somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্পঃসান্ত্বনা

২৮ শে মার্চ, ২০১৪ বিকাল ৪:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

- কিরে বল্টু ব্যাটারি? কি খবর? লিমার খবর কি?

রোদ একটু অবাক হয়ে মিজানের দিকে তাকাল। কথাগুলো দাঁত বের করে মিজান বলছে। বিশ্বাসই হচ্ছে না রোদের। বন্ধুদের মধ্যে, সবচেয়ে চুপচাপ আর ভদ্র ছেলে থেকে থাকে, তা হল মিজান। আর মিজান কিনা, রোদকে বল্টু ব্যাটারি ডাকছে। আবার প্রাক্তন প্রেমিকার কথাও জিজ্ঞেস করছে। রোদ একটু খাটো, আর চোখে চশমা পরার কারণে, ক্লাসের সবাই বল্টু ব্যাটারি ডাকে। প্রথম প্রথম অনেক খারাপ লাগত। পরে শুনতে শুনতে ঠিক হয়ে গেছে। আর রাগ লাগে না।
- তুই আমারে এগুলা বলতেছিস? কি হইছে তোর?
- হাহা, কি হবে বল? তুই বল্টু ব্যাটারি তোরে কি বলব?
-ভাল হইছে।
- তোর লিমার কি খবর? মেয়েটা কিন্তু সেই সুন্দর ছিল। কেন যে ব্রেক আপ করলি। আমার ঐ মেয়ের সাথে প্রেম থাকলে, সারাদিন হাত ধরে বসে থাকতাম। আইসক্রিম খেয়ে, ওড়না দিয়ে মুখ মুছতাম। হাহা।
- ঐ চুপ।

রোদ ধমক দিয়ে মিজানের দিকে তাকায়। ছেলেটার হল কি? কারণ ছাড়াই হাসছে। মেয়ে ঘটিত ব্যাপার নিয়ে, নানা কথা বলছে। এই ছেলেই সারাদিন রুমের এক কোণে বসে থাকে, মন খারাপ করে। হাসে না, কারও সাথে কথা বলে না। মাঝে মাঝে বাসায় ফোন দিয়ে কাঁদে। বাবাকে কি সব বলে আর কাঁদে। কেউ ফোনে, কাঁদার সময় তার আশেপাশে থাকতে হয় না। ওর পাশেও থাকে না কেউ। ভার্সিটি পড়ুয়া একটা ছেলে, প্রতিদিন বাবাকে ফোন দিয়ে কাঁদে। কেমন যেন লাগে। হাস্যকর লাগে। তাই, মিজানকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করেও। ক্লাসের সবাই হাসাহাসি করে মিজানকে নিয়ে। ভার্সিটিতে হাবিব স্যার ক্লাস নেন। অনেক কড়া শিক্ষক। কেউ কথা বললেই, বাহিরে বের করে দেন, ক্লাস থেকে। প্রতিদিন ক্লাসের বাহিরে দাড়িয়ে থাকে, মিজান। হাতে খাতা নিয়ে, দাড়িয়ে দাড়িয়ে স্যার এর লেকচার তুলে। কেউ কথা বললেই স্যার বলেন, এই কে কথা বলল?
সবাই আঙ্গুল তুলে মিজানকে দেখায়। আর মিজান বলদের মত তাকিয়ে থাকে। ক্লাস থেকে বের করে দেয়। বের হয়ে চলে যায়। রোদের মাঝে মাঝে খারাপ লাগে। কিন্তু কিছু করার নেই।
সারাদিন মন খারাপ করে থাকা ছেলেটা আজ হাসছে। ভদ্র ছেলেটা দুষ্টামি করছে। মিজান আবার বলে যাচ্ছে, তোরা পারিস ও। ব্রেক আপ হয়ে গেছে। তাও ফুছুর ফুছুর করে সারাদিন কথা বলিস। লিমাও কেমন, তোর মত বল্টুর সাথে এখনও কথা বলে। আচ্ছা তোরা কি হিসেবে কথা বলিস? বন্ধু? তোরা তো বন্ধুও না।
- চুপ। পেট ফাটাইয়া দিব। আমার এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথে কথা বলি, তাতে তোর কি?
- হাহা, কেউ তার এক্স গার্লফ্রেন্ডের সাথে সারাদিন কথা বলে? যে চলে যায়, তার জন্য থাকে রাগ, ঘৃণা। হাহা।
- আমি বলি।
- বল বল। দোস্ত, আমি যদি একটা চান্স নেই, লিমা কি রাজি হবে?
- আচ্ছা তোর হইছে কি? ফাজলামি করতেছিস কেন? মন ভাল আজ এতো?
- হাহা আসলেই রে,অনেক ভাল। মনটা অনেক ভাল হাহা।

পাগলের মত শব্দ করে হাসছে মিজান। রোদের কেমন যেন লাগছে। পাগল হয়ে যায় নায় তো আবার? হাসছে তো হাসছেই। হাসতে হাসতে রোদকে হঠাৎ জড়িয়ে ধরল। জড়িয়ে ধরেই কাঁদছে মিজান। শব্দ করে হাসি, এখন শব্দ করে কান্না।
- দোস্ত, মনটা অনেক ভাল। অনেক ভাল। আমার আর কাঁদতে হবে না। তোরা ট্যাগরা মিজু ডাকলেও আর কাঁদতে হবে না।

