somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শাশ্বত০০৭
কবিতায় ক্ষুধার্ত প্রজন্ম এসেছে সেই কবেও। কিন্তু এখনো তার শেষ হচ্ছেনা। বস্তুবাদি লোকেরা কবি ও কবিতা দেখলেই অভাবি ও পাগলামি ভাবে..আজব..!!!

দগ্ধ দেহে ভালোবাসার পোড়া গন্ধ…!

১২ ই নভেম্বর, ২০১৩ বিকাল ৩:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সুখের ঘর ছেড়ে যেদিন সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য নিজের শরীরে কেরোসিন তেল ঢেলে আগুন ধরিয়েছিল রাবেয়া, সেদিনই এই গল্পের শুরু। সোহেলদের বাড়ি থেকে মাত্র শ’দুয়েক গজ দূরে তালেব এর বাড়ি। আর এই তালেবের স্ত্রীর নামই রাবেয়া।

দিনটা বৃহস্পতি ছিল। গ্রামে হাটের দিন। ওখানে তালেবের একটা ব্যবসায় ছিল, নারকেলের। গ্রামে গ্রামে ঘুরে সে নারকেল কিনে পাইকারি বিক্রি করতো। যদিও ক্রমাগত লোকসানের মুখে তার ছিল খিটখিটে মেজাজ। লোকসানটাও নিজের অবুঝ ব্যবসায়িক মাথার কারণে। বাজারের হালচাল না বুঝে এর-তার কথায় গন্ডায় গন্ডায় টাকা খরচ করে নারকেল কিনে অবশেষে লসে বিক্রি করতে হত। তবুও ব্যবসায় তার করাই লাগবে। শত মানা করলেও শোনার ছেলে সে না।

আর এই গল্পের সাথে এখানেই সংঘর্ষ। লসের উপর লস দিয়ে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে চোলাই মদ গিলে ঘরে এসে বৌ এর সাথে ঝগড়া। তারপর নির্যাতন। এতে আবার বাতাস দিত তার মা। ওই মহিলা সারাদিন বারান্দার চৌকিতে শুয়ে থেকে বেটার বৌ এর খুঁটিনাটি নোট করে রাখত। ছেলে বাড়ি ফিরলেই যে কোন এক ফাকে কানে লাগাত। আর যায় কোথায়! শুরু হত তুলকালাম।

তাও বেশ চলছিল। বৌটা মানিয়ে নিতে চাইছিল সব কষ্ট সহ্য করেও। কিন্তু পারলো না। আগাগোড়া মদ্যপ হয়ে সেদিন বাইরে থকে ফিরেই সামান্য একটা বিষয় নিয়ে বেঁধে গেল। গালিগালাজ, হাকডাক এর সাথে শুরু হল এবং শেষ হল হালের গরুকে পেটানো ‘হেলো লাঠি’ এর মারে! বৌ যে কোন মানুষ তা এই পেটানো দেখলে মনে হবেনা। মনে হবে শত সহস্রের অবলা জীবকে কষে পেটাচ্ছে মহাকালের কোন ষাড়!
চল্লিশ হাজার টাকা দাবি করেছিল সে শশুরের কাছে। এই নিয়ে বায়নার তৃতীয় ধাপ চলছিল। প্রথম ধাপে একটা রঙিন টিভি এবং দ্বিতীয় ধাপে একটা বাই সাইকেল ছিল। রাবেয়ার বাবা প্রথম দুটি মিটিয়েছিলেন অনেক কষ্টে। কারণ মেয়ে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। বিয়েতে কিছুই দেওয়া হয়নি। তালেবরা তাদের চেয়েও একটু শরীফ ঘরের ছেলে। তাই জামাই এর সামান্য আবদার মিটাতে কলুর বলদের মত খেটে আগের দুটো দিয়ে ছিলেন। কিন্তু এবার চল্লিশ হাজার টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। আর এমন দিতে থাকলে চলে কি করে। তারতো আরো মেয়ে আছে। তারাও দেখছে। ওদেরও বিয়ের পরে যদি এমন দাবী থাকে তবে নিজের শুধু খেটেই যেতে হবে জামাইদের আবদার মেটাতে।
এজন্য রাবেয়া যেদিন প্রথম এসে টাকার কথা উঠিয়েছিল তাকে প্রকারান্তে না করে দিয়েছিলেন। একটু কড়া কথাও শুনিয়ে দিয়েছিলেন। তার মা জামাইকে বুঝিয়ে বলতে বলেছিলেন। এবং সে এসে তাইই করেছিল। কিন্তু কাজ হয়নি। ফাও পাওয়ার স্থান বন্ধ হয়ে গেলে অলস ও দুষ্কৃতিকারি লোকের মাথা গরম হয়ে যায়। মেনে নিতে পারেনা। তালেবও মেনে নিতে পারলোনা। তারপর থেকে ভালোবাসা হাওয়ায় মিলিয়ে গেল ও শুরু হল বৌ এর উপর নির্যাতন।

