
আশা করি আপনারা সকলেই ভালো আছেন।
আপনি কি নিজেকে জানেন? জানলে কতটুকু জানেন? নিজের ব্যক্তিত্ব বা পার্সোনালিটি সম্পর্কে ধারণা রাখুন। ব্যক্তি হিসেবে আপনি কেমন, সেটা আপনার থেকে ভালো কেউ জানবে না, তাই নিজের খবর নিজেকেই রাখতে হবে। একজন মানুষ তার নিজের আত্মাকে চিনবে তখনই, যখন তার লক্ষ্য থাকবে নিশ্চিত, আর সে সেই লক্ষ্যে থাকবে স্থির, অবিচল। অর্থের পিছনে দৌড়ানো ঠিক না। আপনাদের প্রথম কর্তব্য হওয়া উচিত আত্মার উন্নয়ন সাধন। নিজেকে জানতে হলে প্রচুর পরিমানে পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের প্রয়োজন আছে। সত্যিকার অর্থে নিজেকে জানার জন্য কোন নির্দিষ্ট সময় নেই। এটা নির্ভর করে তার বুদ্ধিমত্তার উপর।
নিজেকে জানার মত বড় গুণ আর নেই।
আপনি নিজেকে ভালো করে দেখুন। যতোটা সম্ভব জানতে চেষ্টা করুন। আপনার নিজের ভালো দিক, খারাপ দিক গুলো ভাল করে জানতে চেষ্টা করুন। আপনার প্রতিভা খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন। আমি বিশ্বাস করি- প্রতিভা শূন্য মানুষ নেই। আপনার মধ্যে অবশ্যই কোনো না কোনো প্রতিভা আছে'ই। মানুষের নিজের ভেতরে, তার নিজস্ব অস্তিত্বে যেসব গুপ্তধন রয়েছে সে গুলোকে খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় চেষ্টা প্রচেষ্টার অবসরটুকুও যেন তার নেই। জীবনে সাফল্য লাভ ও সন্তুষ্টির ব্যাপারে পবিত্র কুরআন চমৎকার জীবনযাপন পদ্ধতির দিকনির্দেশনা দেওয়া আছে। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আত্মসচেতনতা। আত্মসচেতনতা মানে হলো নিজেকে চেনা, নিজের সম্পর্কে জানা।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নিজেকে জানার মত বড় গুণ আর নেই। ‘মানুষ কি মনে করে, তাকে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানোর জন্য পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে? তোমরা কি ভেবেছ তোমাদের অহেতুক সৃষ্টি করেছি।’ মোটেও নয় বরং বিশেষ উদ্দেশ্যের জন্যই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেক হয়েছে, আর না- এখন সময় এসেছে নিজেকে চেনা ও জানার, নিজেকে সংশোধন করার। অনেকে বলতে পারেন, কেবল নিজেকে চিনলে লাভ কী? হ্যাঁ, লাভ আছে রে ভাই। সৃষ্টির সেরা জীব ভিক্ষা করবে কেন? করে; এজন্যই যে সে জানে না সে যে কে? মানুষ যদি নিজেকে চিনতে পারতো তবে কাউকে ভিক্ষা করতে হতো না। নবী (স.) বলেন, তুমি যদি আল্লাহকে চিনতে চাও তবে আগে নিজেকে চেনো। মানুষ আসলে নিজেকে চেনার চেষ্টাই করে না। তাকায় কিন্তু দেখে না, শ্রবণ করে কিন্তু শুনে না, পড়ে কিন্তু বুঝে না।
সৃষ্টিকর্তা বলেন, আমি মানুষের জন্য সব কিছু সৃষ্টি করেছি, সাত আসমান ও জমিনে যা কিছু আছে তা মানুষের জন্যই সৃষ্টি। অথচ মানুষ না খেয়ে থাকে, ভিক্ষা করে। কারণ সে জানেই না যে বিশ্বের সমস্ত কিছু তার জন্যই সৃষ্টি করতে হয়েছে। আপনার অবস্থার পরিবর্তন তখনই হবে যখন আপনি পরিবর্তন চাইবেন। আপনি যদি একটি চেয়ারকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরাতে চান তবে তার আগেও আপনাকে চিন্তা করতে হবে আমি চেয়ারটি সরাবো কি সরাবো না। একটি চেয়ারও সরবে না যদি সরাতে না চান, আর জীবন তো সরবেই না। জীবনের পরিবর্তন চাইলেই পরিবর্তন ঘটবে। সহজ সরল কথা হলো- নিজেকে জানো, শান্তিতে থাকো। নিজেদের জানতে হলে ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হবে। ইতিহাস মানেই আমাদের চেনা-জানা অতীতের মানুষের গল্প।
