somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পদচিহ্ন : দাগ কটে যাই

১৮ ই মার্চ, ২০১৪ সকাল ৭:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মায়া লাগাইছে পিরিতি শিখাইছে
দেওয়ানা বানাইছে ...
কি যাদু করিয়া বন্ধে মায়া লাগাইছে।

বাসের পাশের সীটে বসা এক সহযাত্রী হঠাৎ কথা বলে উঠলেন- ভাই, আপনি কি মিডিয়া বা পাবলিক রিলেশন টাইপের কোন কাজের সাথে জড়িত? -কেন? তড়িৎ প্রশ্ন তমালের। -না মানে, কেন যেন মনে হচ্ছিল আপনাকে এই প্রশ্নটি করা যায়। আপনি নিশ্চয়ই কিছু মনে করবেন না, তাই করলাম। -কেন? আমাকে দেখেই আপনার বিশ্বস্ত কেউ মনে হলো? -হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন। আপনার মধ্যে একটা সরলতা আছে। -সরলতা মানুষকে বিশ্বাসযোগ্য করে? -সবসময় না, তবে বোঝা তো যায়। চটকদার এই মিসডিজিটাল যুগে কারো সরলতা যে যেকোন মুহুর্তে অভিনয় হতে পারে, যেকোন হীন স্বার্থ উদ্ধারে তা পাঠকগণ নিশ্চয়ই সহজে অনুধাবন করবেন। কিন্তু তাই বলে কি সরলতা বা সারল্য বা সরল এই কথাগুলোকে একদমই বিশ্বাস করবো না? যা কিছু ঠিক তা ঠিকই। আর যা ঠিক নয় তা বজর্নীয় বা পরিত্যাজ্য। তবে চৌকস থাকাটা নিশ্চয়ই ঠিক। না, লোকটির কোন বাজে উদ্দেশ্য ছিল না। পুক্সক্ষানুপুক্সক্ষভাবে পরখ করে, ঐ সহযাত্রীর সবটুকু আচরণ, আচরণের ক্ষণিক ত্রুটি বা বিচ্যুতি বা মুভমেন্ট, অঙ্গভঙ্গি সব অবলোকন করে যা বোঝা গেল তা হলো, সত্যি লোকটির মনস্তত্ত্বে ছাপ ফেলেছে তমালের সাধারণ জেশ্চার-পোশ্চার, কথাবলা, চাহনী, কন্ডাক্টরের সাথে ভাড়ার লেনাদেনা সবকিছু। লোকটির গন্তব্যে বাস পৌঁছে যাওযায় নেমে গেল সে। যাবার সময় ভিজিটিং কার্ডটা চেয়ে নিল। তমাল ভাবছিল, লোকটি তার মধ্যে কি দেখল যে এমনি এমনিতেই ভক্ত হয়ে গেল? বগুড়ার সাতমাথার এক অফিসে সন্ধ্যায় পৌঁছল তমাল। লাগেজটা গেস্টরুমে রাখতে না রাখতেই ঘন্টা কয়েক আগের সহযাত্রীর মোবাইল কল- ভাই, ভালভাবে পৌঁছতে পেরেছেন? বাকি পথে কোন সমস্যা হয়নি তো? ভদ্রতা করে তমাল বলল- আপনার বাড়িতে সবাই ভাল আছেন তো? -হ্যাঁ, ভাল আছে। আর আপনার কথা আমার ওয়াইফের সাথে বলেছি। -হায় হায়, কি বলেছেন? আমার আর আপনার মাঝে এমন কিছুই হয়নি যা গল্প করে বলা যায়। -না, তবে কেন যেন আপনার গল্প করা যায়।

