগ পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে সাংবাদিকতার আইডি দেখিয়ে কারফিউ পাস জোগার করি । তোমার মৃত্যুতে আন্দোলন আরো বেগবান হয় । মাত্র কয়েকদিন পর ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এরশাদ । গণতন্ত্র ফেরে দেশ। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া সকলের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জানায় জাতি। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে ততই ইতিহাসটির সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে। আর তাই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে স্বৈরাচার এরশাদ। অন্য দলে স্বৈরাচারের প্রধানমন্ত্রী ব্যরিস্টার মওদুদ। তোমার প্রিয় দল জাসদ ও হাত মিলিয়েছে মহাজোটে সেই বিশ্ব বেহায়া এরশাদের সাথে । রাজনীতির এ হাওয়াই যেন লেগেছে তোমার স্মৃতিসত্মম্ভে। আর তাই ধুলোয় মলিন থাকে প্রতিবাদী মুখ। সম্মান করার পরিবর্তে অমর্যাদা করা হয় তোমার বীর এর স্মৃতিস্তম্ভকে। বিপস্নবী চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। অথচ কেউ দেখার নেই। বলার নেই কারও কিছু। শুধু আছে আনুষ্ঠানিকতা। নিয়ম রক্ষার নিয়ম। কিন্তু এভাবে আর কত দিন? ঘৃণ্য এ সংস্কৃতি থেকে দেশ কবে মুক্ত হবে? মিলন দিবসে আজ এ প্রশ্ন সচেতন মহলের।

আমি যাবোনা তোমার স্মৃতি স্তম্ভে । কারন আমার লজ্ঝা করে । কি সাহস নিয়ে দাড়াবো তোমার স্মৃতিস্তম্ভের সামনে ? যদি তোমার কন্যা "শ্যামা "র মুখোমুখি হই ? আমি জানতাম ৯০ এর আন্দোলনে বা এরশাদের পতনে আমাদের রাষ্ট্রের শেণী চরিত্র পরিবর্তন হবে না । আমি জানতাম যে আমাদের ১ দফার আন্দোলনের দাবীর দ্বন্দটা ছিলো ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারের সাথে ক্ষমতাচূৎ এবং ক্ষমতা বর্হিভূত স্বৈরাচারের দ্বন্দ । এই দ্বন্দের অবসান হলেও রাষ্ট্রের শেনীচিরত্র পরিবর্তন হয়না । আমি জানি তুমি সহ সকল প্রগতিশীলরাই জানতো,তারপরও আমরা আন্দোলনে ছিলাম । ১০ অক্টোবর,৯০ সচিবালয়ের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত "জেহাদ" এর লাশ নিয়ে আমরা ছাত্ররা যে শফৎ নিয়ে ছিলাম যে, এরশাদের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরবো না । আমরা আমাদের কথা রেখেছিলাম। আমরা ঘরে ফিরে এসেছি । কিন্ত তোমার আর ঘরে ফেরা হয়নি, তুমি চলে গেলে না ফেরার ভুবনে । তোমার দলটিও আজ ক্ষমতাসীনদের সাথে আছে । তোমার দলের সেদিনের সাধারন সম্পাদক এখন মন্ত্রীত্বের আসনে বসেছেন । তোমার সহযোদ্ধা,যিনি তোমারই সাথে রিকাসায় ছিলেন তিনিও সংসদ সদস্য ছিলেন । কিন্ত তোমার রক্তের সাথে আমরা প্রতারনা করেছি । তাই সাহস পাইনা তোমার স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাড়াতে ।

আমাদের ক্ষমা করে দিও শহীদ ডা: মিলন ।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×