somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সোনালী চুল আর নীল চোখের শিশুদের দিয়ে হিটলারের এরিয়ান মাস্টার রেস্ তৈরির লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম - আর নববর্ষে কিছু স্বদেশ ভাবনা

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ রাত ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


ফটো ১: জার্মানির ভেতরকার একটি লেবেনসবর্ন হোম

হিটলারের প্রসংগে আমাদের সবচেয়ে বেশি শোনা কিছু কথার একটা হোল তার আর্য শ্রেষ্ঠত্বের দাবি। সোনালী চুল আর নীল চোখের ককেশানরা অন্য সব জাতির মানুষের বুদ্বিবৃত্তিক ভাবে উঁচু আর তারাই বিশ্ব শাসনের সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত এই ধারণা ছিল নাজি মতাদর্শে অনেকটা ধর্মীয় বিশ্বাসের মত । হিটলারের এই জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের দাবিরই একটা নৃশংস প্রকাশ ছিল হলোকাস্ট । যাতে কয়েক মিলিয়ন ইহুদিকে "নিম্ন শ্রেণীর" মানুষ হবার কারণে হত্যা করেছিল জার্মান এসএস বাহিনী (SS কথাটা জার্মান শব্দ Schutzstaffel-এর সংক্ষেপ যার মানে হলো প্রটেকটিভ স্কোয়াড্রন Iহিটলারের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা (প্রটেকশন) দেবার জন্যই প্রথমে SS গঠন করা হয়েছিল।পরে এর সাফল্যের কারণে এটাকে অনেক বড় আকারে একটা প্যারা মিলিটারি বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা হয়)। আর্য শ্রেষ্ঠত্বের এই অবসেশন থেকেই গড়ে উঠেছিল একটা এরিয়ান মাস্টার রেস্ গড়ে তোলার ধারণা যা তার রিজিমকে থার্ড রাইখ হিসেবে এক হাজার বছর স্থায়ী করতে পারবে (ফার্স্ট রাইখ হলো গ্রীক বিজয়ী রোমান সাম্রাজ্য, সেকেন্ড রাইখ হলো ইউরোপের প্রভাবশালী হোহেনজোলার্ন (Hohenzollern) ডাইনাস্টি যা ব্রান্ডেনবার্গ আর প্রশিয়া (Prussia, উচ্চারণটা লিখতেই পারলাম না) বা মুটামুটি এখনকার জার্মানি জুড়ে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল | এই দুটো ক্ষমতাশালী সাম্রাজ্যই প্রায় এক হাজার বছর করে দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।)। হিটলারের এই এরিয়ান মাস্টার রেস্ গড়ে তোলার নাৎসি একটি পন্থা হিসেবেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম ।

লেবেনসবর্ন (Lebensborn) কথাটার আক্ষরিক অর্থ হলো "Spring of Life" । একটা এরিয়ান মাস্টার রেস্ তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে ১৯৩৫ সালে এই লেবেনসবর্ন পরিকল্পনার শুরু হয় I এই প্রোগ্রাম ছিল হিটলারের অন্যতম সহযোগী হাইনরিখ হিমলারের ব্রেইন চাইল্ড। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর এই সময়ে কঠিন অর্থনৈতিক চাপে জার্মানিতে জনসংখ্যা অনেক কমে যায়। ১৯৩৩ সালের দিকে জার্মানির জন্ম হার ছিল প্রতি হাজারে মাত্র ১৪.৭% । একটা পরিসংখ্যানে দেখা যায় সে সময় বছরে প্রায় আট লক্ষ এবরশন হতো জার্মানিতে । লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামের একটা লক্ষ্য ছিল অন্তত একলাখ এবরশন কমানো যার মানে হলো একলাখ শিশুকে এই এবরশন থেকে বাঁচিয়ে রাখা। লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামের একটি লিখিত ধারায় প্রোগ্রামের উদ্দেশ্য নিয়ে বলা হয়েছিল "to support )racially and genetically valuable families with many children." হাইমলার জার্মান "শুদ্ধ রক্তের" মেয়েদের উদবুদ্ধ করেন তার এসএস বাহিনীর বিবাহিত ও অবিবাহিত সদস্যদের সাথে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে সোনালী চুল আর নীল চোখের জেনেটিকালি সুপিরিয়র সন্তানের জন্ম দিতে যারা একটা মাস্টার জার্মানিক নর্ডিক রেস্ তৈরী করবে । এ প্রসঙ্গেই হিমলারের উচ্চাকাঙ্খী উক্তি ছিল “Should we succeed in establishing this Nordic race and from this seedbed produce a race of 200 million then the world will belong to us” ।

লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামে পার্টিসিপেট করার জন্য আগ্রহী মেয়েদের অবশ্যই হতে হতো ব্লন্ড চুল আর নীল চোখের অধিকারিণী ।তাদের কোনো জেনেটিক ডিসঅর্ডার নেই সেটা প্রমান করতে হতো মেডিকেল চেক আপের মধ্যে দিয়ে ।তার নর্ডিক হেরিটেজের প্রমান দিতে হতো অন্তত তার গ্রান্ড পারেন্টের নর্ডিক পরিচয় প্রমান করে । তাদের বাবার পরিচয় প্রমান করতে হতো তার শুদ্ধ রেসিয়াল পরিচয়ের জন্য । লেবেনসবোর্ন মা হবার জন্য আগ্রহী মেয়েদের মাত্র ৪০% প্রোগ্রামের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো সব ধরণের মেডিকেল চেকআপ ও জাতিগত শুদ্ধতা প্রমানের পরে । লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামের শতকরা ৬০% ভাগ মা-ই ছিল অবিবাহিতা | বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসএস বাহিনীর সদস্যরাই হতো লেবেনসবোর্ন শিশুদের পিতা । শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভেবে সেরা জার্মান সৈন্যদের নিয়ে তৈরী এসএস বাহিনী ছিল নাজি বাহিনীর সবচেয়ে এলিট ফোর্স । এস এস সদস্যদের বিবাহের ক্ষেত্রে উর্দ্ধতনের অনুমতি নিতে হতো ভাবি বধূর লেবেনসবোর্ন ক্রাইটেরিয়া সঠিকভাবে পূৰণ হয়েছে কিনা সেটা নিশ্চিত করতে । ১৯৩৬ সালে এসএসের এক অর্ডিন্যান্সে সদস্যদের অন্তত চারটি সন্তান জন্ম দিতে পরামর্শ দেওয়া হয় । জাতিগত শুদ্ধতা রাখার জন্য অনেক লেবেনসবোর্ন শিশুর পিতাই নিজের আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে করেন হিমলারের আদেশে।

লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রাম জার্মান মা-দের বেশি ছেলেমেয়ে নেবার জন্য নানা ধরণের ইনসেনটিভ ঘোষণা করে । যেমন দশ বছরের কম সময়ে তিন বা তার বেশি শিশু নেওয়া মা -দের জন্য "অনারারি কার্ড" ইস্যু করা হতো যা দিয়ে দোকানের লম্বা লাইন এড়িয়ে কার্ডধারী মা-দের সরাসরি কেনা কাটার সুযোগ,বিভিন্ন রেন্টের ক্ষেত্রে ডিস্কাউন্ট পাওয়া যেত । রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলো তে সহজশর্তে ও স্বল্প ইন্টারেস্টে লোন দেওয়া হতো লেবেনসবোর্ন অভিভাবকদের । লেবেনসবোর্ন মা-দের জন্য ছিল সম্মানজনক "Mother's Cross" মেডেল । চার সন্তানের জন্য ব্রোঞ্জ মেডেল, ছয় সন্তানের জন্য সিলভার এবং আট সন্তানের জন্য গোল্ড মেডেল ।

