
আমার বন্ধু সালাউদ্দিন।
সালাউদ্দিন একজন আগাগোড়া ব্যর্থ মানুষ। সে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় মালোশিয়া গিয়েছে, ফিজি গিয়েছে, নিউজিল্যান্ড গিয়েছে। কিছু দিন আগে সৌদি আরব গিয়েছে। কোনো দেশেই ছয় মাসের বেশি থাকে নি। অনেক ধার-দেনা করে বিদেশ গিয়েছে। কোনো দেশেই তার ভালো লাগে না। কাজ করে আরাম পায় না। এখন সে বেকার। সালাউদ্দিনের সাথে আমার পরিচয় দুই যুগের বেশি সময় ধরে। আমরা একই সাথে লেখাপড়া করেছি বারো ক্লাশ পর্যন্ত। তবে গত পাঁচ বছর সালা উদ্দিনের সাথে আমার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তিন মাসে আগে একদিন সালাউদ্দিন আমাকে ফোন দেয়। আমাদের পুরোনো হাজার হাজার সৃতি আবার নতুন করে সব মনে পড়ে। এখন আমাদের প্রায়ই দেখা হয়, আড্ডা হয়।
সালা উদ্দিন প্রতি সপ্তাহে দুই দিন আমার বাসায় আসে।
সুরভির রান্না সালাউদ্দিনের খুবই পছন্দ। আমার সাথে আড্ডা দেয়। তারপর চলে যায়। সালাউদ্দিন বিয়ে করেছে প্রায় এক বছর হলো। সালাউদ্দিনের বউ মিলি। মিলি অনেক গুনী মেয়ে। মাস্টার্স করেছে। একটা স্কুলের শিক্ষিকা। স্কুলে মিলি বিজ্ঞান ও অংক শেখায় ছাত্রছাত্রীদের। স্কুল শেষে দু'টা কোচিং এ ব্যাচে ছাত্রছাত্রীদের পড়ায়। কোচিং শেষে মিলি একটা কোর্স করছে। ওয়েব ডেভেলপমেন্টের। সেখানে যায়। সকাল সাত টায় বাসা থেকে বের হয় মিলি, রাত দশ টায় বাসায় ফিরে। স্কুলে পড়িয়ে এবং কোচিং এ পড়িয়ে মিলি মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ইনকাম করে। এদিকে সালাউদ্দিনের কোনো কামকাজ নেই। সারা দিন সে তার স্ত্রীকে সময় দেয়। সকালে স্কুলে পৌঁছে দেয়। স্কুলে শেষ হলে কোচিং এ পৌঁছে দেয়। কোচিং শেষ কোর্সের ক্লাশে নিয়ে যায়। এক হিসেবে দু'জন সারাদিন একসাথেই থাকে।
এইভাবেই যাচ্ছে বন্ধু সালাউদ্দিনের দিনকাল।
সালাউদ্দিনের ফ্যামিলির অবস্থা ভালো না। বেশ অভাব! মিলি পারাবারিক অবস্থাও তত উন্নত নয়। মিলি যা ইনকাম করে তার কোর্স ফি, ছোট ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ আর সিনএনজি ভাড়া দিয়েই সব শেষ হয়ে যায়। বিয়েরপরও মিলি থাকে তার মায়ের কাছে। ভাড়া বাড়িতে। মিলির বাবা নেই। সালাউদ্দিন সপ্তাহে দুই দিন মিলির বাসায় থাকে। মিলির বাসা সালাউদ্দিনের বাসার দূরত্ব ত্রিশ টাকা রিকশা ভাড়া। এইভাবেই চলছে গত এক বছর ধরে। সালাউদ্দিন চাকরী পাচ্ছে না। বউকে নিজের বাসায়ও তুলতে পারছে না। চাকরী পেলেই সালাউদ্দিন বড় বাসা নেবে তখন মিলিকে বড় অনুষ্ঠান করে তুলে নেবে। অনেক চাকরীর সন্ধান করে, এখন চাকরীর আশা বাদ দিয়েছে সালাউদ্দিন। মিলি সালাউদ্দিনকে বলে যেভাবে দিন যাচ্ছে যাক না। চিন্তা করে প্রেসার বাড়িয়ে লাভ কি!
সালাউদ্দিন ছেলেটা ভালো।
বেশ বুদ্ধিমান। তবে তার বুদ্ধি কোনো কাজে লাগে নি। আমরা মাঝে মাঝে চায়ের দোকানে খুব আড্ডা দেই। একদিন সালাউদ্দিন রাত বারোটায় ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। আমি বললাম, এত রাতে বের হলি ক্যান?
সালাউদ্দিন বলল, সুমন (সালাউদ্দিনের একমাত্র শালা) অসুস্থ। ডাক্তার দেখাতে হবে। ডাক্তারের সিরিয়াল দিতে যাচ্ছি।
আমি বললাম, এত রাতে কেন?
সালাউদ্দিন বলল, এই ডাক্তার উপমহাদেশের নাম্বার ওয়ান। সিরিয়াল পাওয়াই খুব কষ্টের। সিরিয়াল দেয় ভোর ছয় টায়। পরে গেলে আর সিরিয়াল নেবে না।
আমি বললাম, ভোর ছয়টায় সিরিয়াল নেয়, তাহলে তুই রাত বারোটায় ঘর থেকে বের হলি কেন?
সালাউদ্দিন বলল, ভোরে যদি ঘুম থেকে উঠতে না পারি? অথবা সিরিয়াল দিতে না পারি। অনেক লম্বা লাইন হয় তো! দশজনের বেশি সিরিয়াল নেয় না। বললাম না উপমহাদেশের নাম্বার ওয়ান ডাক্তার।
আমি বললাম, তোর ধানমন্ডি যেতে সময় লাগবে আধা ঘন্টা। রাত বারোটায় বের হলি। সারা রাত করবি কি?
সালাউদ্দিন বলল, এই হাঁটাহাঁটি করবো। কোনো চায়ের দোকান খোলা থাকলে চা-টা খাবো। তুই বুঝতে পারছিস না। সুমন অসুস্থ আমাদের সবার মন খারাপ।
তখন আমি গভীর ঘুমে।
রাত দুইটায় সালাউদ্দিন আবার আমাকে ফোণ দিয়ে বলল, দোস্ত সময় তো কাটে না। একাএকা ভালো লাগে। কেমন ভয়ভয় লাগছে!
আমি বললাম, অপেক্ষা কর আমি আসছি। সুরভিকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে আমি বাসা থেকে বের হলাম। তারপর রাত আড়াই টায় আমি সালাউদ্দিনের কাছে যাই। সালাউদ্দিন আমাকে দেখে খুব খুশি। খুশীতে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ধানমন্ডি লেকের পাড়ে বসে আড্ডা দেই ভোর পর্যন্ত। সকালে ডাক্তারের সিরিয়াল দিয়ে বাসায় ফিরি।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে নভেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