মিজানের এক চোখে একটু সমস্যা আছে। তাই ক্লাসের সবাই ট্যাগরা মিজু ডাকে। মিজান কখনও কিছু বলে না। কারও কথার উত্তর দেয় না। চুপ করে বসে থাকে। কারও সাথে কথা বলে না। মিজান বলেই যাচ্ছে, রোদকে জড়িয়ে। কেঁদে কেঁদে বলে যাচ্ছে, তোরা দেখতি না, আমি আমার বাবার সাথে ফোন করে কাঁদতাম। তোরা হাসাহাসি করতি আমাকে নিয়ে। কেন কাঁদতাম জানিস? তোরা আমাকে ট্যাগরা মিজু ডাকতি। তোরা আমাকে নিয়ে সবসময় ঠাট্টা করতি। সব কিছুতেই আমাকে দোষ দিতি। আমার অনেক কষ্ট হত। অনেক বেশি। আমার সহ্য হত নারে। আমি তাই বাবাকে ফোন দিতাম। আমার ভাল আব্বুকে। ফোন দিয়ে, কাঁদতাম। সব বলতাম বাবাকে। বাবা ঠিক আমার মন ভাল করে দিত। আমি অনেক বার বলেছি, "আব্বু আমি হলে থাকব না। আমার এখানে ভাল লাগে না।" আমার আব্বু বলে, "ওখানে সবাই বন্ধু। মানুষের সাথে না মিশলে, জীবনকে চেনা যায় না। বোঝা যায় না। কোন কিছুতে কষ্ট পাবার দরকার নাই। হাসবে সবসময় হাসবে। দেখবে কষ্ট নেই।" আমার তাও কষ্ট হত। কিছু হলেই,আব্বুকে কল দিয়ে কাঁদতাম। রোদ আমি এখন কাকে কল দিয়ে কাঁদব? তোরা ট্যাগরা মিজান ডাকলে, আমার কষ্ট হলে আমি কি করব তখন? ক্লাসের সামনে স্যার দাড় করিয়ে রাখলে, আমি কি করব তখন? তোরা বিছানায়, ময়লা ফেলে রাখলে, আমি কি করব তখন? আমার আব্বু যে আর কল ধরবে না। কতবার কল দিলাম, বার বার বড় ভাইটা ধরে। আব্বু ধরে না। আর কখনও ধরবে না। আব্বু হারিয়ে গেছে। অনেক দূরে হারিয়ে গেছে। আমাকে একা রেখে চলে গেছে। একটু বুকে হাত দিয়ে দেখ, কত কষ্ট হচ্ছে। অনেক কষ্ট রে। এতো কষ্ট কখনও হয় নায়। আমাকে কষ্টে রেখে আব্বু চলে গেল। আমাকে আব্বু বলছে কষ্ট হলে হাসতে। আর কষ্ট হবে না। সবার সাথে মিশতে। আমি আব্বুকে ছাড়া থাকব কি করে?

গলা ধরে আসছে মিজানের। এখনও কি যেন বলছে। তবে বুঝা যাচ্ছে না। হাউ মাউ কান্নার সাথে, ঐ শব্দগুলো পেরে উঠছে না। তবুও কষ্ট থেকে রেহাই চাচ্ছে। কষ্ট থেকে রেহাই পাওয়া এতো সহজ হয়ত না। রোদ মিজানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে। রোদেরও চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ব্যথা করছে বুকে। মানুষ যে কষ্ট পায় নি, তা নাকি কখনও অনুভব করতে পারে না। কিন্তু রোদ অনুভব করছে। মিজানের বাবা হারাবার কষ্ট। সান্ত্বনার ভাষা রোদের জানা নেই। এই অবস্থায় সান্ত্বনা দেয়া যায় না। আমরা কিছু হলেই, সান্ত্বনা দেই, সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছু জিনিস কখনই ঠিক হবার না। হয় না কখনও। কিছু ক্ষেত্রে সান্ত্বনার ভাষা আমরা জানি না। ব্রেক আপ হল, বলে দিতে পারি, ধুর ওর চেয়ে ভাল একটা পাবি। পরীক্ষার ফল খারাপ হল। বলে দিতে পারি, একটা পরীক্ষা খারাপ হলে কিছু হয় না। আর এতো পড়ে কি হবে? কষ্টে আছে, বলে দিতে পারি, সব একসময় ঠিক হয়ে যাবে। তবে বাবা মা বা আপনজন হারাবার কি সান্ত্বনা হতে পারে। তা বোধহয় জানা নেই কারও। রোদেরও নেই। রোদ মিজানকে কাঁদতে দিচ্ছে। কাঁদুক ছেলেটা। হাসুক ছেলেটা। পাগলামি করুক ছেলেটা। কষ্ট গুলো কেঁদে কেঁদে ধুয়ে ফেলুক। ঝুম বৃষ্টির পর, রোদ উঠবেই। একটু অপেক্ষা আর একটু চাওয়া। কিছু জিনিস হারালে ,আর কখনও ফিরে পাওয়া যায় না। তবুও হারিয়ে যাওয়া জিনিসের প্রতি ভালবাসা থেকে যায়। মরে গেলে ভালবাসা যায় না। তাই বেঁচে থেকে ,হারিয়ে যাওয়া জিনিসকে ভালবাসতে হয়। ভালভাবে বেঁচে থেকে, ভাল ভাবে ভালবাসতে হয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০১৪ বিকাল ৪:১৭
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×