চর। ধু ধু বালু আর বালুকারাজি। কাশবনের সাদা সাদা ফুলগুলো দেখতে ময়মনসিংহের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া বহ্মপুত্রের তীর ধরে হাঁটছিল তরুণ কয়েকজন শিক্ষার্থী। বহ্মপুত্রের বরপুত্র আর নেই, সে এখন -এই খানে এক নদী ছিল জানলো না তো কেউ, আমার একটা নদী ছিল জানলো না তো কেউ... টাইপের হয়ে গেছে। অর্থাৎ নদীই ইতিহাস আর নদ তো দূরের কথা। বালুচরের আড্ডায় সেখানকার এক মাদ্রাসার শিক্ষার্থী অন্ধভক্ত হয়ে গেল তমালের। আড্ডাতে সবাই গান করেছে, কৌতুক করেছে, রসআলোচনা করেছে কিন্তু এরই মধ্যে কেউ না কেউ যে অনন্য হয়, শহীদুল্লাহর আগ্রহটাই যেন তা প্রমাণ করে দিল। অনেকের মনের কথা অনেকেই বলতে পারে না, কিছুজন বা কেউ একজন বলে। বাকিরা সায় দেয় মৌনতায় বা অঙ্গভঙ্গিতে। কিছুদিন পর শহীদুল্লাহ দুইজন বন্ধু নিয়ে হাজির বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে। তমালকে তাদের সাথে চরের এক অনুষ্ঠানে যেতে হবে। সেখানে শুধু তমালকে উদ্দেশ্য করেই গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এলাকার অন্যান্য বাউল শিল্পীরাও থাকবেন সেখানে। চরের সহজ, সাধারণ আর সরল মনের মানুষগুলোকে গান শুনিয়ে সুনামের বিস্তৃতি কতটা বাড়ানো যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এদের হৃদয়ের সবচেয়ে আবেগঘন জায়গায় ঠাঁই করে নেয়া যাবে আজীবনের জন্য তা অনুমান করা গেল। নির্দিষ্ট দিনে চরের অজোপাড়ায় আমন্ত্রিত হয়ে হাজার মানুষের সামনে তবলা-হারমোনিয়াম আর স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত বেহালায় চলতে থাকলো লালন, হাছন, নজরুল, মারফতি, মুর্শিদী, আব্দুল আলীম, আব্বাস উদ্দিন, মান্নাদেসহ আরো কত রকমের পুরোনো দিনের গান। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, তারপর ভোর অবধি তমালসহ স্থানীয় অন্যান্য শিল্পীরা মিলে প্রায় শতাধিক গান গীত হলো অনুষ্ঠানে। গানের ফাঁকে চা, দর্শকদের সাথে আড্ডা, কথা বলা, অনুরোধের গান গাওয়া, দর্শকদেরকে সাথে নিয়ে গান গাওয়া, মঞ্চে দর্শকদেরকে সুযোগ দেয়া কত কিছুই না হলো। অনুষ্ঠান শেষে এই চরে আরো চার-পাঁচদিন থাকার আমন্ত্রণ এলো। বিভিন্ন বাড়ির কর্তাব্যক্তিরা কোনভাবেই ছাড়তে চাইলেন না তমালকে। গানের মধ্যে যে এতো আত্মিক ভাললাগা আছে তা তারা আগে কখনো ভাবেনইনি। কিন্তু হলে ফিরে আসতেই হলো তমালকে। কারণ পরীক্ষা, ক্লাস আরও কত কার্যক্রম পড়ে আছে। চলে আসার সময় হাজার লোকের ছলছল চোখ যেন বার বার বলছিল- তুমি আমাদের অন্তরের কেউ, আমাদের রেখে যেও না। তোমার সুরের পরশে আবিষ্ট আমরা অন্ধ ভক্ত তোমার। হৃদয়ের ভেতর থেকে যে ভালবাসার উদ্গীরন ঘটে তার প্রকাশ বোধহয় এমনি। এ অপ্রকাশ্য অসাধ্য কর্ম অক্ষরে বানানো শব্দের ঘেরে। অঞ্জনদত্তের সেই গানটি যেন নেপথ্যে ভেসে আসছিল ভাবের সেই করুণ আবহে- ও গানওয়ালা, আরেকটা গান গাও, আমার আর কোথাও যাবার নেই। কিচ্ছু করার নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফরম পূরণ ও জমা দেয়ার কাজ চলছে। মাহিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের মাঠে বন্ধু বান্ধবসহ ভর্তিফরম পূরণ করে কাগজ-পত্রগুলো সাজাচ্ছিল। হঠাৎ একটি অপরিচিত মেয়ে মাহিনের ভর্তি ফরমটা হাতে তুলে নিয়ে প্রশংসা শুরু করলো- এতো সুন্দর লেখা? এতো সুন্দর করেও হাতে লেখা যায়! কার এটা? মাহিনের বন্ধুরা বলল- মাহিনের, এই ছেলেটির লেখা এটা। মেয়েটি- আর কিছু তো আপনার দরকার নেই। এই লেখা দিয়েই অনেক কিছু করা সম্ভব। মেয়েটির কোন কাজের তাড়া ছিল হয়তো, তাই বাই বলে দ্রুতই প্রস্থান করলো সে। পৃথিবীটা গোল, সময়ের আবর্তনে বিভিন্ন প্রয়োজনে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে মানুষের সাথে মানুষের পরিচয় ঘটে, আবার বিচ্ছেদও হয়। কিন্তু প্রয়োজনের কেন্দ্রবিন্দু যখন ঢাকা শহর, তখন তো যে কারো সাথেই যেকোন সময় দেখা হয়ে যাওয়টা সাধারণই বটে। বিশ বছর পর ঢাকা মেডিকেলের সামনের ফুটপাতে হেঁটে যেতে দেখা হলো মাহিনের সাথে সেই মেয়েটির। বয়স আর ছাত্র-চাকরিজীবি এই পার্থক্যের কারণে মাহিনের চেহারায় কিছুটা পরিবর্তন এসেছে কিন্তু তবুও চিনতে কষ্ট হলো না সেই মেয়েটির। -এ্যাই, ভাই আপনি মাহিন? কিছু মনে করবেন না, হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম। চশমা খুলতে খুলতে -হ্যাঁ, কিন্তু আপনি? -আমাকে আপনার মনে নাও থাকতে পারে। তবে আপনাকে মনে রাখতে পেরেছি আপনার চমৎকার হাতের লেখার জন্য। সেদিন আমার অনেক ব্যস্ততা ছিল বলে চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু মস্কিষ্কের মেমোরীতে আপনার মুখচ্ছবি আর নামটা চিরস্থায়ী হয়ে যেন গাঁথা হয়ে রইল। এমনটা কেমন করে হয় জানি না, তবে এটা হতে পারে বিশ্বাস করি। কারণ মানুষের মন আর মস্তিষ্কের ভেতরে বেশি ভাললাগার বিষয়গুলো স্বয়ংক্রীয়ভাবেই দাগ কেটে যায়। তাই কষ্ট করে মনে রাখার মতো করে কিছু করতে হয় না। আমার বিশ্বাস আমার এই কথাগুলোও আপনার ভাল লেগেছে, এটাও মনে থাকবে। আবার দেখা হলে জানাবেন। চলে গেল মেয়েটি, না এখন সে মেয়েটি নয়, নারীটি। সৌম্য, ভদ্র, সুন্দর করে কথা বলতে পারা এক নারী। তার চলার গতিপথে অনেকটা ক্ষণ নির্বাক তাকিয়ে থাকলো মাহিন।

