৩.
বাস চলতে শুরু করলো। বসেই ভ্রমণ আলোচনা রেখে দেশের ট্রান্সপোর্ট সেক্টরের উন্নতি অবনতি নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলাম এবং আমাদের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনিত হলাম গ্রীণ লাইন স্ক্যানিয়াই দেশের সবচেয়ে ভালো বাস। ভাগ্যিস মালিক সামনে ছিলেন না। থাকলে নিশ্চিত আমাদের ফেরার টিকেটটা ফ্রি করে দিতেন।
আলোচনার মনযোগী আমাদের মাঝে হঠাৎ হাসি মুখে আবির্ভূত হলেন একজন। আমরা চমকে ওঠলাম, মালিক নাকি?
না মালিকের কর্মচারী।
স্যার, টিকেটটা। প্রথিবীর সবচেয়ে বিরক্তিকর শব্দ শুনেও তার দিকে হাসি মুখে তাকালাম। টিকেটটা দিলাম।
সে হাসির মূল্য দিলনা। অন্য অর্থ বের করার চেষ্টা করলো। টিকেটা ফেরত দিয়ে আবার সামনে এসে জিজ্ঞসা করলো, স্যার আপনারা ভলবোর যাত্রী না? নাকি, নন এসি??
মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল। ডাক দিলাম, এই এদিকে আসেন। টিকেটে দেখেন নাই? আবার জিজ্ঞসা করেন ক্যান? এই বিষয়ে মানহানির মামলার বিধান নেই বলে বেঁচে গেলেন। না হলে কঠিন প্যাঁচে পড়তেন। সুপারভাইজার সাহেব বিষয়টাকে রসিকতা ধরে একটা খুচরা হাসি দিয়ে চলে গেলেন।
আমি আরো হতাশ হলাম, আমার মানহানির বিষয়টারও মানহানি হওয়ায়।
বাস চলছে। হালকা হালকা শীতশীত ভাব। ছোট ছোট কম্বল দেয়া হলো। আমরা সেটাকে জড়িয়ে ঘুমের ডানায় ভর করে চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত এলাম। খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ক্ষিধা তেমন না থাকলেও বাসে চড়ার নিয়ম হিসেবে এসব জায়গাগুলোতে কেন যে আসোলেই ক্ষিধা লেগে যায়। জোড় করে কিছু একটা খেলাম। মূলত খাওয়াটা ছিল চা।
আবার চৌদ্দগ্রাম ত্যাগ। আবার ঘুম। খুব ভোরে, অনেকটা ভোর হবার আগেই চিটাগাং। মাত্র সাড়ে তিন ঘন্টা বড় জোড় চার ঘন্টায় চলে এলাম।
আমি আর জয় কোনো কূল কিনারা পাচ্ছিনা। জয় বলল, চলেন এক কাজ করি। নাস্তা টাস্তা করি। চিটাগাং থাকার দরকার নেই। বাসে ওঠে খাগড়াছড়ি চলে যাই।
যেই কথা সেই কাজ।
নাস্তাটাস্তা শেষে অক্সিজেন নামক এলাকায় গেলাম। সেখান থেকেই খাগড়াছড়ির বাস ছাড়ে। গিয়েই অক্সিজেন শূন্যতা টের পেলাম। দম বন্ধ হবার যোগাড়। আবারও সেই শান্তি পরিবহন! জটিল সিটিং ব্যবস্থা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে সিটিং ব্যবস্থা সমস্যাসংকুল, যাত্রীদের দাড়িয়ে থাকাই সুবিধাজনক। টিকেট কেটে ঘন্টাখানেক সময় পেলাম। কিছু করার না পেয়ে সেখানেই ফটোগ্রাফী শুরু করলাম। সাবজেক্ট জয় এবং কাউন্টারের বিরল প্রজাতির লোকজন।
একটা সময় গাড়ী চলতে শুরু করল। যেভাবে বসলাম, পা দুটো মোটামুটি হাতে রেখে বললে ভুল বলা হবেনা। সুপারভাইজারকে জিজ্ঞাসা করলাম, ভাই কতক্ষণ লাগবে। সে জানালো বেশিক্ষণ না। এই ধরেন তিন ঘন্টা। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যাবে। তারপর শুরু হলো আমাদের দেখা। এই দেখার অনুভুতি আসলে বলে বোঝানো সম্ভব নয়। চট্রগ্রামের সমতলতা পেরুনোর পর থেকে যে মুগ্ধতা শুরু হয় তার আর থামার কোন সুযোগ ছিলনা। কখনো বিশাল উচুতে, কখনো নিচুতে এভাবেই চলছিল আমাদের যাত্রা। সবুজ আর দুর্গম প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে আমরা নিমিষেই ভুলে স্বস্তিদায়ক সিট না পাওয়ার কষ্ট। গাড়ী চলছে, ফুরিয়ে আসে পথ। আমাদের মুগ্ধতা ফুরায় না। যা দেখি তাতেই মুগ্ধ। আমাদের পাশের দুই ভদ্রলোক এই মুগ্ধতার রোগে আক্রান্ত হলেন বেশি বোঝো গেল। যা দেখেন তাতেই হই হই করে ওঠেন। কিছুক্ষণ পর পর মুগ্ধতার ধ্বনী প্রতিফলিত হয় পাহাড়ে পাহাড়ে। পাহাড় দেখেন চিৎকার দেন আহ! পাহাড়।
বড় বড় গাছ দেখেন আহ! কি বিশাল গাছ।
হঠাৎ শোনলাম, চিৎকার দিলেন আহ! গরু।
অবাক হলাম। ঘটনা কি?
ভাইজান কি ফরেন মাল নাকি? তাকালাম। না ফরেনের আশেপাশেরও ছিটে ফোটাও নাই।
একদম দেশী। হঠাৎ গাড়ী থামানো হলো। চারদিকে তাকালাম। খাবরের বিরতী নাকি? কিন্তু আশেপাশে হোটেল নেই। তাহলে?
সুপারভাইজার জানালেন ঘটনা। আমরাও নামলাম। এটা 'টি' ব্রেক। তবে কেউ আবার চা বিরতী ভেবে ভুল করবেননা। ওটা ছিল টি মানে 'টয়লেট' ব্রেক। সুপারভাইজার বললেন, যার যা প্রয়োজন সেরে নেন। সুপারভাইজারের আদেশে আমরা সবাই লাইন ধরে এক সরু গলির ভেতর দিয়ে গেলাম। অনেককে দেখে বোঝা গেল কোন প্রকার চাপ অনুভব না হওয়ার পরও বোধ হয় গিয়ে ঘুরে আসলেন।
ভয়টা এমন, বলা তো যায়না যদি ধরে!
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা এপ্রিল, ২০০৯ রাত ১১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



