somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কদর (ছোটগল্প)

১৩ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


(ছোটগল্প লেখার সাহস পেয়েছি এই লেখাটি লেখারে পরে। এটি আমার লেখা প্রথম ছোটগল্প। ভুলভ্রান্তি অনেক। প্রথম লেখা কী না!)

সাতসকালে বাজারের দিকে যাওয়ার আগ মুহুর্তেই ঘটে বিপত্তিটা। সুরুজ মিঞা তার ছাতাটা খুঁজে পাচ্ছে না।

খিঁচড়ে গেল মেজাজটা। কাজের সময় কোথায় একটু জিনিসপত্র আগায়ে দিবে তা না, গিয়ে বসে পড়েছে চুলার পাশে। সারাদিনে ঐ এক কাজ! মেয়ে দুটিও হয়েছে সেইরকম। সুরুজ মিঞার আশেপাশে ভিড়ে না। সারাদিন মায়ের চারপাশে ঘুরঘুর করছে, বাবা ডাকলে মুখ চুপসে সামনে এসে দাঁড়াবে। দেখে মনে হবে যেন চুরি করে ধরা পড়েছে, সামনে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে।

এত ভয় পায় কেন কে জানে! তাড়াতাড়ী বিয়ে শাদি দিয়ে জায়গামত বিদেয় করতে পারলে নিশ্চিন্তি হওয়া যায়। মেয়ে পালতে গিয়ে অকাজেই অনেক টাকা পয়সা খরচ হয়ে গেছে। এত পরিশ্রমের টাকা! এভাবে অজায়গায় নষ্ট হয়ে গেলে চলবে? কথাগুলো ভাবতে ভাবতে খিঁচড়ানো মেজাজটা আরো তেতে ওঠে।

ভাদ্রের সকাল। একটু পরেই গা ঝলসানো রোদ উঠবে। উঠানের এক পাশের গোয়াল ঘরে আট-নয় টা গরু পরম নিশ্চিন্ত মনে খড় চিবুচ্ছে। ছোট মেয়েটা পাশে বসে একটা বড় মাটির ভাড়ে ভাতের ফেনের সাথে গমের ভুষি মেশাচ্ছে।

সর্ব সাকুল্যে প্রায় পনেরো- বিশ টা গরুর মালিক সুরুজ মিঞা। গ্রামের বেশ অবস্থাপন্ন গৃহস্থ সে। সামান্য অবস্থা থেকে আজ তার এই উত্থান। বাপের সম্পত্তি বলতে ছিল এই ভিটা আর এক জোড়া গরু। সেই এক জোড়া গরু থেকেই মাত্র কয়েক বছরেই ফুলে ফেঁপে উঠেছে সুরুজ মিঞা।
দুধ বেচে হিসেব করে করে সংসার চালিয়েছে আর জমানো টাকা দিয়ে গরুর সংখ্যা বাড়িয়েছে। নিজের জন্য একটা টাকাও খরচ করেনি। পৈতৃক ভিটাটা মেরামত করিয়েছে।

অতীতের কথা মনে করে গর্বে বুক ভরে ওঠে তার। নিজের বউ আর মেয়ে গুলোকে প্রায়ই তার এই উথানের গল্প শুনতে হয়। আজও তার ব্যাতিক্রম হল না। জোরে জোরে কিছুক্ষণ মূণ্ডুপাত করলো সবার। “সারাদিন খাইটে মরি। ছাতাটাও দেইখে রাখতে পারো না। ঘরে বইসে করো কী সারাদিন? কথায় কথায় চুলার পাড় দেখাও। মাইয়া দুইখান কোন কাজের হইলো না। আমার কপাল মন্দ। একটা পোলা হইলে আগলাইয়া রাখতো। কুনখান দিয়া সব কিছু হইলো বুঝবার পারতাছো না তো! বুঝবা কেমনে? মুখখু মাইয়া মানুষ।”

