somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৮

২৮ শে জুন, ২০০৮ ভোর ৪:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আগের পোষ্টসমূহের ধারাবাহিকতায়-



গনহত্যা

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা ১৯৭১ এর মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্বিচারে গনহত্যা, অত্যাচার, ধর্ষন এবং অগ্নিসংযোগ চালায়।

আনুমানিক ত্রিশ লক্ষ লোক তাদের হাতে শহীদ হয়। দুই হতে চার লক্ষ নারী তাদের হাতে শারিরীক নির্যাতনের স্বীকার হয়। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর এটাই ছিল স্বল্পতম সময়ে নৃশংসতম গনহত্যা। বাংলাদেশের কোন গ্রাম এবং শহর তাদের এই ধ্বংসলীলা থেকে রেহাই পায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়ঃ

১. ডাঃ জেবা মাহমুদের ভাযায় তার পিতা রাজশাহীর সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা মামুন মাহমুদ সম্পর্কে -

কিছু স্থানীয় রাজনীতিবিদ এবং পুলিশ কর্মকর্তা তার বাসায় গোপন মিটিং করেন। কিন্তু তা গোপন ছিলনা। কারন ঐ মিটিং-এ কিছু রাজাকার উপস্থিত ছিল যারা পাকিস্তানি সেনা বাহিনীর কাছে মিটিং-এর খবর পৌছে দেয়।

আমার বাবা ছিলেন কোষাগারের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। সকালে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাপ্টেন কোষাগারে প্রবেশ করতে চাইলে স্থানীয় পুলিশ বাধা দিলে সে আমার বাবাকে জানায়। আমার বাবা জবাবে বলেছিলেন, "আমার লোকজন সঠিক কাজই করেছে। কোষগারে প্রবেশের কোন অধিকার তোমার নেই।" ঐ ক্যাপ্টেন সন্ধ্যায় আবার আসে এবং আমার বাবাকে জানায় রংপুর থেকে ব্রিগেডিয়ার তার সাথে কথা বলতে চায়। আমার বাবাকে সরাসরি গ্রেপ্তারের সাহস তাদের ছিলনা। তারা তাদের সাথে বাবাকে ক্যান্টনমেন্টে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে।

আমার এখনও মনে আছে বাবা জীপে করে ড্রাইভার এবং গার্ড সহ ক্যান্টনমেন্টে যান। তিনি আর কোনদিন ফিরে আসেননি। যেই শয়তানের থাবা থেকে বাবা দেশকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন সেই শয়তানই আমার বাবাকে চিরতরে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়।


২. সংবাদকর্মী নাদিম কাদেরের ভাষায় তার বাবা চট্টগ্রামের কর্ণেল কাদের সম্পর্কে -


একদিন খুব ভোরে একজন পাকিস্তানী ক্যাপ্টেন তার বাহিনী নিয়ে আমাদের বাসায় এসে আমার বাবাকে বলে, "তুমি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও তোমাকে আমি সম্মান দেখাতে পারছিনা। তুমি একজন বিশ্বাসঘাতক, তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।" তারপর থেকে সকল তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বাবাকে সর্বত্র খুঁজি কিন্তু আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার মা তার জন্য অপেক্ষা করেন। আমরা তার লাশ দেখিনি তাই সবসময় এই আশায় থাকি যে তিনি একদিন ফিরে আসবেন।

আমার বাবার একমাত্র অপরাধ ছিলো তেল এবং গ্যাসকুপ খননের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক যেই গুদামে থাকতো তার চাবি আমার বাবার কাছে থাকতো এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী জোরপূর্বক সেই গুদাম খুলে তারা কোন বিস্ফোরক পায়নি। তিনি সব বিস্ফোরক মুক্তিযোদ্ধা মেজর রফিকের কাছে হস্তান্তর করেছিলেন। এই বিস্ফোরকগুলো মুক্তিযোদ্ধারা ব্যবহার করতো।

৩. আফতাব আহমেদের মুখে তার বড় ভাই সৈয়দপুরের ডঃ শামশেদ আলী সম্পর্কে -

সৈয়দপুরের উত্তরে একটি বাষ্পীয় ইঞ্জিন ছিল যেখানে মৃতদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলা হতো। গ্রেপ্তারের পরে আমার ভাইকে সেই ইঞ্জিনের কাছে একটি গর্তের পাশে গুলি করার জন্য নেয়া হয়। মির্জা নামক একজন বিহারীকে এই হত্যার দ্বায়িত্ব দেয়া হয়। গুলি করার সময় আমার ভাই রাইফেলটি ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন কিন্তু তিনি ব্যর্থ হন। এরপর তারা আমার ভাইকে হত্যা করে ষ্টীম ইঞ্জিনে তার মৃতদেহ পুরিয়ে ফেলার চেষ্টা করে কিন্তু তার বিশাল শারিরীক আকৃতির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তখন তারা তার দু-হাত, দু-পা কেটে ফেলে তার শরীরটি পুড়িয়ে ফেলে। আমরা দাফনের জন্য তার দেহটি পাইনি।

৪. খুলনার মুক্তিযোদ্ধা সালাম খানের মুখে তার চার মাসের শিশু রেহানা সম্পর্কে -

চার মাসের শিশু রেহানাও ছিল পাকিস্তানী বাহিনীর নৃশংসতার শিকার। তার অপরাধ ছিলো সে মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম খানের কন্যা। ৩০শে এপ্রিল, ১৯৭১ পাকিস্তানী বাহিনী তার বাড়ীতে হানা দেয়। কিন্তু আবদুস সালামকে না পেয়ে তারা রেহানাকে বুটের তলায় পিষ্ট করে হত্যা করে।



[চলবে]


পুর্বের পোষ্টসমুহঃ

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ১

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ২

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৩

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৪

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৫

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৬

ফিরে দেখুন আমাদের ইতিহাস - ৭


সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুন, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৩
১৪টি মন্তব্য ১৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×