somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শায়খে আকবর মহিউদ্দিন ইবন আরাবি (রহ: ) - এর বয়ানে সাওম পালনের ভিন্নতর অর্থ

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পৃথিবী জুড়ে মুসলিম সম্প্রদায় রমজান মাসের রোজা পালন করছে। রমজান আর রোজা বলতেই আমাদের মতো সাধারণ মুসলিমদের মনে কোন কোন শব্দ হুট করে চলে আসে? ইফতার, সেহরি, দিনে রোজা, রাতে তারাবি, ঈদের কেনাকাটা, যাকাতের হিসাব, যাকাত প্রদান, ফিতরা, তারাবি পড়ার নাম করে বন্ধুদের সঙ্গে পাড়া বেড়ানো, আড্ডা দেয়া – এ সবই তো, কম বেশী?

কিন্তু যে মূল কাজকে ঘিরে গোটা রমজান মাস জুড়ে আমাদের এতো কর্মযজ্ঞ, সে কাজ, রোজা রাখা, বা আরবিতে বললে সাওম – পালন করা, এর তাৎপর্য নিয়ে আমরা কতটুকু চিন্তা করি? স্রেফ না খেয়ে থাকা, স্ত্রী/স্বামী সঙ্গ পরিহার, এবং কথাবার্তায় মাত্রা তথা শালীনতা ধরে রাখা পর্যন্তই আমাদের রোজা রাখার গণ্ডি। না খাওয়া এবং যৌনসঙ্গ পরিহার করাটাই হয়তো সবচে কমন কাজ, যেটা আমরা রোজা রেখে সচরাচর প্র্যাকটিস করে থাকি। রোজার সঙ্গে সঙ্গে আচরণগত, চরিত্রগত পরিবর্তন আনার কাজটা সবক্ষেত্রে সবাই করে উঠতে পারে না।

১২ – ১৩ খৃষ্টাব্দের আন্দালুসিয়ান মহাত্মা, শায়েখে আকবর মহিউদ্দিন ইবনে আরাবি রোজা রাখার সাধারণ ধারণাটিকে বুঝবার জন্য একটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপন করেন, যা বুঝলে আমাদের মতো সাধারণ প্রাকটিসিং মুসলিমদের আত্মিক উন্নতি আরও ত্বরান্বিত হবে।

ইবনে আরাবি (রঃ) এর বিবেচনায় সাহরি, তারাবি, ইফতার ইত্যাদি কর্মকাণ্ডের বাইরেও রোজার এক বিশেষ প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে। রমজান মাসের ঐ বাহ্যিক ক্রিয়াকর্মের সূত্র ধরেই সে অন্তরিন আধ্যাত্মিক বাস্তবতার কাছাকাছি পৌঁছাতে হয়।

খেয়াল করার বিষয় যে, নামাজ, যাকাত, হজ্জ – এ সমস্ত ইবাদতই কিছু না কিছু কাজ করার সঙ্গে সংযুক্ত। নামাজের সময় অজু করে, পবিত্র শরীর ও মনে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করতে হয়, যাকাত দিতে হলে নিসাব পরিমাণ সম্পত্তির হিসেবনিকেশ করে তার পয়সা গরীবদুঃখীর কাছে পৌঁছাতে হয়, হজ্জ করতে হলে বিশাল লম্বা কাজের তালিকা সম্পন্ন করতে হয় একের পর এক।

ইবন আরাবি বলেন, এই সমস্ত আমলের বিপরীতে রোজা হচ্ছে – স্থিরতা। কর্মহীনতা। নন অ্যাকশন। দা অ্যাক্ট অফ নট অ্যাক্টিং। রোজাদারের এই স্থিরতা, নন অ্যাকশন-ই রোজাদারকে খোদার সঙ্গে সংযুক্ত করতে, খোদার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করতে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে নন অ্যাকশন মানে কুঁড়েমি, আলসেমি না, বরং সচেতনভাবে ‘সামাদানিয়া’ (الصَّمَدُ) নামের এক খোদায়ি বৈশিষ্ট্যকে বান্দার চরিত্রের মাঝে ধারণ ও চর্চা করা বোঝায়। আস সামাদ, খোদার ৯৯টি গুণবাচক নামের একটি, যার অর্থ স্বনির্ভরতা, অমুখাপেক্ষিতা। এটা এমন এক গুণ – যা প্রকৃতপক্ষে কেবল আল্লাহতা’লাই ধারণ করেন। ইসলামের অনান্য রুকুনের মধ্যে কেবল সাওম পালনের মাধ্যমেই বান্দা খোদার চরিত্রের এ বিশেষ গুণের এক (অপূর্ণ) প্রতিফলন তার চরিত্রে ঘটায়।