লোকাল ট্রেন। গাদা গাদা মানুষ, রাত্রের জার্নি। কোনমতে ধরে ঝুলে থাকার মতো একটা হ্যান্ডেল নাগালে পেলেই যেন যথার্থ স্বস্তি। এতো ভীড়ের মধ্যেও কচি একটা কণ্ঠের অনর্গল প্রমিত ভাষায় কথপোকথন যেন আকর্ষণ করছিল সবাইকে। ভীড় ঠেলে কাছে যাওয়া প্রায় অসম্ভবই, কিন্তু অনেক কোলাহলের মাঝেও সুন্দর উচ্চারণ আর স্পষ্ট এই কণ্ঠস্বরের মানুষটিকে না দেখলে যেন কোনভাবেই নিজেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না তানহা। তানহা আবৃত্তির ছাত্র। শুদ্ধ উচ্চারণের পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলের ভাষার পার্থক্যগুলো কেমন হয় তা নিয়ে আগ্রহের যেন শেষ নেই। অংকের মতো স্ট্রেইট, নো কম্প্রোমাইজ আর নিরস একটি সাবজেক্টে পড়াশোনা করলেও ভাষা নিয়ে আগ্রহের শেষ নেই তার। তার সাথে হ্যান্ডেল ধরে ঝুলে থাকা আরও দুই বন্ধুকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে গেল সে। বন্ধুরা টিজ করে বলল- ঐ যে গেল, ভাষাবিদ, উচ্চারণবিদ; কোথায় কোন কণ্ঠ শুনেছে আর অমনি তার উৎস উদ্ধারে পাগল হয়েছে। তানহা মনে মনে বলল- কবি নজরুলকেও তার সময়ের মানুষরা পাগল বলে ডাকতেন। কাছে গিয়ে দেখা গেল, দশ-বার বছর বয়সী একটি কিশোরী মেয়ে। পরনে ময়লা নোংরা থ্রিপিস। চুলগুলো এলোমেলো তবে ব্যাকব্রাশ করে ঘুছিয়ে বাঁধার চেষ্টা করেছে মনে হলো। কিন্তু এতো ভীড় আর ছোটখাট দু’একটি পোটলা-পাটলা বয়ে নেবার কারণে ঘর্মাক্ত আর ক্লান্ত দেখাচ্ছে। একটা সীটের সাথে ঠ্যাস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট্ট একটি দুধের শিশুকে কোলে নিয়ে সীটের কাছে মাঝফেøারে বস্তায় বসে আছে তার মা। কিশোরী এই মেয়েটিই এতো সুন্দর করে কথা বলে যাচ্ছিল তার মা এবং ছোট্ট কোলের ভাইটির সাথে। তানহা- চাচি, আপনার মেয়ে তো খুব চটপটে, এফএম রেডিও’র জকিদের মতো করে কথা বলে। কোথায় কাজ করেন আপনি? কোথায় থাকেন? -বাবা, মধ্যবাড্ডায় এক সাহেবের বাসায় কাজে রাখছিলাম এই মাইয়াডারে। সাহেবের পেলেতে (প্লে ক্লাস) পড়া মাইয়ারে পারাইভেট কারে কইরা ইসকুলে নিয়ে যাইত, কেলাস চলা পর্যন্ত অপেক্ষা কইরা তারপর আবার ঔ কারে কইরা বাসায় ফিরত। ইসকুল আর সাহেবদের সাথে থাইক্যা ভাষা চেইঞ্জ হইয়্যা গেছেগা। -আপনার মেয়েকে তারা নতুন জামা কাপড় দেয়নি? বাড়ি ফিরছে নোংরা জামা পরে। -নতুন জামা দিছিল, সাহেবদের বাসার ড্রাইভারকে বোধহয় তারা কইয়া দিছে, নতুন জামা রাইখ্যা যাইতে কইছে। বিশ্বাস করে নাই আমগোরে, যদি মাইয়্যারে আর ফিরাইয়্যা না দেই। -তোমাদের বাড়ি কোথায়? মেয়েটাকে জিজ্ঞেস করলো তানহা। -ইসলামপুরে। -ইসলামপুরের ভাষা ভুলে গেছ? -না, তবে সাহেবদের ভাষা আমার খুব ভাল লাগে। তানহা বুঝতে পারলো এই মেয়েটির মন ভাষার শুদ্ধরূপটি আকৃষ্ট করেছে বলে রপ্ত করে নিয়েছে সহজে, আবার মেয়েটি এমন করে কথা বলার ব্যাপারটিও আকর্ষণ করলো তানহাকে। যেন মনের গহীনে দাগ কেটে গেল।

