somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হলিউডের বিদ্রুপাত্মক,বর্ণবাদ ও আগ্রাসনবিরোধী চলচ্চিত্র-২

০৫ ই মে, ২০২০ রাত ৮:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



বিখ্যাত লেখক হাওয়ার্ড ফাষ্ট এ্যামেরিকার সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য ছিলেন্ ১৯৫০ সালে তাকে এ্যামেরিকায় ফ্যাসিষ্ট ও সমাজতান্ত্রিকদের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পর্কে তদন্তের জন্য গঠিত House Committee on Un-American Activities এর সামনে ডাকা হয়। তিনি স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধ চলাকালে বাবা-মা হারানো সন্তানদের জন্য খোলা তহবিলের জন্য অর্থদানকারীদের নাম বলতে অস্বীকৃতি জানান,যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সাবেক রাষ্টপতি রুজভেল্টের স্ত্রী এলিনর রুজভেল্ট। ফলে তাকে তিন মাসের কারাদন্ড দেয়া হয়। হাওয়ার্ড ফাষ্ট



Mill Point Federal Prison,কারাগারে বসেই তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস স্পার্টাকাস লেখেন।এই ঘটনার সাথে ভাষা আন্দোলনের অংশ নেয়ার অপরাধে ১৯৫৩ সালে আটক শহীদ মুনির চৌধুরীর কারাগারে বসে কবর নাটক রচনার মিল পাওয়া যায়।এদের দুজনেই ছিলেন সমাজতন্ত্রী এবং এজন্যই তাদের সেখানে যেতে হয়েছিলো।

রোম সাম্রাজ্যে দাসদের মুক্তির দাবী জন্য ঐতিহাসিক বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে লেখা এই উপন্যাসেও তার শোষণ মুক্তি ও বিপ্লবী মানসিকতার প্রকাশ ঘটে।বেশীরভাগ প্রকাশনা সংস্থা নিষিদ্ধ করায় তিনি কারামুক্তির পর নিজের উদ্যোগেই উপন্যাসটা প্রকাশ করেন্। এটা ব্যাপকভাবে ব্যাবসাসফল হয়।

এই উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৬০ সালে অভিনেতা কার্ক ডগলাসে প্রযোজিত ও ষ্ট্যানলি কুবরিক পরিচালিত স্পার্টাকাস ছবিটা নির্মিত হয়,যা ছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হলিউডের সবাক যুগের অন্যতম প্রতীকধর্মী সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চলচ্চিত্র।



এ ছবিতে দাসত্ব থেকে স্বাধীনতা ও মুক্তিলাভের জন্য রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্পার্টাকাস ও তার দলের বিদ্রোহের আড়ালে মূলত পৃথিবীর দেশে দেশে এ্যামেরিকার যুদ্ধবাদী নীতি,দেশ দখল,গণহত্যা এবং নিজ দেশে কালোদের উপর জঘণ্য বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পৃথিবীর বড় দুই সাম্রাজ্যবাদী-সন্ত্রাসী দেশ বৃটেন ও ফ্রান্সের জায়গা দখল করে এ্যামেরিকা। ১৯৫০ সালে কোরিয়া তাদের প্রথম আগ্রাসনের স্বীকার হয় । এরপর তারা বৃটিশ মালিকানাধীন তেল সম্পদ জাতীয়করণ করায় ১৯৫৩ সালে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে ইরানে ড: মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করে। সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করায় ১৯৫৪ সালে বৃটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইলের যৌথ সন্ত্রাসী বাহিনী মিসর আক্রমণ কররে দ্বিতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করে।
এমনকি ১৯৫৫ সালে সন্ত্রাসী এ্যামেরিকা সম্পূর্ণ অকারণে নিজ দেশ থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত ভিয়েতনাম হাসলা চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করতে শুরু করে।

এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে হলিউডের সচেতন ব্যাক্তিদের প্রথম প্রতিবাদ ছিলো স্পার্টাকাস ছবিটা।

ডালটন ট্রাম্বো

এই ছবির লেখক হাওয়ার্ড ফাষ্ট,চিত্রনাট্যকার ডালটন ট্রাম্বো-দুইজনই ছিলেন এ্যামেরিকার সমাজতান্ত্রিক দলের সদস্য।এজন্য ফাষ্ট কারাগারে এবং ট্রাম্বোকে হলিউডে কালো তালিকা ভূক্ত করে দীর্ঘদিন হলিউডে কাজ করা থেকে বিরত রাখা হয়।ফাষ্টের আগেই কংগ্রেসের মর্যাদাহানির অভিযোগে তাকে ১১ মাস কারাগারে কাটাতে হয়।

