somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিরিয়ানির অমর সব রন্ধনশিল্পীরা - বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০৪)

৩০ শে জুন, ২০২২ দুপুর ২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এই সিরিজের আগের পর্বগুলোঃ
বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০১)
মাশালাজাদে মাশালাদার… বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০২)
বিরিয়ানি'র বাহারি রকমফের - বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০৩)

বিরিয়ানিনামা’র আজকের আয়োজন বিরিয়ানি’র রন্ধনশিল্পীদের নিয়ে। যে কোন সুস্বাদু খাবারের রন্ধন উপাদানের চাইতে অগ্রে থাকে রন্ধনশিল্পী; কেননা সুদক্ষ রন্ধনশিল্পী’র হাতেই তৈরী হয়ে মুখরোচক সুস্বাদু খাবার। আর বিরিয়ানি’র মত মুখরোচক খাবার রান্না করা চাট্টিখানি কথা নয়। আর তাইতো পুরাতন ঢাকার বিরিয়ানিগুলো রন্ধনশিল্পীদের নামেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছেঃ হাজী বিরিয়ানি, নান্না বিরিয়ানি, ফখরুদ্দিন বিরিয়ানি, ঝুনুর মোরগ পোলাও, হানিফ বিরিয়ানি সহ আরও অনেক নাম বলা যেতে পারে। আর বিরিয়ানির রন্ধনশিল্পী’রা মূলত “বাবুর্চি” বলেই পরিচিত। বাবুর্চি শব্দটি তুর্কি। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিধানে তার মানে ‘মুসলমান পাচক’। আসলে আদিকালে ভুভারতে যে সমাজ জীবন প্রচলিত ছিল সেখানে রান্নার লোকদের বলা হত “বামুন ঠাকুর”, হিন্দু প্রতিষ্ঠিত পরিবারে রান্নার জন্য তারা বাবুর্চি হিসেবেই কাজ করতো। পরবর্তী সময়ে যখন মোঘল শাসন আমলে হেঁশেলে মুসলমান রন্ধনশিল্পীদের জায়গা হল, তাদের উপাধি পাল্টে গিয়ে হল বাবুর্চি। ও হ্যাঁ, যারা আগে খাবার হোটেলে রান্না করতেন তাদের বলা হত “পাকর্শী” হালের জমানায় যাদের পরিচিতি “শেফ” হিসেবে।

আসলে মুসলমান বাবুর্চিদের উঠে আসার পেছনে অন্যতম কারণ ছিলো ঢাকায় মোগল সুবেদারি প্রতিষ্ঠার পর তাদের খাবারে মুরগি-খাশি সহ যে সকল খাবারের প্রচলন ছিলো তা নিয়ে তৎকালীন হিন্দু সমাজে ছিলো বাছবিচার এবং তার সাথে খাওয়াদাওয়াতে ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটায় খুব ছিল কড়াকড়ি। আর এসব কারণেই ধীরে ধীরে মোঘল হেঁশেলে আস্তানা গড়ে উঠতে থাকে মুসলমান রন্ধনশিল্পীদের তথা বাবুর্চিদের। ঢাকার আদি এবং ঐতিহাসিক যত খাবারের কথা শোনা যায়, তার প্রায় সব কয়টাই মোঘল হয়ে নবাব-জমিদার পরিবারের হেঁশেল হতে সময়ের সাথে সাথে নানান বাবুর্চিদের নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় পরিবর্ধিত-পরিবর্তিত হয়ে আজকের রূপ পেয়েছে।

