somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

" নারীর প্রতি সদ্ব্যবহার / ভাল আচরন ও শিষ্টাচার " - নারীদের সঙ্গে কথা বলার ও আচার আচরণের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা। (মানব জীবন - ২৪)।

০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ছবি - muslim.sg

পবিত্র কুরআনের বর্ণনা অনুসারে ইসলাম ধর্মের প্রথম মানুষ-পুরুষ, প্রথম পয়গম্বর বা নবী হযরত আদম (আঃ)। আল্লাহ তার পাঁজর থেকে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করেছেন সমগ্র মানবজাতির মা হিসেবে এবং কালক্রমে এ দুজন থেকেই সারা দুনিয়ার সকল নার-নারী সৃষ্টি হয়েছে । নর-নারী উভয়ের মিলিত প্রচেষ্টাতেই ও কিছু নিয়ম-নীতির অনুসরনের ফলেই পরিবার-সমাজ গঠিত হয়েছে এবং মানব জাতির ক্রমবিকাশ-উন্নয়ন ও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। মানুষ সামাজিক জীব, অন্যদিকে মানুষ প্রকৃতিরও অংশ। তাই মানুষকে জীবন ধারণ, বেঁচে থাকা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য " প্রাকৃতিক - সামাজিক এবং ঐশী " সব বিধি-বিধানই মেনে চলতে হয়। সামাজিক বিধি-বিধান গুলো মানুষের লব্ধ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার আলোকে গড়ে ওঠে। আর তাই সামাজিক বিধি-বিধান না মেনে চললে বা ভঙ্গ করলে মানব সমাজে নেমে আসে বিপর্যয়। ঠিক তেমনি, প্রাকৃতিক বিধান লঙ্ঘন করলেও বা মেনে না চললে মানব সমাজের ধ্বংস অনিবার্য। আর এসব বিধানসমূহের মধ্যে ঐশী বা ধর্মীয় বিধানই শ্রেয় এবং এসব বিধি-বিধান মেনে চলাও মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক।

নারীর সম্বন্ধে ইসলামের মহাগ্রন্থ আল কোরআনে " নিসা" অর্থাৎ " মহিলা" শব্দটি ৫৭ বার এবং " ইমরাআহ" অর্থাৎ " নারী" শব্দটি ২৬ বার উল্লেখ হয়েছে। পবিত্র কোরআনে সুরা " সুরা আন নিসা " তথা ' নারী ' শিরোনামের সুরাটি নারীর অধিকার ও কর্তব্যসংক্রান্ত একটি স্বতন্ত্র ও বৃহৎ সূরাও যাতে নারী জীবনের অধিকার ও কর্তব্যের সাথে তার চলার পথের যাবতীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন মহান আল্লাহ । এ ছাড়া কোরআনের বিভিন্ন আয়াত ও হাদিসে নারীর অধিকার, মর্যাদা ও তাদের মূল্যায়ন সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। ইসলাম নারীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করেছে,দিয়েছে নারীর জান-মালের নিরাপত্তা ও সর্বোচ্চ সম্মান।

মানুষের প্রতি ভাল আচরন তথা ভাল ব্যবহারের ব্যাপারে ধর্মের নির্দেশনা -

মানুষের প্রতি ভাল আচরন বা একের প্রতি অন্যজনের ভাল আচরন মানুষের হক।"আশরাফুল মাখলুকাত" হিসেবে জগতের সব মানুষ পারস্পরিক সর্বোত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকার রাখে। সুন্দর ব্যবহারকে ইসলামে অত্যাবশ্যকীয় ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষ নিজেকে অন্যের কাছে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে।সবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, "তোমরা পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকটতম প্রতিবেশী, দূরবর্তী প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথি, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে" (সূরা আল নিসা, আয়াত- ৩৬)।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সব সময় মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন এবং সর্বোত্তম পন্থায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতেন। আর তাই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, "তুমি মানুষকে তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান করো হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করো সদ্ভাবে"।(সূরা আন-নাহল, আয়াত - ১২৫)।