অকথ্য নির্যাতনের মাত্রা এমন সীমাছাড়া হয়েছিল যে বৌকে পিটিয়ে শিকল দিয়ে বেধে রাখা হত মাঝে মধ্যে! তাতে কাজ না হওয়াতে নতুন ফন্দি আঁটা শুরু করল তার মা। মায়ের কথা মত বৌকে সন্দেহের চোঁখে দেখতে শুরু করল। বৌ নাকি পাশের বাড়ির সোহেলের সাথে হেসে হেসে কথা কয়! তাকে দেখলেই নাকি গলে পড়ে! এই সব কানে ঢুকত আর চুলের মুঠি ধরে কষে লাথি মারত সাধের বৌ এর পেটে! পাড়া প্রতিবেশিরা আগে মানা করতো, ঠেকাতে আসতো। তারপর তারাও বাদ দিয়েছিল। দূরে দাড়িয়ে মজা দেখতো। সোহেলের মা-ই ঠেকাতে আসতেন বেশিরভাগ সময়ে। তবে ছেলের সাথে অপবাদ দিচ্ছে শুনে উনি ভুলেও আর এমুখো হতেন না। ছেলেকেও মানা করে দিয়েছিলেন এই বাড়ির সীমানায় পা না দিতে।

এভাবেই ওদিন একচোট মারের পরে ভাতের থালা বাইরে ছুড়ে দিয়ে গজ গজ করে বেরিয়েছিল তালেব। প্রতিবেশিদের সামনেও চরমভাবে হেনস্তা করেছিল।
দিন গড়িয়ে সন্ধার প্রায় কাছাকাছি সময়ে সোহেল দেখলো তাদের বাড়ির পিছনের পেয়ারা গাছের পাশেই আচমকা দাউদাউ শিখা জ্বলে উঠলো! ভয়ে, আকস্মিকতায় চিত্কার দিয়ে উঠলো সে। দেখলো একটা মানুষ জ্বলন্ত শিখাময় শরীর নিয়ে মরণ চিত্কার করে দৌড়ে আসছে তাদের বাড়ির দিকে। চিত্কারে বাড়ির সবাই বেরিয়ে এল। সবাই হতবাক! বুঝলো রাবেয়াই আসছে এভাবে। কিন্তু সে আসতে পারলোনা। লুটিয়ে পড়লো। পোড়ার যন্ত্রণায় বেঁকে যাচ্ছিল বলে মনে হল। দৌড়ে গেল সে ও তার মা। একটা ছেড়া কাঁথা চেপে ধরলেন গায়ে আর সে শার্ট খুলে ঝেড়ে নিভাতে লাগলো।
রাবেয়ার শাশুড়ি ও তার ছোট ছেলে, ছেলের বৌও এসেছিল। ধরাধরি করে নিয়ে গেল বাড়িতে। বাড়ির উঠোনে পাটিতে দলাপাকানো শরীরটা রেখে ছোট ছেলে ছুটলো ডাক্তার আনতে। সে ওই যে গেলতো গেলই। পালিয়ে গেল বুদ্ধি করে। তালেবকেও ফোন করে অবস্থার কথা জানালো। এবং সেও আর বাড়ি মুখো হল না। ডাক্তার অবশেষে সোহেলেরই ডেকে আনতে হল। সারা পাড়া ভেঙে পড়লো পোড়া রাবেয়াকে দেখতে! এর মধ্যেই তার বাবা, মা, ভাই এবং বোনরা এসে গিয়েছিল পাশের গ্রাম থেকে। কান্নাকাটি, হৈ-হুল্লার মাঝে কোন এক সময়ে রাবেয়া পৃথিবী ছাড়ল। কেউ টের পেলনা। ডাক্তার এসে দেখলেন মরে গেছে। এবং তখনি তার শাশুড়ি মড়া কান্না শুরু করে দিল ‘ আমার সোনার মানিক চলে গেল রে...ওরে কি লক্ষি ছিল রে....!’

