তনিমা বাড়ি পটুয়াখালির চর এলাকাতে । ১২বছর বয়সে তার বাবা তাকে বিয়ে দেয় চল্লিশোর্ধ এক ব্যক্তি সঙ্গে। বিয়ের কোন কিছু বোঝার আগে তার কপালে লেখা হয় তনিমা স্বামী পরিক্ততা।এ অঞ্চলে বেশিরভাগ মেয়েদের বিয়ে নামমাত্র দেয়া হয়, বাবার কুল রক্ষা করার জন্য। মৌসুম বিয়ে হিসাবে একটা কথাও প্রচলিত আছে।তনিমা ভূয়া বিয়ের শিকার হয়। তার বিয়ে রেজিস্ট্রেশন ছাড়া হয়েছে।অথচ আমাদের আইন বলে বিবাহ হলো দুজন নারী ও পুরুষের সামাজিকভাবে একত্রে বসবাসের স্বীকৃতি আদায়ের বৈধ মাধ্যম। মুসলিম আইন অনুযায়ী বিবাহের প্রধান তিনটি শর্ত হলো ছেলে ও মেয়ে উভয়কে সাবালক ও সাবালিকা হতে হবে, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই বিবাহের ব্যাপারে সম্মত এবং দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহ সম্পন্ন হতে হবে। কিন্তু প্রায়শই ভুয়া বিবাহ সম্পন্নের ঘটনা ঘটছে। বিয়ে সম্পন্নের ক্ষেত্রে যথাযথ পদ্ধতিও মানা হয় না বেশিরভাগ সময়। আর এ সমস্যার প্রধান শিকার হচ্ছে নারী।
মুসলিম বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।বিবাহের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট কাজিদের অফিসে সম্পন্ন করা হলে ছেলে ও মেয়ে উভয়ের জন্য মঙ্গলজনক হয়। মুসলিম বিবাহ ও তালাকের ক্ষেত্রে রেজিস্ট্রেশন বাধ্যতামূলক করা হলেও ।তেমনভাবে পদক্ষেপ এখনো নেয়া হয়নি। যার কারণে আইনি সহায়তা পেতে নারী অনেক ঝুঁকি পোহাতে হয়।এই ঝুকির কারণে নারী আইনের আশ্রয় নিতে চায় না। ফলে নারীরা সমাজে রয়েছে যাচ্ছে অবহেলিত। অসামাজিক বিবাহ, একাধিক বিবাহ, বাল্যবিবাহ, যৌতুকবিহীন বিবাহসহ ভুয়া বিবাহ পর্যন্ত প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া সহজ করা। অনেক ক্ষেত্রে নিকাহনামা পর্যন্ত প্রয়োজনের সময় খুঁজে পাওয়া যায় না। বর্তমান আইন অনুযায়ী মুসলিম বিবাহের ক্ষেত্রে যেকোনো স্থানে বিবাহের রেজিস্ট্রেশন করা সম্ভব। এর ফলে দেখা যায়, অপ্রাপ্তবয়স্ক ও অনৈতিক বিবাহের সংখ্যা অহরহই ঘটছে। কেননা, এ আইনের ফলে ছেলে ও মেয়েকে শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। কেউ যদি জোর করে মেয়েকে উঠিয়ে এনে বা পালিয়ে এসে ছেলে ও মেয়ে অন্যত্র বিবাহ বা একাধিক বিবাহ (প্রথম পক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে) করেন, তাহলে বর্তমান আইনে তা শনাক্ত করার কোনো ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশনকারী এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। তিনি আইন অনুযায়ী ছেলে ও মেয়েকে দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বিবাহের রেজিস্ট্রেশন করেন মাত্র।
আমাদের দেশে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে কাজি অফিসে গিয়ে বিভিন্ন জটিলতার কারণে বিবাহ করতে বাধাপ্রাপ্ত হলে ছেলে ও মেয়ে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট বা নোটারি পাবলিকের সম্মুখে হলফনামা আদায় করেন। এরপর হলফনামার ভিত্তিতে যেকোনো কাজি অফিসে গিয়ে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করেন। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ে উভয়েই বা যেকোনো পক্ষ বাবা-মা বা অভিভাবকদের অসম্মতিতে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করার জন্য হলফনামা সংগ্রহ করে থাকে। ছেলে ও মেয়ে সাধারণত নিজেদের সাবালক ও সাবালিকা প্রমাণের মাধ্যমে নোটারি পাবলিকের হলফনামার ভিত্তিতে বিবাহ করে থাকেন। নোটারি পাবলিকের বা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে হলফনামা সংগ্রহ করে বিবাহ হলে ছেলে ও মেয়ে সাধারণত ভিন্ন কোনো স্থানে গিয়ে কাজিদের মাধ্যমে বিবাহ রেজিস্ট্রেশন করে থাকেন। যেহেতু আইনে কনেপক্ষের স্থায়ী ঠিকানায় বিবাহ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। যার কারণে এখানে নারীরা অন্যরকম একটা সমস্যায় পড়েন। ফলে আইনগত কোনো জটিলতা সৃষ্টি হলে অভিভাবকেরা ছেলে ও মেয়েকে খুঁজে পেতে গিয়ে হয়রানির সম্মুখীন হন।
বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে গ্রাম পর্যায়ে প্রকোপটা বেশি। বিবাহের ক্ষেত্রে বর ও কনের বয়স নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় কোনো কাগজপত্রাদি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয় বিধায় এ ধরনের ঘটনা ঘটার সুযোগ হয়। অনুমানের ওপর বা সাক্ষীদের মতের ভিত্তিতে উপস্থিত বর ও কনের বয়স নির্ধারণ হয় বিধায় বর ও কনেপক্ষের অভিভাবকদ্বয় এ সুযোগ নিয়ে থাকেন। বয়সের জটিলতা নিরসনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন সনদ বা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছ থেকে বয়সের সঠিক প্রমাণপত্র বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হলে বাল্যবিবাহ রোধে শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব হতো।বিবাহের পর পারিবারিক জীবনে দাম্পত্য কলহের নানা ঘটনায় বর বা কনে বা উভয়েই তালাক গ্রহণ করতে চায়। কনেপক্ষ যদি ভরণপোষণ বা নির্যাতনের অভিযোগে আদালতে ন্যায়বিচারের জন্য যায়, তাহলে আদালত বিবাহের বৈধতা নিশ্চিত হওয়ার জন্য নিকাহনামার অনুলিপি আদালতে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, বরপক্ষ বা স্বামী নিকাহনামা গায়েব করে ফেলেন। তাই এ ধরনের জটিলতা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য কনেপক্ষের স্থায়ী ঠিকানায় বিবাহ সম্পন্ন ।
বিশ্বের অনেক দেশেই বর ও কনের বিবাহের বয়স যুগোপযোগী করা হয়েছে। আমাদের দেশে সাধারণত যখন কোনো কারণে বিবাহবিচ্ছেদের প্রশ্ন আসে, তখনই দেনমোহরের অংশ পরিশোধ বা আদায়ের বিষয়টি চলে আসে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেনমোহর, সন্তানের ভরণপোষণ ইত্যাদি আদায়ের জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়ে কনেপক্ষকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়। বিবাহ রেজিস্ট্রেশনের ক্ষেত্রে কাজিদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রের কিছু বিধিবিধান রয়েছে। বর্তমান সরকার ২০০৭ সালে কাজিদের নিয়োগ, পরিচালনা, জবাবদিহিতা আইন মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকদের হাতে ন্যস্ত করে। এসব বিষয় উল্লেখ করে কাজিদের পক্ষ থেকে এর প্রতিকার চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগে তিনটি রিট করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাদেশ বাতিলও করেন হাইকোর্ট বিভাগ। বর্তমান সরকার যে অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল, তাতে কাজিদের নিয়োগের ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসক দুই পক্ষেরই ক্ষমতা রয়েছে। স্পষ্ট বিধান না থাকায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। কাজিদের মাধ্যমেই বিবাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পাদিত হয়। তাই দ্রুত এ জটিলতা নিরসন করে ভুয়া কাজি ও ভুয়া বিবাহ রোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করা জরুরি।
Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