এছাড়া হাদীসেও বার বার তাগিদ দেয়া হয়েছে মানুষের সাথে ভাল আচরনের। হজরত সুরাকা ইবনে মালিক (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত,"একদা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) খুতবা প্রদানকালে ইরশাদ করেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো যে অন্যের ওপর অত্যাচার করা ছাড়া নিজ পরিবার ও আত্মীয়স্বজন থেকে সব অনিষ্ট দূর করে"।(আবু দাউদ শরীফ, হাদীস নং - ৫১২০)। আরো বলা হয়েছে, হজরত আবু হুরাইরা (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সাহাবায়ে কেরামের একদলের মধ্যে উপবিষ্ট অবস্থায় বললেন, 'তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিটি কে, আমি কি তা তোমাদের বলব?' সাহাবায়ে কেরাম নিশ্চুপ রইলেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এ কথা তিনবার বললেন। অতঃপর জনৈক সাহাবি আরজ করলেন, 'অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল।' রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, " তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো যার থেকে সবাই মঙ্গলের আশা করে এবং তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে। আর তোমাদের মধ্যে নিকৃষ্টতম ব্যক্তি হলো যার থেকে মঙ্গলের আশা করা যায় না এবং তার অনিষ্ট থেকে মানুষ নিরাপদ নয় " (তিরমিজি শরীফ হাদীস নং - ২২৬৩)।

ইসলামে শিষ্টাচার বা আদবকে ইমানের অংশ বলা হয়েছে। সর্বোত্তম ব্যবহার, বিনয়ী চরিত্র, ব্যক্তিত্ব, আনুগত্য, সহযোগিতা ও পারস্পরিক সুসম্পর্কের মাধ্যমে মানবসেবা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। সে-ই সবচেয়ে আদর্শ মানুষ, যার স্বভাব পরিবারের কাছে,সমাজের বাকী মানুষের কাছে সবচেয়ে ভালো বলে বিবেচিত। সে-ই পূর্ণ মুসলমান, যার আচরণ সর্বোত্তম।

নারীর প্রতি সদ্ব্যবহার - ভাল আচরন ও শিষ্টাচারের ব্যাপারে ইসলামের দিকনির্দেশনা -

স্ত্রীর (নারীর) সাথে সদাচরন এর ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, " হে ঈমানদারগণ! যবরদস্তি করে নারীদের উত্তরাধিকার হওয়া তোমাদের জন্য বৈধ নয়। তোমরা তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে কিছু আত্মসাৎ করার উদ্দেশ্যে তাদেরকে অবরুদ্ধ করে রেখো না, যদি না তারা স্পষ্ট খারাপ আচরণ করে । আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে জীবন যাপন করবে ; তোমরা যদি তাদেরকে অপছন্দ কর তবে এমন হতে পারে যে, আল্লাহ যাতে প্রভূত কল্যাণ রেখেছেন তোমরা তাকেই অপছন্দ করছ "।(সূরা-৪ নিসা, আয়াত - ১৯)। অর্থাৎ তাদের (নারীদের) সাথে উত্তম কথা বলবে। কথায়, কাজে, চলাফেরায় যতটুকু সম্ভব সৌন্দর্য রক্ষা করবে। যেমনটি তুমি তাদের কাছ থেকে আশা কর, তেমন ব্যবহারই করো তুমি তাদের সাথে।

রাসূল (সাঃ) বলেন, "তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো ঐ ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম।(তিরমিযী শরীফ , হাদীস নং- ৩৮৯৫)। রাসূল (সাঃ) চারিত্রিক সৌন্দর্যের মধ্যে এটা ছিল যে, তিনি সদাহাস্য সুন্দর ব্যবহার করতেন। পরিবারের সাথে হাস্যরস, নরম ব্যবহার ইত্যাদি করতেন।


ছবি - muslim.sg

আল্লাহ তা‘আলা নারীকে পুরুষের জীবন সঙ্গিনী হিসাবে মানব জীবন পরিচালনার জন্য পারস্পরিক সহযোগী করেছেন। ইসলাম মর্যাদার দিক দিয়ে নারীকে পুরুষের থেকে ভিন্ন করে দেখেনি। বরং ইসলামের আগমনেই নির্যাতিত, নিপীড়িত, অবহেলিত নারী সমাজ পেয়েছে মুক্তির সন্ধান। নারী কখনো মাতা, কখনো কন্যা, কখনো বোন আবার কখনো স্ত্রী। আর সর্বস্তরেই মহান আল্লাহ নারীকে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। ঠিক মহানবী (সাঃ)ও নারী জাতিকে মর্যাদার সর্বোচ্চ আসনে তুলে ধরে বলেন, ‘দুনিয়া একটি সম্পদ। আর দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সম্পদ হ’ল পুণ্যবতী স্ত্রী’। একজন আদর্শ নারী হল মূল্যবান মণিমুক্তার মতো। আর তাই পবিত্র কুরআনে এই আদর্শ মুসলিম নারীদের মুক্তার সাথেই তুলনা করে বলা হয়েছে " যেন তারা সুরক্ষিত মুক্তা " (সুরা ওয়াকি‘আহ,আয়াত - ২৩)। ইসলাম নারীদের সর্বশ্রেষ্ঠ মর্যাদা দিয়েছে মা হিসেবে। মহানবী (সাঃ) বলেছেন, " মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত"। হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন, "একবার এক লোক মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর দরবারে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার বেশি অধিকারী কে? নবীজি (সাঃ) বললেন, 'তোমার মা'। ওই লোক জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? তিনি উত্তর দিলেন 'তোমার মা'। ওই লোক আবারও জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? এবারও তিনি উত্তর দিলেন ' তোমার মা'। (বুখারি শরীফ)।