চুলার পাশে বসে নীরবে দীর্ঘশবাস ফেলে হাফিজা বেগম। মনে মনে বলে,” হ, হেই তো খালি বুঝবার পারবো!”
আজ এত গুলো বছর ধরে সে আর পরে তার এই মেয়ে দুইটা যে হাড় ভাংগা খাটুনি খেটে যাচ্ছে তা এই লোকরে বলে কী হবে! মেয়ে দুইটারে স্কুলে পর্যন্ত দেয় নাই। বলে, ‘মাইয়াগো পড়ায়া লাভ নাই। পরের বাড়ী পাঠাইয়া দিতে পারলেই তো চুইক্যা গেল।’
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বেগার খাটুনি খাটে মেয়ে দুইটা। গরুর খাবার দেওয়া, গোসল করানো, মাঠে নিয়ে যাওয়া। তার পরেও আছে বাড়ির কাজ। আহারে, তার মেয়ে দুইটারে নিজে থেকে শখ করে একটা কাপড় ও কিনে দেয় নাই কোনদিন। বিয়ের পরে কই যাবে কে জানে! নিজের বাপে যত্ন করলো না, পরের ছেলে কী করবে কে জানে!

সুরুজ মিঞার ছাতা শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল ঐ চুলার পাড় থেকেই। ভুলটা কার হয়েছিল কে জানে! ভুলে খড়ি রাখার মাচায় চলে গিয়েছিল ছাতাটা। খড়ি মনে করে চুলার মধ্যে ঢুকিয়েও দিয়েছিল হাফিজা খাতুন। সকাল বেলাতেই বকাঝকা খেয়ে মাথাটা আউলা হয়ে গিয়েছিল। বড় মেয়ে দেখতে পেয়ে তাড়াতাড়ি বের করে আনে। ছাতার এক পাশের কাপড় একটু পুড়ে গিয়েছে। সুরুজ মিঞা ব্যাপার টা ঠিক দেখে ফেলে। শকুনের চোখ তার। তারপর যা হবার তাই হয়।হাড় কিপ্টে লোক সুরুজ মিঞা। ছাতার এই চরম দুর্দশা সে হজম করতে পারে না। বউ আর দুই মেয়ের উপর অজস্র গালমন্দ বর্ষণ করতে করতে বাজার অভিমুখে রওয়ানা হয় সে।

সেই দিন আর পারলো না হাফিজা বেগম। সামান্য একটা ভুলের জন্য এত শাপশাপান্ত! হাড়ি কুড়ি ফেলে সে ঘরে ঢুকে দোর লাগায়। আজ জাহান্নামে যাক সব। সে কোন কাজ করবে না।
বড় মেয়ে মুনিয়া অনেকক্ষণ ধরে মাকে ডেকে ডেকে খ্যান্ত দেয়। মাকে ভাল মতই চেনে সে। বাবার এই নিত্য দিনের হাঙ্গামায় মাকে আশ্র্য় করেই বাঁচে তারা দুই বোন। পাখীর মার মত মা তাদের দু বোনকে ডানা দিয়ে আগলিয়ে রাখে। ছেলে না জন্মানোর কারণে বাবার যত রাগ, সব এসে জড়ো হয় তাদের দুই বোনের উপর।

অনেকক্ষণ মার দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে চুলার পাড়ে এসে বসে মুনিয়া।
অনেক কাজ পড়ে আছে। ছোটবেলা থেকে কাজ করতে করতে গৃহস্হালির কাজে সে পটু। তবু অসাবধানে কখন যেন গায়ের সাথে পেঁচিয়ে রাখা ওড়নার এক কোণা চুলার মধ্যে পড়ে যায় তা খেয়াল করেনি মুনিয়া। ঠিকমত বুঝে উঠতে উঠতেই জামার অনেকখানি অংশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ছোট মেয়ের চিৎকারে হাফিজা বেগম দৌড়ে এসে দেখে, মুনিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে উঠানে।

