স্বস্তিকা কি যে অস্বস্তি টিম,
আপনাদের সবাইকে সাধুবাদ ও অভিনন্দন একটা চমৎকার সৃষ্টির জন্য। অনেকদিন পর চিন্তা উদ্রেককারী একটি প্রযোজনা নজরে এল আর তাই সকল কলাকুশলী, সহকারী ও চ্যানেল আইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা। প্রথমেই পরিষ্কার করে নেই যে বাবা অথবা মা কে দোষী এ জাতীয় সরল দ্বৈততার ফাঁদে পড়তে চাইছি না। বানিজ্যিক স¤প্রসারণের প্রসঙ্গটা অস্বীকার করছি না বলেই সে বিষয়ে তেমন কিছু বলছি না। আর আমার বলারও তেমন কিছু নেই।
এবার মূল প্রসঙ্গে প্রবেশ করা যাক। নির্দেশনা, ঘটনা বিন্যাস, চরিত্রায়ণ, ক্যামেরার কাজ এবং সংগীতের ব্যবহার চমৎকার হয়েছে বলাই যথার্থ। বিশেষত লং ও ক্লোজ শটের মিশেলটা অনবদ্য। ঢাকার সবুজ রূপটা চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। তবে সবচেয়ে যেটা আকর্ষনীয় সে বিষয়েই সরাসরি চলে আসি। প্রথমত ঘটনা.....। নিজ সিদ্ধান্তে জেদী এবং স্ব স্ব ক্ষেত্রে সফল দুই আধুনিক নারী পুরুষ এবং তাদের টানাপোড়েনের গল্প বললেই পুরোটা বলা হয়না জানি। আর গল্পের মূল ফোকাস বরং বাবা মা হিসেবে এদের দুজনার এবং তাদের সন্তানের টানা পোড়েন। শ্রেণী বিশ্লেষণে প্রত্যেকেই উচু তলার বাসিন্দা। তাই গল্পটা বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে তথাকথিত ‘আপামর’ দর্শকের কাছে মানিয়ে যায় বইকি। যদিও আমার মনে হয় এদেশের দর্শক এর চেয়েও বেশি জটিলতা নিতে সক্ষম।
খুব সরল চোখে দেখলেও চোখে পড়ে যে গল্পের নারীর কাছে পুরুষের যে অস্বস্তি অর্থাৎ স্বস্তিকার প্রতি তার প্রাক্তণ স্বামীর যে বর্তমান উপলব্ধি অথবা পূর্বেরও..(তার একটি রূপ এখন বাবা হিসেবে) তা আবশ্যকভাবেই পিতৃতান্ত্রিক। এমনকি চরিত্ররা তা উপলব্ধি না করলেও। কিন্তু তারপরও স্বস্তিকার কন্ঠে উচ্চারিত হয় উৎকৃষ্ট স্বামী না হলেও নিশ্চিতভাবে প্রধান পুরুষ চরিত্র সার্থক বাবা। আবার অন্যভাবে বললে নিজের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য মায়ের ডেনমার্ক চলে যাওয়াতে হয়ত দর্শক মাকেই দোষী সাব্যস্ত করবে।
একটা বিষয় খেয়াল করার মত আর তা হল বাবা মা তাদের সন্তান নিয়ে যে প্রধান অস্বস্তিতে পড়েছিলেন তা হল ‘ইনসেস্টের’ বা ‘অজাচারের’ যা আবার উত্তরাধিকার, রক্তের সম্পর্ক বিষয়ের সাথে সর্ম্পকিত। আমি অনেকটা যেন দেখতে পাচ্ছিলাম স্বস্তিকার নিজের মেয়ে না হওয়ার বিষয়টা দর্শকদের এবং নাটকের চরিত্রদের কিভাবে স্বস্তি এনে দিয়েছে। কিন্তু লক্ষ্যনীয় যে, দুটি প্রধান ঘটনাতেই নারীটিকে চলে যেতে হল তাদের প্রিয়জনদের ফেলে। প্রথম যাওয়াটিকে স্বেচ্ছায় বলা গেলেও পরেরটি সেভাবে হয়ত দেখার জো নেই।
