বরাবরের মত আজো ল্যাব-এ যাইনি। শুয়েছিলাম আয়েশ করে। রাতে আহমেদ ভাই বলেছিলেন, আজকে এখানকার একটা স্কুলে বাৎসরিক স্পোট্র্স। স্কুলের কতর্ৃপক্ষ আমরা যারা ভিন দেশী তাদেরকে দাওয়াত করে গেছেন। স্পোট্র্স শেষে হালকা আপ্যায়নের ব্যাবস্থা ও আছে। এমন ধরনের অফার আহমেদ ভাই সাধারণতঃ মিস করেন না। আমি অবশ্য এ ধরণের কোন অফারের খোঁজ পাইনা। আর পেলেও হয়তো যাওয়া হত না। কারণ, এদেশের মানুষের সাথে মিশতে হলে একটু হলেও তো এদের সাথে কথা বলতে হবে। আমি তো আবার জাপানী জানি না। তবে আহমেদ ভাই বলাতে আমি সাথে সাথে রাজি হয়ে গেলাম। আরো একটা সুবিধা ছিল, আমাদের এপার্টমেন্টে যে দু'জন জাপানীজ আছে, ওরা ও যাবে সেখানে। ইংলিশে ওদের ভাল দখল আছে। মুলতঃ ওই দু'জনই আমাদের কাছে স্কুল কতর্ৃপক্ষের দাওয়াত পৌঁছে দিয়েছিল।
আহমেদ ভাইয়ের ফোন পেয়ে ওঠে পরলাম। গোসল আর নাস্তা সেরে ঝটপট রেডি হয়ে নীচে গেটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সুন্দর আবহাওয়া দেখে মনটা ভাল হয়ে গেল। মনে ফুরফুরে একটা ভাব এসে গেল। এরই মধ্যে আহমেদ ভাই বেরিয়ে এলেন। আজকে ফতুয়া আর জিন্স পড়েছি। এখানে আসার পর প্রিয় ফতুয়াগুলো পরা-ই হয়না। কি ভাবে পরব। তাপমাত্রা সবসময় থাকে দশের আশে পাশে। তাই আজকের সুযোগটা হাতছাড়া করলাম না।
হেটে গেলে পনর বিশ মিনিট লাগবে। আমরা দেশে থাকলে হয়তো রিঙ্ায় চড়ে ফুরফুরে মেজাজে গল্প করতে করতে চলে যেতাম। হঠাৎ করেই আজ কেন যেন জাহাঙ্গীরনগরের সেই দিন গুলোর কথা মনে পড়ে গেল। বসন্ত কিংবা বৈশাখের প্রথম দিনে তিন-চারজন বন্ধু একই রিঙ্ায় চাপাচাপি করে চড়ে পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ানোর সেই স্বপ্নময় সোনার দিনগুলোর কথা মনে হলেই এক খন্ড মেঘ আমার মনের আকাশটা ঢেকে দেয়। কষ্টের যে সিঁড়িগুলো বেয়ে এতটা উপরে ওঠেছি, সেখান থেকে এক লাফ দিয়ে নেমে যেতে ইচ্ছে করে। চলে যেতে ইচ্ছে হয় আমার ফেলে আসা সোনার সময়ে। প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় বন্ধু আর মানুষগুলোর কাছে। কিন্তু তার কিছুই করতে পারি না। কি করে পারব, জীবনটা যে একটা ওয়ান ওয়ে রোড। এই পথে শুধু এক দিকেই যাওয়া যায়। ফেরা যায় না।
আমি আর আহমেদ ভাই হাটতে শুরু করলাম। পনর বিশ মিনিটের পথ যেতে পুরো চলি্লশ মিনিট লেগে গেল। কারণ, যাওয়ার পথে অনেক ছবি তুলছিলাম। যাওয়ার পথে একটা মজার দৃশ্য চোখে পড়ল। চার পাঁচ জন বুড়ো, বয়স কম করে হলেও সত্তরের কাছাকাছি হবে, রাস্তার পাশের ফুলের গাছগুলোর জন্জাল পরিস্কার করছে। আমি একটু অবাক হলাম। এমন দৃশ্য আগে কখনো চোখে পড়েনি তো! আমি আহমেদ ভাই কে প্রশ্ন করলাম এরা কি করছে। জাপানে কি সক্ষম কাজের লোকের কি আকাল পড়েছে ? আহমেদ ভাই যা বল্লেন, তা শুনে ওই বুড়োগুলোর প্রতি শ্রদ্ধায় মস্তক অবনত হয়ে আসল। মনের গভীর থেকে একটা ছোট্র দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এল। কত মহৎ এদেশের মানুষগুলো। কত ভালবাসে এরা তাদের দেশকে, তাদের পরিবেশকে। সত্তোরোর্ধ ওই বুড়ো মানুষগুলো রাস্তার দু'পাশের ফুটপাথ পরিস্কার করার মত কঠিন কাজ করছে কোন ধরনের পারিশ্রমিক ছাড়াই! শুধু এই কানাজাওয়াতেই না, এই সময়টাতে পুরো জাপান জুড়েই চোখে পড়বে এমন দৃশ্য। বুড়ো বুড়ো মানুষগুলো, যারা বয়সের ভারে সোজা হয়ে দাড়ানোর ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলেছে, কি মহৎ কাজই না করে যাচ্ছে জীবনের একদম শেষ প্রান্তে এসেও। কার জন্য করছে ? কেন করছে ? এটাই কি দেশপ্রেম নয় ? এটাই কি নতুন প্রজন্মের জন্য সুন্দর পৃথিবী গড়ে যাওয়া নয় ? তবে আমরা যে দেশ প্রেম দেশ প্রেম বলে গলা ফাটাই, একজন অন্যজনকে গালাগালি করি, সেটা কি ? আমার এ প্রশ্নের কোন উত্তর কি কারো জানা আছে ?