রোজাদারের যে শারীরবৃত্তিয় এবং মানসিক অবস্থা (ফিজিক্যাল রিয়েলিটি) – সেটা নানাভাবে এই ‘সামাদানিয়া’ নামক মানসিক অবস্থা অর্জনের সঙ্গে সংযুক্ত। খাদ্য/ পানীয়, যৌনকর্ম থেকে বিরত থাকা একটা প্রতীকী কাজ যা খোদাতালার সমস্ত শারীরবৃত্তিয় চাহিদা, অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে অমুখাপেক্ষিতাকে নির্দেশ করে। ঝগড়াঝাটি, ক্রোধ এবং অশ্লীল কথাবার্তা পরিহার করা খোদাতালার যে এক সামগ্রিক প্রশান্ত রূপ – তাকে নির্দেশ করে।

এভাবে রোজার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটা ছোট ছোট নিয়ম বড় বড় আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনের দরজা খুলে দেয়। ভাল কাজের অন্যান্য সব ধরণকে পাশ কাটিয়ে সাওম পালন বান্দাকে যেভাবে এক অনন্য উপায়ে খোদার সঙ্গে সংযুক্ত করে, তেমনি এর পুরস্কারও তেমনি। রোজাদারের পুরষ্কার দানের ভার খোদা অন্য কারো ওপর ছেড়ে দেন নি, বরং নিজের হাতে রেখেছেন।

ইবন আরাবি রহঃ এর মতে, খোদা যেমন একক ও অদ্বিতীয়, তার মতো আর কেউ নেই, সাওমও তেমনি আমলের মধ্যে অদ্বিতীয়, এর অনুরূপ আর কোন আমল হয় না।

[শায়েখে আকবরের কালজয়ী গ্রন্থ 'ফুতুহাত আল মক্কিয়া' (মক্কায় অর্জিত আধ্যাত্মিকভেদের উন্মোচনাবলী) -র রোজা বিষয়ক অধ্যায়ে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলাপ আছে। গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ বিচ্ছিন্ন খণ্ডে ইন্টারনেটে বিদ্যমান। ]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৫৮
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

‘সবচেয়ে কঠিন’

লিখেছেন আবু সিদ, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:১৫


আমি সাদ। আমার বয়স ১৭ বছর। আমি ক্লাস টেনের ছাত্র। আমার ক্লাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর বয়স ১৫ বা তার আশপাশে। আমারও ১৫ বছর বয়সে ক্লাস টেনে থাকার কথা ছিল। কিন্তু আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্চে রাজনৈতিক বিভাজন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৪



উদীচী পুড়ার সময় কি হারমোনিয়াম, তবলা, একতারা, দোতারা, সেতার কিংবা বাঁশি পুড়েনি?, মনে রাখবেন তখন আগুন শুধু কিছু বাদ্যযন্ত্র পোড়ায়নি, -পুড়েছিল এই বাংলার সংস্কৃতির, এই বাংলার শত কোটি মানুষের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'মেটিকুলাসলি ডিজাইন' করে সিলেটকে অশান্ত করে তোলার অর্থ কি?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:১৫

সিলেটে এন,সি,পি সাংগঠনিক ভাবে দূর্বল।
দলের ভিতরে কোন্দল মারাত্মক তা ফেসবুকে দলীয় নেতা কর্মীদের পোস্ট দেখে বুঝা যায়।
অথচ, সামনে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন।
এই পরিস্থিতিতে, দলের মানুষদের 'গরম' করে তোলার একটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৯:২৮

স্বাক্ষী থেকো বাংলাদেশ, স্বাক্ষী থেকো ১৮ কোটি মানুষ।
================================
ইতিহাস কখনো মুছে যায় না। যে জাতি তার মানুষের কান্না, আর্তনাদ ও ন্যায়বিচারের দাবি ভুলে যায়, সে জাতির ভবিষ্যৎও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আজ এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবার সমস্যা, ব্লগ আমাকে কেন ভোগাচ্ছে?

লিখেছেন মেহবুবা, ৩১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩

আবার সমস্যা ব্লগ ঠিকমত দেখা যায় না। কিছুদিন আগে এমনটি হয়েছিল। ব্লগার সুলাইমান সহজ করে সমাধান বের করে দিয়েছিল। এবার একই সমস্যা হচ্ছে তবে সেই একই উপায়ে কাজ হচ্ছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×