একটা বিষয় নিশ্চিতভাবেই এখানে বলা দরকার যে প্রধান নারী চরিত্রের স্বামী হিসেবে হয়ত দ্বিতীয়জন প্রথমজনের তুলনায় বেশি সার্থক হিসেবে উপস্থাপিত যদিও বাবা হিসেবে তার ভূমিকাকে ঠিক ততটা বোঝা যায়নি, অথবা লেখকও সেটা বুঝতে দিতে চাননি। বাবা দিবস হিসেবে ‘বাবার সাথে সম্পর্কের’ বিষয়টিকে ফোকাস করা হলেও আমার কাছে কেবল আরেকটা মেসেজ এর মধ্যে রয়েছে বলে মনে হয়েছে। গল্পটিতে দেখা গেছে যে দুই প্রধান নারী পুরুষের সম্পর্ক বেশ ’সম’, ’আত্মসম্মান পরায়ণ’, ’অনেকটুকুই ইগো কনফ্লিক্ট’। আবার এদের দুজনার কেউই পরস্পরের জন্য ঘৃণা তৈরী করতে চায়নি। আবার নারী চরিত্রের দ্বিতীয় স্বামীও স্ত্রীর স্ব অবস্থান ও সম্পর্কের বিষয়ে ‘উদার’ ও ‘উন্মুক্ত’। যেটা বেশ শিক্ষনীয়। দীর্ঘকাল পরে প্রধান পুরুষ চরিত্রে উপলব্ধি যে স্ত্রীকে ডেনমার্কে যেতে বাধা দেয়া স্ত্রীর কাছে ‘আধিপত্যপরায়ণ’ বলেই মনে হয়েছিল। যেটা সন্তানের জন্য হয়ত ভালো হয়নি। আবার হয়ত ভালোও হয়েছে না হলে পুরুষটির ‘বাবা’ রূপটির হয়ত বিকাশ হোতনা। কিন্তু তারপরও জাজমেন্ট করার অবস্থায় না থেকেও বলা যায় বাবা মার একসাথে থাকাই সন্তানের জন্য সবচেয়ে ভালো এমনটা আদর্শ ধারণায় হয়ত আছে কিন্তু বাস্তবে ভুরিভুরি বিপরীত উদাহরণও আছে।
মি: আফজাল যে জটিল নাগরিক চরিত্রে সবসময় ভালো করেন তা আবারো বোঝা গেল এবং ইলোরা গহর্রেও যে এ বিষয়ে মুন্সীয়ানা আছে তা বোঝা গেল। খুবই দারুণ ভাবে উঠে এসেছে বাবা-ছেলের বন্ধুত্বপূর্ণ খোলা সম্পর্ক, যদিও বাবা ছেলের কাছ থেকে তার মায়ের বেঁচে থাকার কথা লুকিয়েছেন, যেমন মা লুকিয়েছেন মেয়ের এডোপটেড হবার কথা। সবমিলিয়ে দ্বান্দ্বিকতার নানা রূপ আসলে; একটা সময় পর্যন্ত যেমন একদিকে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে একই জরায়ু যদিও ভিন্ন পুরুষ দ্বারা সৃষ্ট দুই নারীপুরুষ (বৈবাহিক, অর্থাৎ যৌণ সম্পর্কে যেতে পারবে কিনা) কোন সম্পর্কে থাকবে , বর্তমানে; দুই একদা স্বামীস্ত্রীর সম্পর্ক কেমন, মেয়েটি তার জন্মসূত্রের কথা শুনলে কেমন প্রতিক্রিয়া হবে, সামাজিক শ্রেণী একটা বিরাট বিষয়, সম্পর্কের আপনত্ব বা নৈকট্য কিভাবে সমঝোতায় আসবে ইত্যাদি নানা বিষয়। এখানে একটা নাটকীয়তা বেশ কুশলী..যেমন ছেলেটির মেয়েটিকে ‘হট’ মনে করার পরই ঘটনায় অকস্মাৎ নতুন মোড় একেবারে দর্শকদের সিটে জমিয়ে দেবার মত।
আমি নারীপুরুষ সম্পর্ক, লৈঙ্গিক রাজনীতি, শ্রেণী, উত্তরাধিকার, রক্তসম্পর্কবিহীন আত্মীয়তা এমন নানা বিষয় নিয়ে পুরো গল্পের উন্মোচন লক্ষ্য করছিলাম মনোযোগ দিয়ে। ভাবছিলাম বাবা দিবসের পরিবেশেও হয়ত পরিশেষে বাবার চরিত্রকেই দোষী (খুবই সরলীকরণ হলেই কেবল) করা হবে। আবার এটাও ভাবছিলাম হয়ত হবেনা। কিন্তু গল্পটাকে মনোযোগ দিয়ে বুঝতে পারলে বাবা বা মা কাউকে দোষী ভাবা আসলে হয়না। তবে হয়ত আমরা জাজমেন্টাল হতে পছন্দ করি। কিন্তু সে চেষ্টা না করার ফলশ্র“তিতে সাধের এন ৭০ অর্জনের একটা মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া হল বোধহয়।
যাই হোক পুরুষের না বাবার; নাকি নারীর চেয়ে বেশি মায়ের কার অস্বস্তি যে আসলে বেশি অথবা ছেলেমেয়ে দুজনার মধ্যে কে অনেক বেশি আক্রান্ত অসহায় বোধ করছে. সে বিতর্কে প্রবেশ না করেই লেখা শেষ করছি। আবারো আলাদাভাবে না বলে পুরো টিমকেই অভিনন্দন। আমরা অচিরেই হয়ত ভিন্নতর জটিলতাকে এবং বাস্তব অ-বাস্তবকে আরো শাণিত ও সূক্ষভাবে দেখতে পাব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



