somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আস্থা অনাস্থার দোটানায় গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থা!

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৪০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সকাল বেলা এক সুহৃদ কল দিয়ে জানালেন তার এলাকায় দোকান লুট হয়ে যাওয়া চাল উদ্ধার হয়েছে স্থানীয় চোরের বাড়ি থেকে। তার মাঝে এ নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ থাকার কথা হলেও তিনি হতাশ। উৎসাহ থাকার কথা বলছি কারণ, ছোট বেলায় যখন গ্রামে কোন চোর ধরা পড়তো তার বিচার কিংবা যে কোন বিচার বসলে অতি উৎসাহ সহকারে তা দেখতে যেতাম। গ্রাম্য সালিশ থেকে একাধারে শিক্ষণীয় ও বিনোদনময় ছিলো। অভিযুক্ত/অভিযুক্তরা সালিশের দু'পাশে, বিচারক মন্ডলী ( জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় মুরব্বীরা) মাঝখানে আর চারপাশে অগণিত দর্শকের সমারোহ থাকতো। বিচারের মাঝখানে অভিযুক্তের ইতিহাস বৃত্তান্ত আর বিচারক মন্ডলীর মান অভিমানের জায়গাও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে স্থান পেত। যেমন একদিন সালিশে জনৈক বিচারক অভিযুক্ত গরু চোর কে এই বলে মার দেওয়া শুরু করলো, " ... পুত, টুয়া..., তোর চৌদ্দ গোষ্ঠী টুয়া (পেন্ট) চোখে দেখছে"। যেন গরু চুরি নয় চৌদ্দ গোষ্ঠীর ঐতিহ্য ভেঙ্গে ভদ্র সমাজের খানদানি প্রতিক টুয়া পরার অপরাধে তার বিচার চলছিলো!।

না, এমন কোন উৎসাহ তো দূরের কথা কল দেওয়া সুহৃদ হতাশা ব্যক্ত করলো এই বলে, সর্ব প্রকার প্রমাণাদি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও চোর নাকি রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। আমি কিছু করতাম! । আমি কি করবো? আমি স্থানীয় নেতা কিংবা প্রভাবশালী কেউ তো নয় এমনকি ঘটনাটিও আমার ইউনিয়নের বাহিরে। করোনার ভুক্তভোগী হয়ে লক ডাউনে আটকা পড়ে আছি বিধায় বিনা কারণে পনের বছর পর এমন সময় কাটাচ্ছি। না, তিনি জানালেন আমি যেহেতু একটি পেইজ চালায় তাই একটা নিউজ করতে হবে যাতে সহজেই স্থানীয় সাংবাদিকদের নজরে আসে বিষয়টা। কারণ এই চুরিকে বিচারের আওতায় আনা গেলে ইতোমধ্যে সংঘটিত চুরির সাথে সংঘবদ্ধ চোর চক্রকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

নিউজের স্বার্থে স্থানীয় চেয়ারম্যান সাহেবকে কল দিলাম। আমার জন্মের পূর্বে তিনি এম.এ পাশ করেছেন। শিক্ষিত মানুষ যখন জনপ্রতিনিধিত্ব করেন তখন সাধারণ মানুষের বুকটা ভরে যায় আস্থায়। এমনি আশা থেকে কল দিলাম। চেয়ারম্যান সাহেব জানালেন স্থানীয় মেম্বার সাহেব বিষয়টি দেখছেন। মেম্বার সাহেবকে কল দেওয়া হলে জানান চেয়ারম্যান সাহেবের কথা। শেষমেশ তিনি ইফতারের পর দেখা করতেও বলছেন, আমার বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়ে!
স্থানীয় এক সাংবাদিক এর সাথে আলাপ হলে জানান বেশিরভাগ। ক্ষেত্রে এমনটি করা হয়। দফারফা হয়ে তার আর সংবাদ হয়ে ওঠেনা আর ওঠলেও সাংবাদিকের জীবনাশঙ্কা থাকে!
যাইহোক, শেষমেশ যা হবার তাই হলো। চাল ফেরৎ আর দোকানের নতুন তালা পেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো দোকানিকে।

কার্যত আসামীর বিচার না হলেও জনমুখে তার ট্রায়াল হয়ে গিয়েছে এবং চোরের কালিমা তার গায়ে ঠিকই লাগছে কিন্তু যথাযথ বিচার না হওয়ার চাপা অভিযোগে সহজ-সরল মানুষগুলোর অকৃত্রিম ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার জায়গায় যে জনপ্রতিনিধি আঘাত দিয়েছেন তা শোধরাবেন কিভাবে!
তার চেয়ে বড় হলো বিচার কার্য পরিচালনা করা যে আমানত তা আমরা ভুলে যাই কি করে!
গ্রাম্য সমাজ ব্যবস্থায় প্রতিটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সালিশ ব্যবস্থার সাথে জড়িত। মানুষ সালিশ বা বিচার ব্যবস্থা থেকে যেমনি বের হতে পারে না, তেমনি সালিশ বা বিচার ব্যবস্থা ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যান করতেও পারে না। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা উন্নত হওয়ার ফলে সমাজ জীবনে উন্নয়নে ছোঁয়া লাগলেও গ্রামীণ বিচার বা সালিশ ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে হতাশা কাজ করে।