মহানবী (সাঃ) এর সময়ের বিখ্যাত এক ঘটনা । মায়ের সেবা করার কারণে হজরত ওয়াইস করনি (রাঃ) প্রিয় নবীর জামানায় থেকেও সাহাবি হতে পারেননি। একবার ওয়াইস করনি (রাঃ) নবীজির কাছে খবর পাঠালেন ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আপনার সঙ্গে আমার দেখা করতে মন চায়, কিন্তু আমার মা অসুস্থ, এখন আমি কী করতে পারি?’ নবীজি (সাঃ) উত্তর পাঠালেন, "তোমার আমার কাছে আসতে হবে না। আমার সঙ্গে সাক্ষাতের চেয়ে তোমার মায়ের খেদমত করা বেশি জরুরি"। এ থেকেও মায়ের প্রতি ইসলামের মর্যাদা বুঝা যায়।


ছবি - shutterstock.com

তাছাড়াও মহানবী (সাঃ) বলেছেন, " মেয়ে শিশু বরকত (প্রাচুর্য) ও কল্যাণের প্রতীক"। হাদিস শরিফে আরও আছে," যার তিনটি, দুটি বা একটি কন্যাসন্তান থাকবে; আর সে ব্যক্তি যদি তার কন্যাসন্তানকে সুশিক্ষিত ও সুপাত্রস্থ করে, তার জান্নাত নিশ্চিত হয়ে যায়"।

ইসলামের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ একে অন্যের পরিপূরক। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে," ‘তারা (নারী) তোমাদের (পুরুষের) আবরণস্বরূপ আর তোমরা তাদের আবরণ"। (সূরা বাকারা, আয়াত - ১৮৭)।

স্ত্রীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সাঃ) বলেছেন,"উত্তম স্ত্রী সৌভাগ্যের পরিচায়ক"। (মুসলিম শরিফ)। তিনি আরও বলেন,"তোমাদের মধ্যে সে–ই উত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম"। (তিরমিজি শরীফ)।

আল কোরআনের আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, "আর তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ তিন রজঃস্রাব কাল প্রতীক্ষায় থাকবে। আর তারা আল্লাহ ও আখেরাতের উপর ঈমান রাখলে তাদের গর্ভাশয়ে আল্লাহ যা সৃষ্টি করেছেন তা গোপন রাখা তাদের পক্ষে হালাল নয়। আর যদি তারা আপোষ-নিষ্পত্তি করতে চায় তবে এতে তাদের পুনঃ গ্রহণে তাদের স্বামীরা বেশী হকদার। আর নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার আছে যেমন আছে তাদের উপর পুরুষদের; আর নারীদের উপর পুরুষদের মর্যাদা আছে । আর আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় "। (সূরা-২ বাকারা, আয়াত ২২৮)। এ আয়াতে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে । বলা হয়েছে, নারীদের উপর যেমন পুরুষের অধিকার রয়েছে, এবং যা প্রদান করা একান্ত জরুরী, তেমনিভাবে পুরুষদের উপরও নারীদের অধিকার রয়েছে, যা প্রদান করা অপরিহার্য।

পর নারীর সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে ইসলামের নির্দেশনা -

