
ফ্ল্যাশ ব্যাক
পার্থ দ্যা অনলি ওয়ান – ২২ শে অক্টোবর
আজ আমার জন্মদিন। জন্মদিন নিয়ে কখনই আমার তেমন কোনো বাড়াবাড়ি ছিলোনা। থাকতোও না হয়তো কখনও। কিন্তু সামিরার সাথে পরিচয় হবার পর, গতবছর সামিরা আমার জন্মদিনে এতটাই বাড়াবাড়ি করেছিলো যে এবারেও আমি জন্মদিনে মনে মনে সামিরার থেকে একই টাইপ বাড়াবাড়ি পেতে যাচ্ছি ধরেই নিয়েছিলাম।
কিন্তু আজ সামিরার সাথে দেখা হওয়াতো দূরে থাক কথা পর্যন্ত হয়নি। গত জন্মদিনে সামিরা আমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য এমন পাগলামি করেছিল, যা মনে পড়লে আমার এখনও হাসি পায়। আসলে জীবনে এমন কিছু মুহুর্ত আসে যা মানুষ অবচেতনভাবেও ভালোবেসে ফেলে। কাল রাত থেকেই তেমন কিছুর জন্যই অপেক্ষা করছিলাম আমি। কিন্তু সামিরার কোন খবর নেই। কাল রাতে ঠিক বারোটায় যখন সামিরার কোনো কল এলোনা, এমনকি একটা টেক্সট পর্যন্ত না তখন মনে মনে আমার ভীষন অভিমান হলো। অনেকটা সেই ১২ বছরের কিশোরের মত অভিমান। একসময় সামিরার কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লাম আমি। সকালে উঠে ফোন, ফেসবুক সবখানে চেক করলাম। ফ্রেন্ডসদের অসংখ্য শুভেচ্ছা বাণী কিন্তু কোথাও সামিরার কোনো একটা শব্দ পর্যন্ত নেই। আমার বুক ভারী হয়ে আসছিলো। আজ সকালে খুব অস্থির লাগছিল।একটা সময় আমাকে ইনহেলার নিতে হলো। সামিরার এই চুপ থাকার কোন কারন খুঁজে পাচ্ছিলাম না।তাই শেষ পর্যন্ত আমি নিজেই তাকে কল করলাম। কিন্তু তার মোবাইলে একঘেয়ে আনরিচেবল বাণী শুনিয়ে গেলো।
আমার হঠাৎ খুব সামিরাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। সামিরাকে দেখার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে আমি সেলফোনে ওর ক্লোজ আপ পিকচারটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। বিষণ্ণ হয়েই বসে ছিলাম সারাটাদিন।বারবার সামিরার কথাই মনে পড়ছিল। এ মেয়েকে নিয়ে এভাবে কোনদিন ভাবতে হবে চিন্তা করিনি। সামিরার অস্তিত্বকে অগ্রাহ্য করার ক্ষমতা আমার আছে এবং আমি সেটা অবলীলায় পেরে যাবো। এমনটাই ভাবতাম আমি আগে। কিন্তু আজ সারাদিন আমি কিছুই করিনি। বন্ধুদের কল রিসিভ করিনি।রুম থেকে বের হইনি।একটার পর একটা সিগারেট খেয়েছি এবং সামিরার কলের জন্য অপেক্ষা করেছি।একবার ভেবেছিলাম সামিরার বাসায় চলে যাব।কিন্তু কেমন যেন একধরনের জিদ এবং অভিমান সারাদিন আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। এসব কি হচ্ছে আমার? আমি বোধহয় আসলেই এই মেয়ের প্রেমে পড়ে গেছি। নাহলে সারাদিন তাকে নিয়েই কেন ভাবতে হবে? এই বাঁধনে জড়াতে চাইনা আমি নিজেকে।
সিলভিয়ার ব্যাপারটি যে সামিরা বেমালুম ভুলে গেলো, ব্যাপারটি নিয়ে বেশ অবাক হয়েছি আমি। যখন তাকে বললাম কালকের ঘটনার জন্য দুঃখিত, সে অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো, বলল কি ঘটনা? কি হয়েছে তোমার? কি বলছ এইসব? আমি হা করে তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে। ও আমাকে ধাক্কা দিয়ে বললো, কি গাঁজা টাজাও ধরে ফেলেছ নাকি আজকাল? জেগে জেগে স্বপ্ন দেখো নাকি? দেখো তোমার পাগলামি কিন্তু আমি আর সহ্য করবনা।