এক সময় স্পোর্টস শুরু হল। প্রথমেই স্বুলের ছেলে মেয়েদের অংশ গ্রহনে শেষ হয়ে গেল প্রথমার্ধ। তারপর শুরু হল দ্বিতীয় পর্ব। এ পর্বে আমন্ত্রিত আতিথি সহ যে কেউ অংশ গ্রহণ করতে পারবে। অনেক গুলো ইভেন্ট আছে। যে কেউ যতটাতে ইচ্ছা অংশ নিতে পারবে। আর অংশ নিলেই পুরোষ্কার। আহমেদ ভাই আমাকে বল্লেন অংশ নিতে। আমি না করলাম। কিন্তু এক পর্যায়ে আয়োজকদের মধ্য থেকে কেউ এসে অনুরোধ করলেন। তখন আমি আর আহমেদ ভাই একটা ইভেন্টে অংশ নেয়ার আগ্রহ দেখালাম। খুবই মজার ইভেন্টাঁ। প্রতিযোগীরা একটা লাইনে দাঁড়াবে। হাত দশেক দূরে প্রত্যেক প্রতিযোগী বরাবর একটা করে কাগজ রাখা আছে এবং তাতে একটা ড্রিংঙ্-এর নাম লেখা আছে। মোট তিন ধরণের ড্রিংঙ্। ওঁচা (জাপানী গ্রীণ টি), কোকাকোলা আর মিকান (কমলার) জুস। সেই কাগজ গুলো থেকে আরো বিশ গজ দূরে তিনটা টেবিলে ছোট ছোট গ্লাসে এই তিন ধরনের জুস রাখা আছে। সাথে একটা স্ট্র। সেখান থেকে আরো বিশ গজ দুরে তিনটি উচু ব্লক বসানো আছে। ব্লক গুলো থেকে দশ গজ দূরে প্রত্যেকের জন্য তিনটি করে বেলুন রাখা আছে। এখন যেটা করতে হবে, তা হল বাঁশিতে ফুঁ দেয়ার সাথে সাথে দৌড়ে গিয়ে ওই কাগজটা নিতে হবে এবং তাতে যে ড্রিংঙ্-এর নাম লেখা আছে সেটা সামনের টেবিলে রাখা ড্রিংঙ্ গুলো থেকে বেছে নিয়ে স্ট্র দিয়ে টেনে খেতে হবে। তারপর দৌড়ে গিয়ে ওই ব্লকটা ডিঙ্গিয়ে তিনটি বেলুন হাতে নিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। খেলাটা মোটেও কঠিন কিছু নয়। তবে আমার জন্য বিপদটা ছিল অন্যখানে। আমি তো জাপানী ভাষার কিছুই জানি না। কাগজে যে জুসের কথা লেখা আছে সেটা জাপানীতে। আর দৌড়ের মাঝখানে এমন সময় ও পাওয়া যাবে না যে কেউ আমাকে বলে দেবে। আবার টেবিলে রাখা ড্রিংঙ্ ও নিদৃষ্ট। একজনেরটা অন্যজন নিতে পারবে না। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। আহমেদ ভাই বল্লেন, যেটাই লেখা থাকুক কাগছে, আপনি আপনার পছন্দ মত একটা খেয়ে চলে যাবেন। সমস্যা হলে হবে যে সবার শেষে যাবে, তার। আমি মনে মনে কমলার জুসই ঠিক করে নিলাম। যা হবার হবে। খেয়ে ফেল্লেতো আর কিছু করার থাকবে না।
আমরা প্রতিযোগীরা সবাই লাইনে দাঁড়ালাম। আহমেদ ভাইকে দেখলাম ভীষণ সিরিয়াস। জিততেই হবে। আমার পক্ষে যে কিছু হওয়া সম্ভব নয় সেটা আমি ধরেই নিলাম। ওই জুস টুকু খাওয়া পর্যন্তই। আর কোন লাভ নেই। দৌড় শুরু হল। আমি কাগজ হাতে নিয়ে তার দিকে একবার ও তাকালাম না। সোজা টেবিলে গিয়ে একটা অরেন্জ জুস নিয়ে এক টানে শেষ করে ফেল্লাম। তার পরের জায়গা গুলো পার হতে তেমন কষ্ট হয়নি। গন্তব্যে পৌছে দেখি আমার আগে একজন মাত্র পৌঁচেছে। তাকিয়ে দেখি আহমেদ ভাই তখনো ড্রিংঙ্ খাচ্ছে।
ছৌট বেলার কথা। যখন প্রাইমারিতে ছিলাম, তখন একবার বিস্কুট দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলাম। পেছনে হাত বাঁধা ছিল বলে একটু দৌড়েই পড়ে গিয়েছিলাম। তারপর দ্বিতীয়বারের মত জাপানে এসে বাচ্চাদের খেলায় অংশ নেয়া। কি যে ভাল লেগেছিল আমার। আবার ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। দিন গুলো মোর সোনার খাঁচায়, রইল না, রইল না ...।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০০৭ সকাল ৭:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