১৯৩৬ সালে প্রথম লেবেনসবর্ন হোমটি তৈরী হয় মিউনিকের কাছে ছোট গ্রাম Steinhoering-এ I লেবেনসবর্ন হোমগুলির বেশিরভাগই তৈরী হয় বাজেয়াপ্ত ইহুদি সম্পত্তিতে । জার্মানির ভেতরে এই প্রোগ্রামের আওতায় বিভিন্ন স্থানে ১০টি লেবেনসবর্ন হোম তৈরী করা হয় যাতে সেখানে প্রোগ্রামে পার্টিসিপেট করা অবিবাহিতা মা-দের নিজেদের বাসা থেকে অনেক দূরে তাদের সন্তানদের জন্ম দিতে পারে সামাজিক বাধার মুখে না পরেই । জার্মানিতে ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে ৮,০০০ লেবেনসবর্ন শিশু জন্ম নেয় । এই প্রোগ্রামের নিজস্ব জন্ম রেজিস্ট্রেশন অফিসও ছিল যাতে এই সব লেবেনসবর্ণ শিশুদের পরিচয় গোপন রাখা যায় । যে সব অবিবাহিতা মা তাদের শিশুদের নিজেদের কাছে রাখতে চাইতেন না সামাজিক কারণে তাদের জন্য এই প্রোগ্রামের বিশেষ এডাপশন সার্ভিস ছিল । যার মাধ্যমে এই প্রোগ্রাম থেকেই এই সব 'বিশেষ' শিশুদের দেয়া হতো অভিজাত ও ধনী জার্মান পরিবারের কাছে সুষ্ঠু লালন পালনের জন্য ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মান অধিকৃত দেশগুলোতেও এই লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রাম সম্প্রসারিত করা হয়। স্বাভাবিক ব্লন্ড চুল, নীল চোখ, আর ভাইকিং রক্তের উত্তরাধিকারী হিসেবে নরওয়েজিয়ান মেয়েরা ছিল লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের “racially valuable” মা ।জার্মানির বাইরে নরওয়েতেই সবচেয়ে বেশি নয়টি লেবেনসবর্ন হোম তৈরী করা হয় । ১২,০০০ লেবেনসবর্ন শিশু জন্ম নেয় জার্মান অধিকৃত নরওয়েতে । এ’ছাড়াও অস্ট্রিয়াতে দুটি, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, ও ডেনমার্কে একটি করে লেবেনসবোর্ন হোম তৈরী করা হয়। সব মিলিয়ে অধিকৃত এলাকায় মোট বিশটি হোম তৈরী করা হয় ।

লেবেনসবর্ন হোমগুলোতে জন্ম নেওয়া শিশু ছাড়াও অধিকৃত ইউরোপের থেকে চেহারায় আর্য বৈশিষ্ঠের ছাপ থাকা শিশু লেবেনসবোর্ন হোমগুলোতে অপহরণ করে পাঠানো হতো আর্য শ্রেষ্ঠত্বের মতাদর্শ অনুযায়ী বা “Germanized" করে গড়ে তুলতে । কিছু পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নন জার্মান প্রায় পাঁচ লাখ শিশুকে লেবেনসবর্ণ হোমে পাঠানো হয় । “Germanized" করার ক্ষেত্রে একটি বিষয় দেখা হতো যে এই সব শিশুদের চেহারায় কোনো ইহুদি বৈশিষ্ঠ্য যেন না থাকে । এই শিশুদের একটা বড় অংশ ছিল পোল্যান্ড, স্লোভেনিয়ার থেকে নেওয়া । একটা পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে পোল্যান্ড থেকে এসএস বাহিনী প্রায় দুই লাখ শিশুকে জার্মানিতে পাঠায় "জাৰ্মানাইজেশনের" জন্য । ১৯৪২ সালে হিমলারের আদেশে স্লোভেনিয়া থেকে ছয় থেকে বারো বছরের মধ্যে ৬০০ শিশুকে জার্মানিতে পাঠানো হয় লেবেনসবোর্ন হোমে ।জাৰ্মান হিস্টোরিয়ান ভলকার কুপ (Volker Koop) তার Give a Child to the Fuehrer – the Lebensborn Organization বইয়ে লিখেছেন যে, উনি জার্মানির ফেডারেল আর্কাইভে এই স্লোভেনিয়ান শিশুদের একটি লিস্ট পেয়েছিলেন এসএস ক্যাপ্টেনের নোটসহ যেখানে এই শিশুদের নামের পাশে লেখা ছিল “parents shot”! চুরি করা এই শিশুদের নতুন নাম, বার্থ সার্টিফিকেট, নকল বংশগত পরিচয়সহ জার্মানির লেবেনসবর্ন হোমে বা জার্মানির স্বচ্ছল পরিবারে পাঠানো হতো প্রতিপালনের জন্য । নানা শারীরিক ও জাতিগত পরীক্ষার ওপর ভিত্তিকরে লেবেনসবোর্ন হোম শিশুদের "আকাঙ্খিত ", "গ্রহণযোগ্য" ও "অনাকাঙ্খিত" এই তিনটে শ্রেণীতে ভাগ করা হতো । এই শিশুদের মাথা, শরীরের সাইজ সহ শারীরিক সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মাপ নেয়া হতো সুপিরিয়র জিনেটিক ফিটনেসের প্রমান হিসেবে ও কোনো জু বৈশিষ্ঠ্য নেই সেটা নিশ্চিত করতে ।


