
অবাক হতে হয় যখন দেখি ইসলাম নিয়ে যারা ঘোরতর বিদ্বেষ পোষণ করে, যাদের কথাবার্তায় ইসলাম বিরুদ্ধ বিষ উগরে পড়ে, তারাও হঠাৎ করে “হূর” নিয়ে বড় চিন্তিত হয়ে ওঠেন। এমনকি ইসলামকে ‘মধ্যযুগের ধর্ম’, ‘মানবাধিকারের পরিপন্থী’, ‘আধুনিক পৃথিবীর জন্য হুমকি’ বলেও যারা নিয়ম করে ফেসবুকে পোস্ট ঝাড়েন, কিবোর্ডে রীতিমত ঝড় তোলেন, তারাও যখন জান্নাতের হূর প্রসঙ্গে এসে যেন প্রেমে মগ্ন হয়ে পড়েন, তখন প্রশ্ন না তুলে উপায় কী—হূরের প্রতি ওদের এত আগ্রহের হেতু আসলে কী?
হূর কী? হূর হচ্ছে, Hoor al-Ayn, often referred to as "houri" or "maidens of Paradise," are described in Islamic texts as beautiful, pure, and virtuous companions for the righteous in the afterlife. অর্থাৎ, হূরুল আইন বা হূর — ইসলামি পরিভাষায় জান্নাতের অপার্থিব নারীসঙ্গিনী, যাঁদের কথা কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। হূরদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে অপার সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও চিরকালীন সতীত্বের প্রতীক হিসেবে।
হূর সম্পর্কে আল-কুরআন ও সহীহ হাদীসে বিস্তৃত আলোচনা এসেছে। হূর হলো জান্নাতের এক অপার্থিব পুরস্কার, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রিয় বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন। এটি কেবল শারীরিক সৌন্দর্য বা দেহগত আকর্ষণের প্রতীক নয়; বরং এটি জান্নাতের পরিপূর্ণ সুখ, প্রশান্তি, নির্মল ভালোবাসা এবং পবিত্র সম্পর্কের প্রতিচ্ছবি। হূর হচ্ছে এমন এক সত্তা, যার সৌন্দর্য, পবিত্রতা ও প্রজ্ঞা—সবকিছুই দুনিয়ার তুলনায় অকল্পনীয়। সূরা আদ-দোখান (৪৪:৫৪)-তে বলা হয়েছে, “وَزَوَّجْنَاهُم بِحُورٍ عِينٍ”—“আমি তাদেরকে হূর ‘ঈনের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করব।” সূরা আত-তূর (৫২:২০) তে এসেছে, “مُتَّكِـِٔينَ عَلَىٰ سُرُرٍ مَّصْفُوفَةٍ ۖ وَزَوَّجْنَـٰهُم بِحُورٍ عِينٍ”—“তারা থাকবে সারি সারি বিছানায় হেলান দিয়ে। আর আমি তাদের হূর ‘ঈনের সাথে মিলিত করব।” সূরা আর-রাহমান (৫৫:৭২)-এ বলা হয়েছে, “حُورٌ مَّقْصُورَٰتٌ فِى ٱلْخِيَامِ”—“তারা হবে তাঁবুতে আবদ্ধ, লজ্জাশীলা ও সংরক্ষিত হূর।” সূরা আল-ওয়াকিয়া (৫৬:২২–২৪)-এ ইরশাদ হয়েছে, “وَحُورٌ عِينٌ، كَأَمْثَـٰلِ ٱللُّؤْلُؤِ ٱلْمَكْنُونِ، جَزَآءًۭ بِمَا كَانُوا۟ يَعْمَلُونَ”—“তারা পাবে হূর ‘ঈন, যারা হবে সুরক্ষিত মুক্তার ন্যায়—এটি তাদের কর্মের পুরস্কারস্বরূপ।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে: “وَأَزْوَاجُهُمُ الْحُورُ الْعِينُ”—“তাদের স্ত্রী হবে হূর ‘ঈন।” রাসূল ﷺ বলেন, “জান্নাতি কোনো নারী পৃথিবীর দিকে উঁকি দিলে তার আলো আকাশ ও পৃথিবীকে উদ্ভাসিত করে দেবে, তার সুগন্ধ চারিদিককে মৌময় করে তুলবে। এমনকি তার মাথার ওড়ন দুনিয়া ও দুনিয়ার সব কিছু থেকেও উত্তম।” (সহীহ বুখারী ২৭৯৬)
