somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইন্দোনেশিয়া সিরিজ - ২ঃ বেরাস্তাগি শহরে

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ইন্দোনেশিয়া সিরিজ - ১ঃ মেদানের পথে পথে


আমার অনেকদিন ধরেই ইচ্ছা লেক টোবা (Lake Toba) দেখার। এর মূল কারণ মানব জাতির গত পঁচাত্তর হাজার বছরের ইতিহাসে এই লেক খুবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। পৃথিবীর বিশেষত পূর্ব আফ্রিকা ও ভারতের সব মানুষের বর্তমান জিনেটিক প্যাটার্ণের পিছনে লেক টোবার ভূমিকা অনস্বীকার্য। Toba catastrophe theory অনুসারে এই লেকের কারণে মানবজাতি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হতে বসেছিল। কারণ এই প্রায় পঁচাত্তর হাজার বছর আগে এই লেকটি একটি আগ্নেয়গিরি ছিল যেটা বিস্ফোরিত হয়ে পুরো পৃথিনীতে এমন অবস্থা তৈরি করেছিল যে মানবজাতির জন্য তা এক বিশাল হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিভাবে একটা লেক মানবজাতিকে পুরো বিলুপ্ত করে দেয়ার উপক্রম করেছিল? কিভাবে বিজ্ঞানীরা একটার পর একটা সূত্র জোড়া দিয়ে Toba catastrophe theory তৈরি করেছেন সেটার গল্প কোন রোমাঞ্চকর গোয়েন্দা কাহিনীর চেয়ে কম উত্তেজনাপূর্ণ না। সে গল্পে পরে আসছি।

মেদান শহর থেকে লেক টোবা প্রায় একশত কিলোমিটার দূরে। তাই ভাবলাম, মেদান যখন আসছি তখন লেক টোবাও দেখে যাই। একদিন সকালে মেদান লেক টোবার উদ্দেশ্য রওয়ানা দিলাম। যাবার পথেই পড়বে বেরাস্তাগি শহর। যদিও এটাকে শহর না বলে ছোট টাউন বা গ্রামের মাঝামাঝি কিছু একটা বলা যায়। আমার সেখানেও একটু ঢু মারার ইচ্ছা। কারণ, এই শহরের মূল আকর্ষণ দুটো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি যাদের একটার নাম মাউন্ট সিবায়েক আর আরেকটার নাম মাউন্ট সিনাবুং। কপাল ভালো থাকলে একটু দূর থেকে ধোঁয়া-ফোঁয়া দেখে আসব। তাছাড়া, বেরেস্তাগি শহর আগ্নেয়গিরির পাশে হওয়ার কারণে এর মাটি খুবই উর্বর হওয়ার কথা। তাই এই এলাকা ফুলে-ফলে শোভিত হওয়াটা স্বাভাবিক।

ডাচেরা বেরাস্তাগি শহরের পত্তন করেছিল উনিশ শতকের প্রথমভাগে। এই শহরের নামটাও এসেছে ডাচ শব্দ “ব্রাস্তাগি” থেকে যার মানে “চালের গুদাম”। যদিও এই শহরে এসে চালের গুদাম নামের কোন স্বার্থকতা পাইনি। এই শহরের নাম হওয়া উচিত ছিল “ফল আর ফুলের গুদাম”।

বেরাস্তাগি শহর সেই অর্থে আহামরি না হলেও নিরিবিলি। শহরের প্রবেশদ্বারে লম্বা তোরণ যেটা শহরের ইতিহাস অনেকটাই তুলে ঘরছে। তবে মূল শহরটা যথারীতি ছোট আর ঘনবসতিপূর্ণ। সরু সরু রাস্তার পাশে ঘিঞ্জি দোকানপাট। তারপরে বেশ শান্ত গ্রামের মত জায়গা। এতই শান্ত যে গাছ থেকে পাতা পড়লেও তার শব্দ শোনা যায়। শহরের দিগন্ত ছুঁয়ে আছে মাউন্ট সিবায়েক আর মাউন্ট সিনাবুং। আর অসংখ্য ছোট-বড় পাহাড় আর টিলা। এসবের ফাঁকে-ফাঁকে ছোট ছোট জনবসতি। আমার এমন জায়গাই ভালো লাগে।

মেদান থেকে বেরাস্তাগির দূরত্ব প্রায় পয়ষট্টি কিলোমিটার। সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে বেরাস্তাগির উচ্চতা এক কিলোমিটারের বেশি। তাই আবহাওয়া বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা। পাহাড়ি রাস্তা, তাই মেদান থেকে গাড়িতে বেরাস্তাগিতে পৌছাতে প্রায় ঘন্টাখানিক সময় লাগবেই। মেদান থেকে রওয়ানা দিয়েছি বেশ সকালে। তাই দুপুরের বেশ আগেই বেরাস্তাগিতে পৌছে গেলাম।

আমার কপাল ভালো। শহরে ঢুকার সাথে সাথে একটা আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখলাম। ধোঁয়া তখনো আকাশময় ছড়িয়ে পড়েনি। হয়ত আমি আসার কিছুক্ষণ আগেই আমাকে স্বাগত জানানোর জন্যই মাউন্ট সিনাবুং জেগে উঠেছে।

- মাউন্ট সিনাবুং আগ্নেয়গিরি

আমার হাতে যেহেতু অঢেল সময়, আমি বেরেস্তাগির মূল শহর পার হয়ে গ্রামের মত জায়গাগুলো ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকি।

