somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সোহাগির প্রেম

০৫ ই মার্চ, ২০১৪ দুপুর ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শিক্ষা, রুচি, চাকরি, সহবত এসব দিয়েও গ্রামের মেয়ে, কাজের লোকের মেয়ের শিক্ষিত সমাজে ঠাঁই হল না, ভালবাসা দূর অস্ত’। কথা বলতে চাই, বলতেই সোহাগি প্রথমেই চারপাশ থেকে পাওয়া নানান হতাশার কথা দিয়ে ওর জীবনের বাস্তবকে আমার সামনে নিয়ে এল।

‘আমার মা যে বাড়িতে সারাদিনের কাজ করতেন সেখানে আমিও ওই বাড়ির মেয়ের সঙ্গেই মানুষ হয়েছি। আমি আর মুনিয়াদি, মানে ওই বাড়ির একমাত্র মেয়ে আমরা একই বয়সের ছিলাম। ওর মতোই স্কুলে যেতাম আমি। মুনিয়াদির মায়ের জন্যেই আমার পড়াশুনা, রুচি, রান্না শেখা। উনি না থাকলে আজ হয়ত আমার দিদির মতোই মাতাল বড়ের পিটুনি খেয়ে বাড়ি বাড়ি আমায় বাসন মাজতে হত। স্কুল, কলেজ পেরিয়ে মন্টেসারি ট্রেনিং নিয়ে এখন একটা এন.জি.ও-তে চাকরি করি আমি। বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়াই। ওই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যেও আমি আমার শৈশবকে দেখতে পাই। মনে হয়, আমিও তো ঠিক এরকম একটা জায়গা থেকেই উঠে এসেছিলাম’!

আমার কাজটা সত্যি আমার জীবনে অনেক খুশির মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। গ্রামের কুঁড়ে ঘরে টিনের ছাদ বসেছে, মাকে সোনার দুল দিতে পেরেছি, হাড় ভাঙা শরীরে বাবার সাইকেল রিক্সা চালানো বন্ধ করেছি। তবে বছরে দু-একবারই যাই ওখানে। আমার বাড়ি হলে কী হবে, শহুরে জীবনের আদব কায়দায় বেড়ে ওঠা আমি শিকড়কে মনে রাখলেও শিকড়ে ফিরতে তো চাইনি। আমার বাড়িতে যদিও এখন আমার খুব কদর। আগে এক বোনের পরে, কালো রঙের বাজে দেখতে মেয়ে নিয়ে বাবা, মায়ের হেলাফেলা ছাড়া আর কিছু জোটেনি আমার। মা সেই কারণেই শহর ছাড়ার পর আমায় কলকাতায় রেখে আসতে পেরে বেঁচেছিল। কিন্তু এখন এই রোজগেরে কালো মেয়েই যে তাদের একমাত্র সম্বল, দুটো ছেলে থাকার পরেও তারা সেটা বুঝতে পেরেছে। তবে আমার বিয়ে নিয়ে তারা বড়ই চিন্তিত’।

‘বিয়ে করনি কেন তুমি’?- জানতে চাই সোহাগির কাছে। সোহাগির চোখ চিকচিক করে। রবীন্দ্রনাথ চলে আসে আমার মনে- ‘স্ফটিক সে নির্বিকার আকাশের মতো/ সেথা আসে শশী রবি, /যায় চলে, তার ছবি/ কোথা হয় গত’। ‘নিজে থেকে প্রেমে পড়ার সাহস বা ক্ষমতা আমার ছিল না। সমাজের একেবারে নিচের স্তর থেকে শহুরে উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবারে কাজের লোকের মেয়ে হিসেবে যখন কোনও মেয়ের ওপর শিক্ষা, ভাল করে বাঁচার, নিজের উপার্জনে পৃথিবী দেখার স্বপ্ন ছড়ায় তখন সেটা স্বপ্ন হয়েই থেকে যায়। বাস্তবে তা হয় না। মুনিয়াদির সঙ্গে মানুষ হওয়ায় মুনিয়াদির কিছুটা প্রভাব, ওই বাড়ির ধাঁচ-ধরন আমার জীবন তৈরি করেছিল এটা ঠিক-ই, কিন্তু আমি তো কোনওদিন মুনিয়াদি হতে পারব না, বা ওর বন্ধুরা আমার বন্ধু হবে না। আমি স্কুলে পড়েছি, কিন্তু সাধারণ স্কুল।