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত, সৃষ্টির সেরা জীব। এ দুনিয়াতে মানুষই একমাত্র বাকশক্তিসম্পন্ন বা কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে। চলার পথে এবং নানা প্রয়োজনে মানুষকে কথা বলতেই হবে। এই কথা হতে পারে কোনো নর কিংবা নারীর সঙ্গে। আর প্রয়োজনে যে কোন নারীর সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দেয় ইসলাম। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর যুগেও বহু নারী তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। অনেক নারী সাহাবি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে মাসলা- মাসায়েল জিজ্ঞাসা করতেন। তিনি সেগুলোর ব্যাপারে ফতোয়া দিতেন। কাজেই কোন নারীর সাথে পুরুষের কথা বলার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা নেই তবে কিছু শর্তসাপেক্ষে বা নিয়ম-নীতির মাঝে ইসলাম নারীদের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি দিয়েছে।

নারীদের সঙ্গে কথা বলার নির্দেশনা বা মূলনীতি বিষয়ে পবিত্র কোরআনে দুটি আয়াত নাজিল হয়েছে।

১। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেন, " হে নবী-পত্নীরা, তোমরা অন্য নারীদের মতো নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো তাহলে পর-পুরুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বোলো না, যাতে অন্তরে যার ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে"। (সুরা আহজাব, আয়াত - ৩২)।

২। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে , " হে মুমিনগণ! তোমাদেরকে অনুমতি দেয়া না হলে তোমরা খাওয়ার জন্য আহার্য রন্ধনের অপেক্ষা না করে নবীর গৃহে প্রবেশ করো না। তবে তোমরা আহুত হলে প্রবেশ করো, তবে অতঃপর খাওয়া শেষে আপনা আপনি চলে যেয়ো, কথাবার্তায় মশগুল হয়ে যেয়ো না। নিশ্চয় এটা নবীর জন্য কষ্টদায়ক। তিনি তোমাদের কাছে সংকোচ বোধ করেন; কিন্তু আল্লাহ সত্যকথা বলতে সংকোচ করেন না। তোমরা তাঁর পত্নীগণের কাছে কিছু চাইলে পর্দার আড়াল থেকে চাইবে। এটা তোমাদের অন্তরের জন্যে এবং তাঁদের অন্তরের জন্যে অধিকতর পবিত্রতার কারণ। আল্লাহর রাসূলকে কষ্ট দেয়া এবং তাঁর ওফাতের পর তাঁর পত্নীগণকে বিবাহ করা তোমাদের জন্য বৈধ নয়। আল্লাহর কাছে এটা গুরুতর অপরাধ "। (সুরা আহজাব, আয়াত - ৫৩)।

এই দুটি আয়াত ও বিভিন্ন হাদিসের আলোকে ইসলামিক স্কলাররা নারীদের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে কয়েকটি শর্ত আরোপ করেছেন। সেগুলো হলো -

১। কোন পুরুষ নির্জনে পর-নারীর সঙ্গে কথা বলবে না।
২। নারীর সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে বৈধতার সীমারেখা অতিক্রম করবে না।
৩। নারীদের সাথে অশ্লীল বা উত্তেজক কোনো কথা বলবে না।
৪। নারী পূর্ণ পর্দার ভেতর থেকে কথা বলবে।
৫। প্রয়োজন-অতিরিক্ত কথা বলবে না।
৬। কাউকে আহত করে কোনো কথা বলবে না।
৭। ন্যায়সংগত ও উত্তম কথা বলবে।

যেকোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে নর-নারী প্রত্যেকেরই সতর্ক হওয়া জরুরি। কেননা মানুষের প্রতিটি কথা রেকর্ড হয়।আল কোরআনে ইরশাদ হয়েছে," মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে (তা লিপিবদ্ধ করার জন্য) তৎপর প্রহরী (ফেরেশতা) তার নিকটেই রয়েছে "। (সুরা কাফ, আয়াত - ১৮)। তাই কথা বলার ক্ষেত্রে আমাদের সকলেরই সর্তকতা অবলম্বন জরুরী।

আবার কণ্ঠস্বর নিচু করে বা আদবের সাথে কথা বলা ইসলামী শিষ্টাচার। এ ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে, " আর তুমি তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বন কর এবং তোমার কণ্ঠস্বর নীচু করো , নিশ্চয় সুরের মধ্যে গর্দভের সুরই সবচেয়ে অপ্রীতিকর "। (সুরা লোকমান, আয়াত - ১৯)।