ময়মনসিংহের একটা মেসে থেকে অনার্স পড়ছিল তাহের। লম্বা পাঞ্জাবী মাথায় টুপি। এই তার নিত্যবেশ। নামাজ-কালাম অধিকাংশ সময় মসজিদেই পড়ে। কিছুলোক নামাজ নিয়মিত পড়লেও ফজরটা নিয়ে প্রশ্ন করলে নামাজ কাযা হওয়ার উত্তরটাই বেশি আসে। তাহেরের ফজর কখনো মিস হয়নি। টগবগে যুবক সকালে মসজিদে যেয়ে নামাজ পড়ে ফেরার সময় তসবিহ জঁপতে জঁপতে ফেরে। ভীষণমাত্রায় আল্লাহবিশ্বাসী। অনেক ঘটনা থেকে একটি ঘটনা তুলে আনা যেতে পারে। একবার তার কষ্টার্জিত টিউশনীর টাকায় কেনা শখের সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটরটা পড়ার কক্ষ থেকে চুরি হয়ে যায়। পাশের কক্ষের বন্ধু রহিমের কাছে ব্যাপারটা বলল। রহিম তাহেরের ভাল বন্ধু, তাহেরের আবেগটা ভাল বুঝতে পারে। অনেক কষ্ট করে টাকা জমিয়ে কেনা ক্যালকুলেটরের জন্য তাহেরের বুকে কত কষ্ট হতে পারে তা সহজেই অনুমান করতে পারলো রহিম। বোঝানোর চেষ্টা করলো। চিন্তিতও হলো। ভাল বন্ধুর মন খারাপ হলে অপর বন্ধুর কি আর ভাল লাগতে পারে? রহিমের মন খারাপ দেখে উল্টো তাহেরই রহিমকে সান্ত¦না দিতে থাকলো। বলল- দোস্ত, এটা হতেই পারে। তাছাড়া আরও বড় কোন ক্ষতি যদি হতো। তাছাড়া যে নিয়েছে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজন ছিল বলেই তো নিয়েছে। আমার না হয় কষ্ট হবে আবার আরেকটা ক্যালকুলেটর কিনতে, কিন্তু যে নিয়েছে আমারটা সে নিশ্চয়ই তার প্রয়োজনটা মিটিয়ে খুশি হয়েছে। পৃথিবীতে কারো জন্য কিছু করতে তো খুব একটা পারছি না। এভাবেইও যদি কিছু করা হয়ে যায়, তো মন্দ কি? আল্লাহ তার সৎ বুদ্ধি উদিত করুক, আর মাফ করে তার জ্ঞান বৃদ্ধির সুযোগ করে দিন। এরপর কোনদিনও আর এ ব্যাপারে ইস্ উহ্ বা আফসোস করে কোন শব্দ উচ্চারণ করতে শোনা যায়নি তাহেরের মুখে। তাহেরের এই আচরণ সত্যি বিমোহিত করে রহিমকে। মনের ভেতরে আজো এই ঘটনাটি দাগ কেটে আছে। হাদিস কোরআনে এই বিষয়গুলো বর্ণনা করা থাকলেও, কাছের কারো কাছ থেকে এই ধরনের আচরণ দেখলে তখন তা মনে রেখাপাত করে। রয়ে যায় আজীবন।