ফটো ২: লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের সব ছেলে মেয়ের শারীরিক বৃদ্ধির মাপ নেয়া হতো সুপিরিয়র জিনেটিক বৈশিষ্ঠ্য নির্ধারণে

লেবেনসবর্ন হোমগুলোতে জন্ম নেয়া ডিজেবল শিশু বা যাদের “Germanized” করা যেত না তাদের মেরে ফেলা হতো বা পাঠানো হতো কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে । লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের ডাক্তার আর নার্সদের নিয়োগ দেওয়া হতো এসএসের মাধ্যমেই ।তারা শুধু যে এই সব শিশুদের লালন পালনের দায়্ত্বি পালন করতো তা নয় ।এই সব শিশুদের নাজি মতবাদে ইনডকট্রিনেশনের দায়িত্বও ছিল তাদের ওপর । কোনো শিশু যথেষ্ট “Germanized" কিনা বা কাউকে কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হবে কিনা তা বির্ধাৰণের দায়িত্বও ছিল এই সব ডাক্তার আর নার্সদের ওপর।লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের মেডিকেল ডারেক্টর গ্রেগর এবনার (Gregor Ebner) ছিল হিমলারের স্কুলের বন্ধু । যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে তার বিচার করা হয় জার্মানিতে । ১৯৭৪ সালে মারা যাবার আগেও নাজি মতাদর্শের ওপর তারা অবিচল বিশ্বাস ছিল ।


ফটো ৩ : সোনালী চুল ও আশ্চর্য নীল চোখের অধিকারী এক বছর দশমাস বয়সী Folker Heinecke কে- চুরি করে “Germanized" করতে নেওয়া হয়েছিল ক্রিমিয়া থেকে ১৯৪২ সালে রাশিয়া আক্রমণের এক পর্যায়ে ।

লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের গোপনীয়তার কাৰণেই এর সম্পর্কে ঠিক তথ্যগুলো পাওয়া খুব কঠিন। যুদ্ধের শেষের দিকে এই প্রোগ্রাম সম্পর্কিত বেশির ভাগ ডকুমেন্টসই এর কর্মকর্তারা নষ্ট করে ফেলে। নিউইয়র্ক টাইমস ২০০৬ সালের "Results of Secret Nazi Breeding Program: Ordinary Folks " শিরোনামের একটা আর্টিকলে এই প্রসঙ্গে লিখেছে, "Only in the last 20 years, as the wall of silence began crumbling, have researchers been able to document the Lebensborn program "। লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রামের অনেক হোমই ছিল এক সময়ের পূর্ব জার্মানিতে । ১৯৯০ সালে জার্মানির এক হবার পরেই এই প্রোগ্রাম সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি হয় । ২০০৬ সালের দিকে ষাটোর্ধ লেবেনসবোর্ন শিশুদের একটি গ্রূপ প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে তাদের অভিজ্ঞতার কথা বললে এই প্রজেক্ট সম্পর্কে খোলাখুলি জানতে পারে সবাই। লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামের মধ্যে দিয়ে ২০০ মিলিয়ন মানুষের বিশ্বজয়ী একটা এরিয়ান মাস্টার রেস্ তৈরী করার হিটলারের লক্ষ্য সফল হয়নি । সারা পৃথিবীর ওপর একটা জাতির আধিপত্যের ইতিহাস রচিত হয়নি । ফার্স্ট রাইখ আর সেকেন্ড রাইখ তাদের আধিপত্য প্রায় একহাজার বছর স্থায় করতে পারলেও হিটলারের থার্ড রাইখ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র এগারো বছর । সোনালী চুল আর নীল চোখের সুপিরিয়র ব্রিডের এই শিশুরা থার্ড রাইখের রক্ষাকবচ হতে পারেনি । নাজি মতাদর্শ বা আর্য শ্রেষ্ঠত্বের ধারক বাহকও হয়নি । বরং যুদ্ধের পরের কঠিন দিনগুলোতে বড় হওয়া লেবেনসবোর্ন শিশুরা আইডেন্টিটি ক্রাইসিস আর সামাজিক নিগ্রহে হতাশ, এলকোহল এবং ড্র্যাগ এডিকশনে জড়িয়ে পরে ।এদের মধ্যে আত্মহত্যার হার তুলনামূলক ভাবে বেশি দেখা যায় । লেবেনসবর্ণ শিশুদের মধ্যে একজনই সারা পৃথিবীতে খুব খ্যাতি পেয়েছিলেন তিনি হলেন এসএস সদস্য বাবা আর নরওয়েজিয়ান মা-র সন্তান বিশ্বখ্যাত সুইডিশ পপ ব্যান্ড ABBA-র অন্যতম সদস্য গায়িকা, সং রাইটার এনি ফ্রিড লিঙস্টাড। ব্লগের অনেকেই হয়তো এনি ফ্রিডের অসাধারণ গলা শুনেছেন ABBA -র পৃথিবী মাতানো গানের সাথে ।


ফটো ৪- লেবেনসবোর্ন বেবী: সুইডিশ পপ ব্যান্ড ABBA -র লিড ভোকালিস্ট ও পপ আইকন এনি ফ্রিড লিঙস্টাড

এই হলো লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রামের ইতিহাস । (নীচের ফটোর) ফুটফুটে ছোট মেয়ে ইনগ্রিড ভন ওলহাফেনকে নয় মাস বয়সে অপহরণ হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় অধিকৃত স্লোভেনিয়া (সে সময়কার যুগোস্লাভিয়া) থেকে এরিয়ান মাস্টার রেস্ তৈরির উদ্দেশ্যে জাৰ্মানাইজেশনের জন্য। তার লেখা নিজের বাবা মা পিতৃ পরিচয়ের শেকড় খোঁজার মন ভার করা অসাধারণ বই "Hitler's Forgotten Children " পড়তে পড়তে অনেক ভাবনাই মাথায় এসে ভর করলো (আনা ফ্রাঙ্কের দ্যা এনেক্স পড়ার মতই মুদ্ধ হয়ে পড়েছি আমি এই বইয়ের প্রতিটা পাতা)। রূপকথার গল্পের বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো এই ছোট লেখাটারও একটা বড় উপসংহার থাকবে ।


ফটো ৫-ইনগ্রিড ভন ওলহাফেন (এরিকা চুরি হবার সময়ের নাম )

লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রাম, এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, এবং এই প্রোগ্রামের ব্যর্থতা সম্পর্কে জানার পরে কিছু ভাবনা ভাবি আমি সব সময়ই । কেন থার্ড রাইখ ব্যর্থ হলো ? কেন লেবেনসবর্ণ প্রোগ্রামের মতো একট প্রোগ্রাম যা বিজ্ঞান সাধারণ ভাবে প্রত্যাখ্যান করে না (মা বাবার জেনেটিকাল বৈশিষ্ঠ্য থেকেই শিশুর মানসিক ও শারীরিক বৈশিষ্ঠ্য নির্ধারিত হাবার কথা বিজ্ঞান স্বীকার করে) সেটা ব্যর্থ হলো ? সেই ভাবনাটা আমি এখনো ভাবি? আমি জানি হিটলারের পরাজয়ের অনেক যৌক্তিক সামরিক ব্যাখ্যা আছে যেগুলো খুবই যুক্তিগ্রাহ্য । সেগুলোর সাথে আমিও দ্বিমত করিনা। কিন্তু ইতিহাসের বিস্তীর্ণ প্রেক্ষাপট থেকে থার্ড রাইখের উত্থান, লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের পরিকল্পনাগুলো ভাবলে বিস্মিত হতেই হয়। মনে হয় হিটলারের পরাজয়,লেবেনসবোর্ন প্রোগ্রামের ব্যর্থতার পেছনে একটা থিওলজিকাল ব্যাখ্যাও কি থাকতে পারে ? যাক সেগুলো নিয়ে পরে কখনো বলা যাবে । নতুন একটা বছরের প্রথম মুহূর্ত কড়া নাড়ছে । লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম সম্পর্কে পড়তে পড়তে মাথায় আসা অন্য একটা কথা বলে লেখার শেষ করি ।

দেশ নিয়ে ব্লগারদের ভাবনা চিন্তা দেখে সব সময়ই আমার ভালো লাগা আছে । সব লেখায় কমেন্টস করা না হলেও গত কয়েক দিনে দেশ ভাবনা নিয়ে কতগুলো লেখা খুব ভালো লেগেছে । চাঁদগাজী সাহেবের একটা চিন্তা জাগানিয়া লেখা "ঢাকা মেগা সমস্যার শহর, ইহার জন্য দরকার অভিজ্ঞ এডমিনিষ্ট্রেটর" । মোস্তফা কামাল পলাশ এ বছরের অর্থনীতির নোবেল নিয়ে লিখেছেন "২০১৯ সালের অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার জয়ি অধ্যাপক অভিজিৎ ব্যানার্জি ও তার স্ত্রী এস্তার দুফলাও এর উন্নয়নশীলদেশগুলোর জন্য এর পরামর্শ"।আর একটু ব্যতিক্রমী হলেও নীল আকাশের "কতটা বেহায়া হলে কাউকে নির্লজ্জ বলা যায়!!! (প্রেক্ষাপট # বাংলাদেশের ফুটবল)" লেখাটাতেও দেশের উন্নয়নের একটা দিক নিয়ে চিন্তা ভাবনাটা খুবই পরিষ্কার ।