চারিদিকে স্ট্রবেরি আর ফুলের বাগান। ফুলের নার্সারির অভাব নেই। এমন কিছু ফুল যেগুলো দেখতে একেবারেই অন্যরকম আর কোনদিন ওরকম ফুল দেখিনি। সে সময় আমার ফুল গাছের প্রতি খুব ঝোঁক ছিল। কুয়ালালামপুরের বাসাতে অনেক রকমের অর্কিড, গোলাপ আর গারবেরা ডেইজির গাছ ছিল। যদি ইমিগ্রেশনের ঝামেলা না থাকত থাকলে একটা আস্ত নার্সারি কিনে নিয়ে কুয়ালালামপুর ফিরে আসতাম।

- বেরাস্তাগি শহর এর শহরের আশেপাশে

- বেরাস্তাগি শহরের বাহিরে গ্রামের মত এলাকা

- বউয়ের আব্বার গাড়ি। আমি আবার নিজের আব্বা আম্মা ছাড়া কাউকে আব্বা আম্মা বলতে পারি না।

- চারিদিকে নার্সারি এর ফুলের গাছ ১

- চারিদিকে নার্সারি এর ফুলের গাছ ২


স্ট্রবেরি বাগানগুলোতে নিজের পছন্দমত স্ট্রবেরি গাছ থেকে পেড়ে কিনে নেয়া যায়। দাম খুব সস্তা আর স্ট্রবেরিগুলো বেশ টসটসে রসালো। বেরাস্তাগিতে এত বেশি ফল-মূল হয় যে এখানে শুধু ফলের জন্যই আলাদা বাজার আছে যেখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে ফল-মূল কিনতে।

- স্ট্রবেরি বাগান। নামমাত্র মূল্যে বাগান থেকে নিজে বেছেই কেনা যায়


পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এখানে ঘোড়ার প্রচলন ছিল এক সময়। তাই শহরে রয়েছে ঘোড়ার খামার। সেখানে সস্তাতে মেলে ঘোড়ার দুধ।

সত্যি কথা বলতে কি আমার শহরের চেয়ে গ্রামের মত জায়গা বেশি ভালো লাগে ঘোরাঘুরির জন্য। কারণ, সব বড় শহরগুলো একই রকম। ব্যস্ত রাজপথ, সুউচ্চ অট্টালিকা আর হাঁস-ফাঁস জীবন। অন্যদিকে রেরাস্তাগির মত গ্রামগুলো শান্ত, নির্জন। অনেক বই আর অলস দুপুরগুলোতে চা দিয়ে এমন গ্রামে নিজেকে হারিয়ে দেয়া যেতেই পার। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সবারই এমন জায়গায় কিছুদিন থাকা উচিত।

- বেরেস্তাগি থেকে লেক টোবার পথে যাত্রাবিরতি। দূরে বউয়ের আব্বার গাড়ি। আমি আবার নিজের আব্বা আম্মা ছাড়া কাউকে আব্বা আম্মা বলতে পারি না।

- লেক টোবার পথে

***
---চলবে---

ইন্দোনেশিয়া সহ বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানতে ও দেখতে আমার চ্যানেলগুলোতে চোখ রাখতে পারেন।

ফেসবুকঃ দেশে বিদেশে ট্রাভেলিং

ইউটিউবঃ লিটল ট্রাভেল



সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:২৪
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নদী ও নৌকা - ১৫

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৩ শে মে, ২০২২ দুপুর ১২:২৫


ছবি তোলার স্থান : কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, কক্সবাজার, বাংলাদেশ।
ছবি তোলার তারিখ : ০১/১০/২০২০ ইং

নদী, নদ, নদনদী, তটিনী, তরঙ্গিনী, প্রবাহিনী, শৈবালিনী, স্রোতস্বতী, স্রোতস্বিনী, গাঙ, স্বরিৎ, নির্ঝরিনী, কল্লোলিনী, গিরি নিঃস্রাব, মন্দাকিনী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেইদিনের কথা (ছেলেবেলার পোংটামি)

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:১১

শেকল
এলাকার এক ভাবীর সাথে দেখা। জিগ্যেস করলেন, বিয়েশাদি করা লাগবে কি না। বয়স তো কম হলো না।
একটু চিন্তা করে বললাম, সত্যিই তো। আপাতত একটা করা দরকার।
তো এই ভাবী... ...বাকিটুকু পড়ুন

কে কেমন পোশাক পড়বে মোল্লাদের জিজ্ঞেস করতে হবে ?

লিখেছেন মোহাম্মদ গোফরান, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৮:৫২




কয়েকদিন আগে আমরা পত্রিকায় পড়েছি পোশাকের কারণে পোশাকের কারণে হেনস্থা ও মারধরের শিকার হয়েছেন এক তরুণী। চিন্তা করতে পারেন!! এদেশের মোল্লাতন্ত্র কতটুকু ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে? কোরানে একটা আয়াতও কি এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেন এত জ্বলে !!

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ২৩ শে মে, ২০২২ রাত ৯:১৮


কেন এত জ্বলে !!
© নূর মোহাম্মদ নূরু
(মজা দেই, মজা লই)

সত্য কথা তিক্ত অতি গুণী জনে বলে,
সত্য কথা কইলে মানুষ কেনো এত জ্বলে?
তাঁদের সাথে পারোনা তাই আমার সাথে লাগো,
সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাহা দেখি, তাহাও ভুল দেখি!

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৪ শে মে, ২০২২ সকাল ১১:২৫



আমার চোখের সমস্যা বেড়ে গেলে, আমি অনেক কিছুকে ডবল ডবল দেখি; ইহা নিয়ে বেশ সমস্যা হয়েছে সময় সময়, এটি ১টি সমস্যার কাহিনী; বেশ আগের ঘটনা।

আমাদের এলাকায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×