এখানে আমাদের গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টদের একটা সোসাইটি আছে যার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে এই অধমের ঘাড়ে খুবই বেমক্কা সময়ে এই টু্যরের ব্যবস্থা র দায়িত্ব নিতে হয়েছে। বেমক্কা, কারন ঘাড়ের উপরে অনেক কাজ, প্রচন্ড ব্যস্ততার মধ্যে সময় যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে প্রায়ই অনুরোধে ঢেকি গিলতে রাজী হই, পরে দেখা যায় গলায় আটকে যায়। এই আয়োজনটাও সেরকম ছিলো।
আমি এ্যাডমিন কাজ পছন্দ করি না, এবারও বুঝলাম। টু্যর কোম্পানীর সাথে যোগাযোগ করোরে, ছাত্রদের ইমেইল করোরে, তাদের রেজিস্ট্রেশন করো এবং টাকার হিসাব রাখোরে, তাদের বিশাল লিস্টি জমা দাওরে ইনসুরেনস করতে... মোট কথা হাজারটা বায়ানাক্কা। রিসার্চের কাজ, থিসিস লেখা সিকেয় তুলে কয়েকদিন মাথা জুড়ে এই কাজের আয়োজন আর ঝামেলা সামলানো। অবশেষে আজ (13ই মে, শনিবার) ছিলো টু্যরের দিন।
আগেই গন ইমেইল করে থ্রেট দিয়ে রেখেছিলাম পাবলিকরে যে 6:15তে ইউনিতে জড়ো হও, ঠিক কাটায় কাটায় বাস ছেড়ে দেওয়া হবো। কতজন আসলা আমি জানি না। পাবলিক ঠিকই কথা রেখেছে। সময়মতো সবাই হাজির, এমনকি বাংলাদেশী গ্রুপও। কে বলেছে বাঙ্গালী সময় অনুসারে কাজ করতে পারে না? ইচ্ছে থাকলেই পারে।
ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে তড়িঘড়ি করে এসে ফরমালিটি সেরে বাসে সবাইকে উঠিয়ে বাস ছাড়তে ছাড়তে প্রায় 7টা। খুব ভয়ে ছিলাম মানুষের দেরী নিয়ে কারন দেরী করলে জ্যামে পড়তে হতো সিংগাপুর মালয়শিয়া বর্ডারে। সেই ঝামেলায় পড়তে হয় নি।
বেশ কয়েকটা জায়গায় গেলাম। মালাক্কা একটা ঐতিহাসিক বন্দর শহর। এখানে বিভিন্ন সময়ে সুমাত্রা থেকে হিন্দু প্রিনস থেকে শুরু করে ডাচ, পতুগর্ীজ বনিক, ব্রিটিশ এবং ইউরোপিয়ান মিশনারীরা এসেছে। আরো এসেছে চীন থেকে অভিবাসী যারা মালয় জনগোষ্ঠির সাথে মিশে গিয়ে জন্ম দিয়েছে নতুন জাতি, সংস্কৃতির। এ দিক থেকে প্রচুর ফিউশন এলিমেন্ট পাওয়া যায় মালাক্কার ইতিহাস, সংস্কৃতি আর লোকজ ব্যাপারগুলোতে। আমরা মূলত যে জায়গাগুলোতে ঘুরেছি তা হলো: ফামোসা, ক্রাইস্টচার্চ, ফ্রানিসস জেভিয়ার চার্চ, স্টাডউস, ঝংকার স্ট্রিট আর একটা গলফ ক্লাব (দুপুরের খাবার জন্য)। সব মিলিয়ে খুব খারাপ যায় নি।
এর মধ্যে একটা বোনাস ছিলো সামহোয়্যারের একজন মানুষের সাথে দেখা করার সুযোগ। ফারিয়ালকে ইমেইল করেছিলাম যাওয়া আগে যে আমি মালাক্কা যাচ্ছি। তো ওর সাথে কয়েকবার ফোনকল চালাচালি করে দেখা করার জায়গা ঠিক করলাম দুপুরের দিকে। আমরা ক্রমাগত এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাচ্ছিলাম। এর ভিতরে শেষ ভেনু্য ছিলো মাহকোতা প্যারেড। প্রায় সাড়ে তিনটার দিকে ফারিয়াল ফোন করলো আমার গাইডের মোবাইলে, জানালো সে মাহকোতা মার্কেটের আশে পাশে। ফোনে চড়াগলা শুনে মনে হচ্ছিলো মেয়ে মনে হয় কর্কট রাশি (আমার মা যেমন, কর্কট এবং আস্তে কথা বলে কম)। পরে জানা গ্যালো সে কুম্ভ। নো ওয়ান্ডর্ার মেয়েটার অনেক এনার্জি আর স্পোটির্ং মনোভাব!