চাঁদগাজী সাহেবের লেখায় আমাদের নেতা নেত্রীদের দক্ষতার সমস্যাটা শিরোনামেই পরিষ্কার হয়ে আছে । মোস্তফা কামাল পলাশ আর নীল আকাশের লেখাটার সারমর্মেও নেতা নেত্রীদের নিয়ে সেই একই হতাশার সুর। যারা আমাদের দেশের নেতৃত্ব দেন সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের দেশ পরিচালনর ক্ষেত্রে ভয়াবহ অদক্ষতা । যেমন উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন নিশ্চিত করতে অভিজিৎ চৌধুরী যা বলেছেন তা কিন্তু খুব নতুন কিছু নয় । ১৯৭৩ সালে জার্মান ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত অক্সফোর্ড অর্থনীতিবিদ শুমেকার (E. F. Schumacher) তারবিখ্যাত বই " Small Is Beautiful: A Study of Economics" -এ বলেছেন টেকসই উন্নয়নের জন্য পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর যতদূর সম্ভব ইন্ডিজেনাস টেকনোলজি ব্যবহার করা দরকার পশ্চিমের হাইটেক ব্যবহারের প্রবণতা বাদ দিয়ে । কারণ সেটাই একটা দেশের সম্পদের সুষম ও দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করবে । তাছাড়া শুমেকার খুব জোরের সাথেই শিক্ষা, অবকাঠামোতে বিনিয়োগের কথা বলেছেন উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য । অভিজিৎ চৌধুরীর বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতার ব্যাপারটার মতো করেই অমর্ত্য সেন অনেক আগেই বলেছেন যে উন্নয়ন নিশ্চিত করতে চাইলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতেই হবে । কারণ গণতান্ত্রিক একটা সমাজেই সম্পদের সুষম বন্টন সম্ভব কারণ সেখানে সরকারের জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকে । বাংলাদেশ স্বাধীন হবার মাত্র দুই বছর পরে লেখা একটা অসাধারণ বই -যা উন্নয়নশীল যে কোনো দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার বাস্তবধর্মী ম্যানুয়াল হতে পারতো সেগুলো কি আমাদের কোনো নেতা নেত্রী পড়েছেন, না সেটার কথাগুলো নিয়ে কিছু ভেবেছেন ? আমরা হাতের কাছে রাখা উন্নয়নের সিঁড়ি ফেলে লাফ দিয়ে মহাশূন্যে সেটেলাইট উড়িয়ে উন্নয়ন নিশ্চিত করার কথা ভাবছি ! ফুটবলের রাঙ্কিংও যে ডাবল সেঞ্চুরি ছুঁই ছুঁই করছে সেখানেও ফুটবল হর্তাকর্তাদের নেতা হিসেবে সীমাহীন ব্যর্থতাই প্রধান । ভুল পদ্ধতিতে সাফল্য পাওয়া যায় না সেটা বুঝতেও আমাদের ফুটবল কর্তারা ব্যর্থ !! আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন মহান নেতা নেতৃবৃন্দ কখনোই উন্নয়নের এই সাধারণ বিষয়গুলো মনে রাখেননি বা রাখতে চাননি । লংকায় গিয়ে আমাদের মহান নেতানেত্রীবৃন্দ সবাই রাবনই হয়েছেন-মনে হয় হতেও চেয়েছেন ।

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের আদলে নেতা বানাবার একটা 'লিডারসবর্ন' সিস্টেম আমাদের দেশে তৈরী করা যায় কিনা ? সেই 'লিডারসবর্ন' সিস্টেমের স্কুল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রী ভর্তির ক্রাইটেরিয়ায় কঠিন ভাবে বংশগত উত্তরাধিকার, এখনকার নেতা নেত্রী, ব্যাঙ্ক লুটপাটকারী, ক্যাসিনোকান্ড করে সম্পদ আত্মসাৎ করা, অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখল করা, চালবাজ, তেলবাজিতে হওয়া এলিটদের ছেলেমেয়েদের বাতিল/ অযোগ্য ঘোষণা করতে করতে হবে । বাংলাদেশের শহর, বন্দর, গ্রাম খুঁজে খুঁজে সৎ,নীতিবান, দেশ প্রেমিক মানুষগুলোর ছেলেমেয়েদের অগ্রাধিকার দিতে হবে সেই স্কুল কলেজে ভর্তির ব্যাপারে।যাদের ডিএনএ অবৈধ ক্ষমতা দখল, সরকারের টাকা চুরি অপব্যবহারের জেনোমের স্পর্শে ক্লেদাক্ত হয়নি কখনো তেমন কিছু মানুষ দিয়ে আমরা আমাদের দেশ শাসনের উপযুক্ত লিডারদের একটা মাস্টার রেস্ তৈরীর কাজ শুরু করতে পারি না আসছে বছর থেকেই ? যাদের থেকে অদূর ভবিষ্যতেই আমাদের দেশ পাবে নেলসন ম্যান্ডেলা,লি কুয়ান, জর্জ ওয়াশিন বা আব্রাহাম লিঙ্কনের মতো কোনো নেতা ? হিটলারের লেবেনসবর্ন প্রোগ্রামের লক্ষ্য ছিল মানবতার বিরুদ্ধে অত্যাচার আর দুঃশাসনের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতা স্থায়ী করা । তাই হয়তো তার পতন হয়েছিল সহসাই ।কিন্তু আমাদের 'লিডারসবর্ন' প্রোগ্রামের লক্ষ্যতো অবিরল অশ্রু ধারার অন্তহীন স্রোতে ভাসা দেশের মানুষের সামান্য স্বস্তি ও সুখ নিশ্চিত করা। এই প্রোগ্রাম সফল করতেতো কোনো বিশ্বযুদ্ধ করতে হবে না আমাদের ! শুধু দরকার একটু শুভ বোধ ।এই 'লিডারসবর্ন' প্রোগ্রামটা সফল করতে আমরা সবাই উচ্চকিত হতে পারি না ?আমি খুব ইমোশনাল কোনো মানুষ না তবুও এমন একটা ইউটোপিয়ান চিন্তা ভাবনা কেন যেন লেবেনসবর্ন প্রোগ্রাম সম্পর্কে পড়ার পর থেকেই মাথায় ঘুরছে !