সমাজে চলার পথে এবং যেকোনো মানুষের সঙ্গে সুন্দরভাবে ও উত্তমরূপে কথা বলা ইসলামের শিক্ষা। এ ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে, " আর স্মরণ কর, যখন আমরা ইসরাঈল-সন্তানদের নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ ছাড় আর কারো ইবাদত করবে না, মাতা-পিতা , আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম ও দরিদ্রের সাথে সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সাথে সদালাপ করবে। আর সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং যাকাত দিবে, তারপর তোমাদের মধ্য হতে কিছুসংখ্যক লোক ছাড়া তোমরা সকলেই অবজ্ঞা করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে "। (সুরা বাকারা, আয়াত- ৮৩)।

চলার পথে কাউকে কটাক্ষ করা, উপহাস করা, কারো দিকে কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত করা এবং কাউকে মন্দ বিশেষণে ভূষিত করা ইসলামে খুবই গর্হিত অপরাধ। এ ব্যাপারে আল কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, "হে ঈমানদারগণ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম"। (সুরা হুজরাত, আয়াত - ১১)।

কিন্তু এসব বিষয় সত্ত্বেও তাদের আন্তরিক পবিত্রতা ও মানসিক কুমন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য পুরুষ ও নারীর মধ্যে পর্দার ব্যবস্থা করা জরুরী মনে করা হয়েছে। পর্দার বিধানের ব্যাপারে ইসালমের সারকথা হলো, কোরআন-সুন্নাহর আলোকে সর্বসম্মতিক্রমে হিজাব বা পর্দা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে নারী জাতির জন্য এক ফরয বিধান। সর্বাবস্থায় এ বিধানের প্রতি পূর্ণ সমর্পিত থাকা অপরিহার্য।

আর এ ব্যাপারে আল কোরআনে মহান আল্লাহপাক বলেন,"এসব আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করলে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; তারা সেখানে স্থায়ী হবে আর এটাই হলো মহাসাফল্য। আর কেউ আল্লাহ ও তার রাসূলের অবাধ্য হলে এবং তার নির্ধারিত সীমা লংঘন করলে তিনি তাকে আগুনে নিক্ষেপ করবেন; সেখানে সে স্থায়ী হবে এবং তার জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি রয়েছে।(সুরা নিসা , আয়াত -১৩ - ১৪)

তবে চিকিৎসা এবং আরো বিশেষ প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন মাফিক শিথিলতা গ্রহণের অবকাশও অবশ্যই রয়েছে। ইসলাম ধর্ম নারী-পুরুষের যে সমান অধিকার দিয়েছে বা নারীদের যে মর্যাদা দিয়েছে পৃথিবীতে কেউ কখনো তা দিতে পারেনি, কখনো পারবেও না। নারী ছাড়া অন্য কেউই মাতৃত্বের সেবা ও সহধর্মিণীর গঠনমূলক সহযোগী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম নয়। মায়েদের ত্যাগ ও ভালোবাসা ছাড়া মানবীয় প্রতিভার বিকাশ ও সমাজের স্থায়িত্ব বজায় রাখা সম্ভব নয়। নারী তথা মায়েরাই সমাজের প্রধান ভিত্তি তথা পরিবারের প্রশান্তির উৎস।


ছবি - patheos.com

রাসুল (সাঃ) এর একটি হাদিসে এসেছে, নারীকে সম্মান করার পরিমাপের ওপর ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদার বিষয়টি নির্ভর করে। তিনটি বিষয় নবী করিম (সাঃ) এর জীবনে লক্ষণীয় ছিল -
১। নামাজের প্রতি অনুরাগ।
২।ফুলের প্রতি ভালোবাসা।
৩। নারীর প্রতি সম্মান। (বুখারি শরীফ ও মুসলিম শরীফ)।


শরীয়তের সকল বিধানের ব্যাপারে আল কোরআনে বলা হয়েছে, " নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সওম পালনকারী পুরুষ সওম পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী নারী, আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী নারী - তাদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান"। (সূরা-২২ আহজাব, আয়াত - ৩৫)।

মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে যথাযথভাবে নারীর প্রতি সদ্ব্যবহার - ভাল আচরন ও শিষ্টাচারের সাথে সাথে শরীয়তের সকল বিধান পালনের তাওফীক দান করুক।

তথ্য সূত্র - আল কোরআনও হাদীস।
=========================================================
পূর্ববর্তী পোস্ট -

