আগের পর্বগুলি - ১ । ২ । ৩ । ৪ । ৫ ।
অনেক দিন পরের কথা,
অফিস রুমে বসে একা একা ভাবছিলো সজীব। কীভাবে তার জীবন টা এরকম হয়ে গেল? যে স্বর্ণাকে বাচতে চেয়েছিল সে, কাটাতে চেয়েছিল সারাটা জীবন। পারলো কোথায়? স্বর্ণা তো তাকে ছেড়ে স্বার্থপরের মত চলে গেল শাহীনের হাত ধরে। সজীব কি কখনো চেয়েছিল সারাজীবন কষ্ট করে কাটাতে। উন্নতি কি তার জীবনে হতোনা? স্বর্ণা তো তাকে সেই সময়টাই দিলোনা।
কলিগ শুভ তাকে অনেক সময় দিত, স্বর্ণার বিয়ে হয়ে যাবার পর। শুভ বিয়ে করেছে, ওয়াইফ কে নিয়ে এসেছে সিলেটে। আগের মত আড্ডা হয়না আর। আসিফ একটা স্কলারশীপ নিয়ে চলে গিয়েছে কোরিয়ার, মাহমুদ ভাই, সেলিম কানাডায়, মাসুম চলে গিয়েছে আরেকটা ইউনিভার্সিটিতে, হাসান ভাই চাদপুরে, পরশ ভাই ঢাকায় একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছেন। একা পড়ে আছে সজীব। অবশ্য এর মধ্যে একটা পদোন্নতি হয়েছে ওর। ও এখন সহকারী অধ্যাপক। নিজের ভিতর নিজে ডুবে থাকে। যতটুকু পারা যায় ব্যস্ত থাকা আর কি। তাও কি ভুলতে পারে ও স্বর্ণাকে? মাঝে মাঝে ওর মনে নাড়া দিয়ে যায় প্রেমের প্রথম দিনের স্মৃতি গুলো। খুব সুন্দর ছিলো দিন গুলো। কেন স্বর্ণা এমন ভাবে বদলে গেল? এই প্রশ্নের উত্তর খুজে পায়না সজীব।
বাবা মা মাঝে মাঝে বিয়ের কথা বলেন। সজীব নিরুত্তর থাকে। বাবা মাকে নিয়ে এসেছে ও সিলেটে। ছোট ভাই খুলনা ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। এখনো ২ বছর বাকি বিবিএ শেষ করতে। ইদানীং সজীবের ও ভালো লাগেনা কিছু। বিএসসি করে আর পড়া হয়নি। এম এস টা এই করা দরকার। বাবা মা সরাসরি বলে দিয়েছেন বিয়ে না করে বাইরে যেতে দেবেন না। সজীব বোঝে সেটা, কিন্তু ওর তো ইচ্ছে করেনা আর কাউকে নিয়ে ভাবতে। কয়েকদিন আগে বাবা দাতের সমস্যা নিয়ে ডেন্টিস্ট এর কাছে গিয়েছিলেন। ডেন্টিস্টের ব্যবহার তার এত ভালো লেগে গিয়েছিল প্রথমে তাকেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ডাক্তার বিবাহিতা ছিলেন। তখন বাবা জিজ্ঞাসা করলেন তার কোন বোন আছে কিনা? ডাক্তারের ছোট বোন ও এমবিবিএস পড়ছে। বাবা তো মহাখুশি, কথাবার্তা অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে গেলেন সেখানেই। পারলে তখন ই বিয়ে দিয়ে দেন সজীবের সাথে। সজীব সোজা না বলে দিল। তার পক্ষে এখন বিয়ে করা সম্ভব না। বাইরে কোথাও মাস্টার্সে এডমিশন পেলে তারপর চিন্তা করবে।
চিন্তার ছেদ পড়লো নারীকন্ঠের ডাকে,
- স্যার, আসতে পারি।
তিথি। তার পুরানো একজন ছাত্রী। বিএসসি শেষ করেছে। ছাত্র ছাত্রীরা সাধারনতঃ ডিগ্রী শেষ করার পর ভার্সিটিতে আসেনা। তিথি কী মনে করে এসেছে কে জানে?
- এসো তিথি। কেমন আছো?
- আছি স্যার, মোটামুটি। আপনি কেমন আছেন?