নতুন বছরের শুভ্ভেচ্ছা সবাইকেই ।

ফটো -ইন্টারনেট




ফটো ৬ : ইনগ্রিড ভন ওলহাফেনের লেবেনসবর্ন প্রোগাম নিয়ে নিজের শিকড় খোঁজা অসাধারণ বইটার কভার (আমেরিকান ভার্সন)
(এই ফটোটা আমার তোলা । হাহাহা ! লাইব্রেরি থেকে এনে পড়ার পর আইফোনে তোলা )

সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জানুয়ারি, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৯
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চিলেকোঠার প্রেম- ১৩

লিখেছেন কবিতা পড়ার প্রহর, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ বিকাল ৪:২৫


দিন দিন শুভ্র যেন পরম নিশ্চিন্ত হয়ে পড়ছে। পরীক্ষা শেষ। পড়ালেখাও নেই, চাকুরীও নেই আর চাকুরীর জন্য তাড়াও নেই তার মাঝে। যদি বলি শুভ্র কি করবে এবার? সে বলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন দেহের অপূর্ব সৌন্দর্যতা বুঝেন না! বলাৎকার বুঝেন?

লিখেছেন মুজিব রহমান, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৮:৩৫


শৈল্পিক প্রকাশের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয় নগ্নতাকে৷ ইউরোপে অন্ধকার যুগ কাটিয়ে রেনেসাঁ নিয়ে এসেছিল আধুনিক ও সভ্য ইউরোপ৷ রেনেসাঁ যুগের শিল্পীরা দেদারছেই এঁকেছেন শৈল্পিক নগ্ন ছবি৷... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নবীকে ব্যঙ্গ করার সঠিক শাস্তি সে ফরাসি শিক্ষক কি পেয়েছে?

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৯:৫৩



গত কয়েকদিন আগে ফ্রান্সে কি হয়েছিল? একজন শিক্ষক ক্লাসে আমাদের নবীর ব্যঙ্গচিত্র দেখিয়েছিলেন, বলা হয়েছিল তার উদ্দেশ্যে ছিল বাকস্বাধীনতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার বিষয়ে বুঝানো। এটার পর এক মুসলিম যুবক তার ধর্মীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবি ও পাঠক

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ১১:৩১

কবিদের কাজ কবিরা করেন
কবিতা লেখেন তাই
ভেতরে হয়ত মানিক রতন
কিবা ধুলোবালিছাই

জহু্রি চেনেন জহর, তেমনি
সোনার পাঠক হলে
ধুলোবালিছাই ছড়ানো পথেও
মাটি ফুঁড়ে সোনা ফলে।

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০

***

স্বরচিত কবিতাটির ছন্দ-বিশ্লেষণ

শুরুতেই সংক্ষেপে ছন্দের প্রকারভেদ জেনে নিই। ছন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রিয় খাবার সমূহ

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে অক্টোবর, ২০২০ রাত ৩:৩৪



আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)।
প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) যেসব খাবার গ্রহণ করেছেন, তা ছিল সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। নবীজি (সা.) মোরগ, লাউ, জলপাই, সামুদ্রিক মাছ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×