মানব জীবন - ২৩ - " নারী " Click This Link
মানব জীবন - ২২ -" স্ত্রী / সংগী অদল-বদল করে যৌনসহবাস" Click This Link
মানব জীবন - ২১ -"পরকীয়া ও লিভ টুগেদার " Click This Link
মানব জীবন - ২০ -"সমকামীতা বা সমকামী বিয়ে" Click This Link
মানব জীবন - ১৯ - " আত্মসম্মান-নীতি-নৈতিকতা " Click This Link
মানব জীবন - ১৮ - " ধর্মহীনতা " Click This Link
মানব জীবন - ১৭ - " ধৈর্য " Click This Link
মানব জীবন - ১৬ -" সততা " Click This Link
মানব জীবন - ১৫ - " লজ্জা " Click This Link
মানব জীবন - ১৪ - "পর্দা " Click This Link
মানব জীবন - ১৩ - "ধর্ম " Click This Link
মানব জীবন - ১২ " সহ শিক্ষা " Click This Link
মানব জীবন - ১১ " শিক্ষা " - Click This Link
মানব জীবন - ১০ "পরিবার " - Click This Link
মানব জীবন - ৯ "বিবাহের পরে" - Click This Link
মানব জীবন - ৮ " মানব জীবনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য " - Click This Link
মানব জীবন - ৭ " তালাক " - Click This Link
মানব জীবন - ৬ "দেনমোহর - স্ত্রীর হক" - Click This Link
মানব জীবন - ৫ "বিবাহ" - Click This Link
মানব জীবন - ৪ " মাতৃত্ব " - Click This Link
মানব জীবন - ৩ Click This Link
"নারী স্বাধীনতা বনাম নারী(জরায়ু)'র পবিত্রতা "
মানব জীবন - ২ " মাতৃগর্ভ (জরায়ু)"- Click This Link
মানব জীবন - ১ "মানুষের জন্ম প্রক্রিয়ার ইতিকথা"- Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মার্চ, ২০২২ দুপুর ২:৩০
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সে কোন বনের হরিণ ছিলো আমার মনে-১৯

লিখেছেন অপ্‌সরা, ২৫ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ৯:৩৫



আজকাল আমি রোজ বিকেলে সিদ্দিকা কবিরের বই দেখে দেখে ডালপুরি, সিঙ্গাড়া, সামুচা বানাই। বাবার বাড়িতে আমি কিছুই রান্না শিখিনি, এমনকি ভাতও টিপ দিয়ে বুঝতে শিখিনি সিদ্ধ হলো নাকি হলো না... ...বাকিটুকু পড়ুন

নূর মোহাম্মদ নূরু ভাইয়া আর কখনও ফিরবেনা আমাদের মাঝে

লিখেছেন শায়মা, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ২:০২


নূর মোহাম্মদ নূরু
আমরা কিছু সামু পাগল আছি যাদের সামুতে না লিখলে কিছুই ভালো লাগে না। নুরুভাইয়া মনে হয় ছিলেন সেই দলে। প্রথমদিকে উনাকে ফুল ফল ও মনিষীদের জীবন নিয়েই লিখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শোক সংবাদঃ ব্লগার নূর মোহাম্মদ নূর আর আমাদের মাঝে নেই।

লিখেছেন কাল্পনিক_ভালোবাসা, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ রাত ৩:০৪



সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আমরা অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানাতে চাই যে, সামহোয়্যারইন ব্লগের ব্লগার নূর মোহাম্মদ নূরু (নূর মোহাম্মদ বালী) আর আমাদের মাঝে নেই। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নইলাহি রাজিউন। গত ২৯ অক্টোবর রাত... ...বাকিটুকু পড়ুন

যেকোনো মৃত্যু: বড় কষ্টের, বড় বেদনার.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৪৯

যেকোনো মৃত্যু: বড় কষ্টের, বড় বেদনার.....

ছড়াকার সাংবাদিক ব্লগার বন্ধু নুর মোহাম্মদ নুরু ভাইর চলে যাওয়া খুব কষ্টের। আরও বেশী কষ্ট পেয়েছি ব্লগার শায়মার পোস্টে নুরু ভাইয়ের মেয়ের হৃদয়বিদারক লেখা পড়ে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১ মাস গত হয়ে যাবার পর?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৬ শে নভেম্বর, ২০২২ দুপুর ১:২৮





ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করে লিখতে শুরু করলেন, সময় গত হবার পর আপনি পরিচিতি পেলেন, সবাই আপনার পোস্ট, কমেন্ট চায় ; আপনি যথেষ্ট সক্রিয় ব্লগে।হঠাৎ আপনি অসুস্থ হয়ে অনিয়মিত, অসুস্থতায় আপনি মৃত্যুবরণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×