- অ্যাজ ইউজুয়াল, যেমন ই থাকি। তা এখন কী মনে করে? কোথায় জব করছো এখন। নাকি বাসাতেই থাকো আজকাল?
- না স্যার, কোন জব করছি না। বাসাতেই আছি। আব্বা রিটায়ারমেন্টে যাবেন খুব তাড়াতাড়ি। তারপর আমরা সিলেট থেকে চলে যাবো।
-আচ্ছা। আজ কী মনে করে ভার্সিটিতে আসলে?
- এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম, স্যার। মনে হলো আপনার সাথে দেখা করে যাই। বাসার সবাই কেমন আছেন? ভাবীর কি খবর?
- বাসার সবাই ভালো ই আছে। আর আমার এখনো বিয়ে করা হয়নি, তাই ভাবী ও নেই।
- স্যার, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?
- মনে করার কি আছে? আমি তো তোমাদের সবার সাথে সবসময় ফ্রেন্ডলি ছিলাম। যেকোন রকম সমস্যায় তোমরা আমার সাথে আলোচনা করেছ। বলো কি বলতে চাও?
- স্যার, আমরা যখন এখানে পড়তাম তখন আপনাকে প্রায় ই ফোনে অনেকক্ষন কথা বলতে দেখতাম। মাঝে মাঝে আপনি অনেক উত্তেজিত হয়ে যেতেন কথা বলতে বলতে। মনে হতো আপনি অনেক হতাশ, অবসন্ন। আমরা মনে করতাম আপনি বোধহয় কারো সাথে প্রেম করেন। সেটা তো ৩ বছর আগের কথা। তাই ভাবলাম বিয়ে করে ফেলেছেন কিনা। এজন্য জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
মুচকি একটু হাসলো সজীব।
- ঠিক ই বলেছ। আসলে এগুলো নিয়ে এখন আর কথা বলতে ভালো লাগেনা। একা ভালো ই আছি।
- কিছু মনে না করলো শেয়ার করতে পারেন। আপনি সবসময় আমাদের ভালো লাগা মন্দ লাগা গুলো শেয়ার করেছেন। আমরা ও চাইতে পারি আপনার কোন কষ্টের অনূভুতি শেয়ার করতে।
- আসলে কি ভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা। তাছাড়া ভার্সিটি তো তোমার সাথে এসব কথা বলার মত কোন জায়গা ও না।
একটু ইতস্ততঃ করে সজীব বলতে শুরু করলো তার জীবনের কথা। তার প্রেমিকার কথা। কিভাবে সে সজীবের জীবনটাকে দুমড়ে মুচড়ে দিয়ে চলে গিয়েছে। যত সম্ভব অল্প কথায় সজীব শেষ করলো তার কথাগুলো। তন্ময় হয়ে শুনছিলো তিথি। চোখটা যেন ভিজেও উঠেছিলো, তাড়াতাড়ি করে আড়াল করলো সেটা।
- স্যার, আমি আজ যাই। পরে কখনো আসবো। ভালো থাকবেন।
- ঠিক আছে। ভালো থেকো।
রাতে ডিনারের পর শুয়ে শুয়ে একটা বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো সজীব। মোবাইলে এসএমএস এর আওয়াজে ঘুম ভেঙ্গে গেল। অপরিচিত নাম্বার থেকে এসেছে।
"আপনি যেদিন থেকে আমাদের ভার্সিটিতে জয়েন করেছেন, সেদিন থেকেই আপনাকে ভালো লেগেছিল। কখনো মুখ ফুটে বলতে পারিনি। জানতাম আপনার কারো সাথে সম্পর্ক আছে, তাই নিজের ভালোলাগা নিজের ভেতরেই রেখে দিয়েছিলাম। আজ আপনার কথাগুলো শুনতে শুনতে ভিজে উঠেছিলো মনটা, তাই তাড়াতাড়ি করে চলে এসেছিলাম। এখন পর্যন্ত ঘুম আসেনি। ভাবছিলাম মানুষের মন এত নরম হয় কীভাবে? আর সেই নরম মনের মানুষটাকে যে এত কষ্ট দিতে পারে সে কেমন মেয়ে? যে চলে গিয়েছে তার জন্য কেন কষ্ট পাবেন, আপনি তো তাকে ছেড়ে চলে আসেন নি। এখনো তাকে মনে রেখেছেন। পুরোনো কথাগুলো ভুলে গিয়ে জীবনটাকে আরেকবার সাজানোর চেষ্টা কী করতে পারেন না। আমি না হয় আপনার সঙ্গী হলাম। আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। ঠকাবো না। আপনার কোন কষ্ট হয় এমন কোন কাজ হবেনা আমার দ্বারা।"
মেসেজটা তিথি পাঠিয়েছে। নির্ঘুম রাত কেটে গেল সজীবের ও। ভাবছিলো পান খেয়ে একবার মুখ পুড়েছে, দই দেখলেও এখন ভয় লাগছে। কী করা উচিত তার। আর একবার দেখবে নাকি?