জেলা শিল্পকলার আয়োজনে জাতীয় এক অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা চলছিল। ক্যাপ মাথায় শিল্পকলার গানের শ্রেণির প্রথম স্থান অধিকারী মাসুম নজরুল সঙ্গীত গেয়ে মাতিয়ে দিলেন পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত শ্রোতা-দর্শকগণ মাসুমের হাতে গুঁজে দিচ্ছিলেন চকচকে টাকার নোট। সেই অনুষ্ঠানে একটি মেয়ের গান তার কাছে ভাল লেগে যায়। মেয়েটি দশ-বার বছর বয়সী হবে। গান গাওয়ার পর পানি খাবে বলছিল। মাসুম মেয়েদেরেকে খুব একটা পাত্তা কখনোই দিত না। কিন্তু এই মেয়েটার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে হলো কেন সে জানে না। দু’একজন ছেলে মেয়েটির পানি পানের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পানি আনতে চলে গেল। মাসুম আজ যেন প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ। ছুটে গেল পানি আনতে। একটা গ্লাসে করে দ্রুতবেগে পাশের এক টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে মেয়েটির হাতে তুলে দিল মাসুম। মেয়েটি পানি পান করছে আর মাসুম হা করে তাকিয়ে দেখছে পানি পানের দৃশ্য। চিকন চাকন মায়াবী চোখের মেয়েটিকে কেন যেন ভালবাসার মতো ভাল লেগে গেল। তার উঁচু গ্রীবা বেয়ে পানি ঢক ঢক করে বয়ে যাওয়ার সময় যে ছন্দের সৃষ্টি হলো, তা যেন বুকের ভেতরে প্রেমের জোয়ার বইয়ে দিল। মাসুম এভাবে কখনোই কাউকে ভাবতে পারেনি। কিন্তু আজ তার কি হলো? মেয়েটি ধন্যবাদ ভাইয়া বলে মিষ্টি করে হাসলো। ডাগর চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। তারপর বলল- ভাইয়া আপনি এতো সুন্দর করে গাইলেন, যেন নজরুল সঙ্গীত নতুন করে অসাধারণ মনে হলো আমার কাছে। অনেকদিন পর হঠাৎ এক মার্কেটে মেয়েটির সাথে দেখা হলো মাসুমের। মাসুম পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছিল। মাসুমের লম্বা চুল আর পরিচিত স্টাইলে মাথায় ক্যাপ পরা অবস্থায় দেখে চিনে ফেলল মেয়েটি আর ডেকে বলল- ভাইয়া, মনে আছে? কোন এক অনুষ্ঠানে পরম যতœ করে একগ্লাস পানি খাইয়েছিলেন আমাকে। -হ্যাঁ, তোমাকে কেন যে এতো ভাল লেগেছিল সেদিন, জানি না। হৃদয়ের কোন এক অংশে তোমার না দেখা স্পর্শটি হয়তো দাগ কেটে গিয়েছিল তাই। -আমিও শুধু আপনার এক গ্লাস পানির জন্য মনে রেখেছি আপনাকে; কষ্ট করে নয়, এটাও দাগ কেটেছিল আমার মনে।

