পানির অপর নাম জীবন। ইহাতে কাহারো কোন সন্দেহ নেই। অবকাঠামো নির্মাণে এর উপস্থিতি আবশ্যক। কৃষিতে শিল্প কারখানায় , বিদ্যুৎ উৎপাদনে এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায়। শিল্প কারখানায় আবশ্যক পানি সরবরাহ হচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির আধার থেকে অবশ্যই সেগুলোর উৎপত্তি প্রাকৃতিক ভাবেই । আবার নদীর তীরে পরিবহনের সুবিধার কথা বিবেচনায় গড়ে ওঠা শিল্প কারখানা অনায়াসে তাদের রাসায়নিক বর্জ্য নদীর বুকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কতটা অকৃতজ্ঞ আমরা!!
ভূগর্ভস্থ পানি কী অসীম আধার ? কখ্খনো নয়। তবে এরও একটি চক্র আছে। সহজ উদাহরণ বৃষ্টি হয়ে শুধু নদী নালা ভরে ওঠে না ভরে ওঠে ভূগর্ভস্থ বালু আর কাদার স্তর । বালুস্তর থেকে আমরা পানি উত্তোলন করি। কাদার স্তর থেকে করা যায় না। তবু কাদা আবার ইঞ্জিনিয়ারদের মাথা ব্যথার অথবা কর্মপরিকল্পনার ভাইটাল ইস্যু । প্রচণ্ড খরতাপে এগুলো শুষ্ক হয় আবার বৃষ্টিতে আর্দ্র হয়ে ওঠে সঙ্কুচন প্রসারণের খেলায় অবকাঠামো গুলোকে অনিশ্চিত অবস্থায় ফেলে দেয়। সেটা এই পোস্টের লক্ষ্য নয়। লক্ষ্য হলো খাবার পানি।
আমরা নদীর বুকে আবর্জনা রাসায়নিক পদার্থ ভাসিয়ে দিয়ে নাকে সরষের তেল দিয়ে ঘুমাই । আমাদেরর কী একটুও ভাবা উচিত নয়? নদীতে কত প্রাণীর বাস; মাছের বাস । তাদের কী অবস্থা? তারা যদি বিষাক্ত জিনিস খায় তাহলে কী আমরা তাদের খেয়ে বিষ খেয়ে নিচ্ছি না ? আমাদের জীবন নাশ করছি না?
নদীর পানির কিছু অংশ ভূগর্ভস্থ পানির আধারে জমা হচ্ছে কিছু যাচ্ছে সাগরে আর কিছু বাষ্প হয়ে আকাশে বৃষ্টির ঘটাবার মেঘ হয়ে । সেটা আজকের লেখার প্রতিপাদ্য নয়। আমি বলছি আমাদের বেঁচে থাকার কথা। আমাদের সুপেয় পানির কথা। জীবনের কথা ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা; তাদের নিরাপদ আবাস সুনিশ্চিত করার কথা।
জীবনের প্রথম মৌলিক চাহিদা পানি তার কথা। যখন জানলাম ঢাকা মহানগরীর ভূআভ্যন্তরীণ পানির প্রথম স্তরের পানি আমরা শেষ করে ফেলেছি, ২য় স্তরের পানি আমরা ব্যবহার করছি উল্লেখ্য যে অপচয় ও করছি নির্বোধের মতো। আর ঢাকা ওয়াসার পরিকল্পনা আগামীতে পানির ৭০ ভাগ পানির সরবরাহ করা হবে নদী থেকে। কখনো কী আমরা ভেবেছি আমাদের চারদিকে ঘিরে থাকা নদীগুলোর কথা? কতটা দূষণ দূর্গন্ধ বুকে নিয়ে তারা সতত প্রবাহিত। আরো গভীরে গেলে তাদের উৎসের কথা; নদী চুক্তি ;নদীর আন্ত সংযোগের কথা। তথ্য উপাত্তের বিশ্লেষণে আজ যাচ্ছি না আমি। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ধলেশ্বরী নদীর তীরে আমরা অযৌক্তিক ভাবে গড়ে তুলছি শিল্প কারখানা উৎপাদ সহজে বাজার জাত করার জন্য অথচ নদীগুলো বিষাক্ত হয়ে ওঠছে মাছ মরে ভেসে ওঠছে আর আমরা মাছ মারার উৎসবে মেতে উঠেছি।
একবারও ভাবছি না এসব নদীতে অসংখ্য পাঙ্গাস ছেড়ে নদী দূষণ প্রশমনের কথা। আমাদের দেশে সুপেয় পানির প্রাপ্যতা অনেক বেশি। ভাবুন তো যে দেশে খরা মরুভূমি তাদের কথা। গভীর ভাবে ভাবলে ভূগর্ভস্থ পানি সারা পৃথিবীর; কোনো দেশের নয়। সেই বিবেচনায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা বলতে গেলে অনুচিত। সম্পদের বিবেচনায় পানি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ । আর তাই পানি নীতি সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
সারা দেশে ভূগর্ভস্থ পানির ভৌতরাসায়নিক গুণাগুণ তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে এলাকাভেদে নিরাপদ পানি সংগ্রহের টেকসই মাত্রা নির্ধারণ করা উচিৎ। দেশের টেকসই উন্নয়ন করতে হলে সর্বাগ্রে ভূগর্ভস্থ পানি ও উন্মুক্ত জলাধার নীতি প্রেক্ষিতপ্লানে অন্তর্ভূক্ত করা উচিৎ । এমডিজি বাস্তবায়নেও লাগসই সুস্পষ্ট পানি নীতি আবশ্যক। বৃহত্তর ঢাকা মহানগরীতে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। তাদের নাগরিক অধিকারের প্রথম অধিকার নিরাপদ সুপেয় পানি। সেটা নিশ্চিত করতে হলে বুড়িগঙ্গা তুরাগ ধলেশ্বরী নদীর পানি দূষণ রোধ করতে হবে।