কার্ক ডগলাস নিজেও সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের প্রতি সহানূভূতিশীল ছিলেন বলেই এই দুই সমাজতন্ত্রীকে নিয়ে কাজ করেছেন।
এখানে বলা প্রয়োজন যে তিনি ছিলেন হলিউডের সবচেয়ে দীর্ঘজীবি অভিনেতা। হলিউডের চিত্রতারকাদের বেশীরভাগই ৮০-৯০ বছর বয়স পর্যন্ত জীবিত থাকলেও তিনি বেচে ছিলেন ১০৪ বছর এবং ২০২০ সালেরই ৫ মে তিনি ১০৪ বছর বয়সে মারা গেছেন।


আদিবাসী হত্যা করে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সন্ত্রাসী এ্যামেরিকার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হচ্ছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ।কারণ এই যুদ্ধে এক পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়া তার সবরকম প্রচলিত ও নিষিদ্ধ অস্ত্রও ব্যাবহার করেছিলো। তারপরও ২০ বছর ধরে চলা এই যুদ্ধে এ্যামেরিকা ৫৮ হাজারের বেশী সৈন্য নিহত হয়। আজ পর্যন্ত হলিউডে ভিয়েতনামে যুদ্ধের সত্যিকারের ইতিহাসকে বিকৃত করে অসংখ্য ছবি নির্মিত হয়েছে।এসব ছবিতে স্বাধীনতাকামী বীর ভিয়েতনামী জনগণ এবং ভিয়েতকং গেরিলাদের খূনী,কাপুরুষ এবং সন্ত্রাসী এ্যামেরিকার গণহত্যাকারী,খুনী-ধর্ষক-নরপিশাচ সৈন্যদের মানবতাবাদী মহাবীর হিসেবে দেখানো হয়েছে।




শুধূ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ের ঘটনা নিয়েই না, ১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও সেখানে আটকে পরা এ্যামেরিকার যুদ্ধ বন্দী এবং ভিয়েতনামী নারীদের গর্ভে সৈন্যদের জন্ম দেয়া সন্তানদের উদ্ধারের নাম করে পুনরায় যুদ্ধের উস্কানি দিয়ে অনেক ছবি বানিয়েছে হলিউডের সন্ত্রাসী নির্মাতা গোষ্ঠী।


এদের মধ্যে প্রধান হচ্ছে হলিউডের ইহুদীবাদী গোলান-গ্লোবাস- এর মালিকানাধীন ক্যানন ফিল্মস। এদের এরকম কয়েকটা ছবি হচ্ছে সিলভেষ্টার ষ্ট্যালোন অভিনীত ১৯৮২ সালে নির্মিত র‌্যাম্বো-২ এবং ৮০-র দশকে নির্মিত চাক নরিস অভিনীত মিসিং ইন এ্যাকশন ছবির পর্বগুলি। এছাড়া হলিউডে ক্যানন-চাক নরিস চক্রই ১৯৮৫ সালে ডেল্টা ফোর্স নামে ছবি বানিয়ে সর্বপ্রথম মুসলমানদের বিমান ছিনতাইকারী সন্ত্রাসী হিসেবে দেখিয়েছে।


এসব ছবিতে পর্দায় ভিয়েতনামী গেরিলাদের হত্যার দৃশ্য দেখে এ্যামেরিকার সংখ্যাগরিষ্ঠ সন্ত্রাসী মানসিকতার জনগণ বাস্তবে সেখানে লজ্জাজনক পরাজয়ের কথা ভুলতে চায়। কিন্ত এই ভিয়েতনাম যুদ্ধের চূড়ান্ত বর্বরতা চালানোর সময়েই ১৯৭০ সালে হলিউডে সোলজার ব্ল নামে একটা ছবি মুক্তি পায়। র‌্যালফ নেলসন পরিচালিত ও ক্যান্ডিন্স বার্জিন অভিনীত এই ছবিতে ১৮৭৭ সালে কর্ণেল চিভিংটনের চেরোকি ক্রিক হত্যাকান্ড- Sand Creek massacre- পরবর্তীকালে সৈন্যদের আদীবাসীদের উপর নৃশংশ গণত্যার রূপকের অন্তরালে মূলত একইসময়ে ভিয়েতনাম,কম্বোডিয়া ও লাওসে বর্বর এ্যামেরিকান সৈন্যদের মাই লাই সহ প্রতিদিন সংঘটিত অসংখ্য গণহত্যা-ধর্ষণের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছে।কারণ সেইসময়ে ভিয়েতমান যুদ্ধের সরাসরি সমালোচনা করে কোন ছবি হলিউডে নির্মাণ করা সম্ভব ছিলো না। ছবির পরিচালকও তার রূপক ব্যাবহারের কথা স্বীকার করেছেন।

তবে যথারীতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সন্ত্রাসী মানসিকতার এ্যামেরিকার দর্শকদের কাছে ছবিটা ব্যবসায়িকভবে ব্যার্থ হয়।তবে বৃটেনে ছবিটা ব্যবসাসফল এবং ১৯৭১-এ তৃতীয় দর্শকপ্রিয় ছবি হয়।এর মাধ্যমে হয়তো বৃটিশরা তাদের এ্যামেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে বর্বরতার একটা পাল্টা জবাব খূজে পেয়েছিলো, যে তাদের মতো এ্যামেরিকানরাও একইরকম খুনী-গণহত্যাকারী।