কোচিং-এ ক্লাস নিয়ে ফিরছিল কিবরিয়া। ফার্মগেট থেকে বাঁ পাশের ফুটপাত ধরে কাওরান বাজারের ভেতর দিয়ে ক্রস করে এফডিসির দিকে যাচ্ছিল। জেলা শহর থেকে আসা একভদ্রলোক তার ছেলের কাছে কাঁঠাল বাগানের কোন এক মেসে যাবেন। বেশ কয়েকবার ভুল করে কাওরান বাজারের ভেতরে ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে বাজারের এক দোকানে বসে চা পান করছিলেন। কিবরিয়াও সেখানে চা পানের জন্য বসলেন। -ভাই চা দাও তো। -স্যার আদা চা না দুধ চা খাবেন? -আদা চা-ই দাও। কণ্ঠের ব্যবসাই করি, কণ্ঠই যদি ঠিক না থাকলো তবে কমেন করে হবে? লেকচার আর লেকচার। -কিসের লেকচার স্যার? -কোচিং-এর লেকচার। পাশে বসে নীরবে চা পান করতে থাকা ভদ্রলোককে ক্লান্ত লাগছিল। বুঝতে পারা যাচ্ছিল কোন সমস্যায় পড়েছেন তিনি। -চাচা, আপনি আশে পাশেই কোথাও জব করেন? -না, আমার ছেলের কাছে এসেছি। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করেছি, উল্টা-পাল্টা কি বললেন, এদিক-সেদিক ঘুরতে ঘুরতে বেশ ক্লান্তই হয়ে পড়েছি। ঢাকা শহরের অভিজ্ঞতা কখনোই ভাল ছিল না। মানুষগুলো কেমন যেন। -চাচা, আমার হাতে তো সময় নেই। তবে আপনাকে লোকেশন বলে দিচ্ছি আর ঠিকমতো করে বুঝিয়ে দিচ্ছি, আপনি এভাবে যান ঠিক ঠিক আপনার ছেলের বাসা পেয়ে যাবেন। রাত্রে ভদ্রলোক কিবরিয়াকে কল করে ধন্যবাদ দিলেন আর জানালেন উনি ঠিকমতো তার ছেলের বাসা খুঁজে পেয়েছেন। মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে মনের অবস্থা সহজেই বোঝা সম্ভব। তবে তার জন্য কিবরিয়ার মতো গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে। অন্যের মনে দাগ রেখে যাওয়ার মতো কাজের জন্য অনেক বড় কাজ করতে হয় না। ছোট ছোট কাজের মধ্য দিয়েও মানুষের মনে ঠাঁই করে নেয়া যায়। দশ বছর আগের কথা, ভদ্রলোক এখনো কল করেন, ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করেন। ভদ্রলোকের একটি কথায় বেশ অনুপ্রাণিত হন কিবরিয়া, তা হলো- আপনার কণ্ঠে আত্মবিশ্বাসের সুর আছে। সেই বিশ্বাসই অপরকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে।