যাই হোক, আমি কোথায় আছি জানিয়ে অপেক্ষা করছিলাম মার্কেটের ভিতরে। কিছুক্ষন পরে বান্দি হাজির। মুহুর্তেই উভয় তরফের আন্তরিক, অসংকোচ গপসপে নতুন পরিচয়ের ধোঁয়া গ্যালো কেটে। মনে হলো যেন অনেক আগেই চেনা। সামহোয়্যার মানুষকে ভালোই কাছে এনে দেওয়ার প্লাটফর্ম হয়ে গ্যাছে আজকাল। কিছু মানুষ থাকে না যারা একটু বেশি রকমের অনেস্ট হয়, যা মনে আসে বলে দ্যায় .. আমাদের ফারিয়াল হলো সেই টাইপ। লুকোপাছা করে না। পাগল পাগল ভাব অথচ খুব ভালো মানুষ। শরীরটা একটু খারাপ যাচ্ছিল কয়েকদিন, তবু তা নিয়েই চলে এসেছে দেখা করতে। যেটা ভালো লাগলো তা হলো সামহোয়্যারের অনেকের লেখা অনেক দরদের সাথে পড়ার ব্যাপারটা। অনেকদিন ফারিয়াল এখানে লিখতো না, কিন্তু জানালো প্রায় প্রতিদিনই অনেকের লেখাই পড়া হয়।
অল্প সময়েই মালয়শিয়া, বিশেষ করে মালাক্কা নিয়ে ওর একগাঁদা অভিযোগ জানা গ্যালো। আলাপ হচ্ছিল সেখানকার বাংলাদেশীদের নিয়ে। তাদের প্রতিও ফারিয়াল বেজায় নাখোশ। অনেক কারন আছে, পরে বলবো'খন। আপাতত একটা হিন্টস দিয়ে রাখি: আমরা দেশের মানুষরা বিদেশে আসলে মাঝে মধ্যে খুব বিচিত্র আচরন করি, খ্যাতগিরি খুব বেড়ে যায় কারো কারো। সেইরকম মানুষগুলো নিয়েই কথা হচ্ছিল ফারিয়ালের সাথে।
কথা বলতে বলতে আমাকে ঘুরিয়ে দেখালো মার্কেটটা। মন্দ না। ছুটির মরসুম বলে প্রচুর মানুষ। আলাপ করিয়ে দিলাম আমার পুরাতন সহপাঠিদের সাথেও। ফারিয়ালের সাথে গপসপ শেষ করে বিদায় জানিয়ে বাসে উঠলাম। রওনা হলাম সিংহপুর।
মনের মধ্যে প্রাপ্তির খবর জানার জন্য কেমন খচখচ করছিলো। এর মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হতেই সিঙ্গাপুরে একজন ফোন করে জানালো সে প্রাপ্তির জন্য কিছু কনট্রিবিউট করতে চায়। ভালো লাগলো মেসেজটা কিছুটা হলেও সফল হয়েছে চিন্তা করে।
বাস ক্যাম্পাসে নামিয়ে দিতে দিতে প্রায় রাত 12টা। প্রচন্ড টায়ার্ড সারাদিনের ধকলে। তারপরেও ল্যাবে এসে সামহোয়্যার না খুলে পারলাম না। প্রাপ্তির ভালো থাকার খবরটা পড়ে ভালো লাগলো।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মে, ২০০৬ রাত ১২:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



