খাদ্যবহির্ভূত পণ্য (শিল্পপণ্য) নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার পর এবার বাড়ছে খাদ্যপণ্যের দাম। নভেম্বর মাসে আটা, ডাল, মাছ, গোশত, মসলা, দুধ ও অন্যান্য খাদ্যসমাগ্রীর দাম বেড়েছে। এর প্রভাবে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৪৫ শতাংশে। অক্টোবর মাসে এর হার ছিল ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়ে গেছে। নভেম্বর মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট হিসাবে মূল্যস্ফীতি হয়েছে ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। অক্টোবর মাসে এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ, আর খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩১ শতাংশে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রতিবেদন সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপক প্রভাব পড়েছে জনজীবনে। বৃদ্ধির এ হার শহরের তুলনায় গ্রামে আরও বেশি। এজন্য বলতে গেলে, নাভিশ্বাস উঠেছে গ্রামের মানুষের। নভেম্বরের তুলনায় দশমিক ৩৩ শতাংশ হারে বেড়েছে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের দাম। অর্থনীতিবিদরা বলছে, সরকারের সার্বিক কর্মকান্ডে ভবিষ্যতে মূল্যস্ফীতির গড় হার কমবে না বরং বাড়বে।
এক মাসের ব্যবধানে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে দশমিক ২৮ শতাংশ। খাদ্যে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির এ হার শহরের তুলনায় গ্রামে বেশি। গেল মাসে গ্রামীণ পর্যায়ে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ। পিছিয়ে নেই শহরের খাদ্যপণ্যের দামও। শহর এলাকায় খাদ্যে মূল্যস্ফীতির হার ছিল গত মাসে ৩ দশমিক ৩৫ শতাংশ। কিন্তু নভেম্বরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
মূলত: খাদ্যদ্রব্যসহ নিত্যপণ্যের দামের উলম্ফন চলছে অনেক দিন ধরেই। এর একটি কারণ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যর্থতা। কিন্তু যখন দাম বৃদ্ধির কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে না, তখন বুঝতে হবে এর পেছনে কাজ করছে কারসাজি বা অন্য কোন অসৎ পন্থা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তেমনটিই লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যেসব খাদ্যপণ্য আমদানিনির্ভর, অভ্যন্তরীণ বাজারে সেসব পণ্যের দামের ওঠানামা নির্ভর করার কথা আন্তর্জাতিক বাজারের দাম অনুযায়ী। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক পণ্যের দাম কমলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে সেসব পণ্য বিক্রি হচ্ছে বেশি দামে। যেমন, গত এক মাসে বিশ্ববাজারে গমের দাম ৫ দশমিক ২১ শতাংশ, পরিশোধিত চিনির দাম ২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মসুর ডালের দাম দশমিক ৭১ শতাংশ কমেছে। কিন্তু এর কোন প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারে পড়তে দেখা যাচ্ছে না। বরং কোন কোন পণ্যের দাম আরও বেড়েছে। সয়াবিন তেল, পাম তেল, মসুর ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, আদা ইত্যাদি পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে স্পষ্টভাবেই অসঙ্গতিপূর্ণ। বোঝাই যাচ্ছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে এ দাম বৃদ্ধি অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে দেখা দরকার কারা এ পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। অভিযোগের আঙুল উঠেছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ও ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কতিপয় ডিলারের দিকে।
অসৎ ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে বাজারে পণ্যের সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেয় এমন অভিযোগ আমরা দীর্ঘদির ধরেই শুনে আসছি। কিন্তু কখনও তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। বাজারে সিন্ডিকেটের উপস্থিতি থেকে থাকলে তা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সরকারের। সেটি মূলত দু’ভাবে করা যায়। একটি বাজার মনিটরিংয়ের মাধ্যমে, অন্যটি সরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত পণ্য আমদানি ও সরবরাহ করে।
অন্যদিকে টিসিবির মূল কাজ বাজারে অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতির উপর নজর রাখা এবং সে অনুযায়ী পণ্য আমদানি করে দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা। কিন্তু বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই টিসিবি এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর পেছনে নানা কারণ রয়েছে। টিসিবির কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দর্নীতিরও অভিযোগ আছে। তবে এবার যে অভিযোগটি উঠেছে তা হলো, টিসিবির কিছু অসৎ ডিলার পণ্য উত্তোলন করে তা বেশি দামে চোরাইপথে বিক্রি করে দিচ্ছে। ফলে বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, বাজার স্থিতিশীল রাখা যাদের দায়িত্ব, তাদের কারণেই দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক। মূল্যস্ফীতির কারণে যখন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে, তখন অসৎ পন্থার আশ্রয় নিয়ে কিছু মানুষ ফুলে ফেঁপে উঠছে। এটি কঠোরভাবে দমন করা দরকার।
উল্লেখ্য, এমনিতেই দেশের ৪০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তার ওপর লাগামহীন এ খাদ্য মূল্যস্ফীতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এ অবস্থায় দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্র হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের ওপর রেকর্ড খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রভাব বেশি পড়ছে। শহরাঞ্চলে সরকারী শিক্ষার ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়াতে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে দরিদ্র পরিবারগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ভেঙ্গে পড়তে পারে। মানুষের কাছে মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্যের প্রয়োজন সবার আগে। খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হলেই সে কেবল অন্য চাহিদাগুলোর কথা ভাবার অবকাশ পায়। মূল্যস্ফীতির কারণে খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় নিম্নবিত্তের মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় ১ ডলারের নিচে। উচ্চ খাদ্যমূল্যের জন্য জনসংখ্যার এই বিরাট অংশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জীবনযাপন করছে।
জনদুর্ভোগ লাঘবে তাই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া সরকারের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


