অনেকদিন ধরেই ভাবছি একটা বিশেষ বিষয়ে লিখব। এটা একটা ভ্রমণ কাহিনী। শিরোনামও ঠিক করে রেখেছি তিমির হননের কবি জীবনানন্দ দাশের একটা বিখ্যাত কবিতার নাম থেকে ধার করে। কবিতাটা হলো ‘আট বছর আগের একদিন’। ঘটনাটা ২০১০ সালের নভেম্বরের ২ তারিখের। ২০১০ থেকে ২০১৮- আট বছর। শিরোনামটা মনে হয় জুতসই।
বন্ধু রাতুলকে সাথে নিয়ে রাজশাহী গিয়েছিলাম ভর্তি পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা দিয়ে ময়মনসিংহে ফিরব অথচ ময়মনসিংহের কোনো বাস নেই। সন্ধ্যে নামছিল তখন। আমরা বিআরটিসির বিশেষ বাসে করে ময়মনসিংহ থেকে রাজশাহী গিয়েছিলাম। সেদিন কেন জানি বাস ছিল না। ঢাকা যেতে হবে। তারপর সেখান থেকে ময়মনসিংহে আসতে হবে।
আমি ভাবলাম ট্রেনে গেলে কেমন হয়? রাতুল আমার প্রস্তাবে সায় দিল। বাসস্টপেজ থেকে রেলস্টেশন কাছেই। হাঁটা দিলাম। পৌঁছতে পাঁচ মিনিট লাগল।
রাজশাহী থেকে ময়মনসিংহের সরাসরি ট্রেন নেই। প্রথমে ঢাকায় যেতে হবে। উপায়ান্তর না পেয়ে ট্রেনের টিকিট কাটতে গেলাম।
সিট নেই। স্ট্যান্ডিং টিকিট কাটতে হবে। তাই কাটলাম। আমাদের ট্রেন আসবে সেই ১১:৪৫ এ। দীর্ঘ অপেক্ষা।
হাঁটাহাঁটি চলল অনেকক্ষণ। অর্থী, সীমা, ইফতি নামের তিন জনের সাথে পরিচয় হলো। তারাও ঢাকার যাত্রী। অর্থী আর সীমার বাড়ি খুলনা। ইফতির বাড়িটা কোথায় ঠিক মনে নেই।
ট্রেনে আমরা একই বগিতে ওঠলাম। সবাই স্ট্যান্ডিং যাত্রী। এতদূর কি আর দাঁড়িয়ে যাওয়া যায়? পত্রিকা কিনে নিলাম বসার জন্য, কিছু শুকনো খাবারও; পথে যদি খিদে পায়।
আমাদের সাথে ত্রিশ-বত্রিশ বছর বয়সি এক মহিলাও ওঠেছেন, সাথে তার আট-দশ বছর বয়সি এক বাচ্চা। উনার বাপের বাড়ি রাজশাহীতেই। স্বামী ব্যস্ত থাকায় বাচ্চাকে নিয়ে একাই ঢাকায় ফিরছিলেন।
ট্রেন ভর্তি মানুষ। দম ফেলার ফুরসত নেই। আমরা যখন বসে আছি, গল্প-গুজব করছি এমন সময় মহিলা বললেন, বাথরুমে যাব। কী একটা অবস্থা! এত মানুষের ভিড় ঠেলে কেমনে সামনে যাই? অবশ্য মহিলা আগেই বলেছিলেন উনি অসুস্থ।
তিন-তিনবার বাথরুমে নিয়ে গেলাম। আমার শরীরের অবস্থা কাহিল হয়ে গেল। লোকজন নানা কথা বলছিল। অসুস্থ মানুষ নিয়ে কেউ এত ভিড়ের মধ্যে আসে?
হঠাৎ মহিলা হাঁপানি শুরু করলেন, খিঁচুনিও শুরু হলো। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। বড়োদের পরামর্শে মুখে শক্ত কাগজ গুঁজে দেওয়া হলো, হাত-পা-বুক মালিশ করা হলো। কিন্তু কোনো উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। সারা দিন মনে হয় কিছু খাননি। শুকনো খাবার খাওয়ার সময় উনাকে সাধা হয়েছিল। নিজে খাননি, ছেলেকে খাইয়েছেন। সারা দিন না খাওয়ায় শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ল। উনি অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
শেকল টেনে ট্রেন থামানো হলো ডাক্তার-বৈদ্য কিছু পাওয়া যায় কী না এই আশায়। কিছু পাওয়া যায়নি। প্রত্যন্ত এলাকা- এখানে ডাক্তার পাবে কোথায়? আমরা হতাশ হয়ে বসে রইলাম। মহিলা তাহলে মরেই গেল? লাশ কোথায় নেব, বাচ্চাটারই বা কী হবে? লোকজন ভেবেছিল আমি মনে হয় উনার আত্মীয়। পরে যখন দেখা গেল আমি কেউ না, তখন ওরাও হতাশ হলো।
পরিশিষ্টঃ মহিলা মারা যাননি। বিমানবন্দরের কাছাকাছি আসতেই উনি জ্ঞান ফিরে পান এবং বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে যান। আমরাও এখানেই নামি। অর্থী, সীমা আর ইফতি নামে কমলাপুর রেলস্টেশনে।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৪:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



