
দ্বিতীয়বার বাড়ি থেকে ফেরার বেশ কয়েকদিন পরে রাতের খাবার খেয়ে সবে আমি ঘরে ফিরে এসেছি, এমন সময় বাইরে ঠকঠক শব্দ। দরজা খুলে দেখি রমেনদা দাঁড়িয়ে ।
-আরে! রমেনদা যে । এসো এসো, বলতেই রমেনদা ঘরে ঢুকলো ।
-মাস্টারদা ; অনেকদিন ধরে আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব বলব ভাবছিলাম ।
- বেশতো! বলে ফেলো, বিনা সংকোচে ।
-আসলে আপনি কি মনে করেন কি না । আর সময়ও ঠিক তেমন হয়ে উঠছিল না ।
কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ থাকলাম। আমার লক্ষ্য ছিল ওর মুখের দিকে। আমিই প্রথম নিরবতা ভঙ্গ করলাম ,
- কি চুপ করে আছো কেন? বল কি বলতে চাও? আমাকে এখনো চিনলে না যে তোমাকে এতটা সংকোচ করতে হচ্ছে ?
- আপনি মাঝখানে দেয়াল লিখন নিয়ে খুব খোঁজখবর নিচ্ছিলেন না?
- হ্যাঁ তা তো নিচ্ছিলাম; কিন্তু তোমরা তো কেউ কোন ক্লু দিতে পারলে না । তাই আমি শেষ পর্যন্ত ও সব প্রচেষ্টা ছেড়ে দিয়েছি। তো আজ হঠাৎ করে এ প্রসঙ্গে । কেন তুমি কি কিছু জানো ? কে লিখছে বা দেয়ালে কি লিখা আছে সে সম্পর্কে ?
- হ্যাঁ মাস্টারদা। আমি একটু জানি বৈকি। আর জানি বলেই আপনার কাছে এসেছি,
বলেই হঠাৎ রমেনদা আমার পা জড়িয়ে ধরলো ।
- আরে! আরে! হচ্ছেটা কি ? কি করছো ? কেন করছ এসব ?
-না না ! মাস্টারদা, আমি একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি । এখানে ছেলে মেয়েরা পড়াশোনা করতে আসে। তার মধ্যে ও সব লেখা উচিত হয়নি । সভাপতি মহাশয় শুনলে হয়তো আমার চাকরিটা চলে যেতে পারে। আপনি বিষয়টি আর কাউকে বলবেন না, প্লিজ ।
-ঠিক আছে । তা না হয় হবে। আমি কাউকে কিছু বলবো না । কিন্তু তুমি যদি ইতিপূর্বে কাউকে কিছু না বলে থাকো তাহলে তো আমার না বলাটা কোন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়াবে না ।
- হ্যাঁ দাদা, সে দিক দিয়ে এক প্রকার যেটা কেউ জানে না নিশ্চিন্ত থাকুন । বিষয়টি আপনি ছাড়া কেউ জানে না । লেখাগুলি সাদরি ভাষায়। উদ্দেশ্য ছিল একজন ছাড়া আর কেউ যাতে না পড়তে পারে । আপনি যেগুলিকে দেওয়ালে দেখেছেন ......... যেমন ,
১- ঘাড়ে হামার দুইটা ছায়া ,
রেহেলা নানীকে সঙ্গে ।
ডায়রিয়ায় মাই মরবাহই/ মহরগেহেই,
হাসে গিরগেহি অথৈ পানি কাই ।
" বাড়িতে আমার দুইটি পোলা ,
থাকে দাদীর/নানির কাছে ।
ডায়রিয়ায় মা মরেছে ,
আমি পড়েছি অথৈ জলে ।
২- দশ বিঘে ভূঁইয়া হায়ে ,
কিন্তু সব পাথর ভূঁইয়া হ্যাকাই ।
পানি নেই হয়লা ,
সবাই রাস্তায় ব্রেস গেলি হাই ।।
" দশ বিঘে জমি আছে,
কিন্তু সব পাথুরে ।
বৃষ্টি না হয়ে খরাতে ,
পড়েছি সবাই পথে ।
৩-চাষাবাদ কোন হই নেখাই ,
চাইর পাশে হাহাকার ।
না খাই কেই দিন কাটেলা,
পা- হি হামানি এই জীবনে ।
" চাষবাস কিছুই নাই,
হাহা কার চারদিকে।
অনাহার- ই জীবনসঙ্গী ,
পেয়েছি আমরা এই জীবনে ।"
৪ - ঝরনা হাই এ অনেক দূরে ,
সেহেটাই হাম নিকের সব ।
শীত বর্ষা শরতে খিলনা সেই পানি ,
গরমকালে ঝরনা দেইলা শুকায় ,
বহুদূরের কুয়ো যেইলা হাপাই।
" বহু দূরের ঝর্ণা ,
সেটিই আমাদের সম্বল।
শীত বর্ষা শরৎ এ পান করি সেই জল ।
গ্রীষ্মকালে ঝরনা যায় যখন শুকিয়ে,
বহু দূরের কুয়োতে যেতে হয় হাঁপিয়ে ।"
৫ - শরৎকাল এক বিহানে,
যেই দিন প্রথম দেখলি ,
মনের অজানা কাই কে হিলি ,
জ্যান তোকে পাই গেলি ।
"শরতের এক প্রভাতে ,
যেদিন প্রথম দেখি ,
মনের অজান্তে বলি,
যেন তোমাকে পেয়ে গেছি । "
৬- তোর ঘরে কে কে হান / হাথুন ,
জানাস লাগা যাই ।
এই কলে আওয়াটা যে কষ্টের ,
সেআইডা যদি হানকে জানা জানাটিস ।
" তোমার বাড়ি কে কে আছে ?
