
ইসরায়েলি বাহিনী যখন গাজায় স্থল অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিল, তখন নেতানিয়াহু তার বাহিনীকে গণহত্যায় উদ্বুদ্ধ করতে বাইবেলের এই লাইনগুলো পড়ে শোনান: "এখন যাও, আমালেককে আক্রমণ করো এবং তাদের যা কিছু আছে তার সবটুকু ধ্বংস করে ফেলো; কাউকে রেখো না - পুরুষ, নারী, শিশু, এমনকি নবজাতক - সবাইকে হত্যা করো; গবাদি পশু, ভেড়া, উট ও গাধা - সবকিছুই শেষ করে দাও। ১ স্যামুয়েল ১৫:৩।"
এর কিছুদিন পরে নেতানিয়াহু আবারও তার সৈন্য ও কমান্ডারদের একটি চিঠি পাঠান। সেখানেও তিনি পুনরায় বাইবেলের এই অংশটি উল্লেখ করেন।
পৃথিবীব্যাপী রাজনীতি ও ধর্মের মধ্যে এক ভয়াবহ দূষণ ঘটেছে। ট্রাম্পের খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদ, ইউরোপের উগ্র ডানপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর উত্থান, ভারতে মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশে জামাতের ইসলামী জাতীয়তাবাদ - এই দূষণের কয়েকটি উদাহরণ মাত্র।
ট্রাম্পের পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে বারবার নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠা করে। আমেরিকায় খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদ এখন একটি শক্তিশালী স্লোগান, যেখানে খাঁটি আমেরিকান হতে গেলে ইভানজেলিক্যাল খ্রিষ্টান ও জায়নবাদী ভাবধারার অনুসারী হতে হবে। ইউরোপে উগ্র ডানপন্থীরা খ্রিষ্টান ঐতিহ্যকে একটি সাংস্কৃতিক পরিমাপক হিসেবে ব্যবহার করে - যা মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। আবার, বাংলাদেশের রাজনীতির দিকে তাকালে ধর্মব্যবসার যে সীমাহীন বিকৃতি চোখে পড়ে, তা দেখে মনে হয়, রাজনীতিতে ধর্মের চেয়ে বড় আফিম আর কিছু নেই।
মানুষের চিন্তা ও বিবেচনাবোধকে আচ্ছন্ন করে রেখে ধর্ম যখন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সমাজের জন্য ভয়ংকর ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। আর তাই ধর্মকে সব ধরনের রাজনীতি থেকে দূরে রাখাই উচিত। সমস্যা হলো, ধর্মকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বাদ দিলে যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বিষয়গুলো রাজনৈতিক আদর্শ থেকে বাদ পড়ে যায়, তাহলে সেখানে একটা শূন্যতা বা বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। সারা পৃথিবীর প্রগতিশীল রাজনীতির মধ্যেই এই শূন্যতা বা বিচ্ছিন্নতার বিষয়টি লক্ষণীয়। কারণ ধর্ম একদিকে যেমন মানুষকে বিভক্ত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অন্যদিকে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ ধর্মের মধ্য থেকেই নৈতিকতা ও সামাজিক সংহতির ধারণা খুঁজে পায়।
ট্রাম্পের রাজনীতির সঙ্গে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের রাজনীতির তুলনা করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। প্রগতিশীলদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার মতো বিষয়গুলো বেশি গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে, সাংস্কৃতিক ও নৈতিকতার প্রশ্নগুলো তাঁদের রাজনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ। এর একটি কারণ হলো, প্রগতিশীল রাজনৈতিক দর্শন ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ায় তাঁরা সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন।