ড. আবদুল করিম ‘মোগল রাজধানী ঢাকা’ বইতে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটিশ আমলে ঢাকা কুঠিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথম বাবুর্চি নিয়োগ করেছিল ১৭২৩ সালে। তবে তাঁদের নামের তালিকা পায়া যায় না। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমলের বাবুর্চিদের মধ্যে বিখ্যাত কয়েক বাবুর্চির নাম আছে এশিয়াটিক সোসাইটির ‘ঢাকাই খাবার’ বইতে যেখানে উল্লেখ আছে পিয়ারু বাবুর্চি, কালু বাবুর্চি, সামিরউদ্দিন বাবুর্চি প্রমুখদের নাম। এর বাইরে ঢাকায় বসবাসকারী বিভিন্ন সাহেব-সুবেদার’দের বাড়ীতে অনেক হান্ডি বাবুর্চিরা কাজ করেছেন আঠারো থেকে উনিশ শতকের দিকে যাদের মধ্যে কয়েকজনের নাম জানা যায় নানান বইপত্তর ঘেটে। এদের মধ্যে “রেলি ব্রাদার্স” এর দীন মোহাম্মদ, শেখ আলী মোহাম্মদ; বংশীবাজারের জুম্মন মিয়া, ব্রিটিশ সাহেবদের বড়দিনের কেক তৈরির জন্য শেখ আলী আমজাদ, স্যার সলিমুল্লাহ’র নবাববাড়ীর প্রধান বাবুর্চি হাসান জান, সহযোগী গুলকান বাবুর্চি, হাফিজ উদ্দিন বাবুর্চি অন্যতম ছিলেন। না। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে ঢাকার অন্য খ্যাতিমান বাবুর্চিদের মধ্যে ছিলেন বংশীবাজারের ইদু খলিফা ও জানু খলিফা; এঁরা ইউরোপীয় রান্নায় দক্ষ ছিলেন। ঈদ বা বড় মজলিশে রান্না করতেন রহমান বাবুর্চি, শুক্কুর বাবুর্চি, চামু বাবুর্চি, সিকিম বাবুর্চি প্রমুখ। আর অতি অবশ্যই ডেজার্ট তথা মিষ্টি’র জন্য ঢাকার প্রাচীন হালুইকরদের মধ্যে নাম আসবে কালাচাঁদ, গন্ধবণিক, সীতারাম’দের। তাদের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে মরণ চাঁদ, মোহন চাঁদ, যাদব ঘোষ এবং অতি অবশ্যই মিষ্টিতে মুসলিমদের পথিকৃৎ ভারতের লখনউ থেকে আগত আলাউদ্দিন হালুইকর।


হাজীর বিরিয়ানি'র হাজী মোহাম্মদ হোসেন বাবুর্চি
স্বাধীনতা পূর্বের পুরাতন ঢাকার ইসলামপুরের কাছে সাইনু পোলাও ওয়ালা’র নাম জানা যায় ইতিহাস হতে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস তার ‘চিলেকোঠার সেপাই’ বইতে এই সাইনু পোলাও ওয়ালা’র কথা উল্লেখ করেছেন। বর্তমানে দোকান চলছে এমন বাবুর্চিদের মধ্যে অন্যতম নাম “হাজী মোহাম্মদ হোসেন”। ১৯৩৯ সালে হাজী মোহাম্মদ হোসেন নামক বাবুর্চি পুরাতন ঢাকার নারিন্দায় শুরু করেন যে বিরিয়ানির দোকানটি সেটি আজকের পুরাতন ঢাকার আলাউদ্দিন রোডের বিখ্যাত হাজীর বিরিয়ানি। আরেকটি বিখ্যাত বিরিয়ানি ‘হানিফ বিরিয়ানি’র হানিফ বাবুর্চি ছিলেন হাজী মোহাম্মদ হোসেনের শিষ্য।


ফখরুদ্দিন বাবুর্চি
অপরদিকে বিখ্যাত ফখরুদ্দিন বাবুর্চি ১৯৫৬ সালে জীবিকার খোঁজে সুদুর পাটনা হতে ঢাকায় চলে আসেন যদিও উনার জন্মস্থান চট্টগ্রাম; কাজ নেন ভিকারুননিসা নুন স্কুল এন্ড কলেজের নৈশপ্রহরী। পরবর্তীতে ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে স্কুল কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে স্কুল কম্পাউন্ডে একটি ক্যান্টিন তৈরী করেন। সেই ক্যান্টিন থেকেই আজকের ফখরুদ্দিন বিরিয়ানী ও রেষ্টুরেন্ট এর জন্ম।