সেটা যদি জানতে ।
এখানে আসাটা যে বেদনার,
সেটি যদি মোকে জানাতে । "
৭ - সেইবার ঘরে যাইকে ,
গির গই বিপদ কাই ।
কাবান আই কে ভাসাই ,
গেরামকে সবাই।
পাঁচ দিন চাইর রাত ,
রাহালী গাছে ডালে।
ছয় দিনে সাহায্য আলেই,
হামনিকে র গেরামে ।
ছুয়া দুইটা না খাই কে ,
মরেক রকম হয়ে গেলাম ,
শহরকে মানকে চুরা গুরে ,
প্রাণ যেন ঘুর কে পালাই ।
" সেবার দেশে গিয়ে/ পড়লাম বিপদে,
হড়কা বানে ভেসে গেল / গ্রামবাসী সকলে,
পাঁচদিন চাররাত / থাকলাম গাছের ডালেতে।
ছয়দিনে ত্রাণ এল / আমাদের গ্রামেতে।
ছেলেদুটো অনাহারে/ মৃতপ্রায় হয়ে ,
শহরবাসীর চিড় - গুড়ে/ প্রাণটি যেন পেল ফিরে ।
৮- নেই জানিলা কালে তোই ,
জবাব নেই দেই সলা হামকে ।
তোর দিকে তাকাই রি হিলা ,
লিখা না হলেও আকার ইঙ্গিতে ।
" জনি না কেনো তুমি,
উত্তর দাও না মুখে ,
তোমার পানে চেয়ে থাকি,
লেখাতে না হলেও আকারে-ইঙ্গিতে ।"
মেদিনীপুর - ওড়িশা সীমান্তের একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রাম নখন্ডি । চারিদিকে শাল পিয়ালের জঙ্গল; আর আছে মাইলের পর মাইল ফাঁকা জমি। কিন্তু সবই প্রায় কাঁকুরে এবং রাঙ্গামাটিতে মোড়া । বৃষ্টিপাত খুবই কম । যা সামান্য ফসলি জমি আছে তা দূর থেকে ঝর্নার জলে সামান্য ফসল হয় বৈকি। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অতি নগণ্য। সভ্যতার আলো সে অর্থে এলাকায় প্রবেশ করেনি । তার মধ্যে মহুয়া ফলের নির্যাস থেকে তৈরি দেশীয় পানিও বা মদ এলাকাবাসীর অত্যন্ত প্রিয় । দু-বেলা পেটে ভাত না জুটলেও আত্মভোলা মানুষগুলোর পেটে একটু মদ পড়লে সারাদিন যেন আর কোন চাহিদা থাকে না । সংসারের ব্যাপারে এহেন সমাজের পুরুষরা অনেকটাই উদাসীন । সেখানে মহিলারা জঙ্গলে কাঠ সংগ্রহ করে সপ্তাহে একদিন বহুদূরে হাটে যায় বিক্রি করতে যা সংসার নির্বাহের কাজে ব্যয় হয়। পুরুষরা দলবেঁধে বছরের একটা সময় জঙ্গলে যায় পশু শিকার করতে। বর্তমান কেন্দ্র-রাজ্য উভয় সরকার বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে অধিবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে আদিবাসী সমাজের চিরাচরিত পশু শিকার চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে । সরকার যদিও বিভিন্ন পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়ন ব্লক কর্মসূচি নিয়ে বিকল্প রুটি রোজগারের ব্যবস্থা করেছে। তবুও তার সুফল যে আদিবাসী সমাজে সেই অর্থে পৌঁছাতে পারেনি সে কথা বলা বাহুল্য।
যাইহোক রমেনদার কাছ থেকে দেওয়াল লিখন উদ্ধারের পর এবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম,
- আচ্ছা দাদা , তোমার ওই দেওয়াল কথনে সমাজ সচেতনতা , অসহায়তার পাশাপাশি একটি গভীর প্রেমের আখ্যান ফুটে উঠেছে । আমাকে যখন এতটা বিশ্বাস করলে তাহলে তোমার এই প্রেমের দেবী কে? সেটা জানতে প্রবল ইচ্ছে হচ্ছে ।
- হ্যাঁ দাদা, এটা নিয়ে আপনার সঙ্গে আমার আলোচনা করা আমার আরেকটি উদ্দেশ্য । যেখানে আপনি আমার বেশ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন ।
- আমি ! আমি তোমার সমস্যার কারন? কি বলতে চাও তুমি?
কৃতজ্ঞতা স্বীকার : সাদরি ভাষায় ছড়া বা কবিতা গুলিকে অনুবাদ কাজে সহযোগিতা করেছেন আমার সহকর্মী শ্রীমতি মালা মুন্ডা ।
বিশেষ দ্রষ্টব্য -১, কৌশলী ভাষার গ্রাম্য কবি হলধর নাগ এর পূর্ব জীবন অবলম্বনে আজকের পর্বটি রচিত । যিনি পরে 'কবিরত্ন' উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। অথচ প্রথম জীবনে একটি গ্রাম্য স্কুলে তিনি তার প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে দেওয়ালে এমনই কিছু প্রেমের কাহিনী লিখে রাখতেন ।
২ - দু-চারটি লাইনের ছড়াকারের আজকের বিশেষ পর্বটি ব্লগে আমার আরেক ছোট ভাই আরোগ্যকে উপহার দিলাম। নভেম্বর ভাইয়ের জন্ম মাস। অনেক অনেক শুভেচ্ছা প্রিয় ভাইকে।
চলবে...........
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই নভেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