অথচ মানুষ যে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের মধ্যে বসবাস করে, তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন না করে শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে রাজনৈতিক আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। মানুষের প্রয়োজন শুধু কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নয়। মানুষের প্রয়োজন গল্প, মিথ ও এমন কিছু সামষ্টিক অভিজ্ঞতা, যার মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত বোধ করে, নিজেদের কোনো একটি সম্প্রদায়ের অংশ মনে করে। মানুষ শুধু ভালোভাবে বাঁচতে চায় না; তারা এমন কিছুর সাথে যুক্ত থাকতে চায়, যা তাদের জীবনের অর্থ তৈরি করে।
এই জায়গাটিতেই ট্রাম্প, উগ্র ডানপন্থি বা জামাতের মতো রাজনৈতিক দলগুলো সুযোগ খুঁজে পায়। প্রগতিশীল রাজনীতির শূন্যস্থান তারা পূরণ করে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, সংখ্যালঘুবিদ্বেষ, হিন্দু বা ইসলামবিদ্বেষ এবং পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি দিয়ে। মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও নিরাপত্তাহীনতাকে একটি রাজনৈতিক আখ্যানের মধ্যে নিয়ে এসে তারা নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে একটি অভিন্ন পরিচয় ও সংহতি তৈরি করে।
আর এখানেই জেমস টালারিকোর মতো রাজনীতিবিদের গুরুত্ব বিশেষভাবে দেখা যায়। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে টালারিকো টেক্সাস থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি একজন স্কুলশিক্ষক এবং নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টান। টালারিকো তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে, ধর্মীয় বিশ্বাসকে সাম্প্রদায়িকতা, বিভাজন ও জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার না বানিয়ে ধর্মের মধ্য থেকেই মানবিকতা, ন্যায়বিচার ও সামাজিক সংহতি গড়ে তোলা যায়। আর সেটা ট্রাম্পের রাজনীতির ঠিক উল্টো রাস্তায়।
আমি প্রথম টালারিকোর নাম শুনি, যখন তিনি টেক্সাসের সরকারি স্কুলের ক্লাসরুমগুলোতে বাইবেলের টেন কমান্ডমেন্টস ঝুলিয়ে রাখার আইনের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। বিষয়টা একটু বুঝে দেখুন; একজন নিষ্ঠাবান খ্রিষ্টান রাজনীতিবিদ অন্য আইনপ্রণেতাদের সমালোচনা করছেন এটা বলে যে, তোমরা বাইবেলের কিছু লাইন ক্লাসরুমে ঝুলিয়ে রাখার যে নিয়ম বানিয়েছ, তা শুধু অসাংবিধানিকই নয়, অখ্রিষ্টীয়ও।
তিনি সেটা কীভাবে করেছেন, সেটা বোঝা যাক। টালারিকোর যুক্তি ছিল, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস থাকা এক জিনিস আর অন্যের ওপর নিজের ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া আরেক জিনিস। তাঁর মতে, ক্লাসরুমে বাইবেলের লাইন ঝুলিয়ে দেওয়া অখ্রিষ্টীয় এ কারণে যে, অন্য ধর্মের যেসব শিশু ক্লাসে এটি দেখতে বাধ্য হবে, তাদের মনে হতে পারে যে এই ক্লাসে তারা অন্তর্ভুক্ত নয় বা স্বাগত নয়। এটা দেখে শিশুরা এটাও মনে করতে পারে যে, তাদের ধর্মবিশ্বাস অন্যদের চেয়ে নিকৃষ্ট। টালারিকো মনে করেন, যিশু যদি এটা দেখতেন, তাহলে তিনি ওই শিশুদের জন্য দুঃখ পেতেন এবং তাদের নিজের প্রতিবেশীর মতো ভালোবাসতে আহ্বান জানাতেন।
টালারিকোর রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি ধর্মকে রাজনীতি থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলেন না; বরং ধর্মের নামে ক্ষমতা ও আধিপত্যের বিরোধিতা করেন। আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি একে অভিহিত করেছেন "ধর্মের জন্য একটি ক্যানসার" হিসেবে। তিনি বলেন, খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদের মধ্যে খ্রিষ্টীয় কিছু নেই। তাঁর মতে, খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদ হলো খ্রিষ্টের নামে শক্তির উপাসনা - সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তি এবং আধিপত্যের উপাসনা। তিনি বলেন, "এই মতাদর্শ যিশুকে এমন এক চরিত্রে রূপান্তরিত করেছে, যিনি বন্দুক হাতে ঘুরে বেড়ান, বিজ্ঞানকে অস্বীকার করেন, অর্থলোভী এবং মানুষের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে বেড়ান।" টালারিকোর ভাষায়, খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদীদের "মুখভর্তি ধর্মগ্রন্থের বাণী" আর "হৃদয়ভর্তি ঘৃণা"।
ঈশ্বর কেমন, সে বিষয়ে টালারিকো একটি সুন্দর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। একজন ধর্মতাত্ত্বিকের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, "আমি ক্ষুধার্ত শিশুদের দেখে ঈশ্বরের বিরুদ্ধে আর্তনাদ করে উঠেছিলাম। কিন্তু পরে বুঝতে পারলাম যে, ওই ক্ষুধার্ত শিশুরাই আসলে ঈশ্বর, আর শিশুর রূপে ঈশ্বরই আমার দিকে তাকিয়ে আর্তনাদ করছেন।" টালারিকোর ভাষায়, "গাজা ও পশ্চিম তীরের মানুষের যে আর্তনাদ, সেটা ঈশ্বরেরই আর্তনাদ; আর সেই আর্তনাদ শোনার অর্থ শুধু সহানুভূতি প্রকাশ করা নয়, কাজের মাধ্যমে সাড়া দেওয়া।"
টালারিকোর মা ছিলেন টেক্সাসের লারেডো শহরের এক ধর্মপ্রচারকের মেয়ে। আর টালারিকোর বাবা ছিলেন হাইস্কুলের পড়াশোনা শেষ করতে না পারা, মদ্যপ ও সহিংস স্বভাবের একজন মানুষ। এক রাতে টালারিকোর বাবা মদ খেয়ে তাঁর মায়ের ওপর সহিংস হয়ে উঠলে টালারিকোর মা নিজের ছোট ফোর্ড এসকর্ট গাড়িতে জিনিসপত্র তুলে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে একটি হোটেলে চলে যান - যেখানে তিনি কাজ করতেন। হোটেল ম্যানেজারের কাছে টালারিকোর মা অনুরোধ করেন, যেন নতুন একটা বাসা খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের একটি হোটেল রুমে থাকতে দেওয়া হয়। পরে তাঁরা পূর্ব অস্টিনের একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে ওঠেন। সেই বাসায় শিশুর জন্য আলাদা ঘর ছিল না। টালারিকো ঘুমাতেন মায়ের আলমারির ভেতরে রাখা ছোট একটা ক্রিবের মধ্যে। তাঁর মা সেই আলমারিটি ছবি ও খেলনা দিয়ে এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যে, সেই আলমারিটাই হয়ে উঠেছিল তাঁর সন্তানের শোবার ঘর।
শৈশবের এই অভিজ্ঞতা স্মরণ করে টালারিকো নিজের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গেও এর মিল খুঁজে পান। সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজিত করার পর বিজয় ভাষণে তিনি তাঁদের বিজয়কে ডেভিড ও গোলিয়াথের যুদ্ধের সাথে তুলনা করেন। তাঁকে ঠেকাতে একদিকে ছিল বিপুল অর্থশক্তি, ওয়াশিংটনের শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রচলিত ক্ষমতাকাঠামো; অন্যদিকে ছিল সাধারণ মানুষের আশা ও সমর্থন। নির্বাচনে তাঁদের মোকাবিলা করতে হয়েছে নেতিবাচক বিজ্ঞাপন ও কুৎসা, বিদেশি বট, এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও এবং ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদের বিপুল অর্থ ও প্রভাব - যে ক্ষমতা দিয়ে ধনকুবেররা রাজনীতিবিদদের নিজেদের পকেটে পুরে রাখেন।
প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়ানো সাধারণ মানুষের আশা, সাহস ও সম্মিলিত শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে টালারিকোর মধ্যে আমি মহাত্মা গান্ধীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। জানি না, এটা আমার মনের অতিরিক্ত আশাবাদী কল্পনা কি না। দেখার বিষয়, রাজনীতির এই নতুন যাত্রায় তিনি কতটা এগিয়ে যেতে পারেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