একটা কথা মনে রাখতে হবে আপনার জন্ম আপনার হাতে নেই কিন্তু আপনার জীবনের সফলতা আপনার হাতে। আপনি কত ফিট লম্বা হবেন তা আপনার হাতে নেই কিন্তু আপনি কত বড় হবেন তা আপনার হাতে। আপনার গায়ের রং কেমন হবে তা আপনার হাতে নেই কিন্তু আপনার জীবনকে আলোকময় করা আপনার হাতে। মানুষ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত জ্ঞানী হতে পারেনা, জ্ঞানী হওয়ার প্রয়াস করতে পারে মাত্র। এই জন্যই যে নিজেকে জেনেছে সে জ্ঞানের কাছাকাছি গিয়েছে, যে নিজেকে জানেনি সে জ্ঞানকেই বুঝতে পারেনি। আমরা কেউই এই পৃথিবীতে গুরুত্বহীন নই। ঠেলাগাড়ি যে চালায়, দিনশেষে সেও একটা পরিবারে ফিরে যায়, যেখানে সে কারো বাবা, ছেলে, স্বামী কিংবা ভাই। কাজেই নিজের মূল্য দেওয়া শিখতেই হবে। আর সেই শিক্ষাটা শুরুই হয় নিজেকে জানার মাধ্যমেই।
একটি ছোট গল্প দিয়ে লেখাটি শেষ করি-
প্রাচীন গ্রিসের মানুষেরা মনে করতো পৃথিবীর সবকিছুর কেন্দ্র হচ্ছে গ্রিস আর গ্রিসের কেন্দ্র হচ্ছে একটা মন্দির। সেই মন্দিরটার নাম হচ্ছে ডেলফি মন্দির। সারা দেশের মানুষ ঐ মন্দিরে আসতো নিজের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে জানার জন্য।
মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে যেই প্রশ্নই করা হতো ভিতর থেকে একটা নারী কণ্ঠে প্রতিধ্বনি হয়ে উত্তরটা প্রশ্নকর্তার কাছে ফিরে আসতো। একদিন সক্রেটিসের বন্ধু মন্দিরে গিয়ে জিগ্যেস করলো, “এখন এথেন্সের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি কে”? মন্দিরের ভিতর থেকে সক্রেটিসের নাম প্রতিধ্বনিত হয়ে সক্রেটিসের বন্ধুটির কাছে ফিরে আসলো।
সক্রেটিসের বন্ধুটি যখন সক্রেটিসকে এই কথাটি জানালো তখন সক্রেটিস একটু অবাক হলেন। তখন তিনি ভাবলেন আমি তো কিছুই জানিনা, তারপরেও আমাকে সবচেয়ে জ্ঞানী বলা হলো? তিনি তখন তা পরীক্ষা করার জন্য এথেন্সের যতো জ্ঞানী আছে তাদের কাছে গিয়ে জ্ঞান সম্পর্কে জানতে চাইলেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় যার কাছেই গিয়েছেন তিনিই এমন ভাব দেখিয়েছেন যে, জ্ঞানটা যেন একা তারই আছে অন্য কারোর কাছে নেই। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলে জাহির করেছেন।
সক্রেটিস তখনই বুঝতে পারলেন যারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী বলে দাবি করছেন তারা আসলেই জানেন না তাদের সীমাবদ্ধতা কি। কিন্তু সক্রেটিস জানেন তার অজ্ঞতা কোথায়। সক্রেটিস বুঝতে পারলেন তারা নিজের সম্পর্কে জানেন না, কিন্তু সক্রেটিস জানেন এটাই তাকে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষে পরিণত করেছে। তাই তিনি বলেছেন, নিজেকে জানো, নিজেকে চিনো। যে নিজেকে চিনতে পারবে সেই পৃথিবীতে বেশি পাণ্ডিত্য অর্জন করতে পারবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে নভেম্বর, ২০১৯ রাত ১১:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