তবে ভিয়েতনাম যুদ্ধ ফেরত অভিনেতা অলিভার ষ্টোন পরিচালিত ১৯৮৬ সালের অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত প্লাটুন ছবিটা এই যুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সব ছবির মধ্যে একমাত্র ব্যাতিক্রম।এখানে ১৯৬৭ সালে ভিয়েতনামে সংঘটিত এ্যামেরিকার সৈন্যদের ঘটানো চরম নৃংশস মাই-লাই গলহত্যার দৃশ্যও দেখানো হয়েছে। অনেক সমালোচক বলেন,জন ওয়েন পরিচালিত গ্রিন ব্যারেট( ১৯৬৭) ছবিটার ইতিহাস বিকৃতির উত্তরে ছবিটা বানানো হয়েছে।



তবে আমার মনে হয়,১৯৮২ সালের ষ্ট্যালোন অভিনীত র‌্যাম্বো ২ এ ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হওয়ার ৭ বছর পরও ভিয়েতনামীদের রাশিয়ানদের ক্রীড়ণক এবং অত্যাচারী কাপুরুষ দিসেবে দেখানো ফলেই তিনি সত্য ইতিহাস তুলে ধরার জন্য এই ছবিটিা বানিয়েছেন।



১৯৮৯ সালে তার পরিচালিত আরেকটা অস্কার প্রাপ্ত পরিচালিত বর্ণ অন দ্য ফোর্থ অফ জুলাই ছবিটাতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বক্তব্য আরো শক্তিশালীভাবে এসেছে,যেখানে দেখানো হয়েছে একজন এ্যামেরিকান সৈন্য ভিয়েতনাম যুদ্ধেক্ষেত্রে আহত হয়ে পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে এসে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ করতে শুরু করেন।টম ক্রুজের এই ছবিতে অভিনয় করা থেকে ধারণা করা যায়,মনে মনে তিনিও হয়তো সন্ত্রাসী এ্যামেরিকার সাম্রাজ্যবাদ নীতির বিরোধী।
(অসমাপ্ত)
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০২০ রাত ১০:১২
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফ্রিদা কাহলো এক ব্যতিক্রমী মানুষ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১:১৪



নীল বাড়ির দূরন্ত মেয়েটি
"লা কাসা আসুল" যার অর্থ নীল ঘর। ১৯০৭ সালের ছয় জুলাই জার্মান বাবা আর স্প্যানিস মায়ের রক্তের সমন্বয়ে একটি মেয়ের জন্ম হয় ম্যাক্সিকো সিটির শহরতলীর একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রেবতি

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ রাত ২:৫৪



আগে আমার অবস্থানটা বর্ণনা করে নিই।
সকাল সাড়ে এগারোটা। ঝকঝকে সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি দিন। আমি দাঁড়িয়ে আছি- বসুন্ধরা মার্কেটের সামনে। আমার ডান হাতের একটা আঙ্গুল শক্ত করে ধরে আছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমকামিতার স্বরূপ অন্বেষনঃ সমকামি এজেন্ডার গোপন ব্লু-প্রিন্ট - আলফ্রেড চার্লস কিনসে [পর্ব দুই]

লিখেছেন নীল আকাশ, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ১১:৪৮

অনেকদিন পরে আবার এই সিরিজ লিখতে বসলাম। লেখার এই পর্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে থেকে এর ব্যাপক বিস্তার ঘটানো হয়েছে খুব সুপরিকল্পিতভাবে। সারা বিশ্বের মতো আমাদের দেশেও এই জঘন্য আচরণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমলাকান্তের কৃষ্ণ কন্যা (শব্দের ব্যবহার ও বাক্য গঠন চর্চার উপর পোস্ট)

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৪:৫৯


শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনও অক্ষর দিয়ে শুরু শব্দাবলি ব্যবহার করেও ছোট কাহিনী তৈরি করা যায় তার একটা উদাহরণ নীচে দেয়া হোল। এটা একই সাথে শিক্ষণীয় এবং আনন্দদায়ক।

কাঠুরিয়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার এই পোস্ট পড়ে কি মনে হয় আমি ইসলাম বিদ্বেষী?

লিখেছেন জাদিদ, ০৭ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩০

আমি গতকাল ফেসবুকে একটি পোস্ট দেই। সেখানে আমাদের কতিপয় হুজুরদের বেহুদা জোসের বিরুদ্ধে আমি লিখেছিলাম। আমার পোস্টটি এখানে হুবহু তুলে দিলাম -

পৃথিবীতে ইসলাম রক্ষার দায়ভার একমাত্র বাংলাদেশী মুসলমানদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×