ঢাকা মহানগরীর বুকে অধিকাংশ এলাকায় সিমেন্ট সিলিঙ হয়ে যাওয়াতে পানির উলম্ব প্রবাহ বিঘ্ন হয় । ভূগর্ভস্থ প্রবেশের স্তরে পানি প্রবেশ করতে পারে না। অধিকাংশ বৃষ্টির পানি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ে বর্ষার সময় কৃত্রিম জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। মানুষের যাতায়াতের বিঘ্ন ঘটে। নগরজীবন বিবর্যস্ত হয় । নদীর দূষিত পানিতে মিশে দূষিত হয়ে যায়। সেখান থেকে দুর্গন্ধ যুক্ত পানি ভূঅভ্যন্তরে প্রবেশ করে । আর এভাবেই শুধু নদী জলাধারের পানি নয় ভূগর্ভস্থ পানিও দূষণের শিকার হয়। আমরা নিশ্চিন্তে দূষিত পানি পান করে স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করি। তাই এখনি সময় পানি বিষয়ে ভাবনার। একটি পানি নীতি প্রণয়ন করা উচিৎ। মনে রাখবেন ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের আওতার বাহিরে নয় । যদিও এর দূষণের মাত্রা সারফেস ওয়াটারের তুলনায় অনেক কম ফলে পানির গুণাগুণ শ্রেয়তরো ।
প্রত্যেকটি শিল্প কারখানায় দূষিত পানি বিশোধন প্লান্ট স্থাপন আইনের মাধ্যমে সুনিশ্চিত করা দরকার। যেসব শিল্প কারখানায় এটা থাকবে না সেটা বন্ধ করতে হবে দেশের স্বার্থে দশের স্বার্থে লাগসই উন্নয়ন নিশ্চিৎ করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রফেসর ডঃ কাজি মতিন আহমেদ একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভূরসায়ন ও পানি বিশেষজ্ঞ। এ বিষয়ে স্যারের অনেক গবেষণা আছে। আরও আছেন শ্রদ্ধেয় প্রফেসর ডঃ কামরুল হাসান যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতম হাইড্রোজিওলজিস্ট তারও বিশাল জ্ঞানভান্ডার। আমার অত্যন্ত স্নেহাস্পদ ড. মাহফুজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভূতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক অত্যন্ত মেধাবী এবং একজন দূর্দান্ত গ্রাউন্ড ওয়াটার মডেলিং এক্সার্ট। এছাড়াও বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপের ভূরসায়ন ও পানি সম্পদ শাখা রয়েছে যার শাখা প্রধান পরিচালক (ভূতত্ত্ব ) জনাব আলী আকবর । এছাড়াও বুয়েটসহ প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে রিসোর্স পারসন; ডিপিএইচ ই , বাংলাদেশ ওয়াটার বোর্ড, আইডব্লিউএম, জাইকা , গ্রাউন্ড ওয়াটার রিলিফ প্রভৃতি। এসব সংস্থার রিসোর্স পারসনের সমন্বয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের গ্রাউন্ড ওয়াটার রিলিফ বিষয়ক মডেলিঙ গুরুত্বের দাবি রাখে। টেকসই পানি নীতি ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব । তাই বাঁচতে হলে জানতে হবে। অবাধ জ্ঞান প্রবাহ থাকতে হবে। মুক্তচিন্তার বিকাশই পারে আমাদের উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে।
সামহোয়্যারইনব্লগ মুক্তমনাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। দেশপ্রেমিকদের তালিকা করলে প্রথম দিকের সবগুলো স্থান ব্লগাররা দখল করবেন এটাই আমার বিশ্বাস। না হলে এতো কবিতা হতো না গল্প হতো না ক্যাওয়াচ হতো না। আমার, তোমার, আমাদের সকলের উপস্থিতিতে ব্লগ ডে সফল হোক ;পানি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন হোক দেশের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে নভেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