কুরআন ও হাদীসের সুস্পষ্ট এসব বর্ণনা উপেক্ষা করেও যাদের ইসলাম নিয়ে তীব্র আপত্তি, তারা হঠাৎ করে হূর প্রসঙ্গে এসে যেন ক্ষুধার্ত হয়ে ওঠেন। একজন ইসলাম-বিদ্বেষী যদি সত্যিই ইসলামকে "কল্পকাহিনী" মনে করেন, তবে সেই ধর্মের জান্নাত ও হূরের ধারণা তাকে এত আন্দোলিত এবং আলোড়িত করে কেন? তিনি তো বিশ্বাসই করেন না, তাহলে ইসলামের অন্যসব বিষয় বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হূরের প্রতি তার এত ঈর্ষা কেন? হূরের পেছনে তারা কেন এত লাগতে যান? হূরের আলোচনায় তাদের এত ইফোর্ট দেওয়ার কারণ কী? তার মানে কি এই যে, তারা উপরে উপরে ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ পোষনের ভাব দেখালেও মনে মনে হুরের প্রতি ভালোবাসা চেপে রেখেছেন ঠিকই?
আসলে হূর শুধু পুরুষের জন্য নয়, এটি জান্নাতের এক পূর্ণাঙ্গ পরিপূর্ণতা, একটি প্রতিদান। নেককার নারী জান্নাতে হুরের চেয়েও উচ্চ মর্যাদায় বিভূষিত হবেন। হূর হলো জান্নাতের নির্মলতা ও চিরস্থায়ী স্নিগ্ধতার উপমা। তাই যখন কেউ হূর নিয়ে ব্যঙ্গ করে, আসলে সে জান্নাতের ধারণাকেই ব্যঙ্গ করে; ঈমানদারদের প্রাপ্তিকে ঈর্ষা করে।
এদের কেউ কেউ হূরের ছবি বানিয়ে মিম বানায়, কেউ আবার হাদীসের অনুবাদ বিকৃত করে পোস্ট দেয়। একদিকে বলে “আমরা বিজ্ঞান মানি”—অন্যদিকে হূর না পাওয়ার হতাশায় ভোগে! হায়রে, ঈমান নেই, তবুও হূরের প্রতি দুর্ণিবার আকর্ষণ এমন যে, হূর যেন না পেয়ে অন্তর হাহাকার করে ওঠে।
আসলে সত্যটা হলো, ঈমান ও সৎকর্মই হূরপ্রাপ্তির একমাত্র পথ। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা ও অন্যায় কাজ ত্যাগ করে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখে—তার জন্য জান্নাতে একটি বিশেষ দরজা খোলা হবে।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম)
তাই বলি, হূরের প্রেমে গোপনে আকুল হয়ে লাভ নেই, আর্তনাদ করেও কোনো ফায়দা হবে না। সত্যিই যদি হূর পেতে চান বিশ্বাসের পথ ধরুন, নচেৎ হিংসার আগুনেই শুধু পুড়তে পারবেন। কাজের কাজ তাতে কিছুই হবে না। কারণ, জান্নাতের হূর তো আর ফেসবুক লাইভে এসে বলবে না—“তোমাকে ভালোবাসি, হে প্রিয়(!) ইসলাম বিদ্বেষী ভাই!”
হূর কেবলমাত্র তাঁদের জন্যই, যারা তাকওয়া ও ঈমান নিয়ে এই দুনিয়ায় জীবন কাটিয়েছে। হিংসা করে লাভ নেই, চাইলে এখনো সময় আছে। ঈমানের পথে আসুন, সৎকর্ম করুন—তবেই মিলবে অপার্থিব সেই প্রেমের পুরস্কার।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুলাই, ২০২৫ দুপুর ১২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