রাবেয়ার মা অজ্ঞান হয়ে গেলেন মেয়ে হারানোর শোকে। বোনরা কাঁদতে লাগলো গলা ছেড়ে। আর তার বাবা শোকে পাথর হয়ে ছুটলেন থানায়। যদিও তার মনে সন্দেহ ছিল কেস হওয়া না হওয়ার ব্যপারে। পুলিশ এসে লাশ নিয়ে ময়নাতদন্ত না করে কেস যে নেবে না তা জানতেন। তারপরেও ছুটতে হল। পুলিশ এল। সবাইকে সরিয়ে লাশ নিয়ে গেল। আটক করলো শুধু শাশুড়ি ও তার ছোট বেটার বৌকে। সোহেল ও তার পরিবারকে পোহাতে হল জিজ্ঞাসাবাদের চরম অসহনীয় পরিস্থিতি।
রাত গভীর হল। চোঁখের সামনে ভেসে উঠলো আগুনের লেলিহান শিখা। ভয়াল চিত্কার কানে টু-টু শব্দের মত গেঁথে রইল। জ্বর এল শরীর কাঁপিয়ে। জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকলো। তারপর সকালে উঠে দেখলো সব ঠান্ডা। গতকালও এমন সকাল ছিল। আজ শুধু ও বাড়ির চিত্কার-চেচামেচিটা নেই, রাবেয়া ভাবীর কান্না কানে আসছে না, পাড়া প্রতিবেশির উত্সুক দৃষ্টি নজরে আসছেনা। আগুন ভাবীর নির্যাতিত শরীর, চিত্কার, কষ্ট, কান্নাকে চিরতরে পুড়িয়ে দিয়ে গেছে পৃথিবী থেকে! এ আগুন কেরোসিনের ছিল না, ছিল যৌতুকের! ভালোবাসা মানুষে মানুষে ছিল না, ছিল টাকায়-পশুতে। কিন্তু তার চলে যাওয়া ভুলে যাওয়ার নয়, শিক্ষার। এমন করেই শত শত রাবেয়ারা পুড়ে যায়। তবু সমাজ শিক্ষা নেয় না। গোয়ার মস্তিষ্কে নারী মানেই ভোগ্য সামগ্রি! সে তার শরীর হোক বা তার দ্বারা পাওয়া সেবা, অর্থ অথবা অন্য কামণায়!

পেয়ারা গাছের কাছে গেল ধীরে ধীরে। যেতে যেতে মনে হল এখনো বাতাসে পোড়া গন্ধ ভাসছে..! যেন যুগ যুগ ধরে তা থেকে যাবে...!
শাশ্বত ৩০.১০.১৩
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭ নভেম্বরঃ যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:০৭

৭ নভেম্বরঃ
যা ঘটেছিল এবং ভাবুন- না ঘটলে কী হতো?

১৯৭৫ থেকে ২০২৬, মাঝখানে পেরিয়ে গেছে অর্ধশত বছর! এই সময়ের মধ্যে ঘুরেফিরে সরকার পরিচালনা করেছে- বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগ... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা সেতু চালুই কি বিআইডব্লিউটিসির লোকসানের একমাত্র কারণ? নাকি প্রশাসনিক স্থবিরতার মাশুল?

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০১

টানা পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিক লোকসান গুনছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থা (বিআইডব্লিউটিসি)। সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সংস্থার নিজস্ব মূল্যায়নে সোজাসাপ্টা বলে দেওয়া হলো—পদ্মা সেতু চালু হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুরানো সেই দিনের কথা ....

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫৭


নওগাঁর বদলগাছীতে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ১৫ জন শিক্ষার্থীর মাথার চুল কাঁচি দিয়ে এলোমেলোভাবে কেটে দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, শিশুদের চুল বড় হয়ে চোখের ওপর পড়ছিল, দেখতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×