সুরুজ মিঞার কাছে যখন খবর পৌঁছায় বেলা তখন দুপুর গড়িয়েছে। পাশের বাড়ির ছেলেটা এসে জানায়, মুনিয়ার শরীরে আগুন লেগেছে। সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে তাকে।
এক রাশ বিরক্তি নিয়ে হাতের কাজ ফেলে সুরুজ মিঞাকে ছুটতে হয় সদর হাসপাতালে। গিয়ে দেখে হাসপাতালের ওয়ার্ডে শুয়ে আছে মুনিয়া। হাতে পায়ে মোটা ব্যাণ্ডেজ়। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো বাবাকে। পাশে নির্বাক বসে আছে হাফিজা বেগম। ছোট মেয়েটা কাঁদছে পায়ের কাছে বসে।

চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখলো সুরুজ মিঞা। ঘর-বাড়ী খোলা রেখে বাড়ী শুদ্ধু সব চলে এসেছে। গরুগুলো খোলা পড়ে আছে। কেউ যদি এসে নিয়ে যায়?! সেই হুঁশ আছে কারো?

তিল তিল করে গড়ে তোলা এত কষ্টের ধন তার…
আজ অবধি কেউ কদর করতে শিখলো না…।।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১৯ দুপুর ১২:২৩
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

» গাঁও গেরামের ছবি (মোবাইলগ্রাফী-৩৬)

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৩২



ঘাসের উপর প্রজাপতির ছবি তুলতে গিয়ে, পিপড়েদের কবলে পড়েছিলাম। ঠিকমত ক্লিক দিতে পারছিলাম না তাই ঠাঁয় বসে ছিলাম হঠাৎ কুট কুট কামড় টের পেয়ে তাকিয়ে দেখি পা আমার লালে লাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

রফিক ভাই

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৫:৪২



আমার বাসার সামনেই ফেনী ফার্মেসী।
ফার্মেসীর মালিক রফিক ভাই। রফিক ভাই আমার বন্ধুর মতোন। তবে তার বয়স আমার চেয়ে বেশী। আমি প্রায়ই ফেনী ফার্মেসীতে আড্ডা দেই। রফিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

কৃষ্নচ্ছায়ায় স্বপ্নের অমনিবাস (অবরোহ)

লিখেছেন বিদ্রোহী ভৃগু, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৭:৫২

আলোকিত আঁধার এক
ঘোর কৃষ্নচ্ছায়ায় গ্রাস করে স্বপ্নের অমনিবাস
আত্মমর্যদা বাক স্বাধীনতা
চিরন্তন মুক্তির স্বপ্ন মূখ থুবড়ে, চারিদিকে শকুনির উল্লাস!

ভেজানো পাটা’শের মতো খুলে খুলে আসে মূল্যবোধ
নীতি নৈতিকতা, পরম্পরা- হারিয়ে যায়
হাওয়াই মিঠাই স্বাদে! দুর্বৃত্তায়নের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সৌদী অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টে কারা আক্রমণ চালায়েছে?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ৯:০৩



গত শনিবার (সেপ্টেম্বর, ১৪) সৌদী আরবের আবকিক অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টে ড্রোন-গাইডেড মিসাইল আক্রমণ চালিয়ে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অয়েল-প্রসেসিং প্ল্যান্টটিকে পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে; এতে সৌদীর দৈনিক তেল উদপাদন ক্ষমতা অর্ধেক... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৮ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৯ রাত ২:০৭



ছবি: যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে টয়োটা যুদ্ধের সময়ে একটি টয়োটা পিকআপ থেকে চাদীয় সৈন্যরা

চাদ–লিবিয়া যুদ্ধ ছিল ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে লিবীয় ও চাদীয় বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত কয়েক দফা বিক্ষিপ্ত যুদ্ধ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×