আমি হেসে ফেললাম, বললাম, তো কি করবে? সে আমাকে অবাক করে দিয়ে বললো, কি করবো শুনবে? এক থাপ্পড় দিয়ে সব পাগলামি ছুটিয়ে দেব। আমি অবাক হয়ে সামিরার কথা শুনছিলাম। এই মেয়ে অবলীলায় কি বলে এসব! জীবনে কোনোদিন কেউ এইভাবে আমার সাথে কথা বলেনি। তারপর সে আমার জন্মদিনে আমাকে নিয়ে সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরবে তা শুনাচ্ছিলো। সামিরাকে খুব আনন্দিত দেখাচ্ছিল। আমি চুপ করে শুনছিলাম। ওর বাচ্চাদের মত আনন্দজ্জ্বল মুখ দেখে আমার খুব মায়া লাগছিল। মনে হচ্ছিল এই মেয়ের হাত ধরে বলি, তোমাকে আর কখনো দুঃখ দিবনা আমি, কখনো না! কিন্তু কিছুই বলিনি। শুধুই চুপ করে বসে ছিলাম।
আজ সামিরা আমার সাথে যোগাযোগ করেনি, এটাও কোনভাবে মেনে নিতে পারছিনা। চারিদিকে কি হচ্ছে আমি কিছু ঠিক বুঝতে পারছিনা। কেন যেন মনে হচ্ছে তার কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে। সামিরা সেদিনের ঘটনা আসলেই ভুলে গেছে? নাকি কি হলো তার, আমার মাথায় সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। রাত দুটো বাজে । অথচ আমি সারাটাদিন কিছুই খাইনি। একা একা এই ঘরে বসেই কাটিয়ে দিলাম। দূর আমি একটা নির্বোধ! এইভাবে একটা সামান্য ঘটনা নিয়ে আটকে থাকা আমাকে সাজেনা ।
রিফ্লেক্সন জার্নাল - ২২.১০.২০১৫
রাত- ২:১০
সামিরা চৌধুরী
আজ আমি সারাদিন কোথাও যাইনি। দরজা জানলা বন্ধ করে, সেল অফ করে সারাদিন ঘুমিয়েছি। কাজের লোকজন ডেকে ডেকে ফিরে গেছে। রহিমাবুয়া যখন আমাকে ডাকাডাকি করে না উঠাতে পেরে বাবাকে ডেকে আনলো তখন অবশ্য একটু সময়ের জন্য উঠতেই হয়েছিলো আমাকে। বাবাকে বললাম, আমার মাথা ব্যাথা আর ভীষন শরীর খারাপ করেছে। আমি আজ সারাদিন শুয়ে থাকতে চাই। বাবা হাসলেন। উনি কোনোদিন আমার কোনো কাজে কখনও বাঁধা দেননি। আজও দিলেন না। বললেন, ওকে সবাইকে বলে দিচ্ছি কেউ যেন তোমাকে আর বিরক্ত না করে। বাবা বাইরে বেরিয়ে গেলেন । আমি শুয়ে শুয়ে বাবার গাড়ি বেরিয়ে যাবার শব্দটা শুনলাম।
তারপর আমি চলে গেলাম সাগর সৈকতে। এখন তো বেলা ৯টা। সকালের সাগর কেমন যেন শান্ত । ওহ এখন তো ভাটার সময় চলছে। আমি পার্থকে বললাম, চলো কাঁকড়া ধরি। পার্থ অবাক হয়ে বললো, তুমি কাঁকড়া ধরবে? কাঁকড়া ধরে কি করবে? আমি বললাম ধরবো মানে আমরা ধরবো। আমি হাত দেবো নাকি কাঁকড়ার গায়ে? তুমি ধরবে আর আমি দেখবো। পার্থর চোখ গোল গোল হয়ে গেলো। রাগে একটু লালও মনে হয়, সে বললো, আচ্ছা না হয় ধরলাম তারপর? তুমি ভেজে ভেজে খাবে নাকি? বুঝলাম সে খেপেছে, আমি বললাম, না, তুমিই ভাজবে তারপর আমি তোমাকে খাইয়ে দেবো। হা হা হা