দুঃখজনক হলেও সত্য কথা গ্রাম সালিশ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়সঙ্গত না হয়ে শোষণের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে যায়!।
রাজনৈতিক প্রভাব,বিচার প্রার্থীদের অর্থনৈতিক বৈষম্যতা , ন্যায়পরায়ন গ্রহণযোগ্য মানুষের সংকট, দীর্ঘ মেয়াদী সালিশ (বার বার বসা), বাদী-বিবাদী কর্তৃক পৃথকভাবে সালিশকারী নিয়োগ, বংশ/এলাকা/ভোটার প্রীতি, নেতৃত্ব ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন প্রতিনিধি না থাকা,
মিথ্যা সাক্ষী, সালিশে অতিঃ জামানত নেওয়া, অনভিজ্ঞ/অগ্রণযোগ্য লোক দ্বারা সালিশী করা, কুচক্রী মহলের কুপরামর্শ, ব্ল্যাংক
স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া, আইনী জ্ঞানের অভাব, চূড়ান্ত মীমাংসা না করা( আপোষ করা), সমস্যা চিহ্নিত না করে সমাধান করা,
সালিশে বাহুবল দেখিয়ে মারামরি, সালিশ থেকে উঠে চলে যাওয়া, হুমকি-ধমকি দেয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ সহ অসংখ্য সংকট বিরাজমান সালিশকে কেন্দ্র করে।

অথচ, এ সালিশ ব্যবস্থাকে যথাযথভাবে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারলে সামাজিক সহিংসতা নির্মূল ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব। গ্রামের মানুষের আদালতে যাওয়ার বিকল্প হচ্ছে সালিশ।
ছোট খাটো চুরি, বাচ্চাদের মারামারি, মহিলা-মহিলায় ঝগড়া, গরু-ছাগলে ক্ষেতের ফসল খাওয়া, জমির আইল-ঠেলাঠেলি, পিতা-মাতার দেখাশোনা, অবাধ্য সন্তান নিয়ে ঝামেলা, প্রেম-পিরিতি, পরকীয়া এমন সব অভিযোগ গ্রামের মাতব্বররা/মেম্বার/চেয়ারম্যানরা সালিশে সমাধান করতে পারলে আইন- আদালতের উপরও চাপ কমে আসবে।
সর্বোপরি, আস্থা অনাস্থার দোটানা না হয়ে গ্রাম্য সালিশ ব্যবস্থাই হতে পারে আদর্শিক ন্যায় বিচারের দৃষ্টান্ত। বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাববার সময় আছে।

**লেখক- এম টি উল্যাহ। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী ও একাধিক গ্রন্থ রচিয়তা।
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২০ রাত ৯:৪৩
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ সুবহানার বীরত্ব

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:১০




সুবহানা খুব ছোট্ট হলেও, দারুণ মিষ্টি দেখতে,
চটপটে, বেজায় সাহসী , কেউ পারে না রুখতে।

স্কুল থেকে ফেরার পথে একদিন দুপুরবেলা
অনাথ দুটি শিশু বসে করছিল কি এক খেলা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:৩৩

গঙ্গা-বুড়িগঙ্গার স্রোত অনেক বদলে গেছে...

একসময় ভারতীয় কূটনীতিক, রাজনীতিবিদ কিংবা বাংলাদেশের কিছু ক্ষমতাসীন নেতা এমন ভাষায় কথা বলতেন, যেন বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়; বরং কোনো ছোট ভাই, আদরের বোন বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অন্তর্দিগন্ত

লিখেছেন মুনতাসির রাসেল, ১৪ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:০৯



যে নদী সাগরকে ছোঁয়নি, সে-ই গায় সবচেয়ে নির্মল সঙ্গীত।
যে বৃক্ষের শাখা ফলের ভারে নত হয়নি, সে-ই আকাশকে বেশি বোঝে, বাতাসকে বেশি শোনে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম ভ্রমগুলোর একটি এই,
মানুষ ভেবেছে প্রাপ্তিই পরিত্রাণ।

তাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Laptop Stand কেন দরকার?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৪ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৯

Laptop Stand কেন দরকার? | Digital Fast IT থেকে স্মার্ট সমাধান



দীর্ঘ সময় ল্যাপটপ ব্যবহার করলে অনেকেরই একটি সাধারণ সমস্যা দেখা দেয়—ল্যাপটপের নিচের অংশ অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়। অতিরিক্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইমিগ্রেশনেই ধরা খেল বিএনপির কূটনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪০


ধরুন আপনার পাশের বাড়ির সাথে সম্পর্ক ভালো না। দীর্ঘদিনের পুরনো ঝামেলা, কথা বলাবলি বন্ধ, একে অপরকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস হয়ে গেছে। এই অবস্থায় পাশের বাড়িতে একটা বৈঠক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×