ইংরেজি খুব ভাল বলতে পারি না আমি। মুনিয়াদিদের সঙ্গে বেড়াতে যাই, রেস্তোরাঁয় এক সঙ্গেই খাই, এক হোটেলেই থাকি, খাদির জামাই পড়ি কিন্তু আজও মুনিয়াদির জন্যে গান লিখে দিতে হয় আমাকেই, ওর আলমারি গুছিয়ে দিতে হয় আমাকেই। আসলে কাজের লোকের মেয়ে এই তকমাটা পুরো মুছে বোধহয় যায় না। ওটা কেবল বাংলা গল্প, আর বাংলা চ্যানেলের সিরিয়ালেই হয়। আসলে মুনিয়াদি, ওর মা, বাবা, তাদেরও দোষ দিতে পারি না। অনেক করেছে ওরা। ওদের জোরেই তো কান্না-হাসি নিয়ে বেঁচে আছি আমি। ওটা এখন আমারও বাড়ি’।

‘তবে বিয়ে হবে না আমার। চাকচিক্য নেই আমার শরীরে। ওটা তো আমার পরিবারের ধারা। আমারও নিজের প্রতি কোনও যত্ন নেই। মুনিয়াদি ফেস প্যাক থেকে ক্রিম কত কী দিয়েই তো চেষ্টা করেছিল। আমার কিছুই ভাল লাগে না। নিজের জন্যে কিছুই করতে ইচ্ছে হয় না। মুনিয়াদির ছোট্ট মেয়ে আমার সঙ্গে থাকে, ওকে নিয়ে আর স্কুল গিয়েই আমি বেশ থাকতে পারি। আমার বিয়ে হবে না। কারণ ড্রাইভার, মিস্তিরি এদের সঙ্গে আমি কেমন করে থাকব? আমার তো প্রতি সকালের ঘুম ভেঙেছে রবীন্দ্রনাথের গান শুনে। আর শিক্ষিত সমাজের কোনও পুরুষ কাজের লোকের, গ্রামের কালো মেয়েকে বিয়ে করবে না’।

কিন্তু আমার শরীর, মন এদের কেমন করে বোঝাই? মুনিয়াদির সঙ্গে ওর বরের বিছানা আদর তো আমি সুযোগ পেলেই লুকিয়ে দেখি আর নিজে কষ্ট পাই। অনেক সময় রাতে ঘুম পেলেও রাত জেগে থাকি, ওরা কী করছে সেটা দেখার জন্যে। সকালে বিছানা তুলতে গিয়ে দেখি কেমন যেন সব এলোমেলো! অথচ আমার বিছানা কেবলই শুকনো, বাসি। মুনিয়াদি বকাবকি করে বলে নতুন চাদর নিয়মিত পাল্টাস না কেন? ওকে কী করে বোঝাই আমার চিরকালীন রিক্ততার কাহিনি। একসঙ্গে এতগুলো বছর কাটিয়েও তো ওর পূর্ণতার মধ্যে দিয়ে আমি কেবল আমার রিক্ততাকেই দেখি, কাজের লোকের মেয়ে বলেই কি আমার এই হাল?’ সোহাগি প্রশ্ন করে আমায়।

সোহাগির প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। এটা লিখতেও খুব মনখারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে, আসলে কিছুই বোধহয় বদলায় না। সবটাই ওপর ওপর বদলায়, নয়ত সোহাগির মতো শিক্ষিত, রুচিশীল মেয়ের সোহাগ হয় না? আমার অবান্তর স্মৃতির ভিতরে সোহাগির অশ্রু ঝলমলে মুখ আজীবন আমায় প্রশ্ন করে যাবে- সোহাগির সোহাগ হয় না কেন - See more at: Click This Link
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×