হাজী নান্না মিয়া
পুরাতন ঢাকার আরেক বিখ্যাত নান্না বিরিয়ানির নান্না মিয়া বিরিয়ানির ব্যবসা শুরু করেন ১৯৬২-৬৩ সালের দিকে পরবর্তীতে স্বাধীনতার পরে ১৯৭৩-৭৪ সালের দিকে পুরাতন ঢাকার মৌলভীবাজারের বেচারাম দেউরিতে আরও বড় পরিসরে তার বিরিয়ানির ব্যবসা শুরু করেন। পুরাতন ঢাকার চকবাজার শাহী মসজিদের বিপরীতে মার্কেটের ভেতরে সকাল ০৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত বিক্রি হওয়া শাহ সাহেব এর বিরিয়ানির “শাহ সাহেব” এর আসল নাম আব্দুর রহমান যার পিতাও ছিলেন এই রন্ধন ব্যবসায় যার নাম ছিলো লতিফ পোলাও ওয়ালা। অপরদিকে নারিন্দার ঝুনু বিরিয়ানির যাত্রা বাবুর্চি নুর মোহাম্মদের হাত ধরে। ১৯৭০ সালে নারিন্দার দোকানে স্বল্প পরিসরে শুরু করেন যে বিরিয়ানির দোকান তা তার মেয়ের নামে নামকরণ করেন। খিলগাঁও এর মুক্তা বিরিয়ানিও প্রতিষ্ঠাতা নিজামউদ্দিন খান এর মেয়ের নামে শুরু হয় ১৯৮৭ সালের দিকে। এর আগে থেকেই খাবার হোটেল ছিল খান সাহেব এর গুলিস্থানে।

তো হালের অনেক অনেক বিরিয়ানি দোকান, তাদের বাবুর্চিদের আবির্ভাব বিরিয়ানির জগতকে করেছে আরও সমৃদ্ধ, তাদের সকলের নাম জানা-আজানা রইলেও তাদের বিরিয়ানির সুখ্যাতি কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়া আর অনলাইন এর কল্যাণে ঠিকই পৌঁছে যাচ্ছে সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে তে। তো “বিরিয়ানিনামা”র আজকের আয়োজন এই পর্যন্তই, আগামী পর্বে কি নিয়ে লেখা থাকছে বলতে পারবেন কি?

এই সিরিজের সকল পর্বঃ
বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০১)
মাশালাজাদে মাশালাদার… বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০২)
বিরিয়ানি'র বাহারি রকমফের - বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০৩)
বিরিয়ানির অমর সব রন্ধনশিল্পীরা - বিরিয়ানিনামা (পর্ব ০৪)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২২ বিকাল ৪:৫৬
১৪টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনন্তের জীবন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ১২:৪৪



কারো হাত ধরে হাঁটা মেঠো পথ ধরে
কারো সাথে বসে থাকা বকুলের তলে
যখন ঝরছে ফুল দু’জনের কোলে
তখন লাগছে বেশ রোমাঞ্চ সময়।
বৃষ্টি ফোটা ঝরে পড়ে দু’জন উপরে
হৈচৈ করা শিশুদের নৃত্য-কোলাহলে
ঘাসের কোমল... ...বাকিটুকু পড়ুন

'জ্ঞান' অর্জন করতে হয়

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৩ দুপুর ২:০৬



শুনেছি আমাদের নবীজির একজন বন্ধু ছিলেন।
তার নাম- ওয়ারাকা ইবনে নওফেল। তিনি বাইবেল এবং অন্যান্য নানা ধর্মের বিশেষজ্ঞ ছিলেন। উনার কাছ থেকেই নবীজি বাইবেল এবং পুরনো নানা ধর্মের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি একদিন সাদা বক হবো

লিখেছেন জিএম হারুন -অর -রশিদ, ৩১ শে জানুয়ারি, ২০২৩ বিকাল ৩:৫৪


তুমি আমাকে বলেছিলে মানুষ হতে,
আমি কোন ভাবেই মানুষ হতে পারছিনা!


মানুষের মায়া দেখলেই আমার ভয় করে!
মায়ার ওজন পাহাড়ের মতো লাগে বুকে,
মায়া বুকে চেপে বসলেই আমার দম বন্ধ হয়ে আসে;
আমি আর শ্বাস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধরো আমি এলাম আবার

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১২:০৮






মনে করো হারিয়ে যাবার পরে আমি এলাম
তোমার অজান্তে কোন এক আলস দুপুরে
যে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তুমি চুল শুকাতে শুকাতে
নিতান্ত অবহেলায় আর্কিডের যে পাতা তুমি ছিড়ে ফেলে দিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামের যে বিষয়গুলি বিজ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ রাত ১২:৪৫



কোরআনের দ্বিতীয় সূরার (সূরা বাকারা) ৩ নং আয়াতে আছে;

‘যারা অদৃশ্য বিষয়গুলিতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে উপজীবিকা প্রদান করেছি তা হতে দান করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×