কতক্ষন ঘুমিয়েছিলাম মনে নেই। স্বপ্নে দেখলাম একবার। পার্থ ভীষন মন খারাপ করে বসে আছে। খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। এলোমেলো চুল।আমি ওকে কত বার যে ডাকলাম। সে শুনতেই পাচ্ছিলোনা। আমি অনেক উঁচু একটা বাড়ির উপরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। একটা খোলা ছাঁদ। ছাদের দরজা বন্ধ ছিলো । কে বন্ধ করেছে জানিনা। আর তাই আমি নীচে নেমে আসতে পারছিলাম না । অনেক ডাকাডাকিতেও সে যখন শুনলোনা। আমি তখন লাফ দিলাম। কি ভয়ংকর অনুভুতি। স্বপ্নের মাঝেও আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবার অনুভুতি আমি স্পষ্ট টের পেলাম। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমি উঠে বসলাম।
বিকেলের দিকে ফের স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙ্গলো আমার। তখন সন্ধ্যা নামছিলো। আমার হাতটা ধরা তখন পার্থর হাতের মুঠোয়। সিগাল উড়ছিলো আমাদের মাথার উপরে। উথাল বাতাসে আমার নীল রঙ শাড়ির আঁচল উড়ছিলো এমনভাবে যে আমি সামলাতেই পারছিলাম না। আমার গলায় ছিলো শামুকের মালা আর হাতে ঝিনুক আর মুক্তার বালা। সেসব আমরা মনে হয় কিনেছিলাম সাগর তীরের দোকানগুলো থেকে। আমার খুব গান গাইতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। স্বপ্নের ভিতরেও দুঃখ হচ্ছিলো আমার, আমি কেনো গান গাইতে পারিনা!
আমাকে অবাক করে দিয়ে পার্থ গাইলো- এই নীল মনিহার, এই স্বর্নালী দিনে তোমায় দিয়ে গেলাম, শুধু মনে রেখো।
ঘুম ভাঙ্গার পর, জানালায় তাকিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা নামছে তখন। দিনটা শেষ হয়ে গেলো। আমি কিছুক্ষন কাঁদলাম। কেনো কাঁদলাম নিজেও জানিনা। হঠাৎ অকারণ হাহাকারে আমার মনটা ভরে গিয়েছিলো। আমি উঠে একটা হট শাওয়ার নিলাম। চুল শুকিয়ে এক মাগ স্ট্রং কফি নিয়ে টিভি রুমে গিয়ে বসলাম টিভির সামনে। টিভি নিউজে এত মারামারি হানাহানি । কিচ্ছু ভালো লাগেনা আমার।
দারোয়ান এসে জানালো, দেশ থেকে সেন্টুভাই এসেছেন। আমি প্রমাদ গুনলাম, সেরেছে এই সেন্টুভাই এখন আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন। উনার একরাশ অবান্তর কথা এখন শুনতে হবে বসে বসে। আমি ভাবলাম একবার যে তাকে বলে দেই আমি বাসায় নেই। কিন্তু তার আগেই সেন্টুভাই আমার সামনে উপস্থিক হলেন। তার বিশাল মেজাজ খারাপ। কি সব নতুন কাজের লোকজন রাখা হয় যে আপন আত্মীয় স্বজনদের চেনেনা। আমি মনে মনে হাসলাম। প্রতিবারই একই অভিযোগ তার। সেন্টুভাই এর পাল্লায় পড়ে আমার একাকী বিলাসের একটা দিনের তেরোটা বাজলো।
আমি সেন্টুভাইকে নিয়ে রাতের ডিনার করলাম। উদ্দেশ্য ঘুমুতে যাবার নাম করে ওর হাত থেকে রেহাই পাওয়া। রাতের খাবার শেষ করে আমি বারান্দায় দাঁড়ালাম। আমাদের ১২ তলা বাসার উপরে দাঁড়িয়েও মাঝে মাঝে ভাবি আকাশটা কত উঁচুতে। আজ এত তারা আকাশে। ছোটবেলায় তারাদের মাঝে মাকে খুঁজতাম। আজও আমি মনে মনে সেই তারাটাকে খুঁজতে থাকি। কি এক অদ্ভুত উপায়ে মন খারাপের দিন গুলোতে আমার মাকে মনে পড়বেই।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৫ রাত ১০:০৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