কয়েকদিনের মধ্যে সজীবের ফিনল্যান্ডে অ্যাডমিশন হয়ে গেল মাস্টার্সে। অনেক ফরমালিটিস বাকি সেগুলো শেষ করতে হবে। বাবা মা তো আগেই বলেছেন বিয়ে না করে বাইরে যেতে পারবেনা। সজীব ওর মাকে বললো তিথির কথা। মা প্রথমে একটু দ্বিমত করেছিলেন, পরে সজীবের কথায় রাজি হলেন। বাবার তো আগে থেকেই কোন কথা ছিলোনা, উনি ছেলেকে বিয়ে করাতে পারলেই খুশি। তিথির সাথে কথা বললো সজীব।
- তিথি, তুমি আমাকে একটা মেসেজ পাঠিয়েছিলে। সেটার উত্তর আজও দেয়া হয়নি। আজ দিতে চাই।
- বলুন।
- তোমাকে যতটুকু দেখেছি কখনো খারাপ লাগেনি আমার কাছে। তবে আমি আর কোন প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চাই না।
- এটা বলার জন্য আজ ফোন করেছেন।
- হ্যা, আরেকটু কথা বলার ছিলো।
- আর কি বলবেন? যা বলার তা তো বলে ফেলেছেন।
- আরেকটু কথা বলার ছিলো। সেটা হলো আমি আর প্রেমের সম্পর্কে জড়াতে চাই না সেটা ঠিক। আমি তোমাকে আমার সারা জীবনের জন্য চাই।
- বুঝলাম না।
- আসলে, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।
আবেগে গলাটা বুজে আসছিলো তিথির। কোনরকমে নিজেকে সংবরন করে বললো,
- আপনি যা বলছেন সেটা কি সজ্ঞানেই বলছেন?
- হ্যা, আমি ঠিক ই বলছি। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। আমি আমার বাব মার সাথে কথা বলেছি। তাদের কোন সমস্যা নেই। শুধু তুমি চাইলেই এখন আমার বাব মাকে তোমাদের বাসায় পাঠাতে পারি।
- সেটা হবে আমার জন্য অনেক বড় পাওয়া।
- এই ছোট্ট জীবনে আমি আর কষ্ট পেতে চাই না। আমি চাই তুমি সবসময় আমার পাশে থাকো।
- আমার থেকে সজ্ঞানে আপনি কোন কষ্ট পাবেন না। শুধু এটুকুই বলতে পারি আল্লাহ আমাকে অনেক ভালোবাসেন তাই আপনার মত একজন মানুষকে আমার জীবনসঙ্গী করে পাঠাতে যাচ্ছেন।
সজীবের আর কিছু বলার ছিলো না তখন। এখন শুধু অপেক্ষা কবে সে তিথি কে তার নিজের করে পাবে?
পরিশিষ্ট:
সজীব তিথি এখন খুব ভালো আছে। সজীবের মাস্টার্স প্রায় শেষের পথে। তিথি বাংলাদেশে। দুজন দুজনকে অনেক বেশি ভালোবাসে, অনেক বেশি মিস করে। প্রতিদিন ই কয়েকবার ফোনে কথা হয়। দিনকে দিন যেন তাদের ভালোবাসা বাড়ছেই। বাবা মা তাদের কাজ কারবার দেখেন আর হাসেন, এরা যে করে বড় হবে। সজীব আর তিথি ও অপেক্ষায় আছে তাদের সংসার শুরু করার।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