মানুষ। অনেক সম্ভাবনার এক স্পষ্ট জ¦লজ্বলে উদাহরণ। সৃষ্টির সকলকিছুর মধ্যে সেরা এই জীবটি মানবিক হবে, হবে দাগকেটে যাবার মতো স্মরণীয়। এটাই কাম্য, কামনা। পৃথিবীর গোলাবর্তে ঘূর্ণায়মান সৌরমন্ডলে এই প্রাণীটির সমাদর অনেক। মহান আল্লাহ অনেক শখ করে আর বিশ্বাস নিয়ে বানিয়েছেন এই মানুষকে। এই মানুষের কাছে তাই সর্বোচ্চ ভালকিছুর প্রত্যাশা সকলকিছুর। মনে রেখাপাত করে, উত্তম কাজের স্মরণ করে প্রশংসায় ভক্তিতে আবেগাপ্লুত হবে কেউ এটাই একে অপরের কামনা। সাধনা এটাই হওয়া উচিৎ। না হলে মানুষ নামটিই বেমানান হবে। সমাজে এমন লোকের অভাব নেই যারা অন্যকে কষ্ট দিতে পছন্দ করে। অন্যকে বোকা বানিয়ে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ধ্বংস ডেকে আনতে যারা প্রতিমুহূর্তে চিন্তা করে, তারা মানুষ নয়। তারা অর্থব, বেকুব। সাময়িক লাভকে তারা দীর্ঘমেয়াদী সুখ মনে করে মিথ্যে আস্ফালন করে। সময়ের পূর্ণাঙ্গ দৈর্ঘ্য এরা বোঝে না। অসীম সময়ের ক্ষুদ্রঅংশকে অনেক বড় সময় ভেবে ভুল করে। মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে অন্যের মনে ঠাঁই নেবার চেষ্টা থাকা উচিৎ। মনে ঠাঁই নেবার ব্যাপারটা অতো সহজ নয়। মন বড় বিচারক। সে কখন কিভাবে বিচার করে কাকে বেছে নেবে তা বোঝা মুশকিল। মন শুধু মন ছুঁয়েছে, ও সে তো মুখ খোলেনি। ও হো হো হো...। সুর শুধু সুর তুলেছে, ভাষা তো দেয়নি। তাই মন ছুঁতে চাইলে মনের মতো হতে হবে। ভেতরকার আলো প্রজ্জ্বলিত হলেই কেবল মন ছুঁয়ে দেয়া যায়। অন্ধকার, কালিমা আর অবৈধ কৌশল মনের গহীনে রেখে শুদ্ধ হওয়া যায় না। সৎ, পরোপকারী হলে তার জন্য ভাল অপেক্ষা করবেই। যদি দৃশ্যত ভাল নাও দেখা যায়, তাও কোন সমস্যা নেই, মানসিক যে তৃপ্তি পাওয়ার ব্যাপার থাকে তা স্বর্গসম। পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত হয়ে আছেন, তারা কোন না কোনভাবে মানুষের মনকে জয় করেছেন। সে কারণেই মানুষ তাদেরকে যুগের পর যুগ স্মরণ করে।

বিচলিত তব নিঃস্ব হও পরের তরে
তৃপ্তি তোমা হতে না রবে বেশি দূরে

হৃদে না বসি আসন করো অন্য হৃদে
মন-প্রাণে থাকো পুত-পবিত্র জাগ্রত কি নিদে

দাগ কেটে যাও প্রতি মনে শুদ্ধ সত্যের তরে
থাকো জীবিত অনন্তকাল হও অমর মরে।

লেখক: এস জে রতন
কথাশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ, প্রশিক্ষক ও উন্নয়নকর্মী
[email protected]


২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×